একটি ভৌতিক ছোটগল্প " জেমস "


(১)

আমার পাশের দোতলা বাড়িতেই থাকেন সুনন্দ বাবু।সুনন্দ রায় চৌধুরী।নিপাট বাঙালি ভদ্রলোক। চেহারা, কথা-বার্তায়, হাঁটা-চলায় সবসময় একধরনের আভিজাত্য চোখে পড়ে। ছ'ফুটের মতো উচ্চতা।চওড়া কাঁধ,পেশি বহুল চেহারা।গায়ের রং নাতিফর্সা।মাথায় দু'ধারে, আর পিছনের দিকটাতে হালকা সাদা চুল।আর উপরটিতে টাক।চকচকে।বয়েস আশির কাছাকাছি।বয়েসের ভারে চামড়া একটু ঝুলে পড়েছে, আর তার উপর শিরার রেখা স্পর্ষ্ট। হাতে পায়ের আঙুল গুলো বেশ লম্বা লম্বা।চোখে সবসময় সাদা কাচের,মোটা কালো ফ্রেমের চশমা।
এই হল মোটামুটি সুনন্দবাবুর চেহারার বর্ননা। সুনন্দ বাবু মিলিটারি বিভাগে চাকরী করতেন। এক সময় যে সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন, সেটা তার বর্তমান চেহারা দেখলে কিছুটা আন্দাজ করা যায় কাশ্মীর, বাংলাদেশ, মায়ানমার, চীন,সব সীমান্তেই কাজ করেছেন। তবে চাকরী জীবনের সব থেকে বেশি কাটিয়েছেন কাশ্মীর সীমান্তে।এসব গল্প আমার তার কাছেই শোনা।সুনন্দ বাবু একা মানুষ।এত বড় দোতলা বাড়িতে এখন তিনি একাই থাকেন। সঙ্গী বলতে তার একমাত্র প্রিয় কুকুর জেমস। তিন বছর হল সুনন্দ বাবুর স্ত্রী মারা গেছেন।স্ত্রী মারা যাওয়ার পর,তিনি যে খুব শক পেয়েছিলেন সেটা আমি বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।সারা দিন বাড়ির ভেতরই থাকতেন।বাইরে একদম ই বের হতেন না বললেই চলে।বিকাল বেলা পার্কেও যেতেন না।শুধু মাসের শেষে একবার ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে যেতেন।সুনন্দ বাবুর একমাত্র ছেলে সোমদীপ,সরকারি ইঞ্জিনিয়র।মুম্বাই তে থাকে। অনেক ধুমধাম করে ছেলের বিয়ে দিয়েছিলেন। বোধ হয় একটু বৌমার হাতের চা খাওয়ার আশায়।কিন্তু সেটা তার ভাগ্যে ছিল না।চা খাওয়া আর হল না।বিয়ে করার পর,ছেলে সেই যে বৌ কে নিয়ে মুম্বাই তে পাড়ি দিল,আর ফেরেনি। বছরে এক-আধবার করে এসে একদিনের জন্যে দেখা করে যেত সোমদীপ।
কিন্তু গত দশ বছরে ছেলে এসে বুড়ো বাপ টাকে একবার দেখে গেছে,এরকমটা অন্তত আমার চোখে পড়িনি।স্বামী-স্ত্রী দু'জন মিলেই জীবনের শেষ দিন গুলো কাটাচ্ছিলেন।কিন্তু হঠাৎ করে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর,প্রচন্ড শক পেলেন তিনি। বার বার একটাই কথা শুধু আমাকে বলতেন,-"খুব একা হয়ে গেলাম রে সুরজিৎ।এখন আমার একমাত্র সঙ্গী,আমার ছেলে জেমস!"সুনন্দ বাবুর গলা দিয়ে, বুকের মধ্যে জমে থাকা একটা যন্ত্রনা বেরিয়ে আসতো।
হ্যাঁ,জেমস তার কাছে শুধুমাত্র একটা কুকুর ছিল না। নিজের ছেলের মতো ভালবাসতেন জেমস কে।যত্ন, লালন-পালন করতেন।

(২)

