একটি প্রেমের ছোটগল্প " দার্জিলিং মেল "





(১)


আমার ছোট্টো এই জীবনে প্রথমবার ঘটতে চলেছে এরকম ঘটনা।কারন,আমি এক জায়গাতে দু'বার কখনো যায়নি।তখন ভাবেনি তিন মাস পরই আমাকে আবার এই দার্জিলিং এ ফিরে আসতে হবে!কিসের টানে আবার আমি ছুটে আসছি এই শৈল শহরে?এই সবুজ পাহাড়, চা-বাগান,পাহাড়ি রাস্তা-খাদ,মেঘের ভেলা, সূর্যোদয়, কুয়াশা ঢাকা স্টেশন, এরাই কি আমাকে টেনে আনছে?সে তো বরাবরই টানে। কিন্তু সত্যিই কি সেই প্রকৃতির মনোমোহিনী রুপ-সৌন্দর্যের আকর্ষনে আমি আবার ফিরে আসছি?
না,অন্যকিছু!
যার রুপ,যার সৌন্দর্য,এই প্রকৃতির থেকে আরও সুন্দর। দু'পাশে নিকষ কালো অন্ধকার।মাঝে মাঝে ট্রেনের পেন্টোগ্রাফের সাথে ইলেক্ট্রিক তারের ঘর্ষনে বিদ্যুতের ঝলকানির আলো ছিটকে পড়ছে রেল লাইনের পাশের ঝোপ-ঝাঁড়ের উপর।তখন বাইরেটা আবছায়া পরিষ্কার দেখা যায়।আবার কিছুক্ষনের মধ্যে কালো হয়ে যায়।বর্ধমান স্টেশন পেরিয়ে ঝড়ের গতিতে ছুটছে রেল গাড়িটি।দার্জিলিং মেল।মনে হচ্ছে কোন এক উত্তাল ঝোড়ো হাওয়া আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।যার কোনো দিক নেই, সীমারেখা নেই।মাঝে মাঝে রেল গাড়ি টি তীক্ষ স্বরে হর্ন দিচ্ছে।এক অদ্ভুত সে আওয়াজ!হু হু..... হু।রাতের নির্জনতা কে ভেদ করে,ছুটে আসা এই হর্নের শব্দ আমাকে পাগল করে তোলে।ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে আমিও হর্ন বাজাই।


শিয়ালদহ স্টেশন থেকে যখন ট্রেনটি ছাড়ে তখন রাত দশটা বেজে দশ মিনিট।প্লার্টফর্মের বোর্ডে টানানো লিস্ট দেখে আমার কোচে উঠে পড়ি। আমার ভাগ্যটা এমনিতেই বরাবর ভালো হয়,সিট কনফার্ম এবং লোয়ার বার্থ।লোয়ার বার্থ বরাবরই ভালো লাগে আমার। লোয়ার বার্থের একটা ভালো সুবিধা হল, জানালার পাশে বসে বাইরের পরিবেশ টা ভালো করে মনের মধ্যে বাঁধিয়ে রাখা যায়।ট্রেনে চড়লে এমনিতেই আমার ঘুম পায় না।সারক্ষন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। গাছ-পালা ছোটে,ঘর-বাড়ি ছোটে,পথ-ঘাট,নদী-নালা সব ট্রেনের গতির সাথে ছুটে পালাতে থাকে।আর তাদের সাথে আমার মনটি ও ছুটে পালায়।শুধু দেহটা জানালার পাশের সিটে বসে থাকে।
এখন কটা বাজে?
