ভালোবাসার গল্প " যেদিন ভালোবাসা শুরু হয়েছিল "



(১)

ট্রেন টা হর্ন দিতে দিতে পার্কসার্কাস ডাউন প্লার্টফর্মে এসে থামে।ঘ্যাঁচ করে একটা শব্দ হয়। হঠাৎ ব্রেক কষলে যেমন হয় আর কি।গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, লোকজন হুড়োহুড়ি করে নামতে থাকে।কেউ কেউ পায়ে,পা বেঁধে হোঁচট খায়।আবার নিজে নিজেই সামলে নেয়।আমি কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে উঠে পড়ি। মিলি কে দেখতে পাই।জানালার পাশে বসে আছে। চোখ দুটো আমার দিকে।প্রতিদিনই থাকে।এ ট্রেন টি তে খুব একটা ভিড় হয় না।বেশ ফাঁকা ফাঁকা থাকে।এর আগের ডায়মন্ডহারবার লোকালে, সোনারপুর নামার সব লোক চলে যায়।আমরাও ওই ট্রেন টা তে গিয়ে সোনারপুর নামতে পারি। কিন্তু যাই না।মিলি অত ভিড়ে যেতে পছন্দ করে না।তাই পরের সোনারপুরে লোকাল ধরে। আমিও পার্কসার্কাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সোনারপুর লোকালের অপেক্ষা করি।
মিলির পাশে গিয়ে ব্যাগটা কাঁধ থেকে নামিয়ে উপরে তুলে রাখি। পকেট থেকে ঘর্মাক্ত রুমালটা বের করে মুখের সামনে ঘোরাই।উপরের ফ্যান গুলো থেকে গরম হাওয়া নামছে।-"কি ভ্যাপসা গরম বলতো আজ?"মিলির দিকে তাকাই আমি।
অনেকটা মুখ বেঁকিয়ে মিলি বলে,-" হ্যাঁ,ট্রেনের সবার গরম তোর একা লাগছে?"
-"লাগছে তো।জানালার পাশ থেকে সরে বোস, আজ আমি বসবো।প্রতি দিন হাওয়ায় বসে বসে যেতে বেশ মজা লাগে,তাই না?"
-"না,সরবো না।তোর ঠাকুরদার ট্রেন নাকি?"
-"ঠাকুরদা! তুই আবার আমার ঠাকুরদা কে টেনে আনলি? বেশ, উঠতে হবে না।তোর কোলেই বসি তাহলে।"
আমি মিলির কোলে বসতে যাই।সজোরে একটা কিল মারে আমার হাতে। -"মেয়েদের কোলে বসার খুব শখ না! বিয়ে করে বউ এর কোলে সারাক্ষন বসে থাকিস।"
-"উফ! আবার মারলি! এত মারখুটে কেন রে তুই?তোর বর দেখবি, বছরের বেশির ভাগ সময় হসপিটলে থাকবে।তখন বুঝবি ঠ্যালা!"
মিলি রেগে যায়।ওর চোখ দেখলে আমি বুঝতে পারি।ও যখন রেগে যায়,তখন আমার দিকে চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে থাকে।এই মুহুর্তে তেমনি চোখের পলক না ফেলে বলল,-"বেশি কথা বললে, এবার খুন করবো কিন্তু......।"
আমি চুপ করে যাই।এই সময় ট্রেনের মধ্যে মারপিট করার ইচ্ছে নেই।কোনো উপায় না দেখে, মিলির পাশেই বসে পড়ি।জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দেই। যাদবপুর ছেড়ে বেরোচ্ছে ট্রেনটি।সূর্য ডুবে গেছে অনেক আগেই।সন্ধ্যা নেমেছে কলকাতার বুকে।তবুও চারিদিকে আলোর রোশনাই।দু'পাশের উঁচু উঁচু ফ্লাট বাড়ি গুলোকে দেখে মনে হয় যেন,বাতিস্তম্ভ।তার দু'পাশে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত কেউ যেন,ধাপে ধাপে বাতি সাজিয়ে রেখেছে।
