একটি প্রেমের গল্প " অসমাপ্ত প্রেমের পাঁচ বছর পর "



(১)

মাঝে মাঝে মনে হয়,জীবনে ভালবাসা কেন আসে,আর আসলেও কেনই বা চলে যায়? যদি চলে যায়,পরে কি আবার তাকে ফিরে পাওয়া যায়? হয়তো বা যায়। আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। যদিও বা পাওয়া যায়,তাকে কি নিজের করে নেওয়া যায়?সবাই পারে না, কেউ কেউ পারে। এটা তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।গল্প শুরুর আগে হয়তো অনেক বকবক করে ফেললাম! আপনারা হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। যাইহোক এবার আসল গল্পটা বলি।

যেদিন প্রথম কলেজে উঠলাম,সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম এ মেয়ে আমার পড়াশুনার বারোটা বাজানোর জন্যই এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাংলা ডিপার্টমেন্টের এত ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ের মধ্যেও,সে যে আলাদা করে সবার কাছে চোখে পড়ার মত।আর দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার ও চোখে পড়ে গেল।সদ্য আঠেরো তে পড়েছি। মনের মধ্যে একটা শিহরন, রোমান্স,উশখুশ, ফ্যান্টাসি ভাব যে তৈরী হচ্ছিল সেটা ভালই টের পাচ্ছিলাম। ওরকম দুধের মতো গায়ের রঙ, টানা–টানা চোখ,মাথার ঘন কালো চুল পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো,উন্নত বুক,চিকন চেহারা দেখলে মনের ভেতর একটা ভূমিকম্প, উথাল পাথাল তরঙ্গমালা তৈরী হয়।
সে যেন বন্য হরিনী!
স্থির,শান্ত,মনোহরিনী তার চোখের চাহনি ভোলবার নয়।সারা শরীরে, সারাক্ষন একটা চপলতার ভাব স্পর্ষ্ট।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলী বইটিকে এক হাতে বুকের উপর চেপে ধরে কলেজের বারান্দা দিয়ে যখন হেঁটে যেত, –মনে হত একটা হলুদ প্রজাপতি,ডানা মেলেছে; এ ফুল থেকে,সে ফুলে উড়ে চলেছে।আর আমি সেই প্রজাপতির রঙ মেখে নিজেকে রাঙিয়ে নিচ্ছি। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে বুঝতে পারলাম, আমার সার্কিটে কোথায় গোলোযোগ দেখা দিয়েছে। মাঝে মাঝে মস্তিষ্ক হ্যাঙ্ হয়ে যেতে থাকল।মধূসূদন দত্তের 'মেঘ নাথ বধ কাব্য' পড়তে গিয়ে মেঘের আড়ালে ইন্দ্রজিৎ এর মুখ আর দেখতে পেলাম না।সেই বন্য হরিনী, অপরুপা, কোথা থেকে এসে উদয় হল। দেশ– বিদেশের যত বিখ্যাত প্রেমের কবিতা সব জোগাড় করে ফেললাম। কত প্রেমের বাংলা উপন্যাসের একটা লম্বা লিস্ট বানিয়ে ফেললাম। সারাক্ষন জানালার পাশে বসে নীল আকাশে, চোখ ডুবিয়ে দিতাম। কথাবার্তা কমে গেল।সব সময় চুপ করে বসে থাকতাম। বাড়ির লোক পড়ল মহা চিন্তায়।মা বলল,–খোকার আমার এ কি রোগে ধরল?" দিদি বার বার এসে মাথায় হাত বোলাতে লাগল।–" আমায় বল ভাই,–কি হয়েছে তোর?"