হাতের কজ্বি টা ঘুরিয়ে চোখের সামনে আনি। ঘড়িতে রাত একটা বেজে পনেরো মিনিট।ট্রেনের সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।এত রাতে কারও জেগে থাকার কথাও নয়।শুধু জেগে আছে আমার চোখ দু'টো। জানালার রডে মাথা হেলিয়ে বাইরের কালো অন্ধকারে তাকিয়ে থাকি। কিছু দেখা যায় না।ক্ষনিকের বিদ্যুতের আলোয় লতা-গুল্ম, স্লিপার,পানা পুকুর,ঝোপ-ঝাড়, এসব চোখে পড়ে।নিমেষের মধ্যে তারা হারিয়ে যায়।শুধু তালে তালে ঝম ঝম ঝম ....শব্দে ট্রেন ছুটে চলে।টিউব লাইট টা জ্বালিয়ে, ব্যাগ থেকে ডায়েরী টা বের করি।চোখের চশমাটা একটা আঙুল দিয়ে উপরের দিকে ঠেলে দিই। তারপর ডায়রীর পাতা ওলটাই।


(২)

একুশে নভেম্বর,২০১৫।লাবনি কে প্রথম দেখেছিলাম, এই দার্জিলিং মেলে।এক পলক দেখা যেরকম হয়,ঠিক সেরকম।শ্যামলা গায়ের রঙ।গোল মুখ, কাজল টানা চোখে সাদা কাচের চশমা,টোল ফেলা গাল,পাতলা সরু গোলাপি ঠোঁটে এক টুকরো হাসি মাখানো ছিল।মাঝারি উচ্চতা, মাথায় ঘন কালো চুল পিঠের উপর ছড়ানো।বয়স আর কত হবে!খুব বেশি হলে তেইশ। চেহারা একটু ভারীর দিকে হলেও তাকে মোটা বলা যায় না।উচ্চতার সাথে বেশ মানানসই। পরনে জিনস আর নীল কুর্তি।কুর্তির উপরে একটা কালো কোট চাপানো।বুকের কাছে কোটের চেন টা খোলা।

নতুন নতুন জায়গা দেখা,ঘুরে বেড়ানোর বাতিক আমার ছোটো বেলা থেকেই।বন-জঙ্গল,সবুজ অরন্যে ঢাকা পাহাড়,নদী,ছায়ায় ঘেরা মেঠো পথ আমাকে চুম্বকের মতো আকর্ষন করে।অচেনা শহর, অজানা জায়গা, বা,বড় কোনো হাইওয়ে ধরে সন্ধ্যার ল্যাম্পপোস্টর আলোয় আমার একা একা হেঁটে বেড়াতে ইচ্ছে হয়। অথবা, কোনো নির্জন প্লার্টফর্মে বসে আমি আকাশ দেখি বা,কোনো জন বহুল প্লার্টফর্মে বসে ট্রেনের যাতায়াত,আর মানুষের কোলাহল।এটা আমার একপ্রকার ইচ্ছে,ভালোলাগা বলতে পারেন।কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই যে তার সবসময় ইচ্ছে পূরন হবে,এমন কোনো মানে নেই।আর যদি সেটা হয়ে যায়,তখন মন কে বেঁধে রাখা যায় না।ছেড়ে দিতে হয় স্বপ্নের টানে। তেমনি আমাকে কেউ বেঁধে রাখতে পারে না।আসলে পাগলদের বেঁধে রাখা যায় না।তাই শেষ পর্যন্ত চাকরী-বাকরী ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি মনের খিদে মেটাতে। স্বপ্ন পূরনের উদ্দেশ্যে।যেখানেই যাই না কেন, কোনো না কোনো কাজ আমি জুটিয়ে নিই। যেমন তেমন একটা কাজ পেলেই হল।শুধু চুরি ডাকাতি, খুন-খারাপি বাদে।তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো হোটেলে,কিম্বা ছোটো রেস্তোরায় আমি কাজ দেখি।শুধু থাকা,খাওয়া আর ঘুরে বেড়ানোর মতো অল্প কিছু টাকা,আর একদিন ছুটি দিলেই আমি খুশি মনে কাজ করে দিই। আর তাছাড়া পকেটে কয়েক বছরের চাকরীর অল্প কিছু টাকা পড়ে আছে।তাই বেশি চিন্তা ও করি না।যেখানে কাজ মিলে যায় সেখানে মাস দুই-তিন থাকি।ভবঘুরের মতো চারিদিকে ঘুরে বেড়াই।বেড়ানো হয়ে গেলে তারপর আবার নতুন জায়গা,নতুন কাজের সন্ধান।আর কাজ না মিললে, সপ্তা'খানেক কাটিয়ে সে জায়গা ছেড়ে বিদায়।