একটি ছোটগল্প " অপরুপা "




তখন ও সকাল সাড়ে ছ'টা বাজেনি। আমরা সবাই ক্লাব ঘরে ঢুকে হট্টগোল শুরু করে দিলাম। যদিও এটা আমাদের প্রতিদিনরই কাজ।কি করলে,কেমন করে সাজালে,জিনিষ টা আরও ভাল হয়-তাই নিয়ে সবাই যে যার মতামত দেওয়া শুরু করলো।কেউ বললো,এবার আলোকসজ্জা টা কিন্তু ফাটাফাটি হওয়া চাই। আবার কেউ বললো,এবার ভালো সাউন্ড সিস্টেম আনতে হবে।কেউ আবার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে পড়ল।এক সপ্তাহ বাদেই আমাদের ক্লাবের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।প্রতিবছরের মতো এবছরে ও খুব বড় করে সেই অনুষ্ঠান করা হবে। কারন এ বছর অনুষ্ঠানের পঁচিশ বছর পূর্ন হচ্ছে। ছোটোবেলায় দেখতাম বাবা রা এই অনুষ্ঠান কত সুন্দর ভাবে চালাতো। জেনারেটরের আলোয়।এখনকার মতো তখন অত সুযোগ সুবিধা ছিল না।শুধু সাদা সাদা টিউব লাইটের আলোয় অনুষ্ঠান হতো।কি সুন্দর সে অনুষ্ঠান! পাড়ার সবাই অংশগ্রহন করতো। লাল পেড়ে শাড়ি পরে বড় বড় দিদিরা নাচতো রবীন্দ্রনাথের গানে।আমার ছোটোবেলায় সেই সব দেখে মুগ্ধ হতাম।বিভিন্ন ধরনের সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান-গান,নাচ, কবিতা আবৃতি,নাটক,হাস্য কৌতুক ক্যুইজ,অঙ্কন প্রতিযোগিতা এরকম আরও অনেক কিছু হত।এখন দিনকাল পালটেছে। বিদ্যুৎ এসেছে।রঙিন আলো এসেছে, জাপানি আলো,ডিজিটাল সাউন্ড,আরও অনেক কিছু।তাই আগের থেকে জাঁকজমক টা একটু বেশি হয়।আর আমরা সেটা দায়িত্ব নিয়েই পালন করি।

আমাদের ক্লাবটি দোতলা।নীচের তলায় দু'টো ঘর।ঢোকার মুখেই ডান দিকে উপরে ওঠার সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠেই টানা বারান্দা। আর একটা বড় হল ঘর।সে সময় নীচের তলায় বড় বড় দিদি রা নাচ, নাটকের রিহার্সাল দিত। আমরা জানালা দিয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে দেখতাম। দিদিরা এসে চোখ পাকিয়ে বলতো,এই এখানে কি দেখছিস?যা,পালা। তারপর ঝানালা টা বন্ধ করে দিত।
আজও নীচের তলায় রিহার্সাল হয় প্রতিদিন বিকেলে, সন্ধ্যে তে।ক্লাবঘর টির পাশেই সবুজ ঘাসে ঢাকা বড় মাঠ।এই মাঠেই প্রতিবছর অনুষ্টান টা করা হয়।অনেক লোক আসে। আগের থেকেও বেশি। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমরা মাঠের চারিপাশ টা দেখছিলাম, এবার মঞ্চ টা কোন পাশে করলে ঠিক হয়!আর তাই নিয়ে সবাই আলোচনা করছিলাম।হঠাৎ আমাদের তপু দা মানে,তপেশ ঘড়ুই কে দেখলাম। হন্তদন্ত হয়ে গেট দিয়ে মাঠে ঢুকছে। প্রায় ছুটতে ছুটতে এগিয়ে আসছে,আমাদের ক্লাব ঘরের দিকে।কি ব্যাপার!