সোনারপুর প্লার্টফর্মে এসে ট্রেন থামে।দু'জন নেমে পড়ি।মানুষের কোলাহল,হকারদের ইতস্তত কথা-বার্তা কানে আসে।তীব্র শব্দে হর্ন বাজাতে বাজাতে এক নাম্বার প্লার্টফর্মে আরেকটা আপ ট্রেন ঢোকে।আমরা ওভার ব্রীজের উপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে এক নাম্বার প্লার্টফর্মে নামি।কিছুক্ষন আগে ট্রেন ঢোকায়,প্লার্টফর্ম কিছুটা লোকজনে পরিপুর্ন।ভিড় এড়িয়ে টিকিট কাউন্টারের পাশ দিয়ে নেমে অটো স্ট্যান্ডের দিকে যাই।উপরে সন্ধ্যার পরিষ্কার আকাশ।নক্ষত্রপুঞ্জরা উঁকি ঝুঁকি মারতে শুরু করেছে।স্টেশন থেকে আমাদের দুজনের বাড়ি,অটোতে দশ মিনিট লাগে। আমরা একটা অটোতে উঠে বসি।রাস্তার দু'পাশের ল্যাম্পপোস্ট গুলো জ্বলে উঠেছে। পোকার দল সেই আলোর চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।অটোর ভেতর থেকে সেগুলো দেখতে পাই আমি।


(২)

সোমেন কাকু স্কুলের মাস্টার।আমার বাবা আর সোমেন কাকু একই স্কুলে চাকরী করতো।সেই সূত্রে বন্ধুত্ব। তারপর দু'জন মিলে সোনারপুরে পাশাপাশি জায়গা কিনে বাড়ি তৈরী করেছিল। এসব অনেক দিনের আগের কথা।মিলি,সোমেন কাকুর একমাত্র মেয়ে।এরকম ডানপিটে,বজ্জাত মেয়ে খুব কম দেখেছি আমি।সেই ছোটো থেকে দেখে আসছি,যত বড় হচ্ছে তত ওর ছেলেমানুষি গুলো বয়েসের সাথে তাল মিলিয়ে বেড়ে যাচ্ছে। বয়েস টা শুধু পঁচিশ ই হয়েছে,কাজ-কর্ম এখনো পাঁচ বছরের মতো।একটা ডোন্ট কেয়ার মনোভাব নিয়ে সর্বদা বিদ্যমান।শিয়ালদহ র কাছাকাছি একটা স্কুলে পড়ায় মিলি।আর আমি একটা প্রাইভেট কোম্পানি তে কাজ করি। প্রতিদিন একই সাথে বের হই, আবার একই সাথে ঘরে ঢুকি।
অটো এসে থামে আমাদের গলির মুখে। ল্যাম্পপোস্টের নীচে।দু'জন নেমে দাঁড়াই।
-"ভাড়া মিটিয়ে দে।" মিলি বলে।
-"মানে! মামার বাড়ির আবদার নাকি?আজ তোর ভাড়া মেটানোর দিন।" আমি জোর গলায় বলি।
-"পারবো না।"
-"পারবি না মানে?"
-"মানে হল,পারবো না আমি ভাড়া দিতে।"
-"আমিও পারবো না।"
অটোওয়ালা আমাদের দু'জনের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে।বলে,-"দাদা,ঝামেলা টা বাড়ি গিয়ে করুন, আমার ভাড়া টা তো আগে মিটিয়ে দিন।"
-"ওর কাছ থেকে নিন।" মিলি বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায়।
আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকি।ভাড়া মিটিয়ে দিই। অটোওয়ালা চলে যায়।ছুটে মিলির পাশে যাই আমি।
-"এটা ঠিক করলি না কিন্তু!"
-"বেশ করেছি।একটা মেয়ের কাছে টাকা চাইতে লজ্জা করে না?"
-"তুই,মেয়ে! কই,দেখে তো একদম মনে হচ্ছে না।"
-"শুভ..অঅঅ....!"