এই হল আমার ভবঘুরে, পাগলাটে, বাঁধনহীন জীবন। কোথাও কেউ আমাকে বেঁধে রাখতে পারে নি।যে ঘটনা টা বলছি,সেটা গত বছর সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা।একবছর ধরে মধ্য ও দক্ষিন ভারতের বন, জঙ্গল,অচেনা শহর ঘোরার পর সেবার,বাড়ির পাশের দার্জিলিং বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে হল।টিকিট ও কেটে ফেললাম।শিয়ালদহ থেকে দার্জিলিং মেল। আমার রওনা হওয়ার তারিখ একুশে নভেম্বর। আর এই দিনেই লাবনি কে প্রথম দেখেছিলাম। রাত তখন এগারোটা।ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে দার্জিলিং মেল।টয়লেট থেকে বেরোতে গিয়েই আমাদের দেখা হয়।আরেকটু হলেই ধাক্কা লাগতো,কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়েছিল লাবনি।
-"সরি!" নিজের মুখ দিয়ে অজান্তেই বেরিয়ে গিয়েছিল শব্দ টা।
-"ইটস ওকে!"শুধু একটুকু বলে একটা শীতল দৃষ্টি বিনিময় করেই পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল সে।আর ওই টুকু সময়েই আমি তার ছবিটা এঁকে নিয়েছিলাম।টয়লেট থেকে ফেরার পথেও একবার চোখে চোখ পড়ল।এর পর আর তাকে দেখেনি।

সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি নিউ জলপাই গুড়ি স্টেশন এসে গেছে।ব্যাগটা পিঠে ঝুলিয়ে ট্রেন থেকে নেমে পড়ি।একরাশ ঠান্ডা ছুটে এসে আমাকে আদর করে।আমার ব্যাগে ঠান্ডার সমস্ত ড্রেস রাখা আছে। শীতের কোট, মাফলার,পশমের টুপি, চাদর।একটা চাদর বের করে গায়ে জড়িয়ে নিই।চারিপাশে একবার তাকাই।মেয়েটি কে দেখতে পাই না।হয়তো আমার আগে নেমে কোথাও চলে গেছে।প্লার্টফর্ম থেকে বেরিয়ে বাইরে আসি।স্টেশনের বাইরে সারি সারি রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে।একটা রিক্সা ডাকি আমি।-"শিলিগুড়ি জীপ স্টেশন যাবে?"
-"জি! সাব।"
নির্দিষ্ট সময়ে পাথুরে রাস্তা দিয়ে শিলিগুড়ি জীপ স্টেশনে পৌঁছাই।চারিদিকে একটা কুয়াশার আস্তরন। দার্জিলিং যেতে গেলে এখান থেকে জীপ গাড়িতে করে যেতে হয়।একটা জীপে উঠে পড়ি।গাড়িটি হেলতে দুলতে আমাকে নিয়ে চলে। অনেক খোঁজা খুঁজির পর একটা সস্তার হোটেল ঠিক করে নিই।কোনো মতে একটা মাথা গোঁজার জায়গা হলেই আমার হয়ে যায়। জায়গা না মিললেও,আজ পর্যন্ত কোনো অসুবিধা হয়নি। সবথেকে ফ্রি তে নিরপত্তা,আর থাকার জায়গা হল বড় বড় রেলওয়ে প্লার্টফর্ম।একটা প্লার্টফর্ম টিকিট কেটে নিলেই হল।এতদিন সেটাই করে এসেছি।কিন্তু যেখানে প্লার্টফর্ম না মেলে,সেখানে হোটেল খুঁজতেই হয়।দার্জিলিং এ সস্তার হোটেল পেলেও কাজ খুঁজে পাই না।হোটেলে হোটেলে, চায়ের দোকানে গিয়ে অনেক চেষ্টা,ও অনুরোধ করি।তবুও কাজ মেলে না। এখানে আমার ভাগ্যটাই খারাপ!হয়তো বেশি দিন থাকতে পারবো না।মনে মনে বলি আমি।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই চারিপাশে ধোঁয়া ধোঁয়া দেখি।মেঘের দল ভেসে চলেছে।মনে হয়, হাত বাড়িয়ে একটা নামিয়ে আমি।বেড থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে,রুমে চাবি লাগিয়ে রাস্তায় বের হই।আমার গায়ে একটা কোট,তার উপর একটা শালের চাদর।