একটি থ্রিলার গল্প " অচেনা সেই মেয়েটি "







(১)

"দাদা,এই মেয়েটিকে কোথাও দেখেছেন....?"
আমি ফোনটা বের করে,স্ক্রিনে ছবিটা দেখালাম। একটা সেলফি ধরনের ছবি।
-" না দাদা, মেয়েটিকে চিনি না, আগে এখানে দেখিনি তো....।"
-"একটু ভাল করে দেখুন,দাদা!........গত কয়েক দিন তো এখানেই ঘুরে বেড়িয়ে ছিল।"
-"না,দাদা।পারবো না।"
আমার চোখ ফেটে জল এল।আমি হয়তো পাগল হয়ে যাব।আমার চুল গুলো এলোমেলো। হাওয়ায় অবিনস্ত্য।সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম আমি।সারি সারি হোটেল।এই হোটেলেই তো একদিন লাঞ্চ করেছিলাম!ভেতরে ঢুকলাম।
-"দাদা, এই মেয়েটি কে দেখেছেন..?"
-"কোন মেয়েটা?"
আমি ফোনের স্ক্রিন টা তার আরও সামনে নিয়ে গেলাম।আঙুল দিয়ে দেখালাম,-"এই যে,এই মেয়েটা।"
-"না দাদা, দেখিনি।"
আমি বিরক্ত হয়ে গেলাম।গলার স্বর চড়ে গেল।
-"কি বলছেন,দেখেন নি! এই হোটেলেই তো এক দিন লাঞ্চ করেছিলাম।সঙ্গে আমিও ছিলাম।"
লোকটা থতমত খেয়ে গেল।বলল,-"দাদা,অনেক মেয়েই তো আসে।সবার মুখ চিনে রাখার সময় হয় না।"
সেটাও ঠিক।এত মানুষের মধ্যে,একজনকে চিনে রাখাই মুসকিল। টলমল পায়ে বেরিয়ে এলাম। চোখের জল গড়িয়ে বুকের কাছে জামার উপর পড়ছে।আমি পাগলের মতো এদিক-ওদিক করতে লাগলাম।কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা আমি মেয়েটাকে।কোথায় যেতে পারে সে?আমাকে না জানিয়ে,সে কোনোদিন চলে যেতে পারে না!
আমি ছুটতে থাকলাম স্টেশনের দিকে।হাওড়া যাওয়ার ট্রেন এখনো ছাড়েনি।হাতের ঘড়ির দিকে তাকালাম।কুড়ি মিনিট বাকি।দীঘা স্টেশন টা খুব বেশি বড় নয়।পরিষ্কার,চকচকে।বেশির ভাগ দীঘায় বেড়াতে আসা মানুষের সমাগম। প্লার্টফর্মে উঠেই ট্রেনটি দেখতে পেলাম।মানুষের ইতস্তত ভিড়।ছুটে গেলাম, ট্রেনের দিকে।এক কামরা থেকে আরেক কামরায়।
-"সোনিয়া!....সোনিয়া!........দিদি,এই মেয়েটিকে দেখেছেন?...........দাদা,এই মেয়েটিকে দেখেছেন? .....একটু ভাল করে দেখুন!"আমি পাগলের মতো ছুটতে লাগলাম ট্রেনের একটা কামরা থেকে,অন্য কামরায়।
-"সোনিয়া..আ...আ...আ...।দিদি, আপনারা কেউ সোনিয়া নামে কাউকে জানেন?সোনিয়া ভৌমিক। এই দেখুন ছবিটা...।"
সবাই নিশ্চুপ।কেউ সদুত্তর দিতে পারল না।ট্রেন হর্ন বাজালো। আমি নেমে পড়লাম প্লার্টফর্মের উপর।ধীরে ধীরে সাপের মতো ট্রেনটি বেরিয়ে গেল।একটি ফাঁকা বেঞ্চের উপর বসে পড়লাম। পাশেই একটা খাবারের স্টল।মেয়েটি তো বিকালে এখানে এসে বসতো মাঝে মাঝে।উঠে খাবারের স্টলের দোকানির পাশে গেলাম। ফোনটা বের করে করে সামনে ধরলাম।
-"দাদা,এই মেয়েটিকে দেখেছেন?...সোনিয়া মেয়েটির নাম।"
-"কই,দেখি ছবি টা?"
আমি ভালো করে তাকে,ছবিটা দেখালাম।
-"এটা তো আপনার ছবি!"
-"হুম! এটা নয়,পাশের মেয়েটির ছবি...দেখুন ভাল করে।এখানে এসে বিকালে প্রায় বসে থাকতো।আমিও থাকতাম সঙ্গে...।"আমি হাতের আঙুল দিয়ে পাশের বেঞ্চের দিকে দেখালাম। লোকটি আমার দিকে তাকালো।জিজ্ঞেস করল,-"কে হয় মেয়েটি আপনার?"
-"কেউ না।কিন্তু মেয়েটি কে আমার খুব দরকার।"
-"না দাদা, মনে পড়ছে না।...যদি চোখে পড়ে, তাহলে আপনার কথা বলব।আপনার নাম টা কি?"
আমি নাম আর শেষে ধন্যবাদ বলে,আবার বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়লাম। হায়! ঈশ্বর,মেয়েটি কোথায় গেল?আমার ওকে খুব দরকার।আমি ওকেই চাই শুধু।আমাকে ছেড়ে ও কোনোদিন চলে যেতে পারে না!ও তো কথা দিয়েছিল, আমাকে ছেড়ে কোনোদিন যাবে না!আমার দু'চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়তে লাগল। অসময়ের মেঘ ভেঙে বৃষ্টির মতো।