আমরা সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম।সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে,তপু দা কে দেখতেই আমরা সবাই হতবাক।উদভ্রান্তের মতো চেহারা। মাথায় উসকো-খুসকো চুল।চোখে-মুখে একটা ভয়ার্ত ছাপ। আমাদের সামনে এসে হাঁফাতে লাগলো। কথা বলতে পারলো না।মনে হয়,বাড়ি থেকে সারা রাস্তা ছুটে এসেছে।আমি বিস্মৃত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,-"কি হয়েছে তপু দা? তুমি এরকম হাঁফাচ্ছো কেন?"
তুপু দা কোনো রকমে ঢোক গিলে পিছন দিকে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল,-"অপরুপা!"
আমি ভয় পেলাম।জিজ্ঞেস করলাম,-"কি হয়েছে অপু দির?"
এখানে বলে রাখি,অপরুপা দি কে আমি অপু দি বলে ডাকতাম।
-"অপরুপার ঘর ভেতর থেকে বন্ধ।কোনো সাড়া দিচ্ছে না!"তপু দা শ্বাস নিতে নিতে বলল।
-"সে কি!"
ক্লাব থেকে হেঁটে তপু দার বাড়ি যেতে পাঁচ-সাত মিনিট সময় লাগে। আমরা সবাই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটলাম তপু দার বাড়ির দিকে।

অপু দি আমাদেরই পাড়ার মেয়ে। তপু দার একমাত্র বোন।এখনো বিয়ে হয় নি।বাবা-মা মারা যাওয়ার পর অনেকটা খাওয়ার পর উচ্ছ্বিষ্টর মতো পড়ে আছে দাদার বাড়িতে। অবশ্য এ বিষয়ে তপু দা কে কোনো দোষ দেওয়া যায় না। তপু দা বোন কে খুব ভালোবাসে।যত দোষ বৌদির,মানে তপু দার বৌয়ের।ভারী দজ্জাল মেয়ে-ছেলে।অপু দি কে একদম সহ্য করতে পারে না।সকাল- বিকেল উঠতে বসতে খাওয়া নিয়ে কথা শোনায়।-" নবাবি হয়েছে! সারা দিন নাচ,গান,নাটক নিয়ে পাড়ার ছেলে দের সঙ্গে নেচে বেড়ানো হচ্ছে! আমার ঘাড়ে বসে আর কত দিন খাবি রে?এবার তো নিজের পথ নিজে দেখ! চেহারার যা ঢঙ,আর গায়ের যা রঙ,-কেউ এজীবনে বিয়ে করবে বলে মনে হয় না! তারপর সারাজীবন আমার ঘাড়ে বসে,পায়ের উপর পা তুলে খাওয়া আর নেচে কাটিয়ে দেওয়া! "
অপু দি যে পায়ের উপর পা তুলে খায় না,সেটা আমি জানি।সকাল বেলা সবার আগে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সব কাজ গুছিয়ে দেয়। বাজার করে আনে কোনো কোনো দিন।বৌদির সাথে রান্নার কাজে হাত লাগায়।তারপর বৌদির ছেলে,ঝন্টু কে স্কুলে দিয়ে আসে।এর পরেও কি করে তপু দার বউ ওরকম মুখ ঝামটা দেয় বুঝিনা বাপু! মাঝে মাঝে মনে হয়,সবাই মিলে মুখে গামছা বেঁধে রাতের অন্ধকারে একদিন আচ্ছা করে দজ্জাল টা কে ক্যালানি দিয়ে আসি।তপুদা ও কিছু বলতে পারে না বৌ কে।আমরা এ নিয়ে তপুদা কে অনেক কিছু বলি,ঠাট্টাতামাসা করি-সারাজীবন তো বউ এর কাপড়ের নীচে ঢুকে থাকলে,এবার একটু কাপড়ের নীচ থেকে বের হও।
তপু দা ফ্যাকাসে হাসি হেসে আমাদের দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে বলতো,-"পারি না ভাই! বৌ আই.সি.ডি.এস চাকরী করে, কিছু বলতে গেলেই আমার উপর দাঁত-মুখ খেঁচিয়ে ওঠে।"