আমি শুধু নীরব হয়ে হাসতাম।বেশ কিছুদিন পর, আমার রোগ–শোক সব উধাও হয়ে গেল। বুজতে পারলাম,মেয়েটির পিছনে শুধু আমি নই,–আমাদের ক্লাস,ও সমগ্র কলেজ মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ জন ছেলে লাইন দিয়ে আছে। মন টা দমে গেল।বাংলায় নব্বই এর উপর নাম্বার নিয়ে,কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম।ভালো ছেলে বলে একটা পরিচয় ছিল ক্লাসের ভেতর। সারাক্ষন বই নিয়েই বসে থাকতাম।তাই শিক্ষক মহাশয় রা আমাকে একটু নজরে রাখতেন বেশি।কিন্তু আড়ালে–আবডালে, যে মিট মিট করে মেয়েটিকে দেখতাম,সেটা হয়তো কেউ বুঝতে পারেনি। একদিন হল কি, এ.মিত্র স্যারের ক্লাস চলছে।সারা ক্লাস পিন ড্রপ সাইলেন্স।হঠাৎ আড়চোখে পাশের বেঞ্চে তাকাতেই, বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা হল,সারাটা শরীর কেঁপে গেল। মেয়েটি আমার দিকে আগে থেকেই তাকিয়ে আছে। চোখে, চোখ পড়তেই মাথাটা অন্য দিকে সরিয়ে নিলাম। সে তো চোখ নয়! যেন অক্সি–অ্যাসিটিলিন শিখা।তিন সেকেন্ডের বেশি তাকিয়ে থাকা যায় না।খুব ভয় পেলাম মনে মনে,– মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে ছিল কেন?তাহলে আমার এই চোখে চোখে প্রেম প্রেম খেলা টা কি বুজতে পেরেছে? বুকের বদলে, থর থর করে পা কাঁপতে শুরু করল।
দু'দিন পর একটা ঘটনা ঘটল।আর তাতেই আমার ফিউজ উড়ে গিয়ে, মনের ভেতরের রঙিন বাল্ব টা টুপ করে কেটে গেল। সুন্দরের মধ্যে এত ভয়ঙ্কর রুপ লুকিয়ে ছিল,–সেটা আর কে জানতো?
আমাদের ক্লাসের সবথেকে হ্যান্ডসাম বয় রাজীব।দেখার মতো তার বাইসেপস,আর ট্রাইসেপস। ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র আদুরে ছেলে।বাবার প্রচুর টাকা থাকলে যা হয় আর কি, হোন্ডার নিউ মডেলের বাইক নিয়ে প্রতিদিন কলেজে ঢুকতো। চোখে সবুজ রঙের চশমা, মাথার সামনের দিকের অল্প কিছু চুল ব্রাউন করা,পিছন দিকে কিছুটা চুল আবার লম্বা।জেল লাগানো চুলের স্টাইল টা একদম সিনেমার হিরোদের মতো।জামার উপরের দিকের একটা বোতাম খোলা।আর সেই খোলা বোতামের ভেতরে জিমকরা বুক টা দেখে কত মেয়ের যে বুক কাঁপতো-সেটা উপরওয়ালা জানতো।এহেন ছেলের প্রতি যে কলেজের সকল মেয়ে পাগল হয়ে যাবে,সেটাই স্বাভাবিক।খেলার মাঠে তার এক একটা কভার ড্রাইভ,দিলস্ক্রুপ,সুইচ হিট, যখন মাঠের বাইরে আছড়ে পড়ত তখন গ্যালারিতে বসে থাকা সমস্ত মেয়েদের হৃদয়ে একটা ঢেউ উঠত।কিন্তু রাজীব বিশেষ কাউকেও পাত্তা দিত না। সে ফেবিকুইকের আঠার মতো,সেই মেয়েটির পিছনে লেগেছিল।
সেদিন ক্লাসে চুপ করে বসে বই এর পাতা উলটে উলটে দেখছিলাম। একটু পরেই জে.কে.দের ক্লাস।হঠাৎ পিছনের বেঞ্চ থেকে ঠাস করে একটা শব্দ এল। চকিতে পিছন ফিরে দেখি রাজীব গালে হাত বোলাচ্ছে, আর তার সামনে মেয়েটি রক্তচক্ষু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।শুধু একটাই কথা শুনতে পেলাম,–"দ্বিতীয় বার যেন, আর এ ভুল টা না হয়!"
তারপর গট গট করে পিছন থেকে সামনের বেঞ্চে এসে বসে গেল।হাত পা আমার ঠান্ডা হয়ে গেল।–এই মেয়ের দিকে তাকাই আমি?আমি যে এখনো কেন অন্ধ হয়নি,সেটাই আমার কাছে বিস্ময় কর লাগল,–এত দিন তো আমার চোখ উপড়ে নেওয়ার কথা ছিল!–না,বাবা! আর প্রেম ট্রেম নয়।পড়াশুনা ছাড়া আর কিছু ভাববো না।–এ তো মেয়ে,মেয়ে নয়,ভয়ঙ্করী নিশ্চয়!