আর মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ।রাস্তা ধরে কিছুটা পথ হেঁটে যাই।একটা ছোটো চায়ের দোকান রাস্তার পাশে।ঝুপড়ির মতো।দার্জিলিং এ এসে,এখানকার চা না খাওয়া টা সব থেকে বড় অপরাধ।এক ভাঁড় চায়ের অর্ডার করি।চুমুক দিতেই শরীরে একটা আমেজ আসে।চা শেষ করে উদ্দেশ্যহীন ভাবে কিছুক্ষন ঘুরে বেড়াই। এদিক-সেদিক।ভবঘুরের মতো।দুপুর গড়িয়ে বিকাল নামে।বিকালে গাড়ি তে করে বেরিয়ে পড়ি। গাড়ি গিয়ে টী গার্ডেনে থামে।আমি নেমে পড়ি পাহাড়ি রাস্তায়।আমাকে রেখে গাড়িটা একটু একটু করে পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে যায়। এক মনোরম পাহাড়িয়া সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র এই চা বাগান। যেদিকে তাকাই সবুজের সমারোহ। আমার কবিতা লিখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু পারি না।বিকেলের আলো গড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের ধাপে ধাপে চা বাগানের পাতায়।স্থানীয় পাহাড়ি মেয়েরা সারিবদ্ধ ভাবে চায়ের পাতা তুলছে।অদ্ভুত সুন্দর সে দৃশ্য! মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি কিছুক্ষন।আলো কমে আসে।আমি পাহাড়ি বাঁকা পথ বেয়ে উপরের দিকে উঠতে থাকি।রাস্তার একপাশ দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে,হেঁটে আসছে পাহাড়ি মেয়ে, বউ রা।মাথায় ঘোমটা,হাঁটু পর্যন্ত কাপড় পরা।পিঠে চা পাতার ঝাঁকা।ভারী সুন্দর লাগে তাদের হাঁটা। আরও কিছুটা উপরে এগিয়ে যাই আমি।বাঁকটা ঘুরতেই মেয়েটাকে দেখতে পাই।মাথায় গোল টুপি।পরনে শাড়ি নয়, গেঞ্জি আর হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট।পিঠে চা পাতার ঝাঁকা।আমার দিকেই হেঁটে আসছে।মাঝে মাঝে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে সবুজ চা বাগানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। কাছে আসতেই চমকে উঠি আমি।মেয়েটিকে খুব চেনা চেনা লাগছে। মনে করতে পারি না।মেয়েটি পাশ কাটিয়ে,চলে যেতেই আমি ডাকি,-"এই যে শুনুন!"
ঘুরে দাঁড়ায় মেয়েটি।আমার দিকে এগিয়ে আসে।-"আমাকে ডাকছেন?"
-"আপনাকে আমার খুব চেনা লাগছে! কোথায় দেখেছি বলুন তো!"
মেয়েটি এবার আমার দিকে ভালো করে তাকায়। উপর থেকে নীচে। তারপর বলে,-"আপনিই জানেন সেটা।"
আমি হাতে তর্জনী মাথায় ঠেকিয়ে বলি,-"হ্যাঁ মনে পড়েছে।দার্জিলিং মেল।....টয়লেট থেকে বেরোতে গিয়েই...কিন্তু আপনার চোখে যে একটা চশমা ছিল!"
মেয়েটি হেসে বলে,-"আপনার মনে রাখার ক্ষমতা তো দারুন!"
-"না,কোনো জিনিষ ভালো করে দেখলে,আমার মনে থেকে যায়।"
মেয়েটি চা পাতার ঝাঁকা পিঠে নিয়ে রাস্তা বেয়ে নীচে নামতে থাকে। আমিও মেয়েটির সাথে সাথে নীচের দিকে নামি।
-"ও আপনি তাহলে,ওই টুকু সময়ে আমাকে ভালো করে দেখেছিলেন?"
আমি মেয়েটির প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বলি,-"আপনার সাথে যে আবার দেখা হবে আমি ভাবেনি! তবে আপনাকে দেখে এখানকার মেয়ে বলে মনে হয় না।"
-"তাই বুঝি?"
