একটি প্রেমের গল্প " লভ্ গেম "





ঘরটির ভেতরে ঢুকতেই আমার চোখ দাঁড়িয়ে গেল। দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। যেটা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। বোকার মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ঘুর পাক খেতে  লাগলাম আমি। তবে এই কি.....!

(১)

সাজানো গোছানো পাঁচতলা অফিস। নর্থ কলকাতায় বড় একটা মাল্টি ন্যাশেনাল কোম্পানী তে কাজ করি আমি। আমার বসার জায়গাটি দোতলায়।দোতলার অফিস ঘরটির সব থেকে পিছনের সারিতে আমার টেবিল। টেবিলের উপর কম্পিউটার রাখা। কাজে নিমগ্ন।একটু আগেই ফোন করে ছিল  বিক্রম। ফোন ওঠাতে পারি নি। মাসের শেষের দিকে অফিসে কাজের চাপ টা একটু বেশি থাকে। তখন আশে পাশে তাকানোর ফুসরত মেলে না কারও।

কম্পিউটারের স্ক্রিন টা অফ করে অফিসের দোতলার পিছন দিকের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। টানা লম্বা বারান্দা। এখানে দাঁড়ালে যে,দখিনের খোলা বাতাশ চোখে-মুখে এসে লাগে,তেমন কোনো ব্যাপার নয়। আসলে অফিসের স্টাফ দের বিড়ি- সিগারেট খাওয়ার জায়গা এটা। অফিসের ভেতর সিগারেট খাওয়া নট অ্যালাও। তাই ধোঁয়া ছাড়তে এই পিছন দিক টা তে আসতে হয়। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ফস করে দেশলাই জ্বাললাম। বিক্রম কি তবে খোঁজ পেয়েছে?
কোনো তথ্য পেয়েছে?

বিক্রম আমার বন্ধু। অনেক দিনের পুরানো বন্ধু। আমার দু'জন ছোটো থেকে এক সাথে স্কুলে পড়াশুনা করতাম। বিক্রম এখন একজন সফ্টওয়্যার  ইঞ্জিনিয়ার। কলকাতায় একটা বড় বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে। পকেট থেকে ফোন বের করে বিক্রমের নাম্বার ডায়েল করলাম। তিনবার রিং হওয়ার পর ফোন তুলল বিক্রম। -"হ্যাঁলো! তখন ফোন তুললি না কেন?"
সিগারেটে একটা টান দিয়ে বললাম,-" সরি ভাই। তখন কাজে খুব ব্যস্ত ছিলাম রে। তো বল, কোনো খোঁজ, তথ্য, ঠিকানা পেলি?"
-" সেই জন্যেই তো ফোন করে ছিলাম।"
-"পেয়েছিস?" বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
-" কে তৈরী করেছে,তার নাম ঠিকানা পায়নি। তবে যে ইমেল পাঠিয়েছিলাম, তার রিপ্লাই পেয়েছি।"
-"কোথায় ওদের ঠিকানা? কোথায় অফিস? বাংলা না, বাংলার বাইরে?" আমার চোখে মুখে বিস্ময়।
-" বাংলার বাইরে।ব্যাঙ্গালোর।তবে কোনো বাঙালির কাজ বলে এটা মনে হল না।"
বিক্রমের কথা থামিয়ে আমি বললাম,-" হতেই পারেনা। যে তৈরী করেছে, সে অবশ্যই বাঙালি হবে। নইলে এরকম একটা গেম কেউ তৈরী করতে পারে না।"
- 'আচ্ছা, একটা সত্যি কথা বলতো, তুই হঠাৎ  একটা গেম ডেভেলপার কে নিয়ে পড়লি কেন?"
সিগারেটের শেষ টা বারান্দায় একটা কোনায় ছুড়ে দিয়ে বললাম,-" 'গেম' টা ফোনে খেলেছিস তুই?"
-"সময় আর পেলাম কই? তবে চারিপাশে যাকেই দেখি ওই 'গেম' নিয়ে পড়ে আছে। অল্প সময়ে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।..আমাদের অফিসের অনেকেই তো ফোনে মুখ গুঁজে পড়ে আছে।"
-"সময় পেলে একবার খেলে দেখিস। আমাকে যেতেই হবেই তার কাছে, যে এই 'গেম' টা তৈরী করেছে।"
-"কি!" বিস্মিত হল বিক্রম।
-"হ্যাঁ। ওর সাথে একবার দেখা করতে চাই।"
-" কেন?"
আমি হাসলাম। হেসে বললাম,-" আমি জানতে চাই, গেম টি তে শেষ পর্যন্ত ছেলেটি, মেয়েটি কে পাবে কি না?

