একটি প্রেমের গল্প " অর্ধেক গোলাপ "






(১)

সুনন্দা সত্যিই আসবে?

না,আমি একটা মিথ্যে আশা নিয়ে ফালতু বসে আছি।ও কেন আসবে না?অবশ্যই আসবে।ও কে আসতেই হবে।আমি সুনন্দা কে তো মন থেকে ভালোবাসি।আমি তো ও কে মন থেকে চাই।তবে কেন আসবে না?মা বলে,মন থেকে ভালবেসে কোনো কিছু চাইলে,তা পাওয়া যায়। ঈশ্বর তার ইচ্ছে পূরন করেন।তবে আমার ইচ্ছে, ঈশ্বর কেন পূরন করবেন না?
পার্ক টির ভেতর একটা ছাতিম গাছ।তার নীচে বসার একটা বেঞ্চ।তিন জন বসা যায়।বিকালের সূর্যটা গাছের পিছনে।তাই সামনের দিক টা ছায়া ময়।সবুজ ঘাসের উপর রোদ পড়ে এসেছে। প্রেমিক–প্রেমিকা রা তার উপর বসে আছে। ঘাসের উপর বসে গল্প করার একটা মজাই আলাদা।আমি মাঝে মাঝে এই পার্কটিতে এসে বসি।থানার সামনে রাস্তা দিয়ে সোজা তিন মিনিট হেঁটে গেলে এই পার্ক টি পড়ে।থানার কাছাকাছি হওয়ায় জন্য পার্কটিতে খুব একটা ভিড় থাকে না।কারন এখানে 'ইন্টুমিন্টু' করার সুযোগ পাওয়া যায় না।আজ ভ্যালেন্টাইন ডে তে তবু একটু ভিড় চোখে পড়ছে।আমি হাতের ঘড়ির দিকে তাকালাম।সাড়ে চারটে বাজে।

সুনন্দা কি সত্যিই আসবে না?

আমি মনে মনে নিজের ভুল টা মেনে নিলাম। না,আসাটাই স্বাভাবিক।কারন সুনন্দা তো এক বার ও আসবে বলেনি।আমিও তো আমার মনের কথা শুনে এখানে বসে আছি।আমার মন বার বার বলছে সুনন্দা আসবে।ও ভাল না বাসলেও ,আমার ভালোবাসার টানে আসবে। হাতের ভেতর ধরে রাখা গোলাপ ফুল টা গরমে ভিজে উঠেছে।পাত গুলো যেন মরে যাচ্ছে। পাপড়ি গুলো ঝুলে পড়েছে।আমার ঘরের জানালার নীচে,এক ফালি জায়গায় উপর একটা ফুলের বাগান।আমার দিদি নিজের হাতে যত্ন করে বানিয়েছে।নানা রকম ফুলের গাছ লাগানো।দিদিকে হেল্প তো দূরের কথা, কোনোদিন ওর বাগানে ঢুকেও দেখিনি।বরং জানালা দিয়ে কাড়ি কাড়ি থুতু ফেলেছি ওর সাধের পাতাবাহার গাছের উপর।এ নিয়ে কম ঝগড়া হয় না দুজনের মধ্যে। একটাই মাত্র গোলাপ গাছ বাগানটিতে।কমলা রঙের গোলাপ। লাল গোলাপ গাছ টি কিছুদিন আগে মরে গেছে। গতকাল রাত থেকে দেখে রেখেছি কুঁড়ি ফুটেছে।আজ সকালে ঘুম ভেঙে দেখলাম পাপড়ি মেলেছে। আর বিকালে মটাস করে ভেঙে নিয়ে চলে এসেছি।কেউ দেখতে পায়নি। দিদি জানতে পারলে,আবার একটা কুরুক্ষেত্র শুরু হবে।তা শুরু হোক।বাজার থেকে বাসি ফুল কিনে প্রোপোজ করা,আর গাছ থেকে তরতাজা ফুল তুলে প্রোপোজ করার মধ্যে একটা ফারাক আছে।কিন্তু এখন কমলা গোলাপ হাতে নিয়ে ভয় করতে লাগলো? সুনন্দা যদি ব্যাপার টা জানে!তাহলে আমাকে কি ভাববে!