-"হুম।"
-"আমি তো এখানকার নয়,তো মনে হবে কি করে!"
-"কোথাকার তবে?"
-"কলকাতার কাছেই আমার বাড়ি।"
-"তাই। আমার বাড়ি ও তো ওদিকেই।চব্বিশ পরগনা।কিন্তু এখানে আপনি,....এ চা পাতার ঝাঁকা পিঠে....বুঝতে পারছি না।"

মেয়েটি এবার হেসে আমার দিকে তাকায়।গোল টুপি পরে যেন মেয়েটিকে আরও সুন্দর লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটি বলে,-"আমি এখানে চা বাগানে কাজ করি।সে সব অনেক গল্প। তো,আপনি এখানে বেড়াতে এসেছেন?"
-"না, কাজে।" বলি আমি।
-"কি কাজ করেন?"
-"এই তো ঘুরে বেড়ানোটাই আমার কাজ।" কথাটা বলেই আমি হাসতে থাকি।
মেয়েটি বলে,-"আপনি বেশ মজা করতে পারেন।"
-"হুম তা একটু পারি।বিশেষ করে মেয়েদের সাথে।" আবার হাসি আমি।
-"সে তো বুঝতেই পারছি। ট্রেনে একটু খানি দেখা, অথচ কিভাবে আলাপ জমিয়ে নিলেন!"
-"আসলে ঘুরে বেড়ানোর আমার খুব শখ।নতুন নতুন জায়গা,সবুজ গাছপালা,বন-জঙ্গল আমার খুব ভালো লাগে।তাই তাদের টানেই বেরিয়ে পড়ি। সারা বছর ভবঘুরের মতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা....।"
মেয়েটি বিস্ময় ভরা চোখে আমার দিকে তাকায়। বলে,-"সারাবছর ঘুরে বেড়ান?কাজ-বাজ করেন না?"
-"করতাম,একটা চাকরী।ভালো লাগেনি,তাই ছেড়ে দিয়েছি।যেখানে বেড়াতে যাই,সেখানে যেকোনো একটা কাজ খুঁজে নেই।তবে এক জায়গায় বেশীদিন মন টিকতে চায় না।"
-"সে কি! আপনি তো পুরো পাগল।" মেয়েটি বলে।
-"অনেকটা সেরকম বলতে পারেন। "
মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।একটা স্নিগ্ধ দৃষ্টি।চোখ দু'টো ভারী সুন্দর দেখায়। মায়াময়।আমি সে চোখে তাকিয়ে থাকতে পারি না। চোখ নামিয়ে নিই। আলো আরও কিছুটা কমে আসে। আমরা পাশাপাশি হেঁটে চলি।এখন আমরা অনেকটা নীচের দিকে প্রায় সমতলের কাছে নেমে এসেছি।কিছু এলো মেলো,ছড়ানো ছেটানো বাড়ি ঘর দেখতে পাই।নীরবতা ভঙ্গ করে মেয়েটি বলে,-"তাড়াতাড়ি পা চালান।খুব ঠান্ডা নামছে।"
এতক্ষন বুঝতে পারেনি সেটা।মেয়েটির কথায় এবার বুঝতে পারি, সত্যিই ঠান্ডা লাগছে।একটা ঝুপড়ির মতো ঘরের কাছে গিয়ে থামে মেয়েটি।
-"এখানেই আমি থাকি।আপনি কোথায় উঠেছেন?"
-"হোটেলে।"
-"ওহ।হোটেলে ফিরতে তো অনেক সময় লেগে যাবে।আর ঠান্ডায় হৌটেলে পৌঁছানোর আগে জমে বরফ হয়ে যাবেন। তার থেকে আজ আর হোটেলে ফিরতে হবে না।আমার এখানে থাকতে পারেন।দু'টো ঘর আছে, অসুবিধা হবে না।আর কেউ কিছু বলবেও না।"
আমি হেসে বলি,-"না,তা কি করে হয়! আমার শীতের জিনিষ পত্র সব হোটেলে পড়ে আছে। আর গায়ে সামন্য কিছু!"