(২)


প্লার্টফর্মের এই বেঞ্চটা তেই তো মেয়েটিকে প্রথম দেখেছিলাম।তখন আমার চোখে সরু সুতোর মতো জলের রেখা।বিকালের হলদে রোদ নেমেছিল স্টেশনের নীল,সাদা রঙের টিনের শেডে।আমার মনের মতো,ভারী বাতাশ বয়ে যাচ্ছে।দীঘা স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে,সর্বপ্রথম এই বেঞ্চটির উপর বসে ছিলাম।আমার পিঠে একটা কলেজ ব্যাগ।ব্যাগের ভেতর আমার কয়েকটা জামা-প্যান্ট,কিছু কাগজপত্র,ওষুধ, ফোনের চার্জার,আর একটা জলের বোতল। আমার চোখের কোনে জল জমেছিল।টপটপ করে পড়ছিল গাল বেয়ে।মানুষ যখন হাসে তখন তার সঙ্গে সমস্ত পৃথিবী হাসে। কিন্তু সে যখন কাঁদে,তার সঙ্গে আর কেউ কাঁদে না। কাঁদতে হয় একা একা।তাই এতদিনের কষ্ট,যন্ত্রনা, মায়া-মমতা সব ত্যাগ করে আজ বেরিয়ে পড়েছি। যেদিকে দু'চোখ যায়।এ পথ চলার কোনো শেষ নেই।কোনো সীমা নেই,কোনো লক্ষ্য নেই,কোনো উদ্দেশ্য নেই।নিরুদ্দেশর পথে।এক মুক্তির আনন্দে, হয়তো মৃত্যুই একমাত্র যার গন্তব্য। আমার কিছু মনে পড়ছে না।কিছু মনে করতেও চাই না।মনের যন্ত্রনা, সব কিছু কে ভুলিয়ে দেয়। মায়া-মমতা,ভালবাসা,হাসি-আনান্দ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সব কিছু।আমিও সব হারিয়েছি। হারিয়েছি নিজের অস্তিত্ব।আজ বেরিয়েছি সেই অস্তিত্বের খোঁজে।নিজেকে খুঁজতে।চারিদিকের রঙহীনতার মাঝে,এক রঙমহলের খোঁজে।হাত দিয়ে চোখের জল টা মুছে নিলাম।
আমি ব্যাগ থেকে জলের বোতল টা বের করে গলায় ঢালতে যাব,ঠিক তখন মেয়েটিকে দেখলাম।আমার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা এতক্ষন আমাকেই দেখছিল!বৈশাখীর সন্ধ্যায় হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া কালো মেঘের মতো ঘন চুল। এক টুকরো চুল কপাল থেকে কানের পাশ দিয়ে গালের কাছে নেমে গেছে।বন্য হরিণীর মতো শান্ত চোখ দুটো যেন পিট পিট করছে। মোহময়ী চেহারা।টিকালো নাকের নীচে, গোলাপের পাপড়ির মতো কমনীয় ঠোঁট।পরনে একটা সালোয়ার কামিজ।পিটে ব্যাগ।বয়স খুব বেশি হলে চব্বিশের কাছাকাছি।
আমি জলের বোতলটা বন্ধ করে ব্যাগে ঢোকালাম। আকাশ টা এবার লাল হয়ে এসেছে।
-"একটু জল হবে? মানে,আমার টা শেষ হয়ে গেছে।" আমার দিকে তাকালো মেয়েটি।
আমি জলের বোতল টা বের করে মেয়েটির দিকে এগিয়ে দিলাম।মেয়েটি সাদা সাদা দাঁত বের করে হাসল।গালের টোল দুটো স্পষ্ট।কয়েক ঢোক জল খেয়ে বোতল টা আমার হাতে দিয়ে বলল,-"ধন্যবাদ।বাই দ্য ওয়ে,আমি সোনিয়া। আপনি?"
থতমত খেয়ে নামটা বললাম।
-"রনিত।রনিত রয়।"
-"বাহ! দারুন নাম আপনার।তো, দীঘায় ঘুরতে এসেছেন?"
-"হ্যাঁ।"
আমি সোনিয়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। এক অদ্ভুত মুদ্ধতায় ভরে উঠেছে প্লার্টফর্ম টি। মেয়েটি আবার বলতে শুরু করল।
-" একা একা বসে আছেন?..আর কাউকে তো দেখছি না।যদিও আমিও একা এসেছি।ভাল লাগছিল না,তাই একা একা বেরিয়ে পড়লাম। আমি এরকমই।যখন ইচ্ছে করে একা একা বেরিয়ে পড়ি।যেদিক যেতে মন চায়, সেদিকেই বেরিয়ে পড়ি।আপনিও বুঝি আমার মতো, একলা বেরিয়ে পড়েছেন?"সোনিয়া প্রশ্ন করে আমার দিকে তাকালো। শান্ত,মায়াময় একটা
দৃষ্টি।
আমি চুপ করে রইলাম।
- "ধুর আপনি এত কম কথা বলেন কেন?কম কথা বলা ছেলেদের আমার একদম পছন্দ হয় না।"
আমি বিরক্ত হলাম।একটা অপরিচিত মেয়ের সাথে একরম আলাপ আমার পছন্দ হয় না।এক বার ভাবলাম,উঠে চলে যাই কিন্তু আমার উঠতে মন চাইল না।আমি সোনিয়ার কথায় আবিষ্ট হয়ে পড়ছি। এ একটা মায়াজাল যেন।
-"আপনি কোন হোটেলে উঠেছেন?"
এবার আর চুপ করে থাকা ঠিক হবে না।
-"এখনো হোটেলে উঠিনি।আপাতত প্লার্টফর্মেই উঠলাম"উত্তর দিলাম আমি।
সোনিয়া হেসে পড়ল।-"এই তো বাবুর মুখে বুলি ফুটেছে। তাহলে কোথায় থাকবেন?চলুন আমার রুমে যাই।এক সাথে গল্প করা যাবে।আমিও একটা সঙ্গী পাব।"
আমি চমকে উঠলাম।সে আমার দিকে চেয়ে, একটু হাসলো।তারপর বলল,-"ভয় পেলেন? আপনাকে দেখে আমার খুব ভাল মনে হল তাই বললাম।"
-"না,মানে ভয় ঠিক না। তবে...?"
-"তবে আর কিছু নয়,চলুন।"
সোনিয়া উঠে দাঁড়াল।সঙ্গে সঙ্গে আমিও উঠে পড়লাম।

