একটি প্রেমের গল্প " অবন্তিকা "



সবাই কে 'গল্পপড়ুয়া'র তরফ থেকে বইমেলার অনেক শুভেচ্ছা রইল।আপনাদের ভালোবাসায় আমার প্রথম প্রকাশিত বই 'যদি তোমার প্রেমের গল্প এমন হয়'  পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা বইমেলায়। অন্নপূর্ণা প্রকাশনী, ৩৬১ নং স্টল।



(১)

অবন্তিকা মেয়েটির নাম।পুরো নাম অবন্তিকা সেনগুপ্ত।বন্ধু–বান্ধব,অফিসের স্টাফ রা, আত্মীয়,স্বজন সবাই অবন্তিকা'র 'কা' অক্ষর টি কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছে।ছোটো করে সবাই অবন্তি বলে ডাকে।বয়েস পঁচিশের কাছাকাছি। খুব ফর্সা না হলেও,কালো নয়। ছিপছিপে, পাতলা গড়ন হলেও,তাকে রোগা বলা যায় না। চোখে মুখে একটা বুদ্ধিমত্তার ছাপ স্পষ্ট।দেখা গেছে,স্লিম ফিগারের মেয়েরা,অন্যদের তুলনায় একটু বেশী বুদ্ধিমান হয়।গোলগাল মুখের উপর, এক টুকরো কালো চুল যখন হাওয়ায় উড়ে এসে পড়ে তখন মুখশ্রী টা সদ্য ফোটা কমল এরমতো সুন্দর লাগে।আমার গল্পের নায়িকা অবন্তিকা, চপল স্বভাবের,হরিণীনয়না,সর্বদা পুলকময়, মোলায়েম ঠোঁট টি তে সবসময় স্মিত হাসি লেগেই আছে।

প্রতিদিন সূর্যের লাল রঙ গায়ে মেখে আকাশের ঘুম ভাঙে।গাছ–গাছালি,ঘাস–লতা,পাখিরাও জেগে ওঠে নতুন দিনের আহ্বানে।সেই সাথে অবন্তিকার ও ঘুমটা ভেঙে যায়।উঠে বসে খাটের উপর,তারপর হাত বাড়িয়ে পাশের জানালা টা খুলে দেয়।বাইরে টা তখনোও পরিষ্কার নয়,আবছায়া অন্ধকার।সারা টা শহর বোধহয় এখনোও ঘুমিয়ে আছে।বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে,কিচেন রুমে ঢুকে পড়ে।
ঘড়িতে সকাল পৌনে সাত টা।
–" মামী,টিপিন তৈরী রইল। খেয়ে নেবে সবাই।টিঙ্কুর টা টিপিনকৌটাতে ভরে দিয়েছি।" অবন্তিকা চেঁচালো।বেগুনি রঙেরব্যাগটা কাঁধের এক পাশে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ল।–"আজ আবার লেট হবে।"
বাস থেকে অফিসের সামনে নেমে,হাতের ঘড়ির দিকে তাকাতেই বুকটা দুরু দুরু করে উঠল অবন্তিকার।যা ভেবেছিল,ঠিক সেটাই হয়েছে! অফিসে ঢুকতেই,সৃজিতা বলল,–'আজ আবার লেট করলি! বস অনেক আগেই ঢুকে গেছে।"
ঠিক দশ মিনিট পর বসের রুম থেকে ডাক এল অবন্তিকার।আর হবে নাই বা কেন! প্রতিদিন যদি কেউ লেট করে আসে,তাহলে ডাক তো পড়বেই। ভয়ে ভয়ে বসের রুমের কাছে গিয়ে,দরজা টা আস্তে করে ঠেলে অবন্তিকা বলল,–"আসব স্যার!"
–"এসো।"
অবন্তিকা মাথাটা নীচু করে ঘরে ঢুকলো।
–" তোমার ব্যাপার টা কি! প্রতিদিন আধ ঘন্টা লেট করে অফিসে ঢুকছো?এটা সরকারি অফিস নয়। এখানে একটা রুল আছে।"
—"স্যার! মায়ের শরীর টা খারাপ। সকালে একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়েছিল।"অবন্তিকা মাথা নীচু করে জবাব দিল।
–"গত কাল বললে, বাবার শরীর ঠিক ছিল না! আজ মা! কখন বের হও ঘর থেকে?"
–"পৌনে সাত টা"
–" পৌনে সাত টা! তবু এই টুকু পথ আসতে এত লেট হয়?"
—" আর কোনোদিন হবে না স্যার।"
–" কথা টা যেন মাথায় থাকে।"
অবন্তিকা আর কোনো কথা বলল না।মুখ নীচু করে দু পাশে ঘাড় কাত করল।তারপর ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।