-"আমার ড্রেস পরবেন।" মেয়েটি হাসে।
তারপর কিছুক্ষন থেমে আবার বলে,-"আসলে আপনাকে আমার ভালো লেগেছে একটা কারনে!"
-"কি কারন?"
-"আপনি পাগল তাই।" মেয়েটি হেসে ওঠে।
আমি চুপ করে থাকি।মেয়েটি চাবি দিয়ে দরজা খোলে। ভেতরে ঢুকি দু'জন।ছোটো ছোটো দু'টো ঘর।তবে বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন।
-"ওই চেয়ার টা তে বসুন।" মেয়েটি হাত দিয়ে একটা চেয়ার দেখিয়ে দেয়।আমি পা দু'টো সটান করে চেয়ারে বসি।হাত দুটো উপরে করে আলিস্যি ছাড়ি।তারপর জিজ্ঞেস করি,-"আপনার নাম টা জানা হল না!"
-"লাবনি।তবে আর আপনি করে বলবেন না।"
আমি হেসে বলি,-"আমার নাম সুজয়।আচ্ছা,তুমি করে বলবো।"
লাবনি হেসে বলে,-"হ্যাঁ,মনে থাকে যেন।ভুল যেন না হয়।"
-"কত দিন এখানে আছো?"লাবনি কে জিজ্ঞেস করি আমি।
-"বছর দু'য়েক ।"
-"বাড়ি যাও না?"
-"বছরে একবার।ওই সেদিন তো বাড়ি থেকেই ফিরছিলাম।"
-"তো হঠাৎ এখানে চলে এলে কি মনে করে!"
-"সে অনেক গল্প।রাতে বলবো। এখন কাজ আছে।"
সন্ধ্যা নেমে গেছে।কেরোসিনের আলো টা জ্বালিয়ে, কিছু শীতের জিনিষ এনে আমাকে দিয়ে যায় লাবনি।-"এগুলো পরে নাও।আমি একটু চা করে আনি।"
আমি জ্যাকেট টা পরে তার উপর চাদর টা জড়িয়ে নিই। আর মাথায় মেয়েদের টুপি।বেশ কিছু সময় পর কত গুলো বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে দল বেঁধে বই-খাতা আর টিমটিমে আলো নিয়ে ঘরে ঢোকে।তাদের কে দেখে আমার মনে হয়,এই পাশাপাশি স্থানীয় ঝুপড়ি বাসীর ছেলে মেয়ে। লাবনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে, স্থানীয় ভাষায় তাদের বসতে বলে।বাচ্চা গুলো বসে পড়তে শুরু করে।আমার হাতে চায়ের কাপ টা দিয়ে, লাবনি বলে,-"তুমি খেতে থাকো। আমি একটু এদের পড়িয়ে দিই।"

আমি কিছু বুঝতে পারি না।ওদের ভাষায়,লাবনি পড়াতে থাকে। ঘড়িতে সাত টা বাজলে তবে পড়া শেষ হয়।তারপর রান্না,খাওয়া-দাওয়া সারতে আরও দু'ঘন্টা।বাইরে ঝাঁকিয়ে শীত পড়েছে।আমার এই শীত জিনিষ টা সহ্য হয় না। আবার গরম ও যে ভাল লাগে তা নয়।মনে হয়, সারাটা বছর চিরবসন্ত বিরাজ করুক।
-"আপনার শীত লেগেছে বুঝতে পারছি।আসলে অভ্যাস ও নেই তো!" লাবনি দু'টো চাদর জড়িয়ে আমার পাশে বসে।
-"তা ঠিক।আমি একদম ঠান্ডা সহ্য করতে পারি না।তাই তো শীত প্রধান জায়গা গুলোতে আমি কখনো ঘুরতে যাইনি।এই প্রথম দার্জিলিং এ এলাম।"
লাবনি হাসে।-"বুঝতেই পারছি তোমাকে দেখে। যেভাবে কাঁপছো!"
আলোটাকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বলি,-"এবার বলো,তুমি এখানে কেন?"