(৩)

হোটেলের দোতলায় রুমের দরজা টা খুলল সোনিয়া।তারপর আমাকে ডেকে ভেতরে ঢোকালো। বেশ সাজানো গোছানো ঘর।নিশ্চয় অনেক ভাড়া নিয়েছে।একটা খাট, জানালার পাশে,তার ডান দিকে টেবিলের উপর বড় টি.ভি। তার পাশে একটা মিউজিক সিস্টেম ও রাখা। টি.ভি র সামনে একটা সোফা। সে পিট থেকে ব্যাগটা নামিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে বলল,-"দাঁড়িয়ে কেন? বসুন।আচ্ছা আপনি হাসতে জানেন?না,পেঁচার মতো মুখ করে থাকেন সবসময়?"
 খিল খিল করে হেসে উঠল সোনিয়া।আমার ও হাসি পেল।বললাম,-"না, মানে...ঠিক তা নয়..!"
-"থাক,আর মানে জেনে কাজ নেই।
আপনি বসুন,আমি আগে স্নান সেরে ফ্রেস হয়ে আসি।তারপর আপনি।" সোনিয়া বাথরুমে ঢুকে গেল ড্রেস নিয়ে।
আমি অবাক হয়ে বসে রইলাম।কিসের টানে আমি এলাম এখানে?মেয়েটির সঙ্গ যেন আমার ভাল লাগছে।আমাকে টানছে।ঠিক আধ ঘন্টা পর সোনিয়া বের হল।একটা সুবাস ছড়িয়ে পড়ল ঘর ময়।হাঁটুর উপর পর্যন্ত একটা ছোটো প্যান্ট, আর উপরে গেঞ্জি।ভেজা চুল গুলোতে তোয়ালে জড়ানো।কি সুন্দর লাগছে!আমার বুকের ভেতর টা কাঁপছে।চোখ দু'টো দাঁড়িয়ে গেছে।স্নান করার পর মনে হয়, মেয়েদের সব থেকে সুন্দর দেখায়। সব থেকে আকর্ষনীয় দেখায়।
-"এবার আপনি যান।আমি খাবারের অডার দিচ্ছি।"
পাঁচ মিনিট পর চোখে মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে এলাম বাথরুম থেকে। খাবার চলে এল কিছুক্ষনের মধ্যে। খাবারের নাম জানিনা আমি। খেতে শুরু করলাম।সোনিয়া খেতে খেতে বলল,-"বার বার আপনি বলতে পারছি না।তুমি করে বলছি।"
-"তুমি করেই বলো।"আমি বললাম।
-"আচ্ছা,তুমি এত কম কথা বলো কেন?একদম হাসো না!"
-"আমার হাসি পায় না।"ছোটো করে উত্তর দিলাম।
-"তাহলে আমি হাসাবো? একটা জোকস শুনবে?"
-"বলো।"
-"ভেজ না ননভেজ?
 আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল সোনিয়া। আমি চুপ করে রইলাম।
-"তাহলে ননভেজই বলি।"
সে বলতে শুরু করল।-"দাদু গেল চমকে,পাড়া গেল থমকে, আর মাথা গেল বমকে,..কি দেখে ভাই?"........বলোতো কি দেখে?"মেয়েটি জিজ্ঞেস করল।