(২)

রাহুল রয়,রয় ইন্ডাস্ট্রির একমাত্র কর্নধার।লম্বা, চওড়া চেহারা।পুরুষালি গলার আওয়াজ।বয়েস সাতাশের কাছাকাছি।পরনে তার সবসময় সময় সাদা জামা, কালো প্যান্ট।তিন তলা অফিস। বাবার তৈরী করে দেওয়া ছোটো জিনিষ টা আজ শাখা–প্রশাখার মতো চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে।অল্প বয়েসে তার এই প্রতিভা অনেকের কাছে ঈর্ষার মতো।অনেক কর্মচারী কাজ করে তার আন্ডারে।বাড়ি থেকে প্রতিদিন ঝকঝকে চার চাকার গাড়ি করে নিজের অফিসে আসে।
শুধু একবার নয়,এই নিয়ে পর পর তিন দিন অবন্তিকা কে দেখতে পেল।এর আগে কোনোদিন দেখিনি।হয়তো সে ভাবে লক্ষ্য ও করিনি,তাই চোখে পড়েনি। বাড়ি থেকে তার অফিসে আসার পথে একটা অনাথ আশ্রম পড়ে। কোমর সমান পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। গেট দিয়ে ঢোকার পথে ফুলের বাগান।তারপর আশ্রমের ঘর।আজ নিয়ে,এই পর পর তিন দিন রাহুল,অবন্তিকা কে এই বাড়ি থেকে বেরোতে দেখলো।তারপর হন্তদন্ত হয়ে বাস ধরতে। পরদিন গাড়ি থেকে বেরিয়ে চোখ টা ভেতরে রাখতেই ব্যাপার টা দেখতে পেল রাহুল।এবং বুঝতেও পারল অবন্তিকার প্রতিদিন অফিসে লেট হওয়ার কারন।
আশ্রমের বারান্দায় একটা কালো ব্ল্যাক বোর্ড ঝোলানো।তার সামনে প্রায় পঁচিশ তিরিশ জন অনাথ শিশু বসে আছে।আর অবন্তিকা তাদের কে পড়াচ্ছে।
বেশ তো মেয়েটি! মন্দ নয়। যেরকম ভেবেছিল ঠিক তার উলটো। মনে মনে ভাবল রাহুল। তারপর সাঁ করে গাড়ি চালিয়ে অফিসের পথে চলে গেল।
অবন্তিকা অফিসে ঢুকতেই আবার তার ডাক পরল রাহুলের ঘরে।আজ আবার দশ মিনিট লেট।অনেক চেষ্টা করেছিল সঠিক সময়ে ঢোকার।কিন্তু বাস টাই যত নষ্টের গোড়া।মনে মনে বাসের ড্রাইভার টিকে খুব গালাগালি করতে ইচ্ছে করল অবন্তিকার।
-"আজ আবার কি সমস্যা হল তোমার?" অবন্তিকা ঘরে ঢুকতেই কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল রাহুল।
–"বাবার শরীর টা ঠিক নেই স্যার! বয়েস হয়েছে তো।" অবন্তিকা মুখ নীচু করল।
–"সাট আপ! প্রতিদিন তোমার এক অজুহাত। তোমার লজ্জা করে না,মিথ্যে মিথ্যে বাবা মাকে হসপিটলে পাঠাতে?"
অবন্তিকার চোখ দুটো পায়ের দিকে। কোনো কথা বলতে পারল না।কি বা বলবে এই অবস্থায়? দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে,এক মিনিট দাঁড়াতে বলল রাহুল।–"কাল থেকে যেমন আস তেমন লেটে আসবে।আর ছেলে, মেয়ে গুলোকে ভাল করে পড়াবে, যেন আদর্শ মানুষ তৈরী হয়।"
চমকে উঠল অবন্তিকা।স্যার তাহলে সব দেখে ফেলেছে! চোখ তুলে তাকালো রাহুলের দিকে। হাসি হাসি মুখ।গম্ভীর মুখের আড়ালে যে এত সরলতা থাকতে পারে–সে কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি। কোনো কথা না বলে,রাহুলের মুখের দিকে চেয়ে একটু হাসল অবন্তিকা। তারপর বেরিয়ে গেল দরজা দিয়ে।
ঘড়িতে ছ'টা কুড়ি।পুরো অফিস ফাঁকা।ফাঁকা হবারই কথা।অফিস শেষে, কে অফিসে বসে থাকতে চায়?পালাতে পারলে বাঁচে সবাই।কিন্তু একটা কম্পিউটার, এখনো চলছে।অবন্তিকা একবার হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো। তারপর আবার কম্পিউটারের স্ক্রিনে চোখ রাখল।শুধু কীপ্যাড প্রেসের শব্দ।