লাবনি মাথার টুপিটা ঠিক করে নিয়ে বলে-"আসলে ঘুরে বেড়ানো আমার কাছে একটা নেশা। বন-জঙ্গল, সবুজ পাহাড়,নদী-নালা খুব প্রিয় আমার। ঠিক তোমার মতো।"
আমি হেসে বলি,-" ওহ! তুমিও তো তবে পাগলী।তারপর বলো!"
একটা ঠান্ডা হাসি হেসে হাত দু'টো হাঁটুর কাছে বেঁধে লাবনি বলে,-" জানো,আমার খুব ইচ্ছে করতো, দার্জিলিং এর এরকম সবুজ চা বাগানে এসে কাজ করবো।চায়ের পাতা তুলবো, এখানকার ঝুপড়ি তে থাকবো। আর স্থানীয় বাচ্চাদের পড়াবো,আর ঘুরে বেড়াবো.... তাই মনের টানেই এখানে চলে আসি।তারপর এই জায়গা,এই সব মানুষদের ভালো লেগে যায়। সেই থেকে এখানে আছি...।"
এ পর্যন্ত বলে কিছুক্ষন থামে লাবনি।
আমি ওর চোখের দিকে তাকাই।কথা গুলো বলতে বলতে ওর চোখে এক উচ্ছ্বলতা ফুটে ওঠে।আমি একচোট হেসে বলি,-"তুমি তো পুরো আমার মতো পাগল।তবে একটু আলাদা।"
-"কি আলাদা?" বলে লাবনি।
-"আমি এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারি না।"
-"ও তার মানে,আপনি এখান থেকে চলে যাবেন?"
-"যে তো হবেই ।কত দিন আর থাকবো!একটা কাজ ও জুটলো না।"
-"ওহ! তার মানে তোমার দার্জিলিং ভালো লাগেনি। চলো কাল আমার ছুটি। তোমাকে ঘুরিয়ে আনবো।তবে ভালো লাগবে।আর চলে যেতে ইচ্ছে করবে না।"
পরদিন সকালে হোটেলে ফিরি। ব্যাগে শীতের ড্রেস ডুকিয়ে নিই। তারপর লাবনির কাছে চলে আসি।দার্জিলিং থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দুরে ঘুম স্টেশন।আমাকে সেখানে নিয়ে যায় লাবনি।কত উপরে আছি আমি নিজেও জানি না।সত্যি কি অপূর্ব লাগছে স্টেশনটি কে!একটা কুয়াশার চাদর মুড়ে রেখে ছোট্টো স্টেশন টি কে। আমরা দু'জনে সেই কুয়াশার পেটের ভেতর ঢুকি। বেশ পরিষ্কার-পরিছন্ন প্লার্টফর্ম।একটা ফাঁকা বেঞ্চে বসি দু'জন।সামনে টয় ট্রেন যাওয়ার রেল পথ।
-"তোমার ভাল লাগছে না,সুজয়?"
-"ভাল।এমনিতেই প্লার্টফর্ম আমার খুব প্রিয়।তবে খুব ঠান্ডা।"
-"আমারও সব থেকে প্রিয়,এই জায়গাটা।মন খারাপ হলে,এখানে এসে চুপ করে বসে থাকি।... এই তোমার ঠান্ডা লাগলে,আমার চাদর টা নাও।"
লাবনি চাদর খুলে ফেলে।আমি তাকে আটকাই।-"না... না। তোমার ঠান্ডা লাগবে। "
লাবনি জোর করে নিজের চাদর খুলে দেয়। আমি গায়ে জড়িয়ে নিই। তারপর বুকের কাছে হাত দু'টো বেঁধে বলে,-"অন্য সময় এলে,তোমাকে টাইগার হিল থেকে সূর্যোদয় দেখাতাম।এখন তো বরফে ঢেকে থাকে।"
কিছুক্ষন থেমে তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,-"তুমি এখানে থেকে যাও সুজয়। দেখবে, ভালো লাগবে।"
লাবনির অনুরোধ আমি রাখতে পারেনি।ফেরার দিন দার্জিলিং ছেড়ে,যখন নিউ জলপাই স্টেশনে পৌঁছাই,সে আমার সাথে আসে।
-"আর এদিকে কোনোদিন আসবে না?"লাবনি আমাকে জিজ্ঞেস করে।
-"যদি আবার ইচ্ছে করে, নিশ্চয় আসবো।" বলি আমি।