-"বাঁদরি বিয়ে করলে তো,দাঁত-মুখ খেঁচাবেই!" আমরা হেসে বলতাম।
তপু দা আমাদের কাছে দু:খ প্রকাশ করে বলতো,-কি যে বলিস তোরা! আমার চিন্তা হয় শুধু বোন টা কে নিয়ে।ওর বিয়ে টা হয়ে গেলেই, একটু শান্তি পাই।নিজের চোখে এ যন্ত্রনা আর দেখতে পাচ্ছি না।"
হ্যাঁ,অপু দির বিয়ে হয় না।কারন? অপুদির গায়ের রঙ নাকি কালো। বেঢপ চেহারা।পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা  অপু দির গায়ের রঙ সত্যিই কালো। অনেক টা আফ্রিকান দের মতো।কিন্তু তাই বলে বেঢপ চেহারা বলবে?কালো হলেই, তার চেহারা বেঢপ হবে এমন কোনো মানে নেই। অনেক কালো মেয়ের মুখের চেহারা ফর্সাদের থেকে অতি সুশ্রী হয়। শুধু গায়ের রঙ কালো বলেই,সবার নজর এড়িয়ে যায়।অপুদি ও সেই রকম-চিকন চেহারা,টিকালো নাক, টানা টানা চোখ,পাতলা ঠোঁট, পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো কালো চুল।মুখের হাসি টি ও অতি সুন্দর। অন্তত আমার তাই মনে হয়।
অপু দির বয়স সাতাশ।আমার থেকে বছর তিনেকের বড়।ক্লাব থেকে অপু দি দের বাড়ি রেখে আমাদের বাড়ি যেতে হয়।আমাদের বন্ধু দের মধ্যে, আমার সঙ্গে একটু বেশি কথা বলতো অপু দি।মনের দু:খ জানাতো।আমার খুব কষ্ট হত শুনে। তার লম্বা চুল গুলো নিয়ে,মাথার পিছনে একটা বড় করে খোঁপা বাঁধতো অপু দি। তার উপর ক্লিপ লাগাতো।তারপর বলতো,-" দেখ সমু,আমাকে কেমন লাগছে?"
আমি বলতাম,-"দারুন।"
-"ঘোড়ার ডিম দারুন।আমি জানি, আমাকে বিশ্রী লাগছে।তবুও তুই ভালো লাগছে বলবি!" বলতো অপুদি।
আমি অপু দি কে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করাতাম,-"সত্যি বলছি, তোমাকে ভালো লাগছে।"
-"তাহলে আমার বিয়ে হয় না কেন?"
কথাটা বলে অপু দি হো হো করে হাসতো।আমি আর কিছু বলতে পারতাম না। তপু দার বউ, দু'চোখে দেখতে না পেলে কি হবে,পাড়ার সবাই খুব ভালোবাসতো অপু দি কে। অপু দি পড়াশুনায় খুব ভাল।বি.এ পাশ।বাংলা অনার্স নিয়ে পাশ করা। গ্রাজ্যুয়েসন পাশ করার পর অনেক চাকরীর পরীক্ষা,কোনো একটা কাজ পাওয়ার অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ভাগ্য সাথ দেয়নি।কিছুতেই কিছু হয়ে ওঠেনি।তারপর নিরাশ হয়ে টিউসান পড়ানো শুরু করে। আমাদের ক্লাবের নীচের তলাতে টিউসান পড়ানোর ব্যবস্থা করে দিই। পাড়ার অনেক বাচ্চারাই পড়ে।যে যেমন খুশি মাইনে দেয়।মুখ ফুটে কারও কাছে কিছু চায় না অপু দি। জোর করে না।তবুও এই কাজ টা পেয়ে অপু দি খুব খুশি।প্রতি দিন বিকেলে যখন আমি ক্লাবে আসি, তখন আমার সাইকেলের পিছনে করে তাকে নিয়ে আসি।আমরা দোতলায় উঠে ক্যারম বোর্ড পিটি আর নীচের তলায় সে পড়ায়।মাঝে মাঝে উপরে উঠে আমাদের ধমক লাগাতো।-"এত চিৎকার-চেঁচামেচি করিস কেন তোরা?মুখ বুঁজে খেলতে পারিস না!"
