একটি প্রেমের গল্প " বক্সার "




(১)

দেবু বলল,"সিগন্যাল লাল না,সবুজ?"

আমরা দুজন এই মুহুর্তে মাঠের সবুজ ঘাসের উপর।দেবু একটা হাঁটু ভাঁজ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে।আর আমি,ওর পাশে বসে আছি।আমাদেরই ক্লাবের মাঠ।কিছুক্ষন আগে ফুটবল খেলা শেষ হয়েছে।সবাই চলেও গেছে।শুধু আমরা দু'জন শুয়ে আছি।দেবু আর আমার বাড়ি ক্লাবের কাছেই।তাই খেলা শেষে, তাড়াতাড়ি বাড়ি না ফিরে মাঠে বসে একটু গল্প করি। সন্ধ্যা নেমেছে সবুজ মাঠে।সবুজ ঘাস গুলো একটু একটু কালো হয়ে আসছে।সন্ধ্যা বেলা প্রতিদিন ঠান্ডা বাতাশ বয়।চোখে-মুখে এসে লাগে। শরীর শিরশির করে। হঠাৎ দেবুর এরকম সিলেবাস বহির্ভূত প্রশ্নে আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আসে-পাশে তাকালাম। না! কোথাও তো কোনো রেল লাইন নেই।অথবা কোনো বড় রাস্তাও নেই এদিকে,যেখানে সিগন্যাল থাকতে পারে!
-"এখানে কোথায় সিগন্যাল?আমি এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলি।
-"আবে! ক্যালানে,রাস্তার সিগন্যালের কথা কে বলছে?তোর প্রেমের সিগন্যালের খবর কতদূর? সত্যিই! এই মাথা নিয়ে যে কি ভাবে প্রেমে পড়লি কে জানে!"দেবু বিরক্ত হয়।
দেবুর প্রেমের ব্যাপারে অনেক অভিজ্ঞতা আছে। প্রায় আট-দশ টা প্রেমের অভিজ্ঞতা।সেই ক্লাস সেভেন থেকে প্রেম করা শুরু করেছে।আর এখন আমাদের ক্লাসের শর্বানীর সাথে প্রেম করে। দেবু যে দেখতে,একদম সিনেমার হিরোর মতো,মস্ত মাসল,সিক্স প্যাক বডি-তা ঠিক নয়। তবু কি ভাবে যে, বার বার ওর কপালে মেয়ে জুটে যায়,আমি নিজেও জানি না!
মাঠ থেকে এক মুঠো ঘাস ছিড়ে দূরে ছুড়ে ফেলে বললাম,-"কোথায় আর সবুজ,সিগন্যাল লাল ই হয়ে আছে।"
-"আর কোনদিনই ও সবুজ হবে না।দিনের পর দিন,এরকম চুপচাপ বসে দেখে গেলে,সৃজিতা উড়ে এসে তো আর প্রেম নিবেদন করবে না!তার থেকে এক কাজ কর,মেন লাইনে সিগন্যালের ভরসায় না থেকে,লুপ লাইন ধরে অন্য দিকে কেটে পড়।"
-"মানে!" আমি বিস্মৃত হয়ে দেবু কে প্রশ্ন করি।
-"মানে হল গিয়ে,সৃজিতার জন্যে বসে না থেকে,অন্য মেয়ে দেখ।"
-"আমার অন্য মেয়ে আর দেখতে ভালই লাগে না।"
-"তাহলে,সরাসরি গিয়ে বলে দে যে, তুই ও কে ভালোবাসিস।"
-"ভয় করে খুব।যদি আমার অবস্থা,রাজের মতো হয়!"
রাজের কথা মনে পড়লে,আমি কেন ক্লাসের সব ছেলেই সৃজিতা কে ভয় পায়।

(২)