(২)

আমার একটা অভ্যেস ছিল।বদ নয়, ভাল অভ্যেস।কলেজে কোনো পিরিয়ড না হলে, আমি লাইব্রেরী তে গিয়ে বিভিন্ন বই পড়তাম।আরও অনেকে যেত,তবে বেশীর ভাগ পড়ার নামে, চোখে চোখ মেলাতে।সেদিন ও লাইব্রেরী রুমের একটা কোনার চেয়ারে বসে ছিলাম।জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ টা দেখা যাচ্ছে। রৌদ্রজ্জ্বল আকাশ! পাশের বড় মেহগনি গাছটিতে দুটো ঘুঘু পাখি ঝিমোচ্ছে।অকস্মাৎ একটা কন্ঠস্বর কানে এল,–" এই যে ভাল ছেলে, তোমার কাছে এ.মিত্রের নোট গুলো পাওয়া যাবে?"
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা পড়ছিলাম। মনে হল স্বপ্ন দেখছি! সেই মেয়েটি আমার সামনে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে। মেয়েটি আমার সাথে কথা বলল! পেট্রোলের পরিবর্তে,জল দিয়ে মোটর বাইক চলছে,– একথা শুনলে মনে হয় এত বিস্মিত হতাম না।ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখলাম,–না,কেউ তো নেই।
–" আরে তোমাকেই বলছি!" মেয়েটি কপালের উপর থেকে চুল সরিয়ে সামনে বসলো।
–"আমার নাম,তানিয়া। তোমার নাম কি?"
গলার কাছে কথা জড়িয়ে গেল। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। কোনোরকমে নিজের নাম টা বললাম,–" সৌরভ।"
–" নোট গুলো একটু দেবে! কালই ফিরিয়ে দেব।"
ব্যাগ থেকে এ.মিত্রের নোট গুলো বের করে একটু ওভার স্মার্ট ভাব মেরে বললাম,–" না না, তুমি যত দিন খুশি রাখতে পার।"
—" তার দরকার নেই, জেরক্স করতে একদিনই যতেষ্ট!"
কথাটা শুনে আমার মুখ টা আমসত্ত্বের মতো শুকিয়ে গেল।তবু মনের ভেতর একটা খুশির পরশ ছড়িয়ে পড়ল।

(৩)