আমার বাড়ির একে বারে গা ঘেঁষে সুনন্দ বাবুর দোতলা বাড়ি।মাঝখানে শুধু ব্যবধান বলতে একটা পাঁচিল।বেগুনি রঙা বাড়ি।মাঝে মাঝে বর্ডার গুলোতে লাল রঙ করা। বাড়ির সামনে পাঁচিলের গায়ে লোহার গেট।তার পাশে নেমপ্লেট বসানো,"সুনন্দ রায় চৌধুরী।" গেট দিয়ে ঢুকতেই খোয়া বসানো হাত দু'য়েকের চওড়া রাস্তা।ডান পাশে এক ফালি জায়গার উপর ফুলের বাগান করা।হরেক রকম ফুল।রঙবেরঙেরর।তার স্ত্রী যখন বেঁচেছিলেন তখন প্রতিমাসে বাজার থেকে নানা ধরনের ফুলের চারা কিনে এনে লাগাতেন। এখন আর বাগানটার অবস্থা আগের মত নেই। পাতা ঝরে যাওয়া গাছের মতো ন্যাড়া ন্যাড়া লাগে।একজন লোকও রেখে দিয়েছেন,রান্না, বাজার,বাগান দেখা শোনা করার জন্য।কিন্তু, নিজের শখের জিনিষের উপর নিজের যতটা যত্ন থাকে,অন্য কারোর ততটা থাকে না।
আমি মাঝে মাঝে সন্ধ্যা বেলা সুনন্দ বাবুর বাড়ি গিয়ে তার সাথে বসে গল্প করে আসি।আমার নাম সুরজিৎ সামন্ত।বয়েস পঁইত্রিশের কাছাকাছি। একটা সরকারি স্কুলে ক্লার্কের চাকরী করি।ব্যাচেলর মানুষ।তাই স্কুল থেকে ফিরে, সন্ধ্যাবেলা ওনার ঘরে চলে যাই।আমার এই আগমনে উনি কখনো বিরক্তবোধ করেন নি, বরং প্রতিদিনই আসতে বলতেন আমাকে। অনেক গল্প হত।নানা ধরনের গল্প।সুনন্দবাবুর চাকরী জীবনের গল্প,বন্দুক নিয়ে লড়াই এর গল্প,তার প্রথম ভালোবাসার গল্প। আরও অনেক। তবে বার বার ছেলেকে নিয়ে একটা আক্ষেপ তার গলায় ঝরে পড়তো।সুনন্দবাবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলতেন,-"ছেলেটা আমাকে একটা ফোন ও করে না।কেমন আছে কে জানে! ফোন করলে উলটে বলে,কাজের সময় বার বার ফোন করো কেন?"
আমার মন ও সেই কষ্টের সবটুকুই টের পেত। ঘন্টা দু'য়েক মতো গল্প হত।সুনন্দ বাবু কাজের লোকটিকে চা করতে বলতেন।চা খেতে খেতে গল্প চলতো আমাদের।এই সময় তার পুত্রসম জেমস,সুনন্দবাবুর কোলের উপর মাথা,আর সামনের দু'পা তুলে দিয়ে সোফার উপর শুয়ে থাকতো।সুনন্দ বাবু জেমসের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতেন,-"আমার এই ছেলেই, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমার কাছে থেকে যাবে।"
জেমসের একটু লম্বাটে চেহারা।স্বাস্থ্যবান।গায়ের রঙ সাদা,তার উপর কালো কালো ফুট ফুট দেওয়া। আমি যখন সুনন্দ বাবুর বাড়ি প্রথম প্রথম আসতাম,তখন জেমস হল্লা-চিল্লা শুরু করে দিত।তীব্র প্রতিবাদ।সুনন্দ বাবু কড়া গলায় বলতেন,-"জেমস! উনি আমাদের পড়শি।"
জেমস মনে হয়,সুনন্দ বাবুর সব কথা বুঝতে পারতেন।ধমক খেয়ে চুপ হয়ে যেত জেমস। তারপর একটু একটু করে জেমসের সাথে আমার পরিচয় হয়ে গেল।আমাকে দেখলে আর প্রতিবাদ জানাতো না।পায়ের কাছে এসে,আমার মুখের দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়তো।আমিও একটু আদর করে জেমসের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম।

(৩)

হঠাৎ একদিন সুনন্দ বাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বেশ কিছুদিন ধরে,তার কথা-বার্তায়,একটা পরিবর্তন এসেছিল সেটা বুঝতে পারছিলাম। সুনন্দ বাবুর নিজস্ব পারিবারিক ডাক্তার ছিল।ডা: সেন,ডাক্তার হিসেবে যেমন ভাল,মানুষ হিসেবে আরও ভাল।তিনি এসে মাঝে মাঝে সুনন্দ বাবুর চেক আপ করে যেতেন। ওষুধ দিয়ে যেতেন।