আবার একটা কিল আমার পিঠে পড়ার আগেই গেট ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকি।রাগে গজ গজ করতে করতে মিলি চলে যায়।আমি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠি।রান্না ঘর থেকে মায়ের রান্নার আওয়াজ পাই।গন্ধ ভেসে আসে আমার নাকে। নিজের ঘরে ঢুকে,ব্যাগটা নামিয়ে খাটের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিই। মিলি টা সত্যিই বদলালো না! বাচ্চাদের মতো রয়ে গেল।মনে মনে হাসি পায় আমার।ছোটোবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি।স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে, মিলি আমার মার কাছে গিয়ে বলল,-" জেঠিমা, শুভ কে আজ ম্যাডাম মেরেছে।"
-"কেন?" মা বলেছিল।
-"একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। আর সেই মেয়েটি ম্যাডাম কে বলে দিয়েছে।"
আমি লজ্জায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিলাম। রাগ হচ্ছিল খুব।মা আমার কান টা ধরে টেনে লাল করে দিয়েছিল সেদিন।আমিও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলাম না।একদিন টিফিন আওয়ারে, একটা কাগজে 'আমি তোমাকে ভালোবাসি।-ইতি তোমার প্রিয়।' লিখে,মিলির ব্যাগে ঢুকিয়ে দিলাম।স্কুল থেকে ফিরেই সোজা মিলির মায়ের কাছে গিয়ে বললাম,-"কাকীমা, আমাদের ক্লাসের বিজু,কাগজে কি সব লিখে, মিলি কে দিয়েছে।আর মিলি সেটা নিয়ে ব্যাগে রেখে দিয়েছে।"
মিলি অবাক হয়ে গেল।বলল,-"না মা,বিজু কিছু দেয়নি।"
-"আমি নিজে চোখে দেখেছি কাকীমা।ও কাগজ টা নিয়ে ব্যাগের মধ্যে রেখেছে,আর এখন মিথ্যা কথা বলছে।"
মিলির মা ব্যাগ চেক করা শুরু করল।কাগজ টা বের করে দেখল। তারপর কি ঘটল বুজতেই পারছেন আপনারা! মিলি সাত দিন আমার সাথে কথা বলেনি। আজ এসব কথা মনে পড়তেই, আমার হাসি পেল খুব।জামা-প্যান্ট ছেড়ে বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিই। তারপর টি.ভি. টা নিয়ে বসি।


(৩)

পরদিন গান্ধী জয়ন্তীর ছুটি।মিলি স্কুলে যাই নি। সকাল ন'টার সময় আমি ওর ঘরে যাই।মিলি খাটের উপুড় হয়ে একটা পত্রিকা দেখছে। আমাকে দেখে উঠে বসে।
-"আজ স্কুলে গেলি না?"জিজ্ঞেস করি আমি।
-"না।আগেই বলে দিয়েছিলাম।আর শরীর টাও ঠিক ঠাক চলছে না।"
কাকীমা জল খাবার নিয়ে ঢোকে। গরম গরম লুচি,আর আলুর তরকারী।আমি একটা লুচির অর্ধেক কেটে,একটু তরকারী নিয়ে,মুখের ভেতর দিয়ে বলি,-"আ! কাকীমার জবাব নেই! যতবার খাই ততবার মুখে লেগে থাকে।"
-"পেটুক দের সব ভালো লাগে।"
-"আমি পেটুক? আর তুই যে, আমাদের বাড়ি গিয়ে,কাউকে না বলে সেই ছোটোবেলা থেকে আজ পর্যন্ত আচারের বোয়াম গুলো সব সাবাড় করে দিস,তার বেলা?"
-"বেশ করি।তাতে তোর কি? তোর খাই নাকি?"
পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে যাচ্ছে বুঝে আমি চেপে যাই।হেসে বলি,-"বাদ দে।চল না, কাছে পিঠে কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসি।তোর শরীর টাও চাঙ্গা হয়ে উঠবে,ভালোও লাগবে।"
-"তোর সাথে যাব কেন রে?বিয়ে করে বরের সাথে যাব।" মিলি বলে।
-"বিয়ে! তোর! একবার সামনের দাঁত দু'টো আয়নায় দেখেছিস?একটার উপর আরেকটা উঠে আছে।কে করবে তোকে বিয়ে?"
-"আবার,তুই এরকম বললি.....।"
মিলি হাত দিয়ে আমার পেটের চামড়া টেনে ধরে। আমি 'আ' করে চেঁচিয়ে উঠি।-"কি করছিস?লাগছে তো।"
-"আর বলবি?"