গাছে ফুল ফুটলে,গাছটির যেমন ভাল লাগে। আকাশের কোলে পাখি উড়লে,আকাশের যেমন ভাল লাগে,ঠিক তেমনি তানিয়া আমার সাথে কথা বললে,আমারও ভালো লাগতো।বন্ধুত্ব টা জমে গেছে অনেক দিন আগে।'তুমি' পালটে 'তুই' ঢুকে পড়েছে কথার মধ্যে।মনের মধ্যে আবার সুপ্ত ভালবাসা টা জাগতে শুরু করেছে।
কলেজের পাঠ দ্বিতীয় বর্ষ পেরিয়ে,তৃতীয় বর্ষে পড়ল। কিন্তু মনের কথাটা আর বলা হল না।কি যেন একটা ভয় পেয়ে বসল আমার! একটা হারানোর ভয়।যদি সে এ সব না ভাবে?কথা বলা বন্ধ করে দেয়! এরপর পড়াশুনার চাপ ও বেড়ে গেল।কিন্তু সম্পর্ক টা অটুট রইল।
একদিন কলেজ ও শেষ হয়ে গেল। তানিয়া মাস্টার ডীগ্রী নিয়ে পড়তে শুরু করে দিল।আর আমি হন্যে হয়ে চাকরীর চেষ্টা করতে লাগলাম। সপ্তাহে একবার করে দেখা হত। সবুজ মাঠে,নীল আকাশের ছায়ায় বসে অনেক গল্প করতাম। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হত,ওকে ভালবেসে ঘাসের কোলে হারিয়ে যেতে।
সেদিনের বিকেল টা ছিল বড় ফ্যাকাশে। আকাশে কালো কালো মেঘ গুলো ভেসে বেড়াচ্ছিল। সূর্য টিও যেন মন খারাপ করে পাড়ি দিচ্ছিল দিগন্তের ওপারে। সেই কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে,তানিয়া বলল,–"এই সৌরভ! জানিস,আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।ছেলে হাইকোর্টের সরকারি উকিল।"
বুকের ভেতর টা যেন হু হু করে উঠল আমার। কেউ যেন হৃৎপিন্ডের ভিতরে পিন ঢুকিয়ে দিল। কিছু বলতে পারলাম না,সব কথা যেন তালগোল পাকিয়ে গেল জিভের আগায় এসে। মনের তেরোটা বাজিয়ে সেদিন ঘরে ফিরলাম। সারা রাত ঘুম হল না।এপাশ,ওপাশ করে কেটে গেল। বালিশে মুখ লুকিয়ে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করল। 'ভালবাসি'কথাটা কেন আমি ওকে বলতে পারছি না?
একটা ছটফটানি শুরু হল শরীরের ভেতর। দু'দিন পর এ যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে ওর বাড়িতে চলে গেলাম। কিছুক্ষন আগে কলেজ থেকে ফিরেছে তানিয়া।আমাকে ওর বেডরুমে বসিয়ে,বাথরুমে চলে গেল। ফ্রেশ হয়ে এসে ঘরে ঢুকলো। একটা গন্ধ পেলাম,–ওর শরীরের গন্ধ। টাওয়েল দিয়ে মুখের জল গুলো মুছতে মুছতে বলল,–"কি ব্যাপার! আজ সোজা বাড়ি চলে এলি? কিছু জরুরি কথা আছে নাকি?"
চুপ করে রইলাম।কথাটা গলার কাছে এসেও আটকে গেল। কিছুতেই উগরে তুলতে পারছি না।
–"কথা পরে হবে,কি খাবি বল? চা না,কফি?"
–"কফি।"
তানিয়ে হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষন পর দু'টো কাপ নিয়ে ঢুকলো।তারপর আমার কপালের দিকে তাকিয়ে বলল,–" তোকে আজ অন্যরকম লাগছে! কিছু হয়েছে নাকি?"
টেনসন হলে যা হয় আর কি! আমি কপালের ঘাম মুছে বললাম,–"কই না তো,কিছু হয়নি!"
তানিয়া আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকালো।তারপর বলল,–"না, তুই মনে হয় কিছু একটা বলতে এসেছিস? ভয় পাচ্ছিস।বল না, কি বলবি?
তানিয়া যেন ব্যাকুল হয়ে উঠল।আমি আর সহ্য করতে না পেরে বলেই ফেললাম। তবে 'ভালবাসি' কথা টা নয়,বললাম–" তোর প্রিয় একটা বাংলা উপন্যাস দে না, একটু পড়ব!"
ও অবাক হয়ে গেল।–" এই কথা বলতে গিয়ে, তোর কপালে ঘাম জমছে!"
অনেক বছর পর আজ আমার মনে হল,কেন সেদিন আমি কথাটা বললাম না?কেন এত ভয় পেলাম?আজ নিজেকে খুব ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হল। এরপর আমার জীবন টা অন্যদিকে বাঁক নিল।চাকরী পেয়ে,বাংলা ছেড়ে চলে গেলাম চেন্নাই। মালগাড়ির গার্ড।অনেক দিন পর বন্ধু মারফৎ খবর পেলাম,–তানিয়ার, সেই উকিল ছেলের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে।এখন সে একটা সরকারি স্কুলে পড়ায়। খবর টা শুনে চারিদিক টা শূন্য হয়ে গেল।চৈত্রের কাঠ ফাটা রোদে মাঠ যেমন ফালি ফালি হয়ে খাঁ খাঁ করে, –আমার বুকের ভেতর টিও তেমন হল।মালগাড়ির পিছনের কেবিনে বসে নীল আকাশ দেখতাম। সাদা সাদা মেঘের ভেলা ভেসে চলেছে,এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।


(৪)

