অনুগল্প " সবুজায়ন " ~ স্বদেশ কুমার গায়েন




দুপুর বেলা হঠাৎ স্ট্রোক হল কমল বাবুর। ছেলেরা একটা গাড়ি ডেকে তড়িঘড়ি করে হসপিটলে নিয়ে গেল।এরকম কিছু যে একটা হবে,তা জানাই ছিল সবার।তিন ধরে বুকের যন্ত্রনা টা বেড়ে যাচ্ছিল।কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়ালই করেন নি তিনি।ছেলেরা বার বার করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু কমল বাবু ডাক্তারের চেম্বার মুখো হননি। ছেলেদের কথার উত্তরে বলেছিলেন,-"এই বয়েসে আর ডাক্তারের কাছে গিয়ে কি হবে। শুধু শুধু টাকা জলে দেওয়া।"
ডাক্তারের কাছে না গেলেও,বুকের যন্ত্রনা নিয়ে বার বার পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে ছুটে গেছেন। সে কারনে পরে আসছি।

কমল বাবুর আসল নাম কমলেশ মন্ডল।সত্তরের কাছাকাছি বয়েস।তবুও শক্ত সমর্থ শরীর।বেঁটে খাটো চেহারা।শ্যামলা গায়ের রঙ।সরু সরু চোখ, মাথায় টাক।শুধু পিছনের দিকে এক গুচ্ছ সাদা চুল।আর চোখে একটা মোটা ফ্রেমের সাদা কাচের চশমা।একসময় তাদের অবস্থা বেশ ভালোই ছিল।নিজে বেশ কিছুদিন স্কুলে দপ্তরীর কাজ করেছেন।বড় দোকান ছিল বাজারে তাদের।কমল বাবুর বাবাই দেখা শোনা করতেন। কিন্তু বাবা চলে যাওয়ার পর, সে ব্যবসায় ভাঁটা পড়ে।নিজের খামখেয়ালি পনার জন্য।এখন অবশ্য কমল বাবুর দুই ছেলে সেই ব্যবসা দেখা শোনা করে।আসলে, কমল বাবু লোকটা কেমন পাগল টাইপের।তার কাজ বলতে একটাই। সারাদিন ঘুরে ঘুরে বেড়ানো আর রাস্তার পাশে গাছ লাগানো।কখনো চারা কিনে,বা, কখনো পঞ্চায়েত থেকে চারা এনে নিজে হাতে লাগিয়েছেন। শুধু নিজের বাড়িতে নয়,রাস্তার পাশে।গাছের বীজ নিয়ে চারা তৈরী করেছেন। সেই চারা নিয়েও রাস্তার পাশে সারি সারি লাগিয়েছেন।আর এই কারনে পাড়ার লোক, কমল বাবুকে খ্যাপাটে বলেন।অবশ্য তা তিনি গায়ে মাখেন না।প্রতিদিন সকালে বিকেলে গাছ পাহারা দেন।সময় হলে জল ও দেন গাছের গোড়ায়।

কমল বাবুর বাড়ির পাশে ফাঁকা মাঠ।সেই মাঠের উপর দিয়ে বড় মাটির রাস্তা এঁকে বেঁকে চলে গেছে পাশের গ্রামের ভেতরে।এই রাস্তার দু'পাশের প্রতিটা গাছ তার নিজের হাতে লাগনো। কত ধরনের গাছ।সোনাঝুরি, ইউক্যালিপটাস,অর্জুন,শিমুল,আম....।
ছায়াময় রাস্তায় বিকেলের দখিন হাওয়ায় বসে সবাই যখন গল্প করে,তখন সবাই কমল নাম করেন।মনে মনে খুশিতে ভেসে যান কমল বাবু। প্রতিটা গাছ কে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করে বড় করে তুলেছেন।গাছ গুলোর উপর তার কেমন মায়া পড়ে গেছে। যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান,তখন গাছ গুলো মাথা নাড়ায়। কমল বাবু মনে মনে কথা বলেন  গাছেদের সাথে।শুধু নিজে নন, সবাই কে গাছ লাগাতে বলেন কমল বাবু।তার বাড়ির কাছের প্রাইমারী স্কুলের পাশে বড় বট গাছ টি কে দেখিয়ে স্কুলের ছেলেমেয়ে দের ডেকে গর্ব করে বলেন,এ গাছটা তার নিজের হাতে লাগানো।তারপর গাছের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাচ্চাদের গল্প করেন। কমল বাবুর এই গাছ প্রীতি ছোটো বেলা থেকে ছিল না।স্কুলে যখন দপ্তরীর কাজ করতেন,তখন গাছের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একজনের বক্তৃতা শুনেছিলেন।তারপর থেকে তার এই গাছের প্রতি ভালোবাসা।বক্তৃতা দিয়ে সবাই খালাস! কিন্তু তাকে পালন করে কত জন!
কমল বাবু পালন করতেন।

যেদিন শুনলেন মাটির রাস্তা আরও চওড়া হবে, দুপাশের গাছ সব কেটে ফেলে,নতুন করে কংক্রিটের রাস্তা হবে,গাড়ি চলবে,সেদিন থেকে কমল বাবুর বুকের যন্ত্রনা টা বেড়ে গিয়েছিল। যন্ত্রনা নিয়ে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে বার বার ছুটে গিয়েছেন পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে।কিন্তু কোনো কাজ হয় নি।বৃথা তার প্রচেষ্টা।


আজ বড় বড় গাড়ি, গাছ কাটার যন্ত্র ঢুকছে গ্রামের মধ্যে।চারিদিনে মানুষের সমাগম। মেশিনের শব্দের বান চলছে।কেউ কেউ বড় করাত নিয়ে গাছের গোড়ায় বসে পড়েছে। গাছগুলো আজ নিশ্চুপ।একটার পর একটা গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে।লোড করা হচ্ছে গাড়িতে। চলছে সবুজের ধ্বংস লীলা.........।


শুধু কিছুক্ষন আগে খবর এল,হসপিটলে কমল বাবু মারা গেছেন।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

2 comments:

  1. Replies
    1. Thank u so much.blog er aro golpo porar anurodh roilo.valo lagle blog adress ti share korben.

      Delete

Powered by Blogger.