-"না।"
মিলি ছেড়ে দেয়।আমি একটু দম নিয়ে বলি,-"ওই দাঁত দুটোর জন্যে, হাসলে তোর মুখটা আরও সুন্দর দেখায়।"
-"কি!"মিলি আমার দিকে কটমট তাকায়।আমি আর কিছু বলি না।চুপ করে থাকি।লুচিতে মনোনিবেশ করি।শেষ লুচিটা মুখে পুরে,আবার বলি,-"চল না,একটু বেড়িয়ে আসি।"
-"কোথায় যাবি? মিলি বলে।
-"তোর তো প্রিয় জায়গা জঙ্গল।আমার ও।চল, কোনো জঙ্গল থেকে বেড়িয়ে আসি।"
-"কোথায়? দেখ,বেশি দিন ছুটি নিতে পারবো না কিন্তু।"
আমি একটু ভাবি।তারপর বলে উঠি,-"সুন্দরবন!"
-"ওরে বাবা! না, বাঘের পেটে যেতে পারবো না।" মিলি ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠে।
-"ধুস! আমি তো আছি।আর ধারে কাছে বলতে এটাই বেস্ট হবে।ছুটিও লাগবে কম।"
অনেক অনুনয় বিনয়ের পর মিলি রাজী হয়। আমরা ঠিক করি পরের সপ্তাহেই যাব।

(৪)

আমার বন্ধুই সব ঠিক করে দেয়। আমার বন্ধুর নাম শোভন।ও কে একটা ফোন করতেই,সব কিছুরই ব্যবস্থা করে দেয়। নির্দিষ্ট দিনে সকালে আমরা দু'জন বের হই।ট্রেনে ক্যানিং এ নামি। মিলির কাঁধে একটা ব্যাগ।ব্যাগে তেমন কিছু নেই।কিছু ব্যাক্তিগত জিনিষ আর শুকনো খাবার। ক্যানিং থেকে গাড়িতে আমাদের নিয়ে যায়। জায়গাটার নাম সোনাখালি। আসেপাশের লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি।এখান থেকে লঞ্চে নদী পথে যেতে হবে। বড় লঞ্চ।প্রায় পনেরো-কুড়ি জনের একটা দল।আমরা লঞ্চে উঠি।
নদীতে ভরা জোয়ার।জোয়ারের সময় নদী বেশি বড় দেখায়।মিলি আমার হাত চেপে ধরে।,-"শুভ, আমার ভয় করছে। চল,বাড়ি ফিরে যাই।"
-"ধুর পাগলি! কিছু হবে না।"
লঞ্চ চলতে শুরু করেছে।ডেকের উপরে একটা লম্বা বেঞ্চে দু'জন বসে আছি।আরও অনেকে আছে। ম্যানেজার এসে সকালের জলখাবার দিয়ে যায়।মন্দ নয়। প্রায় এগারোটার দিকে সুন্দরবনে পৌঁছাই।লঞ্চ সজনেখালি অফিসে দাঁড় করায়।জঙ্গলে প্রবেশ করতে গেলে এই অফিস থেকে অনুমতি, গাইড ম্যান সঙ্গে নিতে হয়।এখানেও দেখায় অনেক কিছু আছে।সবাই লঞ্চ ছেড়ে জেটি ঘাটের উপর ওঠে।মিলি কে হাত ধরে উপরে তুলি। আরও অনেক পর্যটক ঘোরাঘুরি করছে।অনেকেই বিদেশি।
-"শুভ,দেখ কতগুলো হনুমান?"মিলি বলে।
আমি চারিপাশে তাকাই।একসাথে এত হনুমান কখনো আমি দেখি নি। সব এ গাছ থেকে ও গাছে লাফাচ্ছে।অনেকে বিস্কুট ছুঁড়ে দিচ্ছে,আর হনুমান গুলো লাফিয়ে লাফিয়ে সেগুলো ধরছে। বেশ মজা লাগলো আমার।মিলি বায়না করে, আমিও দেব।পাশের দোকান থেকে, একটা বিস্কুটের প্যাকেট কেনে মিলি। তারপর একটা একটা করে ছুঁড়ে দেয়।কয়েকটা ছোটো ছোটো বাঁদর লাফালাফি করে সেগুলো ধরার জন্য। মিলি হাসতে থাকে বাচ্চাদের মতো।আমারও হাসি পায়।