এবার সে কথা বলি।

সৃজিতা শুধু আমাদেরই পাড়ার মেয়ে নয়, আমাদের সাথে একই ক্লাসে পড়ে।এই মুহুর্তে আমরা দু'জন মাঠের যে প্রান্তে বসে আছি,ঠিক তার সামনেই সৃজিতাদের দোতলা বাড়ি। সৃজিতার ঘরের জানালা দিয়ে আলো এসে পড়ছে মাঠে।ও কি জানালায় এসে দাঁড়াবে? আমি জানালার দিকে একবার তাকাই।
সৃজিতা বক্সিং খেলে।ডিসট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন।জিম করা শরীর।পাতলা ও নয়,আবার বেশী মোটাও নয়। একদম পারফেক্ট বলতে যেমন টা বোঝায় ঠিক তেমন।গায়ের রঙ ফর্সা।টানা টানা হরিনী চোখ।ঘাড়ের নীচ বরাবর ছোটো করে কাটা চুল। সোনালি রঙের।কপালের উপর থেকে এক টুকরো চুল সবসময় কানে পাশে টোল পড়া গালের উপর ঝুলে থাকে।হাওয়ায় ওড়ে।কখনো চোখের উপর পড়ে।তখন হাত দিয়ে সেটা একপাশে সরিয়ে দেয়। সরানোর সেই ভঙ্গিমাটাই আমাকে কাছে টানে বেশি।পাতলা ভেজা ভেজা গোলাপি ঠোঁট সৃজিতার। সৃজিতা লিপিস্টিক পরে না,তবুও ওর ঠোঁট গোলাপি। বাচ্চাদের মতো।দেখলেই,মনে হয় একটু ছুঁয়ে দিই।কিন্তু বাস্তবে যে সেটা কত কঠিন,সেটা আমি বুঝি।যে মেয়ে দেখতে ভালো,পড়াশুনায় ভালো, আবার খেলাধূলায় ভালো-সে মেয়ের বাজার দর ভালো হয়।এ কথাটা দেবু বলেছিল।আমি 'বাজার দর' শব্দ টি নিয়ে আপত্তি করেছিলাম। বলেছিলাম,-"বাজার দর শব্দ টা পালটা ভাই। কথাটা শুনলে কেমন বাজারি বাজারি মনে হয়!"
দেবু তর্ক করেনি।কথাটা পালটে বলেছিল,-"সে মেয়ের চাহিদা, ছেলেদের কাছে তুঙ্গে।"
সৃজিতা দেখতে যেমন ভালো,তেমনি বক্সিং ও খেলে ভালো।খেলা -ধূলার সাথে,আবার পড়াশুনাতে ও তুখড়।আমরা সবাই একাদশ শ্রেনীতে পড়ি।সায়েন্স বিভাগ।এবার রাজের কথায় আসি। রাজ ছিল আমাদের ক্লাসের সব থেকে স্মার্ট ছেলে।লম্বা-চওড়া,ফর্সা চেহারা। মাথার চুলে জেল লাগানো। সামনের দিকের কয়েকটা চুল আবার হালকা ব্রাউন কালারের। রাজ,দশম শ্রেনী পর্যন্ত ইংরাজী মিডিয়াম স্কুলে পড়তো।তারপর আমাদের বাংলা মিডিয়াম স্কুলে এসে ভর্তি হয়।সে মুখ দিয়ে যে কটা কথা বলতো, তার মধ্যে থাকতো বেশির ভাগ ইংরাজী শব্দ। এরকম ছেলের প্রতি যে স্কুলের সব মেয়েরা ফিদা হয়ে পড়বে,সেটা স্বাভাবিক ব্যাপার।কিন্তু সৃজিতা কে কোনোদিন রাজের সাথে আমি কথা বলতে দেখেনি।