সেদিন রাতে বৃষ্টি নামলো।খুব জোরে নয়। ঝিরঝিরিয়ে।সন্ধ্যা থেকে আকাশে মেঘ করেছিল।তখনি বুঝেছিলাম বৃষ্টি আসতে পারে। আমার কথাই ঠিক হল।বৃষ্টি এল ঠিক রাত দশটায়।সবে মাত্র খেয়ে দেয়ে একটু শোবার তোড়জোড় করছি,ঠিক তখনি গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ।ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম।নিঝুম রাতে কান পেতে বাইরে,বৃষ্টির শব্দ শুনতে দারুন লাগে।বেশ কিছুক্ষন কাটল।হঠাৎ জেমসের গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম।তীব্র হুঙ্কার নয়। বিপদের সংকেত পেলে কুকুর রা যেমন কাঁদে ঠিক সেরকম।
আমার জানালার সোজাসুজি সুনন্দবাবুর ঘরের জানালা।তাই আওয়াজ টা স্পর্ষ্ট আমার কানে এল।তড়িঘড়ি খাট থেকে নেমে জানালা খুললাম। দেখি,জেমস জানালার রড দিয়ে মুখ বের করে দিয়েছে। আমার জানালার দিকে চেয়ে আছে।আর কান্নার মতো আওয়াজ করছে। নিশ্চয় কোনো বিপদ হয়েছে! ছাতা আর একটা টর্চ লাইট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমি।পাঁচিলের গেট খোলাই আছে। সেটা দিয়ে ঢুকে পড়লাম। ঘরের ঢোকার গেটেও তালা নেই। বুঝলাম, খাওয়ার পর এখনো তালা লাগানো হয়নি।দেরি না করে,সোজা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। সুনন্দ বাবুর ঘরের সামনে।আমাকে দেখে জেমস ছুটে এল।পা তুলে আমার জামা-প্যান্ট টানতে লাগলো।আমি ছুটে গেলাম সুনন্দ বাবুর কাছে।খাটের উপর শুয়ে আছেন তিনি।জোরে জোরে নিশ্বাসপ্রশ্বাস ফেলছেন।মুখে একটা তীব্র যন্ত্রনা।আমাকে দেখে,কাছে ডাকলেন।পাশে গিয়ে বসলাম আমি।
আমার হাত ধরে বললেন,-"সুরজিৎ আমি হয়তো আর বাঁচবো না। আমার সমস্ত কিছু কাগজ পত্র, এল.আই.সি,ফিক্স ডিপোজিট, এই বাড়ির দলিল,যাবতীয় সবকিছু ঔই আলমারীর মধ্যে রাখা আছে। আর আলমারীর চাবিটা টেবিলের ড্রয়ারে।কোনোদিন ছেলে এলে তাকে সব বুঝিয়ে দিও।........আর পারলে জেমস কে তোমার কাছে নিয়ে রেখো।ও বেচারে খুব একা হয়ে যাবে।"
সুনন্দ বাবুর শরীর নিস্তেজ হয়ে আসতে লাগলো। একটা শেষ চেষ্টা করলাম আমি।ডা: সেন কে ফোন লাগালাম।বিশ মিনিট পর ডা: সেন এলেন।কিন্তু কোনো ভরসা দিতে পারলেন না।শেষ পর্যন্ত শেষ রাতের দিকে সুনন্দ বাবু চলে গেলেন এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে।
ভোর বেলায় সুনন্দ বাবুর ছেলে, সোমদীপ কে ফোন করে দিলাম। পর দিনই প্লেনে চলে আসবে বলল তারা দু'জন।তার বাবার মৃত দেহ কে একদিন রেখে দিতে বলল।অনিচ্ছা সত্বেও ছেলের কথা আমরাও রাখলাম।

(৪)