-"আরে,এরকম একটা গান ছিল না?.....কি দেখে?"পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম আমি।
সোনিয়া হেসে বলল,-"আরে বোকা,দিদিমা আবার প্রেগনেন্ট হয়েছে দেখে।"
আমি এবার সত্যি হো হো হো করে হেসে উঠলাম।কি মেয়েরে বাবা! সে আরও জোকস বলতে শুরু করল। আমার চোখে জল চলে এল হাসতে হাসতে।
-"এই যে বললে,তোমার হাসি পায় না?এখন তো হাসতে হাসতে পাগল হয়ে যাচ্ছ।"বলল সোনিয়া।
-"তুমি খুব ভাল,সোনিয়া।"
-"এই নাচবে? আমার খুব নাচতে ইচ্ছে করছে। চলো চলো।"
সে খাট থেকে নেমে,আমার হাত ধরে টেনে তুলল। আমি আবার ধপ করে বসে পড়লাম।
-"নাচ! আমি একদম পারি না।" কালী পূজোয় একবার ভাসান ড্যান্স দিয়েছিলাম,সেটা মনে পড়ল।
-"পারি না বললে,শুনবো না! আমার সাথে নাচতে হবে।"
সোনিয়া উঠে গিয়ে মিউজিক সিস্টেম অন করল। একটা গান চালালো।-"গুলাবো,জেরা ইত্র গিরা দো!"
সোনিয়া এখন আলিয়া ভাট হয়ে গেছে।আমি শাহিদ কাপুর হতে চাই না।চুপ করে সোফায় বসে রইলাম। গানের ভলিউম আরও বাড়িয়ে দিল।জোর করে সে টেনে নিয়ে গেল আমাকে।আমার শরীরের খুব কাছে এল।
-"আরে বাবা!ঘুরতে এসেছি,একটু আনন্দ না করলে চলে? হই,হুল্লোড়,মস্তি,ইয়ার্কি........।"
কখন রাত এগারোটা বেজেছে খেয়াল নেই। সোনিয়া নাচ থামিয়ে বসে পড়ল।আমার যেন এখনো নাচতে ইচ্ছে করছে তার সাথে। সোনিয়ার পাশে বসে কয়েক ঢোক জল খেলাম। বললাম-"এই কাল,সমুদ্রের তীরে ঘুরতে যাবে?"
-"আচ্ছা! কালকের কথা কাল ভাবা যাবে।রাত হয়ে গেছে,আজ তুমি আমার এখানে থেকে যেতে পার। তবে,একটা শর্তে!"
-"কি? কি শর্ত?"
-"বদ মতলব করলে কিন্তু হবে না।"মেয়েটি হাসল।
পরদিন দুপুরে সমুদ্রের জলে হারিয়ে গেলাম দুজন।জলের ঢেউ সরিয়ে, সে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।ওর শরীরের প্রতিটি অঙ্গের স্পর্শ পাচ্ছি আমি।আমার জলভেজা শরীর টা কেঁপে উঠল।বিকালে ঘুরে বেড়ালাম দুজন।সাদা মেঘের ভেলা দেখলাম।দিগন্তরেখা দেখলাম। যেখানে সূর্যটা একটু একটু করে জলে ডুবে যায়।শুধু নীল অনন্ত জলরাশির ছলাৎছলাৎ শব্দ।