ট্রেন ছেড়ে দেয়।প্লার্টফর্মে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে, ফ্যাকাশে মুখে,হাত নাড়াতে থাকে লাবনি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আমি দেখতে পাই।আমিও হাত দেখাই।


(৩)

তখন ভাবেনি একটা অমূল্য সম্পদ হারিয়ে,এক বুক যন্ত্রনা নিয়ে ফিরছি।যে যন্ত্রনা আমাকে প্রতিটা রাত ঘুমোতে দেবে না।যে যন্ত্রনা আমাকে প্রতি মুহুর্তে একা করে দেবে।তাই আর থাকতে পারি নি।তাই আবার ফিরছি।সেই দার্জিলিং, বরফে ঢাকা পর্বতমালা, সবুজ চা বাগান,পাহাড়ি রাস্তা, কুয়াশার চাদর,মেঘের ভেলা.....।
কিসের টানে আমি ছুটে এলাম আবার? দার্জিলিং এর প্রেমের টানে?না,আমাকে ফিরতে হচ্ছে লাবনির টানে।লাবনির কাছে।
সকাল আট বেজে পনেরো মিনিটে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ট্রেন এসে থামে।আমি নেমে পড়ি।রিক্সা ধরে শিলিগুড়ি জীপ স্টেশন।সেখান থেকে দার্জিলিং।অনেক খোঁজা খুঁজির পর লাবনির ঘর দেখতে পাই।দরজায় চাবি দেওয়া।বুকের ভেতর টা কেঁপে ওঠে আমার।লাবনি কি তবে এখানে থাকে না?মনের মধ্যে একটা ভয় চেপে ধরে।যদি অন্য কোথায় চলে যায়! না কোথাও যেতে পারে না লাবনি।
একজন মহিলাকে এগিয়ে আসতে দেখি।তাকে হিন্দিতে জিজ্ঞেস করি, -"এই ঘরে একটা মেয়ে থাকতো, তাকে কোথায় পাওয়া যাবে এখন?"
মহিলাটি হিন্দিতে উত্তর দেয়,-" দিদিমনির তো আজ ছুটি।কোথাও বেড়াতে গিয়েছে হয়তো।"
মহিলাটি চলে যায়।আমি আস্বস্ত হই।কিন্তু কোথায় যেতে পারে?মনে পড়ে,লাবনি বলেছিল তার সবথেকে প্রিয় জায়গা ঘুম স্টেশন।সেখানে আগে যাওয়ার মনস্থির করি। দেরী না করে একটা গাড়ী নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।কিছু সময় পর নিদির্ষ্ট জায়গায় গাড়ি এসে থামে।চারিপাশে ঘন কুয়াশার আস্তরন।কিছু দেখা যায় না।গাড়ীর ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ছুটে যাই প্লার্টফর্মের ভেতর। বেঞ্চের উপর একটা মেয়ে বসে আছে।একা একা। গায়ে চাদর জড়ানো।একটু কাছে যেতেই আমি লাবনি কে চিনতে পারি।সে ও আমাকে দেখতে পায়। দাঁড়িয়ে ওঠে। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে কাছে আসে।
-"তুমি এখানে!" লাবনির গলায় বিস্ময় নেমে আসে।
-"তোমার ঘর বন্ধ দেখে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।ভেবেছিলাম,তুমি আর এখানে থাকো না।"
লাবনি হাসে।-"তাহলে শেষ পর্যন্ত দার্জিলিং তোমার ভালো লাগলো? আর তার সৌন্দর্যের টানে আবার ফিরে এলে!"
আমি লাবনি হাত ধরি।একটা উষ্ণ স্পর্শ পাই। কাছে টেনে নিয়ে বলি,-" না!দার্জিলিং আমাকে মোটেও টেনে আনতে পারেনি।তোমার টানেই আমাকে আবার ফিরে আসতে হয়েছে।"
লাবনির চোখে জল আসে।জলভরা চোখে হাসে।আমরা দু'জন বেঞ্চে গিয়ে পাশাপাশি বসি।কুয়াশা ছুটে এসে আদর করে দেয়।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.