ধমক খেয়ে আমরা সবাই সাইলেন্ট মোডে চলে যেতাম।তবে পড়ানো হয়ে গেলে মাঠে বসে আমাদের সাথে গল্প করতো। অপু দি নাকি নাচ ও জানতো! কোন ছোটোবেলায় একবার শিখেছিল। তাই বাচ্চাদের পড়ানো হয়ে গেলে, বাচ্চাদের নাচ শিখাতো। কবিতা আবৃতি করা, ছবি আঁকা শিখাতো।যার যেটা পছন্দ।আমরা দেখতাম।ভালো পারতো না হয়তো, তবুও মন-প্রান দিয়ে চেষ্টা করে যেত।আর এই কারনেই, শুধু আমরা না,পাড়ার সবাই অপু দি কে খুব ভালোবাসতো।গত পাঁচ বছর ধরে আমাদের ক্লাবের এই সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান একাই পরিচালনা করে অপু দি।আমরা তার হাতে অনুষ্ঠাননের দায়িত্ব তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকি। অনান্য দিক গুলো সামলাই নিজেরা ।
অনুষ্ঠানের আগের ক'দিন প্রায় সারাদিন আমাদের ক্লাবে পড়ে থাকে সে।বাচ্চাদের নিয়ে রিহার্সাল করায়।আরও কয়েকজন পাড়ার মেয়ে এসে সাহয্য করে।যেদিন অনুষ্ঠান শুরু হয়, সেদিন তার সাথে কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায় না। হাঁটে না,উড়ে বেড়ায় আমরা বুঝতে পারি না।মঞ্চ কি ভাবে সাজানো হবে,কি কি লাইট থাকবে,বাচ্চারা কে কি পরবে-তাই নিয়ে ব্যস্ততার শেষ নেই।এ বছর ও তার উপর সমস্ত দায়িত্ব।

আমাদের পাড়া থেকে একটু দূরে মাঠের মাঝে বিশাল বড় দিঘি।কালো জল।দিঘির অর্ধেকের কম জায়গা ঝুড়ে,জল শালুক,ঘেটু ফুল,কচুরি পানার দাম।এপাড় থেকে কচুরি পানার দাম টানলে,ওপারের জল নড়ে উঠতো।দিঘির পাড়ে সারি সারি তাল গাছ।সবাই বলতো 'তাল দিঘি'। অপুদি আর আমি মাঝে মাঝে সেখানে ঘুরতে যেতাম।অপু দি ই আমাকে ডেকে নিয়ে যেত। বলতো, -"চল সমু,বেড়িয়ে আসি।"
-"কোথায়?"
-"ওই তাল দিঘি থেকে।জায়গাটা খুব দারুন, নির্জন,ছায়া ঘেরা।"
আমরা সেখানে গিয়ে পাশাপাশি বসতাম দিঘির পাড়ে।কালো জল হাওয়ায় ঢেউ খেলতো।বড় বড় মাছ খেলে বেড়াতো জলের গভীরে।কখনো ভুস করে উপরে ভেসে উঠতো।অপুদি বুকের উপর,দু'টো হাঁটু ভেঁজে বসে বলতো,-"আমি
খুব খারাপ দেখতে,না রে সমু?"