রাতে হোটেলে ফিরে খাবার পর আমি সোফায় শুয়ে পড়লাম। সোনিয়া খাটের উপর।কিছুক্ষণ পর একটা হাতের স্পর্শ পেলাম।
-"রনিত! ঘুমিয়ে পড়েছো?"
-"না।তুমি ঘুমোই নি। কেন?"
-"আমার তোমার কাছে ঘুমোতে ইচ্ছে করছে।"
আমার বুক ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করল।মেয়েটি আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার পাশে শুয়ে পড়ল। ঠোঁট দুটো খুব কাছে এগিয়ে এল। তার শরীর আমার প্রতিটা রন্ধ্র ছুঁয়ে চলেছে। উষ্ণ নিশ্বাস- প্রশ্বাসের তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে দু'জনের। আমি যেন মেয়েটির শরীরের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছি। ঠোঁটের ভেতর থেকে ঠোঁট সরিয়ে সোনিয়া বলল,
-"তুমি খুব ভাল রনিত।"
-"তুমিও।আমার সবসময় তোমার কাছে থাকতে ইচ্ছে করে।"
-"তাই? থাকো তাহলে।কে বারন করেছে?"
-"আমাকে ছেড়ে যাবে না তো, কোনোদিন?"
-"না"