আজ সকালে বাজারে গিয়ে,প্রিয়র সাথে দেখা। গোলাপ কিনছে।কমলা গোলাপ।আমি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,–"কি রে! লাল গোলাপ থাকতে,কমলা গোলাপ কিনছিস?
প্রিয় আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।বলল,–"তুই বুঝবি না খোকা! লাল তো ভালবাসার প্রতীক,আর কমলা গোলাপ শুধু ভালবাসা নয়,
তার সাথে 'ইয়ে' ব্যাপার–স্যাপারের প্রতীক।"
আমি ডাবল বিস্মিত হয়ে বললাম,–"ইয়ে মানে কিয়ে?"
–'ও তোর খুবড়িতে ঢুকবে না, বন্ধু।"
আমি জোর করে চেপে ধরলাম।প্রিয় বলল,–"ভালবাসার পর কি হয়?নির্জন ঘরে একটু বেশি কাছে আসা। উদ্দীপনা, শিরশিরানি.....এ সব বোঝানোর জন্য।'
আমার লজ্জাও লাগলো,আবার ভয় ও করল।আমার বাড়ির গাছটিতে তো কমলা গোলাপ ই ফুটেছে!
হায়!কি করি এখন?সুনন্দা যদি ব্যাপার টা জানে,তবে কেলেঙ্কারির এক শেষ।একবার ভাবলাম,বাজার থেকে লাল গোলাপই কিনে নিয়ে যাই।তারপর আবার ভাবলাম,গাছের
তরতাজা ফুলটা দিতে পারব না? সুনন্দা জানে না ব্যাপার টা।ও কি করে জানবে,এই 'ইয়ে'র প্রতীকের ব্যাপার টা?মনে মনে অঙ্ক কষার মতো ধরে নিলাম।

গলকাল বিকেল বেলা টিউসান থেকে ফেরার পথে দেখা হল সুনন্দার সাথে।প্রতি রবিবার পি.কে.এস স্যারের কাছে ভূগোল পড়তে যায়।আমিও ঠিক করেছি সেকেন্ড ইয়ারে উঠেই,স্যারের পদচরনে গিয়ে পড়বো।একমাত্র হেতু সুনন্দা।তখন বিকেলের পরিষ্কার আকাশে মেঘেরা খেলা করছে।আমি সুনন্দার পথ আটকে দাঁড়ালাম।
–"আবার,তুই? আমি যেখানে যাই তোর সাথে দেখা হয়ে যায়!"সুনন্দা আমার দিকে তাকিয়ে বলল।
আমি একটু 'ইয়ে' টাইপের ছেলে মানে,যাকে বলে
'কেলানে'।কম কথা বলি।তাড়াতাড়ি কথা বলতে পারি না।মেয়েদের সামনে গেলেই, আমার হাত–পা,সব কিছু ঠান্ডা হয়ে যায়।মদ,বিড়ি সিগারেট কোনো প্রকার নেশা করি না।মেয়েদের
সাথে দুষ্ট দুষ্ট কথা বলতে,কিরকম অস্বস্থি
হয়। সিনেমা হলে অন্ধকার কোনে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে শিখিনি। আর তাই মনে হয়,আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ে মনে হয় আমার
কপালে জোটেনি।তবে এটা আমারই ধারনা।
সুনন্দার প্রশ্নের উত্তরে আমি একটু হাসি টেনে বললাম,–"ভালোবাসি বলেই তো তোর সাথে দেখা হয়ে যায়!"
সুনন্দা জোরে কিছু বলতে যাচ্ছিল।থেমে গেল।তারপর সুর নরম করে বলল,–"দেখ সোনু,সব সময় ভালো বাসি,ভালোবাসি করবি না।আমি তোকে কোনোদিন ভালোবাসি নি।
তোকে ভালোলাগে তাই,তোর সাথে কথা বলি।"
–"ভালো না লাগলে,ভালোবাসবি কি করে? প্রথমে ভালোলাগা, তারপর ভালোবাসা।"
–"উফ! আমি তোকে ভালোবাসতে পারবো না। অন্য একজন কে আমার পছন্দ হয়।"
–"ওহ! ভালতো এখনো বাসিস নি তাকে। আর তাছাড়া আমি তো তোকে ভালোবাসি।"
–"ধাৎ !পথ ছাড়,আমি বাড়ি যাব।"
সুনন্দা একটু এগিয়ে গেল।আমি হেঁকে বললাম,–"কাল বিকালে পার্কে আসবি।আমি তোর জন্যে অপেক্ষা করবো।"
–"আমি কখনো আসবো না।"
–"আমার ভালবাসাই তোকে টেনে আনবে। আমার সে বিশ্বাস আছে।"
–"আসবো না....আসবো না....।

শেষ কথা টা এখনো আমার কানে বাজছে।হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সাড়ে চারটে।সুনন্দা হয়তো আর আসবে না।কিন্তু আমার মন বার বার বলছে ও আসবে।যারা সত্যি কারের ভালবাসে,তাদের মন এরকম বলে।একটা দৃঢ় আশা নিয়ে বসে থাকে।সে আশা অপুর্ন থাকবে জেনেও।আমিও ঠিক সেই ভাবে বসে আছি।

(২)