দু'জন অফিসের ভেতর ঘুরতে থাকি।পুরো জায়গাটা লোহার জাল দিয়ে ঘেরা।লোহার জালের ওপারে ঘন জঙ্গল।ঘর গুলো সব প্রায় একতলা সমান উপর দিয়ে তৈরী করা।নীচে ফাঁকা। হয়তো বাঘের ভয়েই এরকম ভাবে তৈরী।আমরা দু'জন লোহার জালের পাশের একটা রাস্তা দিয়ে হাঁটি।এদিকটাতে তেমন কেউ নেই।নির্জন।হঠাৎ সামনে একটা বড়সড় হনুমান এসে পড়ে। মিলি চোখ বন্ধ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে।হনুমান টা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।আমি এক হাত দিয়ে মিলিকে বুকের কাছে চেপে রেখেছি।হনুমান টা বিশ্রী রকম ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে ডাকতে ডাকতে তিন লাফে গাছের উপরে আরেকটা হনুমানের পাশে চলে যায়। মিলিকে চোখ খুলতে বলি।-"দেখ,হনুমান টা তার বউ এর পাশে চলে গেছে।"
-"হ্যাঁ! তোকে তো, ওদের বিয়েতে নিমন্ত্রন করেছিল।" মিলি হাসে।সেই সাথে আমিও।
দুপুরে আসল জঙ্গলের ভেতর ঢুকি। বড় একটা নদীর মধ্যে দিয়ে ঢুকছি। দু'পাশে ঘন জঙ্গল। সুন্দরী,শাল,বেত গরান,গেঁওয়া,কেঁওড়া, কত রকমের গাছ। জোয়ারের জল,নদীর পাড়ের নুইয়ে পড়া গাছের ডালে ছলাৎ ছলাৎ করে বাড়ি মারছে।আমরা দু'জন ডেকের উপর বেঞ্চে বসে আছি।আমার চোখ দু'টো সবুজ ঘন জঙ্গলে আটকে গেছে। হেঁতালি খেজুর গাছ,হোগলার বন। গাছপালা যে প্রকৃতির প্রেমিকা ,তা সুন্দরবনে না এলে বোঝা যায় না।সেই নিবিড় ঘন,সবুজ বনানীর রুপ-সৌন্দর্য আহরন করতে করতে বঙ্কিম চন্দ্রের মতো লিখতে ইচ্ছে করে,-"আহা! কি দেখিলাম,জন্মজন্মান্তরে ও ভুলিব না।"
মিলি হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে,-"ওই দেখ, একটা হরিন গাছের নীচে দাঁড়িয়ে। কিন্তু শিং নেই!"
আমি সেই দিকে তাকাই।বলি,-"ওটা হরিন নয়, হরিনী।"
-"হ্যাঁ, তুই তো গিয়ে চেক করেছিস যে,ওটা মেয়ে হরিন!" মিলি বলে।
-"ধুর! আমি শুনেছি মেয়ে হরিন দের শিং থাকে না।"
যেখানে এসে লঞ্চ থামে,সে জায়গাটার নাম দোবাঁকি ক্যাম্প।সকলে লঞ্চ থেকে উপরে ওঠে। আমাদের দু'পাশে লোহার জাল দিয়ে ঘেরা। কয়েকজন পুলিশ কে বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।একটা ফ্লাই ওভার জঙ্গলের উপর দিয়ে অনেক ভেতরে চলে গেছে।দু'জন উপর দিয়ে হাঁটি।অন্যরাও আমাদের সামনে দিয়ে চলছে। নীচে বেতের জঙ্গল।মিলি সেই প্রথম থেকে, আমার হাতটা জোর করে চেপে ধরে রেখেছে।ফ্লাই ওভার টা,উঁচু টাওয়ার পর্যন্ত গিয়েছে।দু'জন সেই টাওয়ারে উঠি।যে দিকে চোখ যায়,শুধুই ঘন সবুজ জঙ্গল।
-"তোর ভাল লাগছে না,মিলি?"আমি,মিলিকে জিজ্ঞেস করি।
-"খুব।তুই না থাকলে,কোনোদিন হয়তো দেখতে পেতাম না প্রকৃতির এই সৌন্দর্য।"

লঞ্চের ডেকের উপর বসে,মৃদুমন্দ হাওয়ায়, দু'পাশের ঘন জঙ্গল দেখে চোখে একটা শান্তি আসে।অবশ্য সবাই সেই শান্তি পায় না।গাইড ম্যান বলল,এই জায়গাটা ভগবতপুর কুমীর প্রকল্প।এখানে কুমীর দেখা যায়।আমাদের দুপুরের খাবার দিয়ে গেছে। খাওয়াও শেষ।হঠাৎ সবাই চেঁচিয়ে ওঠে এক সাথে।-"কুমীর কুমীর!"