পরদিন বিকালে সোমদীপ এল বউ কে নিয়ে। আমি আর আসে-পাশের কয়েকজন পালা করে সুনন্দ বাবুর কাছেই সবসময় আছি। জেমস সেদিন রাত থেকেই সারক্ষন সুনন্দ বাবুর মাথার কাছে বসে আছে।আর বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক -ওদিক তাকাচ্ছে।
সোমদীপ আর তার স্ত্রী ঘরে ঢুকতেই জেমস তীব্র হুঙ্কার দিয়ে উঠল।ছুটে গিয়ে লাফিয়ে পড়ল সোমদীপের উপর।এক টানে জামা টেনে ছিঁড়ে ফেলল।হাঁটুর কাছে প্যান্টের উপর দিয়ে কামড়ে ধরল।চোখের নিমেষে আমাদের সামনেই ঘটে গেল ঘটনাটা।সে কি গজরানি জেমসের!
আমি ছুটে গিয়ে জেমস কে ধরলাম।
-"জেমস! জেমস!....ছেড়ে দে...।"
আমি ধরে রাখতে পারছি না।ভয়ে সোমদীপের বউ এর দিকে তাকিয়ে বললাম,-"তোমরা আর এক মুহুর্ত এখানে থেকো না।এখনি চলে যাও।"
আহত অবস্থায় ওরা দু'জন সিঁড়ি দিয়ে নীচের দিকে ছুটলো।ওরা চলে যেতেই একটু শান্ত হল জেমস।বুঝতে পারলাম,জেমস মোটেই চায় না সোমদীপ এখানে আসুক।একটা গাড়ি এনে, সুনন্দবাবুর শবদেহ কে তোলা হল।আমি কিছু রজনীগন্ধার ডাল কিনে এনে সাজিয়ে দিলাম। এক চুল ও নড়ালো গেল না জেমস কে।সুনন্দ বাবুর সাথে গাড়ির ভেতরেই রয়ে গেল।
কাঠের আগুনে যখন সুনন্দবাবুর দেহটা পুড়ছে, তখন জেমসের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতর টা হু হু করে উঠল।মনে হল,জেমস ও কাঁদছে।ওর চোখ দিয়ে জল পড়ছে। এত মায়া একটা কুকুরের মধ্যে!

সুনন্দ বাবুর শব দাহ করে করে আমরা ঘরে ফিরলাম। তার কথা মতো আলমারির চাবী আমার কাছে রেখে দিলাম।অনেক চেষ্টা করলাম জেমস কে আমার কাছে নিয়ে যেতে,কিন্তু জেমস গেল না।নিজের ঘরেই রয়ে গেল।আমি মাঝে মাঝে খাবার দিয়ে আসতাম।কিন্তু কিছুই খেত না জেমস।সারক্ষন চুপচাপ জানালার পাশে বসে,বাইরে তাকিয়ে থাকতো।
বেশ কয়েকদিন কেটে গেল।স্কুলের নতুন সেশনের ভর্তি শুরু হয়ে হয়েছে।তাই কয়েকদিন নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।স্কুলেও কাজ আবার ঘরে এসেও কাজ। কম্পিউটারে স্টাইপেন্ড,কন্যাশ্রী প্রকল্পের ডাটা এন্ট্রি করা।তাই জেমসের দিক থেকে খেয়াল আমার কিছুটা সরে গেল।এর মাঝে আমার এক নিকটাত্মীয়ের অসুস্থতার জন্য তাকে দেখতে যেতে হল। যাওয়ার আগে একবার সুনন্দবাবুর ঘরে গিয়ে জেমসের খাবার দিয়ে এলাম।কিছু খেল না জেমস।শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।সেই মোটাসোটা চেহারাটা আর নেই। অনেক হাড়গিলে চেহারা হয়ে গেছে জেমসের।আত্মীয়র বাড়ি থেকে ফিরতে দু'দিন সময় লাগলো আমার।
রবিবার সন্ধ্যায় ফিরলাম।চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলাম।দোতলায় নিজের বেডরুমে ঢুকে আলো জ্বালালাম।তারপর পশ্চিমের দিকে,
সুনন্দবাবুর ঘরের পাশের জানালা টা খুলতেই একটা গন্ধ এল।পচা, দুর্গন্ধ।নাকে হাত দিলাম আমি।কিসের গন্ধ?
তারপর কথাটা মনে পড়তেই,বুকের ভেতর টা ধড়াস করে উঠল।ড্রেস না পরিবর্তন করেই ছুটলাম সুনন্দবাবুর বাড়ি।গেট দিয়ে সিড়ি,সিড়ি বেয়ে উপরের ঘর।যা ভেবেছিলাম,সেটাই হল।ঘরের মেঝেতে জেমস মরে পড়ে আছে।আর সেখান থেকেই গন্ধ টা উঠছে।চোখে জল চলে এল আমার।ঘর বন্ধ করে বাইরে বেরিয়ে চলে এলাম।পর দিন সকালে পাড়ার
দু'টো ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে জেমস কে বাইরে বের করে আনলাম।তারপর দেহ টা কে সৎকারের ব্যবস্থা করে বাড়ি ফিরে
এলাম।

(৫)