-"পাগল হয়ে গেলি নাকি? এর জন্যে তুই ব্যাঙ্গালোর যাবি!...এরকম ভুরি ভুরি 'গেম' প্রতিনিয়ত কত তৈরী হচ্ছে।"
-" এ 'গেম' টা সম্পুর্ন আলাদা। এর ভেতরে আলাদা একটা গল্প আছে।"
-"মানে!"
-"তুই বুঝবি না। 'গেম' টা কে ভালো করে লক্ষ্য কর বুঝতে পারবি। এটা নিছকই একটা গেম নয়। একটা উপহার। একটা না পাওয়া ভালোবাসা।.. এক জন কে উদ্দেশ্য করে এই গেম টা তৈরী করা হয়েছে।"
-"ওহ! তাই নাকি! তুই বুঝে গেলি।"
-" হ্যাঁ ঠিক তাই। আমি যত দুর  বুঝতে পেরেছি।"
-" ধুর! কি যে বলিস। খেলা নিছকই খেলা। এর মধ্যে কি গল্প থাকতে পারে?"
-" 'গেম' টা খেলার সময় ভালো করে লক্ষ্য করবি,যতই চেষ্টা করুক না কেন, মেয়েটা কে কিছুতেই ধরতে পারছে না ছেলেটা। মাঝে মাঝে  খুব কাছে এসেও আবার হারিয়ে যাচ্ছে  মেয়েটি ।"
-" অনেক টা টেম্পল রান গেমের মতো তাইতো?"
-" না। এটার গ্রাফিক্স, ফিচারস,থিম সবটাই আলাদা। অসাধরন।"
-" আচ্ছা। তবে তো দেখতেই হচ্ছে।"
-" হু দেখিস। আর শোন, কিভাবে  ওই গেম ডেভেলপারের সাথে দেখা করা যাবে, কোথায় ওর অফিসের ঠিকানা,আমাকে পুরো ডিটেলইস এ জানাস প্লিজ!"
-"আচ্ছা জানাবো। এখন রাখি। চল, বাই।"

ফোন রেখে দিল বিক্রম। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে, পকেটের ভেতর ঢুকিয়ে রাখলাম আমি। তারপর আবার কম্পিউটারের সামনে গিয়ে বসলাম।


বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা। সপ্তাখানেকের বেশি হবে। একটা অ্যান্ড্রয়েড গেম বেশ জনপ্রিয়  হয়ে গেছে সবার কাছে। বাস, ট্রেন, প্লাটফর্ম, স্কুল,কলেজ,অফিস সর্বত্র- যেদিকে তাকাই সবাই ফোনে মুখ গুঁজে গেম টি তে নিমগ্ন। টিফিন আওয়ারে আমার অফিসের অনেক কেই 'গেম' টি খেলতে দেখলাম। আমি আর বাদ যাই কেন!  সারাদিনের কাজের ফাঁকে, মোবাইল গেম অনেক টা স্ট্রেস দূর করে। তাই গুগল প্লে স্টোর এ খুঁজে গেম টি বের করলাম। গেমটির নাম লভ্। প্রথমেই অবাক হয়েছিলাম, এরকম অদ্ভুত নাম দেখে। এরকম নামে কোনো গেম হয় নাকি!
কিন্তু সবথেকে আশ্চর্য লাগলো,অতি অল্প সময়ে গেম টি দশ লাখের উপরে ডাউনলোড হয়ে গেছে। কি আছে এই গেম টির মধ্যে?
তখন বুৃঝতে পারিনি, এই গেম টি আমাকে ব্যাঙ্গালোর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে। তখন বুঝতে পারিনি এই গেম টি আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়বে।
প্লে স্টোর থেকে ডাউনলোড করে গেম টি অপেন করতেই একটা লভ্ চিহ্ন ভেসে এল স্ক্রিনে। সেই সাথে সুন্দর ডিজাইন কর আই লাভ ইউ লেখা। ট্যাপ দ্য স্ক্রিনে ক্লিক করতেই, দুটো অ্যানিমেটেড চরিত্র সামনে এল। একটা ছেলে, আর একটা মেয়ের ছবি। হাত ধরে আছে রাস্তার উপর। তারপর একটু একটু করে দু'জনের হাত ছেড়ে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটির চোখ দিয়ে জল পড়ছে। একটা হুড খোলা গাড়ি এসে থামলো মেয়েটির পাশে। মেয়েটি উঠে গেল গাড়ির মধ্যে। এরপর শুরু হল আসল খেলা। ছেলেটি ছুটতে থাকলো গাড়ির পিছনে। কিছুটা ছুটতেই ভিলেন দের অ্যাটাক।তাদের কে মেরে এগিয়ে চলে ছেলেটি। সবুজ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেয়েটির গাড়ি ছোটে। ছেলে টিও। একের পর এক বন্য জন্তুদের আক্রমন ছেলেটির উপর। তারপর মেয়েটির গাড়ি টি থামে নদীর পাড়ে। সঙ্গে সঙ্গে একটা হেলিকপ্টার মেয়েটি কে উড়িয়ে নিয়ে যায়। ছেলেটি স্পীড বোটে নদী পার হয়। আবার জলজ জন্তুদের আক্রমন।
...একটার পর একটা লেবেল শেষ হয়ে যায়। মেয়েটির খুব কাছে পৌঁছে গিয়ে ও আবার মেয়েটিকে হারিয়ে ফেলে। কিছুতেই যেন মেয়েটিকে ধরতে পারছে না ছেলেটি।তখন বুঝিনি আমিও গেম টির নেশায় পড়ে যাব। যত লেবেল পার হচ্ছি, ততই মেয়েটিকে কাছে পাওয়ার একটা নেশা চেপে ধরছে।

এতক্ষনে ব্যাপার টা আমার নজরে পড়ল। আর তাতেই আমার সারা শরীর বিদ্যুতের ঝটকা মারলো। এর আগে আমি ভালো করে দেখিনি। হঠাৎ আমার চোখ গেলো 'গেম' এর মেয়েটির মুখের দিকে।ভালো করে মুখটা দেখতেই আমার বুকের ভেতর টা কেঁপে উঠল। মনে হল মেয়েটি জীবন্ত। সে কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। এটা কি করে সম্ভব? সেই একই চশমা চোখে,পুরু মোটা ঠোঁট, প্রিয় গোলাপি রঙের ড্রেস......। মেয়েটির মুখের আদল টা যতবার দেখছি আমার বুকের ভেতর টা থর থর করে কাঁপছে।

মোবাইল গেম কেমন করে তৈরী করে আমি জানি না। কিন্তু কেউ যে গেমটি তৈরী করে সেটা আমি জানি।কে তৈরী করলো এরকম একটা গেম? ফোনটা বন্ধ করে আমার বন্ধু বিক্রম কে ফোন লাগালাম। ও সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। এসব সম্পর্কে তবুও একটা ধারনা আছে। তাই বিক্রমের কাছে আমার ফোন করা।ফোনে বিক্রম কে সব কিছু বলতেই, বিক্রম বলল,-" আচ্ছা, গেম টা ডাউনলোড করে আমি তোকে সব জানাচ্ছি।"

তারপর আজ দুপুরে অফিসে বসে বিক্রমের ফোন পাই।বিক্রম আমাকে কি ঠিকানা টা দিতে পারবে? আমার ধারনা কি ঠিক! না ভুল পথে যাচ্ছি আমি? কি করে ভুল হবে, এত মিল থাকার সত্বেও?