উপর থেকে নীচে নামতেই ব্যাপার টা নজরে এল রাহুলের। একটু অবাক হল।অবাক হওয়া টাই স্বাভাবিক।অফিস টাইমের শেষে যদি কেউ বসে কাজ করে,তাহলে যেকেউ অবাক হয়।হাতের ঘড়ির দিতে তাকাতে তাকাতে রাহুল জিজ্ঞেস করল,–" কি ব্যাপার অবন্তিকা?অফিস টাইম তো শেষ হয়ে গেছে কুড়ি মিনিট আগেই।"
চমকে উঠে চোখ তুলে তাকালো, অবন্তিকা।মুখ টা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।চুল গুলো এলোমেলো। কীবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে বলল,–"একটু কাজ বাকি আছে স্যার।আর তাছাড়া,আমি আধঘন্টা পরে ঢুকি,সুতারং আধঘন্টা বেশী কাজ করলে কিচ্ছু হবে না।"
অবাক হতেই হয়।এরকম কথা শুনলে সবাই অবাক হয়।রাহুল ও অবাক হল।তবে কিছু বলতে পারল না।বেশী অবাক হলে,অনেক সময় কথা হারিয়ে যায়। ছ'টা পঁইত্রিশে অফিস থেকে বেরোলো অবন্তিকা।অফিস থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়াল।মেঘলা আকাশ।বৃষ্টিও আসতে পারে। সেরকম একটা পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে ঠান্ডা হাওয়ায়।সূর্য ডুবে গিয়েছে অনেক আগেই।রাস্তার ভ্যাপার গুলো জ্বলে উঠেছে।বাস আসতে আর বেশী দেরী নেই।মিনিট দশেক বাকি।হঠাৎ একটা চার চাকার গাড়ি এসে থামল তার সামনে।–"অবন্তিকা!"
রাহুল একটা জোরে হাঁক দিল।–"আমার গাড়িতে চলো।তোমার বাড়ির পাশে ছেড়ে দিচ্ছি।"
নিজের কান কে ও বিশ্বাস করতে পারল না। এরকম ঘটনা ঘটলে বিশ্বাস ও করা যায় না মাঝে মাঝে। এত বড় একজন মানুষ তাকে ডাকছে! গাড়ির কাছে এসে অবন্তিকা বলল,–" না,স্যার! ঠিক আছে।আমি বাসে চলে যেতে পারবো।"
আরও একবার রিকোয়েস্ট করার পর,আর না বলতে পারল না। গাড়িতে এসে বসল।ভয় ভয় করতে লাগল তার।বসের গাড়িতে! কেউ যদি জেনে যায়! কী ভাববে সবাই?বস আর স্টাফ এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটে।এরকম অনেক গল্প সে শুনেছে। না!গাড়িতে না ওঠাই ঠিক ছিল। কিছু একটা বাহানা বানালেই হত!
–"তুমি খুব মিথ্যে কথা বল,তাই না?"
চমকে উঠে 'অ্যাঁ ' করল অবন্তিকা।গাড়ীর ভেতর এসি চালানো,তবুও ঘেমে উঠছে সে।
–" বাবা–মা কে মিথ্যে মিথ্যে প্রতিদিন সকালে হসপিটলে পাঠাতে ভাল লাগে?"
অবন্তিকা হাসল,–ফ্যাকাশে,রঙচটা হাসি।এবার আর মিথ্যে কথা বলতে পারল না অবন্তিকা। সত্যিটা বলল।–"আমার বাবা–মা নেই।মামার কাছে মানুষ।মামার বাড়িতেই থাকি।"
ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল রাহুল।সামনে ঝুঁকে পড়ল দুজনই।–"স্যার,আমার বাড়ির গলির কাছে এসে গেছে। এখানেই নেমে গেলে হবে।"
গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো অবন্তিকা।খুব ইচ্ছে করল,রাহুল কে 'বাই' বলে হাত নাড়তে।হাত ওঠাতে পারল না।এখনো তার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে আছে রাহুল। একটা ছোটো ধন্যবাদ জানিয়ে, বাড়ির দিকে পা বাড়াল সে।