নদীর চড়ার উপর তাকাই।একটা খুব বড় কুমীর স্যাঁত করে পাড় থেকে নেমে আমাদের লঞ্চের সামনে দিয়ে চলে যায়।একটা বড় ঢেউ এসে লাগে লঞ্চের গায়ে। জোরে জোরে দুলতে থাকে লঞ্চ। মিলি ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে।আমার পিঠের কাছে,দুহাতে জড়িয়ে ধরে, গলার পাশে মুখ লুকিয়ে দেয়।
-"মিলি! কি হচ্ছে! ছাড়, লঞ্চের সবাই দেখছে।কি ভাববে বলতো!"
-"যা ভাবে ভাবুক।"মিলি মুখ তোলে না।একই ভাবে থাকে।

সন্ধ্যার আগেই আমরা আবার সজনেখালি অফিসে ফিরি। লঞ্চ টি কে নদীর মাঝখানে কাছি দিয়ে বাঁধে।আরও একটা রাত এখানে থাকতে হবে।কাল আবার ঘুরতে নিয়ে যাবে-পাখিরালয়। প্রথম থেকেই আমরা দু'জন লঞ্চের ভেতরে ঢুকেনি।ডেকের উপরেই বসে থাকি। এখনও বসে আছি।আর কেউ নেই।সবাই ভেতরে বসে আড্ডা দিচ্ছে।সূর্যটা একটু একটু করে বনের ওপারে চলে যাচ্ছে। সবুজ সবুজ গাছপালা গুলো কালো হয়ে আসছে।জঙ্গলের ভেতর থেকে একটা বুনো হাওয়া এসে চুল গুলো এলোমেলো করে দেয়।
ম্যানেজার এসে বলে,-"সন্ধ্যার পর,কেউ ডেকের উপর থাকবেন না।বাঘ আসতে পারে।"
ম্যানেজার চলে যায়।আমি নদীর জলের দিকে তাকাই। সূর্যের লাল রঙ আর কালো মিশে একটা অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে।মিলি কে ডেকে দেখাই।বলি,-"তোর এখানে ভালো লাগেনি, মিলি?"
মিলি আমার চোখের দিকে তাকায়। এরকম ভাবে আগে কখনো ও কে তাকাতে দেখি নি।
-"কি দেখছিস ওভাবে?" আমি বলি।
মিলি চুপ করে থাকে।কিছু সময় পর, আমার, আরও কাছে সরে আসে।দু'হাতে জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে নেয়।-"খুব ভালো লেগেছে।তোর সাথে সারাজীবন,এভাবে ঘুরতে দিবি?"
আমার মুখ দিয়ে কথা বের হয় না। কিছু বলার আগেই,মিলির ঠোঁট দু'টো আলতো করে আমার ঠোঁট কে ছুঁয়ে দেয়।টুপ করে সন্ধ্যা নামে নদীর বুকে।শুধু নদীর পাড়ে,অন্তহীন জলরাশির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ।মিলি উঠে পড়ে।লঞ্চের ভেতরে চলে যায়।আমি আরও কিছুক্ষন ডেকের উপর বসে থাকি।তারপর ভেতরে যাই।দেখি,মিলি একটা বাচ্চার সাথে গল্প করছে।আমি পাশে গিয়ে বসি। ও আমার দিকে তাকায় না।রাতের খাবার আসে। দু'জন খেয়ে নিই।কেউ কাউকে কিছু বলতে পারছি না।রাতে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমোয় মিলি।তবুও কথা হয় না।
পরদিন লঞ্চ ছাড়ে।পাখিরালয় যাবে।
-"কি হয়েছে রে তোর?" আমি মিলির পাশে বসে জিজ্ঞেস করি। ও একদৃষ্টে জলের গভীরে তাকিয়ে আছে।আমি ওর হাতে,দু'আঙুল দিয়ে জোরে চেপে ধরি।তবুও নিশ্চুপ।অন্যদিন হলে, আমার তলপেটে এতক্ষন বক্সিং চলতো। আজ কিছু বলে না।শুধু আমার হাতটা ধরে কোলের কাছে টেনে নেয়।পাখিরালয়ের কাছে এসে পড়েছে লঞ্চ টি। পরিযায়ী পাখিরা দল বেঁধে গাছের ডালে বসে আছে। আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। চারিদিকে শুধু পাখিদের কলতান।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.