এরপর অনেকদিন কেটে গেছে।প্রায় মাস খানেক হবে।মাস খানেকের বেশি ও হতে পারে।সেদিন রাতে খেতে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলাম।ঘড়িতে রাত দশটা বাজে।কাজের মাসী রান্না করে দিয়ে গেছে অনেক আগেই।হঠাৎ কলিং বেল টা বেজে উঠল।বিরক্ত হয়ে নীচে নেমে দরজা খুললাম। দেখি,সোমদীপ আর তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে।

সেদিনের পর থেকে সোমদীপ কে আর দেখা যায়নি। আজ হঠাৎ! কি কারন? আমাকে দেখে সোমদীপ বলল,-"বাবা,কি তার টাকা-পয়সা,বাড়ির দলিল সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলে গেছে?"
মারা যাওয়ার আগে সুনন্দ বাবুর কথা মনে পড়ল আমার।হ্যাঁ,চাবিটা তো আমার কাছেই আছে।আমি মাথা নেড়ে বললাম,-"হ্যাঁ!তোমার
বাবা,আমাকে সব বলে গিয়েছে। চলো তোমাকে সব দেখিয়ে দিই।"
-"কুকুর টা নেই তো?"সোমদীপ জিজ্ঞেস করল আমাকে।
এখনো ভয় যাইনি সোমদীপের।আমি হেসে বললাম,-"না,সে মাসখানেক হল মারা গেছে।"

তারপর আমার টেবিলের ড্রয়ার থেকে চাবিটা বের করে নিলাম।সাথে একটা টর্চ।জেমসের দেহ সৎকার করে আসার পর ঘর টা তালা মেরে দিয়েছিলাম আমি।আর খোলা হয়নি।কারেন্ট
অফিস থেকে লোক এসে কারেন্টের লাইন ও কেটে দিয়ে গেছে।গেট খোলাই ছিল।গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে চাবি ঘুরিয়ে তালা খুললাম আমি।তারপর ভেতরো ঢুকলাম। কেমন একটা গন্ধ!অনেক দিন কোনো ঘর বন্ধ থাকলে,যেমন
গন্ধ বের হয়,ঠিক তেমন এটা।সিঁড়ি দিয়ে
দোতলায় উঠে সুনন্দবাবুর ঘরে ঢুকলাম তিন জন।টর্চের আলো ফেললাম চারিদিকে। ধুলো, ময়লা,মাকড়শার জালে ঘিরে ফেলেছে ঘরটি কে।বাঁদিকের কোনায় দাঁড় করানো আলমারিটার উপরে টর্চের আলো ফেলে সোমদীপ কে বললাম,-"এই,আলমারীর ভেতর তোমার বাবা,সব কাগজপত্র রেখে গেছেন।.. ..এই নাও তার চাবি।সব কিছু ঠিক আছে কিনা,দেখে নাও।"

আমার হাত থেকে চাবি নিয়ে সোমদীপ আলমারির কাছে গেল।হঠাৎ একটা আওয়াজ কানে এল আমাদের।আমরা তিনজন চকিতে হয়ে পিছনে ঘুরলাম।হাতের টর্চ লাইটের সুইচের উপর থেকে আঙুল সরে গেল আমার।ঝুপ করে একটা কালো অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমরা। দু'টো লাল গোলাকার বস্তু দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।টর্চের আলো ফেলতেই আমি কঁকিয়ে
উঠলাম।
-"জেমস!"
হাত-পা থর থর করে কাঁপতে শুরু করে দিল।গলা শুকিয়ে এল আমার। এ কি করে সম্ভব!জেমসের চোখ দুটো কি অসম্ভব লাল।
জবাফুলের মতো।রক্তচক্ষু! হিংস্র একটা দৃষ্টি নিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ধারালো দু'টো দাঁত বের করে একটা তীব্র হুঙ্কার দিয়ে উঠল জেমস।কি ভয়ঙ্কর সে গর্জন! এরকম গর্জন আগে আমি শুনিনি।তারপর বিদুৎ গতিতে আমাকে কাটিয়ে,আলমারির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সোমদীপের উপর লাফিয়ে পড়ল।সোমদীপ ছিটকে পড়ল মেঝের উপর।আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, -"পালাও...পালাও।"

টর্চ জ্বালিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগলাম।আমার পিছন পিছন ওরা দু'জন।সিঁড়ি পেরিয়ে গেট,গেট পেরিয়ে রাস্তা, রাস্তা দিয়ে সোজা আমার বাড়ি।এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁফাতে লাগলাম আমরা।
সুনন্দবাবুর ঘরের ভেতর থেকে এখনো জেমসের সেই তীব্র গর্জন ভেসে আসতে লাগলো।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.