(২)

বিকেল পাঁচটা। বিকেল ঠিক নয়। সন্ধ্যা হব হব ভাব। অফিস থেকে বেরিয়ে গাড়ি ধরে সোজা হসপিটলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে চলে গেলাম। থার্ড ফ্লোর। আমাকে দেখতে পেয়ে মা এগিয়ে এল।  মা কাছে আসতেই বললাম,-" সুনীতা, এখন কেমন আছে?"
মা বলল,-" ডাক্তার তো বলল ভালো আছে। তবে বিপদ সম্পুর্ন কাটেনি। চোখ মেলে তাকাচ্ছে না।"

আপনাদের বলা হয়নি, সুনীতা আমার স্ত্রী। বছর খানেক হল বিয়ে করেছি আমরা। কিন্তু বিয়ের মাস সাতেক পর সুনীতার লিভারে ক্যানসার ধরা পড়ে। কলকাতার একটা বড় বেসরকারি হসপিটলে ভর্তি করি সুনীতা কে।
সব কিছু রিপোর্ট চেক করার পর ডাক্তার বলেছিল,-" দেখুন অপারেশন করা যেতে পারে। কিন্তু অপারেশন করলেই যে, আমরা তার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারবো না। আর অপারেশন টা যতেষ্ট ভাইটাল। লিভারের বেশিরভাগ টা কেটে বাদ দিতে হবে। ফাইভ পারসেন্ট মৃত্যুর সম্ভবনা আছে।"

চোখে জল এসেছিল আমার। এটা মৃত্যুর সাথে লড়াই ছাড়া আর কি! তবুও আমি জোর করেই সুনীতার অপারেশন  করাই। সুনীতা নিজেও জানে তার এই মারন রোগের কথা। লুকানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু লুকাতে পারি নি। সুনীতা বলেছিল,-" ভয় পাচ্ছো কেন? ছেলেদের ভয় পেতে নেই। তুমি ভয় পেলে, আমি সাহস পাবো কি করে? আর মরতে তো হবেই সবাই কে। একদিন আগে বা, একদিন পরে। "


হসপিটল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে টিভি নিয়ে বসলাম। টেনসান কমাতে। কিছুতেই মন টা ভালো লাগছে না। শুধু রিমোট ঘুরিয়ে যাচ্ছি। বারবার আমার 'গেম' এর মেয়েটির মুখ মনে পড়ছে। মেয়েটির মুখের আদল আমার চেনা। তবে কি সুনীতার কথাই সত্যি!
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আবার ফোনটা নিয়ে পড়লাম। বার বার দেখছি মেয়েটি কে।
এগারোটার দিকে বিক্রমের ফোন এল। ফোন টা রিসিভ করে কানে দিলাম।-"বল।"
-"তুই ঠিকই বলেছিস, যে গেম টা তৈরী করছে সে একজন বাঙালী ছেলে। ছেলেটির নাম অভিজিৎ চক্রবর্তী। ওরা ওদের অফিসের নাম্বার, ঠিকানা মেল করে দিয়েছে। কিন্তু ওরা ছেলেটির মোবাইল নাম্বার দিই নি।"
-" অভিজিৎ!" আমি যেন নামটা শুনে একটু মর্মাহত হলাম।
কিছুক্ষন পর আবার বললাম,-" যাই হোক,ওর অফিসের নাম্বার পেলেই হবে।"
-" কি ব্যাপার বলতো? আমি কিছু বুঝতে পারছি না!"
-" কিছু না।"
-"ছাড় তোর পাগলামোর কথা। সুনীতা কেমন আছে বল?"
একরাশ কালো ছায়া এসে পড়লো আবার আমার উপর। বললাম,-" জানি না রে। ডাক্তার রা ভরসা দিচ্ছে। কিন্তু আমি কোনো ভরসা পাচ্ছি না।"
-" ঠিক হয়ে যাবে সব। চিন্তা করিস না। কিন্তু তুই এই অবস্থায় সুনীতা কে ছেড়ে ব্যাঙ্গালোর যাবি? তোর দায়িত্ব বোধ দেখে অবাক হচ্ছি!" বিক্রম বলল।
-" আমাকে যেতে হবেই রে। কাল ফ্লাইটে যাব, আবার পরশু চলে আসবো।"
-" যা পারিস কর।"

ফোন রেখে দেয় বিক্রম। ফোনের স্ক্রিন টা অফ করে বালিশের পাশে রেখে দিয়ে চোখটা বন্ধ করি। অনেক কিছু দেখতে পাই। সুনীতার সাথে সেই প্রথম দেখা। প্রথম পরিচয়। এক বছর প্রেম। তারপর বিয়ে। রঙিন সে  দিন, আজ সব ফ্যাকাশে। রঙচটা।