-"কে বলেছে?মোটেও খারাপ নও। শুধু গায়ের রঙ টা একটু কালো এই যা!"বলতাম আমি।
-"তাহলে,আমাকে কেউ পছন্দ করে না কেন? যেই দেখতে আসে,সেই মুখ ফিরিয়ে চলে যায়।"
-"ধুর! তা তে কি হয়েছে? তোমাকে পাড়ার সবাই খুব ভালোবাসে।"
-"হুম! বাবা যে কেন আমার নাম রেখেছিল অপরুপা! বৌদিটা আমার নাম নিয়ে ও কথা শোনায়।"
অপুদি নিজের নাম নিয়ে আক্ষেপ করতো।তার বাবা নাকি বলতো, আমার মেয়ে কালো তো কি হয়েছে,ওই আলো জ্বালবে।প্রত্যেক বাবা-মার কাছে তার মেয়ে সব থেকে সুন্দর।অপরুপা মানে,শুধু বাইরের চেহারার রুপ নয়।মনের ভেতরের ও একটা রুপ থাকে।তাই ওর নাম অপরুপা ই থাকবে।আর অপু দির ও সেই মনের ভেতরকার রুপটি ছিল প্রদীপের মতো উজ্বল। অপুদির কথায় আমি রেগে গিয়ে বলতাম,-"তোমার ঐ বৌদি টার উপর আমার খুব রাগ হয়।কোনদিন হেব্বি মারবো।"
অপুদি হেসে বলতো,-"কেন?"
-"তোমায় শুধু কথা শোনায় কেন?"
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলতো,-"বাব্বা! আমার জন্যে এত ভাবিস তুই!"
আমি হ্যাঁ বলতাম।অপুদি আমার একটা হাত নিয়ে নিজের কোলের উপর রাখতো।বলতো,-"দেখ সূর্যটা কেমন লাল হয়ে যাচ্ছে?পাখিরা সব ঘরে ফিরছে এবার।যদি পাখি হতে পারতাম, উড়ে যেতাম অনেক দুর...আর ফিরতাম না!"
আমি অপু দির মুখের দিকে তাকিয়ে বলতাম,-"দিদি,তোমার কলেজের কোনো বন্ধু ছিল না?"
-"হ্যাঁ,ছিল তো।কেন রে?"
-"তোমার কাউকে কোনোদিন, ভালোলাগে নি?ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়নি?"
অপু দি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলতো,-"বড্ড চালাক হয়েছিস তুই।দিদির কাছ থেকে সব কথা জেনে নেওয়া,তাই না?"
-"বলো,না!" জোর করতাম আমি।
অপু দি দু'পাশে মাথা নাড়াতো।-"না, তখন পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, অত কিছু ভাবিনি।"
-"আর এখন?"
অপু দি আমার নাক টেনে দিয়ে বলতো,-"তোকে সব বলবো কেন রে?"
-"জানো দিদি,আমি মা কে বলেছি তোমার জন্যে একটা ছেলে দেখতে।মা বলে,হ্যাঁ মেয়েটার জন্যে একটা ছেলে দেখতে হবে,নিজের বাড়িতে ও খুব যন্ত্রনায় আছে মেয়ে টা।"
অপু দি বাঁ'হাত দিয়ে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে টেনে নিত।বলতো,-"পাজি ছেলে একটা! তোর এত কিছু করতে কে বলেছে?"