সুনন্দা কলিং বেল টিপলো দু'বার।সিঁড়ি দিয়ে নেমে দরজা খুলে দিল নীল।
–"চল,ভেতরে।"
সুন্দর করে নীলের ঘর টা সাজানো।এক কোনে পড়ার টেবিলের উপর ল্যাপটপ।দেওয়ালে একটা বড় করিনা কাপুরের অর্ধেক শরীর দেখানো ছবি চিপকানো।সুনন্দা সে দিকে চোখ তুলেই নামিয়ে নিল।দক্ষিনের জানালার পাশে গিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল,–"বাড়ি এত ফাঁকা কেন?তোর বাবা–মা বাড়িতে নেই?"
–"না রে।মাসীর বাড়িতে গিয়েছে।তাইতো তোকে বাড়িতে আসতে বললাম।"নীল বলল।
–"মানে!" পিছন ঘুরে তাকালো সুনন্দা।নীল হাসলো।
–"কিছু না।দুজন একটু একান্তে সময় কাটাতে পারবো।"
নীল এগিয়ে গিয়ে,সুনন্দা কে জড়িয়ে ধরল। নীলের ঠোঁট দু'টো উষ্ণ হয়ে উঠেছে।মুখ টা গলার কাছ থেকে,দ্রুতো বুকের দিকে নামছে।
গরম নিশ্বাস টের পেল সুনন্দা।
–"কি করছিস? ছাড় আমাকে।তোকে আমি ভালো ছেলে ভাবতাম।আর তুই ও.....।"
হাত দিয়ে জোরে ঠেলে সরিয়ে দিল নীল কে।
–"কি বলছিস?আমি তো তোকে ভালোবাসি।" নীল বিস্মৃত হল।
–"এই তোর ভালোবাসার ধরন?"
সুনন্দা দরজার দিকে পা বাড়ালো।সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে বাইরে বেরিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটলো পার্কের দিকে।


(৩)

এখনো সন্ধ্যা নামে নি।আকাশ টা লাল রঙে সেজেছে।পার্কের মধ্যে আগের থেকে একটু ভিড় বেড়েছে।আমার এই ছাতিম গাছটির দিকে কেউ আসেনি।সবাই সবুজ ঘাসের উপর বসে গল্প করছে।আমি এখনো বসে আছি।ঘড়িতে পাঁচটা
বেজে দশ মিনিট।সুনন্দা আর আসবে না।আসার হলে,এতক্ষন এসে যেত।হাতের গোলাপটির দিকে একবার তাকালাম। ঝিমিয়ে পড়েছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল।একটা একটা করে পাতা ছিঁড়তে লাগলাম।তারপর গোলাপের পাপড়ি গুলো।কুচি কুচি হয়ে সেগুলো আমার পায়ের কাছে পড়তে লাগলো।অর্ধেকের বেশি ছেঁড়া হয়ে গেল।হঠাৎ চমকে উঠলাম।
–"সোনু!"
চোখ তুলে দেখি সুনন্দা দাঁড়িয়ে।আমি থমমত খেয়ে গেলাম।পায়ের কাছে পড়ে থাকা পাপড়ি গুলোর দিকে তাকালাম।
–"তুই! আমি ভেবেছিলাম তুই আর আসবি না।তাই ফুল টা ছিঁড়ে ফেললাম এই মাত্র।কি হবে এবার?"
সুনন্দা আমার মুখ খানা দেখলো।কিছু বলল না।ওর চোখে জল।তারপর আমাকে জোরে বুকে টেনে নিল।আমি দ্বিগুন বেগে থতমত খেয়ে
বললাম,–"কি করছিস?ছাড় আমাকে।"
–"না ছাড়বো না।তোকে খুব ভালবাসবো।"
দু'মিনিট পর ছাড়লো।আমার খু ভাল লাগছিল। আবার জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো সুনন্দা কে।সাহস হল না।আমার হাতের অর্ধেক গোলাপ ফুল টা নিয়ে ভাল করে দেখলো।পড়ন্ত সূর্যের আলোয় কমলা রঙ টা বোঝা যাচ্ছে।আমার
মুখের দিকে তাকালো সুনন্দা। হাত দিয়ে আমার নাকটা টেনে এপাশ ও পাশ করে বলল,–"কমলা রঙের গোলাপ কেন রে? অন্য
কোনো মতলব আছে নাকি?"
আমি জিব কেটে বললাম,–" বিশ্বাস কর,কোনো মতলব নেই।আমি শুধু তোকে ভালবাসি।আমার বাড়ি গাছ থেকে এটা তুলে এনেছি।"

সন্ধ্যা নেমে এসেছে।পার্কের ভেতর আলো গুলো
জ্বলে উঠল দপ করে। সুনন্দা আমার হাত টা নিজের হাতে নিল।পাশাপাশি হাঁটছি দু'জন।পার্ক থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তা দিয়ে।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.