একদিন টিফিন আওয়ারে বসে আমরা সবাই গল্প করছিলাম।হঠাৎ দেখি রাজ,তার ডান হাতটা সৃজিতার উন্মুক্ত কাঁধের উপর রেখে কিছু একটা বলছে।সৃজিতার চোখ রাজের হাতের দিকে ছিল।রাজ,কি যে বলছিলো,আমি সব টা শুনতে পায়নি।শুধু শেষের 'সেক্সি' শব্দ টা আমার কানে এসেছিল।তারপর যে এরকম একটা ঘটনা ঘটবে,আমরা কেউ ভাবেনি। সৃজিতা বাঁ হাত দিয়ে,নিজের কাঁধ থেকে হাত টা সরিয়ে, ডান হাত দিয়ে রাজের তলপেটের কাছে বক্সিং স্টাইলে এমন একটা পাঞ্চ মারলো যে, রাজ 'আঁ' শব্দ করে পেটে হাত চেপে পাশের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়লো। সারা ক্লাস সাইলেন্ট মোডে চলে গেছে।আমার চোখ গুলো রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে গেল। ঠিক দেখছি তো!
তারপর থেকে রাজের পেটে যে, যন্ত্রনা শুরু হল,সে যন্ত্রনা আর কমেনি।সাতদিন পর হসপিটলে ভর্তি করা হল রাজ কে।সিটি স্ক্যান হল। ডাক্তার বললেন অ্যাপেন্ডিক্স। অপারেসন করতে হবে।আমরা সবাই থ মেরে গেলাম।মাঝে মাঝে আমরা হসপিটলে দেখতে যেতাম রাজ কে।পরে ওর বাড়ির লোকের কাছেই জেনেছিলাম, রাজের অনেকদিন থেকে পেটে ব্যাথার রোগ ছিল।আমরা সবাই একটু শান্তি পেয়েছিলাম,এ কথা শুনে।
তারপর একদিন ক্লাসে,শিক্ষক মহাশয় এসে সৃজিতা কে বলেছিল,-"তুমি এটা ঠিক করো নি।"
-"রাজ, আমার গায়ে হাত রেখেছিল, তাই আমিও ওর গায়ে হাত রেখেছিলাম।এর থেকে বেশি কিছু নয়।" স্পর্ষ্ট ভাষায় জবাব দিয়েছিল সৃজিতা।
বাবা! এ মেয়ের একটা পাঞ্চ যদি, সামন্য গায়ে হাত রাখা বলে মনে হয়,তবে যেদিন সত্যি সত্যি ক্যালাবে সেদিন তো হাড়-গোড় কিছুই আস্ত থাকবে না।সেই থেকে স্কুলের সবাই সৃজিতা কে একটু সমঝে চলে।অকারনে কেউ বিরক্ত করে না।শুধু স্কুল কেন, পাড়ার ছেলেরাও ওর ধারে কাছে ঘেষে না।শুধু আমিই ওর দিকে আড় চোখে তাকাই।জানিনা,ও সেটা দেখতে পায় কিনা! হয়তো দেখতে পায় না।দেখতে পেলে আমারও জায়গা এতদিন হসপিটলে হতো। তাও ভালো,ওর মার খেয়ে হসপিটলে যেতেও রাজী। একটু হাতের স্পর্ষ তো পাবো।

(৩)