(৩)

কি অদ্ভুত মেয়ে!
মনের মধ্যে এত বড় একটা কষ্ট চেপে রেখে,তবু হাসি মুখে জীবনটা কে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। জীবন কে কত সহজ করে নিয়েছে।যেন কোনো দু:খ নেই তার। গোলাপি ঠোঁট দুটোতে সর্বদা একটা মিষ্টি হাসি।প্রানবন্ত–উচ্ছ্বল–মিশুকে– হাসিখুশি–শুধু একটু মাঝে মাঝে মিথ্যে বলে। কিন্তু সে তো দরকারে বলে।
অফিসের সামনে এসে গাড়িতে ব্রেক কষলো রাহুল।মনে মনে একটু হাসল।ভেতরে ঢুকে অবন্তিকা কে দেখতে পেল না।আজ হয়তো একটু বেশী লেট হচ্ছে!
অনেক সময় কেটে গেল।অবন্তিকা এল না। সৃজিতা কে জিজ্ঞেস করে ব্যাপারটা জানতে পারল। অবন্তিকার খুব জ্বর।হসপিটলে ভর্তি। টিফিন আওয়ারে পর,গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল রাহুল।সোজা হসপিটলের সামনে এসে থামলো। গাড়িটা পার্কিং করে,রিসেপসনে গিয়ে খবর নিল।–" সেকেন্ড ফ্লোর,বারো নাম্বার রুম।"

ভূত দেখলেও বোধ হয়, এত অবাক হত না অবন্তিকা –যতটা রাহুল কে দেখে হল।
–"কি করে হল?" রাহুল জিজ্ঞেস করল কাছে গিয়ে।
আবার একটা মিথ্যে বলল সে।–" জানিনা। "

আসলে গতকাল রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। যাকে বলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।সন্ধ্যার মেঘ ভেঙে পড়ল যেন অবন্তিকাদের ছাদে।বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ছাদের উপর পড়ে,ফেটে ছড়িয়ে পড়ছিল চারিদিকে।এক এক ঝাপটা,জানালা দিয়ে ছুটে এল তার ঘরে।ভিজে যাচ্ছিল,চুল, জামা,ফর্সা শরীর টা।নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি, ছুটে চলে গেল ছাদে।দু'হাত পাখির ডানার মতো মেলে দিয়ে ভিজলো। ইচ্ছেখুশি ভেজা।নতুন প্রেমে পড়লে নাকি বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ভালো লাগে! বৃষ্টি দেখতে খুব ভালো লাগে।বৃষ্টির শব্দ শুনতে ভালো লাগে।তাই মনে হয় বৃষ্টির সাথে প্রেমের এক অদ্ভুত সম্পর্ক।আর অবন্তিকা প্রেমে না পড়েই,বৃষ্টিতে ভিজলো।মনের একটু ভাললাগাতেই ভিজিয়ে নিল নিজেকে ।পরদিন যেটা ঘটার,সেটাই ঘটল।ভোরবেলা কাঁপুনি– ঝাঁকুনি শুরু হল। নাক বন্ধ হয়ে গেল।নিদিষ্ট সময় অন্তর হাঁচি শুরু হল।তারপর সোজা এই হসপিটলের বেডে।
এতক্ষন কথাটা ভাবেনি অবন্তিকা।ভাববার সময় পায়নি।রাহুল বেরিয়ে যেতেই ভাবনাটা শুরু হল।হঠাৎ কি হল স্যারের! এই সব বড় বড় ঘরের ছেলেরা এই রকম ই করে।যে মেয়েকে পছন্দ হয়, তাকে পেতে চায়।তারপর সব কিছু মিটে গেলে,এটা ছেড়ে আরেকটা!
এটা প্রেম হবে কি করে?
আরও কিছু আবোল–তাবোল ভাবলো।তারপর আবার চোখ বন্ধ করল।ভোর রাতে একটা স্বপ্ন দেখলো অবন্তিকা।পরের মাসে তার জন্ম দিন। আর রাহুল তাকে,নিজের রুমে ডেকে নিয়ে হাতে একটা ফুলের তোড়া দিল।লাল,নীল,সাদা ফুল। ভুর ভুর করে ফুলের গন্ধ উড়ছে ঘরের ভেতর। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো।তারপর তারদিকে এগিয়ে এসে কি বলতে যাচ্ছিল,– আর ঠিক সময় ঘুমটা ভেঙে গেল। খুব বিরক্ত হয়েছিল অবন্তিকা।স্বপ্ন গুলো এরকমই পাজী! সে শুনেছে,ভোর বেলার স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়!