এখনো সোনিয়ার 'না' বলাটা আমার কানে বাজছে।বেলা বাড়ছে, প্লার্টফর্মের বাইরে ঝলমলে রোদ।কোথায় খুঁজে পাব আমি  সোনিয়া কে?গত কয়েকদিন আমি তার সাথে প্রতিটা মুহুর্ত কাটিয়েছি। আমার সমস্ত যন্ত্রনা মুছে দিয়েছে সে।আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছে।আমি পারবো না সোনিয়া কে ছাড়া বাঁচতে।আমাকে খুঁজে পেতেই হবে।


(৪)

হোটেলের রেজিস্টার বুকে সোনিয়ার ঠিকানা পাওয়া যেতে পারে! ভাবনাটা মাথায় আসতেই আমি প্লার্টফর্ম থেকে বেরিয়ে হোটেলের দিকে দৌড়লাম। সোজা রিসেপসন।
-"দাদা,সোনিয়া ভৌমিক নামে একটা মেয়ের ঠিকানা চাই।এই হোটেলেই থাকতো। ফর্সা,সুন্দরী,কালো চুল, পাতলা চেহারা,মাঝারি উচ্চতা,...রুম নাম্বার ১০৯।"
রিসেপসনের লোকটি আমার দিকে ভাল করে চোখ বোলালো।তারপর বলল,-"আপনি পাগল, আছেন মশাই।১০৯ নাম্বার রুম তো আপনরই নামে বুক করা।রনিত রয়।বেশ কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি, আপনি আপন মনে কথা বলতে বলতে হোটেলে ঢুকছেন।সেদিন আপনার রুমে খাবার দিতে গিয়ে রুম বয় দেখল,আপনি নাকি সোফায় বসে একা একা কথা বলছেন,তারপর একা একা গান চালিয়ে উদ্দাম নাচছেন......।"
-"কি বলছেন,এসব? আমি মেয়েটির সাথে প্রতিটা মুহুর্ত কাটিয়েছি। তার শরীরের গন্ধ এখনো আমার গায়ে লেগে আছে।"
-"ও সবআপনার মনের ভুল।এই নিন রেজিস্টার খাতা।নিজেই দেখে নিন,সোনিয়া ভৌমিক নামে কারও নাম এন্ট্রি আছে কি না?
আমি পাগলের মতো খাতার পৃষ্টা ওলটাতে লাগলাম।পেলাম না কোথাও।কিন্তু আমার ফোনে তোলা ছবি টা তো আর মিথ্যে বলবে না। আমি পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। গ্যালারী ওপেন করলাম। স্ক্রিনের উপর শুধু আঙুল টানতে লাগলাম।কোথায় গেল ছবিটা? এখানেই তো ছিল! কোথায় গেল?
রিসেপসনের লোকটি আমার উপর বিরক্ত হল। -"কোথা থেকে যে এসে জোটে এসব!"তারপর রেজিস্টার খাতাটি রেখে দিয়ে অন্যদিকে চলে গেল।
আমি বোকার মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর নিজের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে, খাটের উপর শুয়ে পড়লাম।কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না।ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নের ভেতর সোনিয়া এল।আমার মাথায় হাত রাখলো।
-"আমি তোমাকে ছেড়ে যায় নি রনিত।সব সময় তোমার সাথে আছি।তোমার মন খারাপ করলেই, ছুটে চলে আসবো তোমার কাছে।"
আমি ঘুম ভেঙে,ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলাম।ঘরের ভেতর সেই মন কেমন করা গন্ধ,ভেসে বেড়াচ্ছে।

বি:দ্র: গল্পে ব্যবহৃত জোকস টি গুগল থেকে সংগ্রহীত।

স্বদেশ কুমার গায়েন (ফ্রেব্রুয়ারী,২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.