সন্ধ্যা নামতো কালো দিঘির জলে।জল আরও কালো হয়ে যেত।ঘরে ফেরা পাখিরা বাসায় ফিরে সারা দিনের জমানো গল্প শুরু করতো।
-"দিদি,এবার ওঠো। সন্ধ্যা হয়ে এল।"আমি উঠে দাঁড়িয়ে বলতাম।
-"আরেকটু থাক না,আমার কাছে।"
অপু দি আমার হাত ধরে টেনে পাশে বসাতো।
আরও কিছুক্ষন গল্প করার পর আমরা উঠে পড়তাম।সন্ধ্যার ঝাপসা অন্ধকার গায়ে মেখে ঘরে ফিরতাম।

সেই অপুদির এরকম একটা খবর শুনে কেউ বসে থাকতে পারে না।তাই তপুদার পিছন পিছন আমরা সবাই ছুটলাম,তার বাড়িতে। গেট দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দেখি,সেই দজ্জাল টা দাঁড়িয়ে আছে। ফ্যাকাশে মুখ।অপুদির ঘরের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিলাম।দরজা বন্ধ। জানালার কাছে গিয়ে জোরে জোরে ধাক্কা মারলাম। জানালাও খুলল না।দরজা ভাঙা ছাড়া আর উপায় নেই।বিনু ছুটে শাবল আনতে গেল। আমি ঘর্মাক্ত মুখে একবার হাত টেনে তপু দা কে জিজ্ঞেস করলাম,-"হঠাৎ কি হয়েছিল,তপু দা?"
তপুদা বলল,-"জানি না! কাল রাতে তোর বৌদির সঙ্গে খুব কথা কাটাকাটি হয়,অপরুপার।তারপর এই কান্ড....!"
শাবল আসতেই দরজার ফাঁকে ঢুকিয়ে একটু জোর লাগাতেই, ভিতরের কাঠের ছিটকিনি খুলে গেল।লাফিয়ে ভেতরে ঢুকলাম সবাই।অপু দি খাটের উপর শুয়ে আছে।শান্ত,নিশ্চুপ বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে।ঠোঁটের পাশে সাদা গেঁজা বেরিয়ে গলা বেয়ে বালিশের উপর পড়েছে।তপু দা হাউ হাউ করে কেঁদে গিয়ে পড়ল।আমি টেবিলের পাশে গিয়ে বিষের বোতলটা দেখতে পেলাম। তার নীচে একটা কাগজ রাখা।কাগজ টা হাতে নিয়ে চোখ বোলালাম।কিছু একটা লেখা।
তপু দা বলল,-"হসপিটলে নিয়ে যেতে হবে।"
আমি কাগজটা পকেটে ঢুকিয়ে, সন্তু কে বললাম,-"শীঘ্রই একটা ভ্যান জোগাড় কর।"
ও ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল।সবাই মিলে অপুদি কে ধরে বাইরে বারান্দায় বের করল।আমি ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে কাগজ টা বের করে আবার চোখ রাখলাম।

"আমার সমু,

জানি,তুই ছুটে আসবি সবার আগে।যখন কাগজ টা হাতে পাবি,তখন হয়তো অনেক দুরে চলে যাব আমি।তুই জিজ্ঞাসা করতিস না,দিদি তুমি কাউকে কখনো ভালোবাসো নি?বোকা ছেলে একটা,আমি তোকেই খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম।তোর সাথে থাকতে খুব ইচ্ছে করতো। কিন্তু আমার এই ছাড়া আর কোনো রাস্তা ছিল না যে!যাই হোক,মন খারাপ করবি না একদম।আর হ্যাঁ,অনুষ্টান টা কিন্তু বন্ধ করবি না।"
-অপু দি।

আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়তে লাগলো।বুকের ভেতর টা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। কাগজ টা হাতে নিয়ে ছুটে বাইরে এলাম।অপুদি কে ভ্যানে তুলে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। পাড়ার সবাই এসে হাজির হয়েছে। সবার চোখে জল।কেউ কেউ জোরে শব্দ করে কেঁদে ফেললো। আবার কেউ ভ্যানের পিছনে দৌঁড়ালো।কাগজ টা হাতে করে সেই দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।আমি জানি,এতক্ষনে অপু দি আমাকে ছেড়ে অনেক দূর চলে গেছে।ওই মুখটা দেখে আমি আর সহ্য করতে পারবো না।বুকের ভেতর একটা যন্ত্রনা হু হু করে বাতাসের মতো ছুটে এল।সেই সাথে একটা তীব্র হাহাকার,জড়িয়ে ধরলো আমায়।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.