শরীর টা এখন অনেকটাই ঠিক হয়ে গেছে।জ্বর টা আর নেই।মাঝে মাঝে একটু নাক টানছে। আর রুমাল দিয়ে নাক টা মুছে নিচ্ছে।নাকের ডগাটা তাই লালচে।আরও বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে মুখ টা।নার্স দিদি বলেছে দুপুরের দিকে ছেড়ে দেবে তাকে।

(৪)

অফিসের স্টাফদের সমস্ত ফাইল ঘেঁটে তছনছ করে ফেলল রাহুল। কিছু একটা খুঁজছে! কি খুঁজতে পারে আর?
-"বিভাস!"
হাঁক দিল রাহুল।সঙ্গে সঙ্গে একটা বেঁটে–খাটো লোক ঘরে এসে ঢুকলো।
—"এবছর নতুন যারা জয়েন করেছে তাদের ফাইল গুলো কোথায়?"
লকার টা দেখিয়ে দিল বিভাস।অনেক খোঁজা খুঁজির পর,অবশেষে অবন্তিকার ফাইল টা খুঁজে পেল। জন্মতারিখ টা কোথায় পাব?
সেটাও পেয়ে গেল।পরের মাসের আঠেরো তারিখ।

ঘরের মধ্যে এসি চলছে।তবুও খুব ঘামছে রাহুল।বার বার পকেট থেকে রুমাল বের করে কপাল টা মুছে নিচ্ছে।টেবিলের উপর ফুলের তোড়া টা রাখা।অফিসে আসার পথে, নিজে হাতে কিনে এনেছে। ঘড়ির কাঁটার মতো, বুকের ভেতর টা টিক টিক করতে শুরু করেছে। আর করবে নাই বা কেন?এরকম অবস্থায় সে আগে কখনো পড়েনি।
অাজ অবন্তিকার জন্মদিন।তাকে ডেকে পাঠিয়েছে,দু'মিনিট হয়ে গেল। আরও এক মিনিট পর অবন্তিকা এসে ঢুকলো।বুক টা দপ দপ করছে।এ'কশ মানুষের সাহস একত্রিত করে রাহুল উঠে দাঁড়ালো। ফুলটা অবন্তিকার হাতে দিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,–"হ্যাপি বার্থ ডে!"
খুব নার্ভাস মনে হল।যাকে দেখলে অফিসের সবাই ভয় পায়,আজ একটা মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তার এহেন অবস্থা দেখে মনে মনে হাসি পেল অবন্তিকার। খুব মজা লাগছে তার।মেয়েরা মনে হয় এরকম চায়,যে সব ছেলেদের তাদের দেখে হাঁটু কাঁপুক।অবন্তিকার ও আজ সব ভয় চলে গেছে।ফুলটা হাতে নিয়ে চোখ দু'টো বড় বড় করে বলল,–" স্যার! এটা ঠিক নয়।আমার হাতে যদি এখন ফুল দেখে,তাহলে সবাই কি ভাববে বলুন তো?"
–" কি!"
–" ভাববে,আপনি আমাকে একটু বেশি বেশি...! অনেকে নানা রকম প্রশ্ন ও করতে পারে।"
—"সেটাও ঠিক।কি হবে তাহলে?"
–"অফিস শেষে, বাড়ি ফেরার আগে এসে নিয়ে যাব!"
অবন্তিকা হেসে বেরিয়ে গেল।খুব ভাল লাগছে তার। কম্পিউটারের সামনে আর কাজ করে ইচ্ছে হল না।সারক্ষন মাউস পয়েন্ট টা, ঘোরাতে লাগল।

সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে,দরজা টা বন্ধ করে দিল অবন্তিকা।ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে,ফুলের তোড়া টা নিয়ে খাটের উপর লাফিয়ে পড়ল। বুকের উপর রাখলো।হাত বোলালো পাপড়ির উপর।ভেতর থেকে একটা ছোটো কাগজ বের করে আনলো।
—"আমাকে ভালবাসবে?"
খুব হাসি পেল অবন্তিকার।এত বড় ছেলে,আর কিরকম বাচ্চাদের মতো লেখা! কাগজ টা নিয়ে চোখের খুব সামনে এনে হেসে বলল,–"না। ভালবাসবো না।"
তারপর লেখাটির উপর ঠোঁট ছোঁয়ালো।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.