সত্যি বলতে কি,সৃজিতা কে একটু ভয় ই পাই। আর ভালোবাসি বলেই ভয় পাই।তাই মুখ দিয়ে 'ভালোবাসি' শব্দ টা আর বের হয় না।
আমার মুখে ভয়ের কথা শুনে দেবু উঠে বসে। বলে,-"ওহ,ভালোবাসি কথা বলতে এত যখন ভয় তাহলে, বাড়ি গিয়ে মায়ের আঁচলের নীচে ঢুকে থাক।প্রেম করতে হবে না।"
আমি নিশ্চুপ।আকাশে চাঁদ উঠেছে।শালপাতার থালার মতো চাঁদ।সেই সাথে তারার ঝিকিমিকি। আমি সেই দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলি,-"বলার চেষ্টা তো করি ভাই,কিন্তু সামনে গেলেই নেটওর্য়াক উড়ে যায়।তখন আর কথা স্পর্ষ্ট বের হয় না।"
-"তাই তো,বলছি ও কে ছেড়ে এবার অন্য মেয়ে দেখ।আমাদের ক্লাসের জুঁই মেয়েটি কিন্তু খারাপ নয়!"
-"পারবো না রে ভাই। বক্সিং রিং এ যখন সৃজিতার চেহারা টা আমার মনে পড়ে,তখন আমার বুকের ভেতর উথাল-পাতাল হয়। ঝড় উঠে।বিদ্যুৎ চমকায়।বৃষ্টি নামে। ও কে সব থেকে সুন্দর দেখায় বক্সিং রিং এর মধ্যে- মাথায় বক্সিং হেলমেট,হাফ প্যান্ট,ঘামে ভেজা টাইট গেঞ্জি,উঁচু ভরাট বুক,ফর্সা শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা-মনে হয় ওর ঘামে ভেজা গেঞ্জি টা নিয়ে মুখের উপর রাখি,বুক ভরে গন্ধ নিই।ওর শরীরের গন্ধ।সে গন্ধ, বিদেশি পারফিউম কেও হার মানাবে।"
আমি কিছুক্ষন থেমে আবারও স্বপ্নের জগতে ডুব দিই।"....সৃজিতা এখন ডিসট্রিক্ট চাম্পিয়ন। এরপর স্টেট লেবেল,তারপর ন্যাশনাল,তারপর ইন্টারন্যাশনাল।অলিম্পিকে খেলবে।ব্রাজিল অলিম্পিক।সেবার কি ব্রাজিলে অলিম্পিক হবে? ব্রাজিল না হোক,রাশিয়া,চীন,আমেরিকা, জার্মানি কোথাও তো একটা হবে.....! সৃজিতা খেলবে,আর আমি বাড়ি বসে রাত জেগে সেই খেলা দেখবো।তারপর সোনার মেডেল নিয়ে দেশে ফিরবে। দমদম বিমানবন্দরে, মিডিয়া, লোক- জন ঘিরে ধরবে।তার মধ্যে থেকে সৃজিতা আমাকে ডেকে কাছে টেনে নেবে..........।"
আর বেশিক্ষন স্বপ্নের দেশে থাকতে পারি না। দেবু একটা ছোটো করে লাথি মারে।বলে,-"শালা! মুখে একটা কথা বলতে পারে না,তার আবার স্বপ্নের বহর দেখো! তুই পারিস ও বটে! "
আমি ওর কথায় আমল না দিয়ে বলি,-" স্বপ্ন ছাড়া আর কি আছে! যারা বাস্তবে কিছু পায় না, তাদের বেঁচে থাকতে স্বপ্নের জগতে ডুব দিতে হয়।"
কিছু সময় পর আমরা উঠে পড়ি। বাড়ির পথে যাই।আকাশে ভাসা ভাসা মেঘ।চাঁদের আলো উছলে পড়েছে পাশের মেহগনি,বট গাছের ডালে। বাড়ি গিয়ে পড়ায় মন বসে না।বই খুলে বসে থাকি। কেমিস্ট্রির অনু-পরমানুর বন্ড গুলো সব গুলিয়ে যায়।জেমস বন্ডের কথা মনে পড়ে। ঢিসুম!ঢিসুম! সৃজিতা ও এরকম ঢিসুম,ঢিসুম করে।
আসলে সৃজিতার প্রতি আমার আকর্ষন প্রথম থেকেই ছিল।কিছু দিন আগে একটা ঘটনার পর থেকে সেই আকর্ষন বেড়ে দ্বিগুন হয়।আমি খেলাধূলায় ভালো না হলেও, আমাদের স্কুলের গেম টিচারের সাথে আমার ভালো সম্পর্ক। তিনি স্কুলের ফুটবল টিমের সেরা একাদশ তৈরীর সময়,আমার কাছে জানতে চাইতেন যে, আমাদের ক্লাসে কে কে ভালো খেলে?কে কেমন চরিত্রের?
রনি ছেলেটা খুব ভালো খেলে তা নয়।মোটামুটি খেলে। কিন্তু শৃঙ্খলতার অভাব।তাই এবছর রনির জায়গা হল রিজার্ভ বেঞ্চে।ব্যাস! আর যায় কোথা! রনি বিস্ফোরক পদার্থে পরিনত হয়ে গেল,আর যেখানে সেখানে বিস্ফোরন ঘটাতে শুরু করলো। কেননা,তার রিজার্ভ বেঞ্চে বসার একমাত্র কারন নাকি আমি।
সেদিন স্কুলে ঢোকার সময় গেটের কাছে, আমাকে ঘিরে ধরল রনি। সঙ্গে আরও আমাদের ক্লাসের দু'জন।রনির হাতের আঙুল আমার চোখের সামনে ঘুরছে।এই মারে কি সেই মারে একটা ব্যাপার।তারপর আমার জামার কলার ধরে বলল,-" তোর জন্যেই সব হয়েছে।"
হঠাৎ দেখি রনি, আমার জামার কলার ছেড়ে দিয়েছে।আর মুখটা শুকিয়ে আমসত্বের মতো হয়ে গেছে।পাশে অন্য দু'জন কাঁচুমাচু শুরু করেছে।তারপর তিনজনই দৌড়।কি হল ব্যাপার টা? আমি হচকচিয়ে পিছনে ঘুরে দেখি, আমার ঠিক পিছনেই সৃজিতা দাঁড়িয়ে।কি বলবো আমি? কিছুই তো মনে আসছে না।কিছু শোনার ও অপেক্ষা করে না সৃজিতা। আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যায়। সৃজিতা আমার জন্যে দাঁড়িয়ে পড়েছিল? না, সৃজিতা কে আসতে দেখে এরা পালালো! আমি জানি না।
তবে এই ঘটনার পর থেকে সৃজিতার প্রতি আমার টান দ্বিগুন হয়ে যায়।আমি আরও ওর প্রতি ভালোবাসায় ডুবে যাই।

(৪)