(৩)

এই মুহুর্তে আমি ব্যাঙ্গালোর শহরে। একটা ফ্লাই ওভারের উপর দিয়ে গাড়ি ছুটছে। চারিপাশে উঁচু উঁচু ফ্লাট বাড়ি। গাড়ির মধ্যে ছেলেটির অফিসের একজন স্টাফ। তার সাথে আমি বসে।

ব্যাঙ্গালোরে নেমে, বিক্রমের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী আমি ছেলেটি, অর্থাৎ অভিজিৎ এর অফিসে চলে যাই। ঠিকানা খুঁজতে বেশি বেগ পেতে হয়নি। ট্যাক্সিওয়ালা কে বলতেই আমাকে পৌঁছে দেয়। বেশ ঝকঝকে অফিস।
ভেতরে ঢুকে  একজন কে জিজ্ঞেস করি,-" অভিজিৎ চক্রবর্তী আছেন?"
এখানে হিন্দি আর ইংরাজী মিশিয়ে আমাদের কথা-বার্তা চলে। লোক আমার দিকে তাকায়।
তারপর বলে,-" কে আপনি?"
-"আমার নাম সৌনক। কলকাতা থেকে আজই আসছি। ওনার সাথে আমার খুব দরকার। একবার দেখা করতে চাই।" বলি আমি।
-" কিন্তু, উনি তো আজ অফিস আসবেন না। "
-"ওনার বাড়ি কোথায়? আমাকে ওনার সাথে দেখা করতেই হবে।" একটা কাকুতি মিনতি ধরা পড়ে আমার গলায়।
-" তা কি করে সম্ভব!"
-"আপনি ওনাকে একবার ফোন করে বলুন, যে কলকাতা থেকে একজন দেখা করতে এসেছে। খুব জরুরি দরকার।" আমার চোখ ভিজে ওঠে।

আমাকে দেখে,লোকটির হয়তো একটু মায়া হয়। বলে,-"আচ্ছা, আপনি বসুন। আমি ফোনে দেখছি।"
ভেতরে চলে গেল লোকটি। পাঁচ মিনিট পর ফিরে এল। তারপর বলল,-" চলুন আমার সাথে। ওনার ফ্লাটে নিয়ে যেতে বলল আপনাকে।"
আমার মন টি খুশিতে ভরে ওঠে। লোকটির সাথে বেরিয়ে পড়ি।




প্রায় ত্রিশ -পঁইত্রিশ তলা একটা ফ্লাটের সামনে গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামি আমি। লোকটি বলল,-" সেভেন্টিনথ ফ্লোর। রুম নং- ৪০২।" গাড়ি চলে যায়।
আমি, সিকিউরিটি কে কার্ড দেখিয়ে গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। হেঁটে গিয়ে লিফট দিয়ে উঠে সোজা সেভেন্টিনথ ফ্লোর। রুম নং-৪০২ এর সামনে গিয়ে কলিং বেল বাজালাম। একটা অল্প বয়েসি মেয়ে এসে দরজা খুলে দিল। মেয়েটি কে দেখে আমার কাজের মেয়ে বলেই মনে হল। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম আমি।


... ভেতরে ঢুকতেই আমার চোখ দাঁড়িয়ে গেল। দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। যেটা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। বোকার মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ঘুর পাক খেতে  লাগলাম আমি। তবে কি এই সেই! ঘরটির চারিপাশের দেওয়ালে সুনীতার ছবি লাগনো। প্রথম দিনই 'গেম' টি তে মেয়েটির ছবি দেখে চমকে উঠেছিলাম। একদম সুনীতার মুখের আদল। তবে কি সুনীতা এই ছেলেটির কথাই বলেছিল? কিন্তু এর নাম তো অভিজিৎ!