পাঁচ বছর কেটে গেল।এর মাঝে আর বাংলায় আসি নি কোনোদিন। পাঁছ বছর বাইরে কাটিয়ে, একদিন ফিরলাম নিজের জায়গায়।আর ফিরতেই দেখা হয়ে গেল তানিয়ার সাথে। এক অপরাহ্নের রাস্তায়।কিন্তু একি!ওর মাথার সিঁদুর কোথায়?হাতের শাখা ও দেখতে পেলাম না। আমাকে দেখে,হেসে বলল,–" তোকে তো আর চেনাই যাচ্ছে না!একদম পালটে গেছিস!"
তারপর সন্ধ্যায় ওর বাড়ির ঠিকানা দিয়ে কফি খাওয়ার নিমন্ত্রন করল।সন্ধ্যা সাত টায় তানিয়ার বাড়ির সামনে গিয়ে কলিং বেল বাজালাম। কিছুক্ষন পর ও এসে দরজা খুলে দিল।ওর সাথে ঘরের ভেতর ঢুকলাম।সুন্দর করে সাজানো ঘর টা।বসার জন্যে দু'টো সোফা,তার সামনে টেবিলে একটা বড় টি.ভি রাখা।সোফার দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,–" তুই বোস, আমি কফি করে আনি।"
ভাল করে ওর দিকে চাইলাম।সে পাতলা,চিকন শরীরের যৌবনে এখনো ঘুন ধরেনি।বরং আগের থেকে আরও বেশী লাবন্য ফুটে উঠেছে।শুধু মুখশ্রী টা মলিন,ফ্যাকাসে।
কফি খেতে জানতে পারলাম,বিয়ের এক মাস পরেই ওর স্বামী একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। তারপর আর স্বামীর ঘরে থাকতে পারি নি।এখন এ বাড়ি টা কিনে নিয়ে একা থাকে, আর স্কুলে পড়ায়। গল্পে গল্পে রাত যে কখন বেড়ে গেল বুঝতে পারি নি।ওঠার জন্য উসখুস করছি,ঠিক তখন তানিয়া আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,–" অনেক রাত হয়ে গেছে। আজ রাত টা, আমার এখানে থেকে যা!"
চমকে উঠলাম আমি।বুকটা যেন ধড়াস করে উঠল।ভুল শুনলাম না তো! ওর চোখের দিকে তাকালাম। সে দৃষ্টিতে যেন,একটা বিরহ,যন্ত্রনা, কাতরতা,ভালবাসা,একটা আশ্রয় সব কিছু যেন মিলেমিশে ছিল। আমি বোকার মতো ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। বুকের ভেতর টা দপ দপ করতে লাগল।আর সে শব্দ হয়তো ঘরের নিস্তব্দ বায়ুস্তর ভেদ করে ওর কানে গিয়ে পৌঁছালো।
তানিয়া আমার অবস্থা দেখে হাসল।–"কি রে! ভয় পেলি নাকি?"
তানিয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে,যখন রাস্তায় নামলাম, তখন আকাশে বড় চাঁদ। জোছনালোকে ভরে গেছে চারি দিক টা।কানের কাছে তানিয়ার কথা টা বাজতে লাগল। সত্যি ভয় পেলাম আমি?কেন ভয় পেলাম? ও তো অন্যায় কিছু বলেনি।আমি তো ও কে এখনো পর্যন্ত ভালবাসি।আর সারা জীবন বাসব।তবে সমস্যাটা কোথায়? না! আমি আর ভয় পাব না। ভয় পেলে চলবে না। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নানান চিন্তা ভাবনা মাথায় এল। নিজের উপর খুব রাগ হল। আজ ভালবাসা কে পেতে খুব ইচ্ছে করল।পিছন ফিরে জোরে জোরে হাঁটতে লাগলাম তানিয়ার বাড়ির দিকে। দরজার পাশে গিয়ে,পাগলের মতো কলিং বেল টিপতে লাগলাম। তানিয়া দরজা খুলতেই ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকলাম।–" কি রে! আবার এলি? কিছু ফেলে গেছিস নাকি?"
আর কোনো কথা বলতে দিলাম না ও কে। সজোরে আমার বুকের কাছে টেনে নিয়ে,চেপে ধরলাম।পাগলের মতো ওর মাথার চুলের মধ্যে হাতের আঙুল গুলো ঢুকিয়ে দিলাম। তানিয়া কোনো বাঁধা দিল না।মুখ দিয়ে কোনো কথাও বলল না। শুধু নীরবে আমার অবাধ্য,আদরের পরশ শুষে নিল ওর শরীরে।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.