ঘটনাটা বেশ কয়েকদিন ধরে আমার চোখে পড়লো।আর তাতেই আমার সমস্ত আশা,ভরসা চলে গেল। আমাদের স্কুলের আর্টস বিভাগের একটা ছেলে,সৃজিতার সাথে প্রায় কথা বলে। সৃজিতাও বলে।ছেলেটি, আমার মতো হ্যাংলা-প্যাংলা নয়। বেশ স্মার্ট এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। সারা স্কুলের মধ্যে এই একটা ছেলে সাহস করে সৃজিতার কথা বলে। সৃজিতাও ছেলেটিকে পাত্তা দেয়।
অবাক হই আমি।তাহলে নিশ্চয় সৃজিতা ছেলেটিকে ভালোবাসে।দেবু খবর নিয়ে আসে, ছেলেটি সৃজিতার বক্সিং কোচের আত্মীয়র ছেলে।এই স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছে।আমার মনটা আরও ভেঙে যায়। মনে মনে ঠিক করি,এদের থেকে সাইড হয়ে যাওয়া ভাল।কষ্ট পেয়ে কোনো লাভ নেই। তিন- চার দিন আর সৃজিতার দিকে আড় চোখে তাকাই নি।ওর চোখে আলাদা ভাবে পড়ার জন্য সিঁড়ির কাছে দাঁড়াই নি।স্কুলে যাই, বন্ধুদের সাথে বসে গল্প করি,আড্ডা দিই।বাড়ি ফিরে পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি।মন বসে না, তবুও জোর করে বই খুলে বসি।
সেদিন সিঁড়ি দিয়ে ক্লাসে উঠতে গিয়ে জুঁই এর সাথে ধাক্কা লাগে। আরেকটু হলে ও পড়ে যাচ্ছিল। আমি হাত বাড়িয়ে ধরি।জুঁই সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,-"দেখে হাঁটতে পারিস না?"
-"সরি রে!" আমি বলি। ক্লাসের দিকে এগিয়ে যাই।জুঁই আবার ডাকে।
-"এই শোন,রনি নাকি তোর সাথে ঝামেলা করছে?"
-"না,তেমন কিছু নয়।"
-"রনি টা কোনোদিন শোধরাবে না! আমি ও কে নিয়ে আর পারি না। কি যে করি!"নিজের মতো মাথা নাড়তে নাড়তে জুঁই নীচে নেমে যায়।
বায়োলজি ক্লাস শেষ হতেই চারটে বেজে যায়। বায়োলজি সাবজেক্ট টা শুধু আমার আছে। ফোর্থ সাবজেক্ট হিসেবে।কিন্তু আমার অন্য সব বন্ধুদের নেই। তাই ওরা আগেই কেটে পড়েছে। আমাদের ক্লাস ঘরে ঢোকার আগেই কমার্স ডিপার্টমেন্টের ঘর পড়ে।ওদের অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে।তাই ঘর ফাঁকা।সবার শেষে ক্লাস থেকে বেরিয়ে কমার্সের ঘরের দরজার সামনে আসতেই,পিছন দিক থেকে কে যেন হ্যাচকা টান মারে।হাত ধরে টেনে ঘরের ভেতর দরজার আড়ালে নিয়ে যায়।দেওয়ালের গায়ে জোরে চেপে ধরে।
সৃজিতা!
আমি চমকে উঠি।যেন হাই ভোল্টেজ শক লাগে। সৃজিতা তার বাঁহাতের কনুই এর কাছ দিয়ে আমার গলাটা চেপে রেখেছে,দেওয়ালের সাথে। আমি নিরুপায়।অসহায়! মুখ টা আমার খুব কাছে এনে সৃজিতা বলে,-"আমার দিকে আর আড় চোখে তাকাচ্ছিস না কেন? অন্য মেয়ের দিকে তাকানো হচ্ছে? ......আবার হাত বাড়িয়ে তাকে ধরা হচ্ছে!এরপর অন্য কোনো মেয়ের সাথে কথা বললে,এমন এক মারবো....।"
সৃজিতা কথা শেষ করতে পারে না। হেসে ফেলে। আমার গলার কাছ থেকে হাত নামিয়ে আনে। ওর ঠোঁট দু'টো আমার খুব কাছে।আরও কিছু টা এগিয়ে আসে।পাতলা,গোলাপি, বাচ্চদের মতো ভেজা ভেজা ঠোঁট। অনেক দিনের ইচ্ছে একটু স্পর্ষ করার।আমি হাতের একটা আঙুল নিয়ে ওর ঠোঁটে রাখি।উষ্ণ নয়, একটা শীতল স্পর্শ পাই।সৃজিতার মুখে একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.