পাশের সোফায় আমাকে বসতে বলে মেয়েটি ভেতরে চলে গেল। কিছু সময় পর একটা ছেলে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো।আমি উঠে দাঁড়াতেই, ছেলে টি হাতের ইশারায় বসতে বলল। বসে পড়লাম আমি।বেশ লম্বা- চওড়া চেহারা ছেলেটির। ফর্সা গায়ের রঙ। পরনে একটা সাদা-কালো ট্রাউজার্স।উপরি ভাগে টি-শার্ট। ছেলেটির বয়েস প্রায় আমারই মতো হবে। ত্রিশ এর কাছাকাছি। আমার সামনের সোফায় বসে ছেলেটি বলল,-" আমার নাম অভিজিৎ। আপনি?"
নিজের নাম বললাম আমি।
-"তো, বলুন কি হেল্প করতে পারি আপনার?"
-"আপনার রিসেন্ট তৈরী করা গেম টি দেখে আপনার কাছে ছুটে আসা।"
অভিজিৎ হাসলো। আমি বললাম,-" আপনার নাম কি,বুবু?"
চমকে উঠে আমার দিকে তাকালো অভিজিৎ।
বলল,-"আপনি কি করে জানলেন? এই নামে তো একমাত্র....."
-"এই নামে আপনাকে একমাত্র সুনীতাই ডাকতো,তাই তো?" আমি হেসে বললাম।
আবার চমকে উঠে আমার চোখের দিকে তাকালো অভিজিৎ।-"আপনি চেনেন! "

অপারেশনের পর প্রথম যখন জ্ঞান ফেরে সুনীতার,তখন আমি গিয়েছিলাম ওর পাশে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল সুনীতা। ওর গায়ে হাত রাখতেই একটা কথাই শুনতে পেয়েছিলাম আমি,-" বুবু, তোকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে।"
বুবু! অনেকটাই অবাক হয়েছিলাম আমি। কে বু্বু? কাকে দেখতে চাইছে সুনীতা? সুনীতা কি ভুল বকছে! ডাক্তার বলেছিল,-"বেশিক্ষন পেসেন্টের কাছে থাকবেন না।"
বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম আমি। তারপর হঠাৎ এই গেমটির সাথে পরিচয়।

অভিজিৎ এর কথার জবাবে আমি বললাম,-" হ্যাঁ। এই ঘরের চারিদিকে যার ছবি লাগানো, সে আমার স্ত্রী। এখন মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে সে। আপনাকে দেখতে চেয়েছে। এখনো ও আপনাকে ভুলিনি।"
চোখে জল চলে এল অভিজিৎ এর। চাপা স্বরে বলল,-" প্রথম ভালোবাসা সত্যিই ভোলা যায় না। কোথাও মনের কোনে থেকে যায়।"
-"আপনি চলুন আমার সাথে। ও খুব খুশি হবে। "
অভিজিৎ উপর-নীচে মাথা নাড়লো। বেশ কিছুক্ষন চুপচাপ থাকার পর আমি বললাম,-" আপনার তৈরী গেম টি কিন্তু চমৎকার। এর জন্যেই আমি আপনাকে খুঁজে পেলাম। প্রথম দিন দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম, 'গেম' এর মেয়েটি আর কেউ নয়- সুনীতা।"



(৪)

সুনীতা এখন অনেকটাই সুস্থ্য। চোখ মেলে তাকিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ এ কি হবে সে আমিও জানি না। ডাক্তার বলেছে, কিছু দিনের মধ্যেই তাকে ছেড়ে দেবে।

আজ একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে অভিজিৎ কে নিয়ে হসপিটলে চলে গেলাম। মা-বাবা সবাই ছিল। অভিজিৎ কে সঙ্গে নিয়ে ছোটো ঠান্ডা ঘরের মধ্যে ঢুকলাম। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে সুনীতা। ওর গায়ে হাত দিলাম আমি। চোখ মেলে আমার দিকে তাকালো সুনীতা। আমি হেসে আস্তে করে বললাম,-" দেখো, কে তোমায় দেখতে এসেছে?"
অভিজিৎ কে দেখে চমকে উঠল সুনীতা। শরীর টা কেঁপে উঠলো। যেন নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছে না। অভিজিৎ এর দিক থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকালো সুনীতা। চোখের পাতায় জল টলমল। ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি। আমার হাত টা জোরে চেপে ধরলো।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.