একটি ভূতের গল্প " ভূতুড়ে "





কি দরকার ছিল এবার কাজ টা হাতে নেওয়ার! আর যদিও বা,নিল তবে কেনই বা আসতে গেল এই গো-ভাগাড়ে! কাছাকাছি কোথাও গেলেই পারতো।আসলে সব টাই হল মনের বাতিক। মনের বাতিক হল ভয়ানক বাতিক।কখন কোনদিকে টেনে নিয়ে যায় কেউ বুঝতে পারে না। আর মনের বাতিক আছে বলেই তো এই ধরনের কাজ,প্রতিবারই তার কাঁধে এসে পড়ে। রবীন দা,বেশ ভালো করেই জানে,প্রীতম কে এ কাজ টা দিলে,কোনোভাবেই না করতে পারবে না।প্রীতম ও না করতে পারে না।কারন,একটাই- তার একটু ঘোরাঘুরির নেশা আছে।আর সেই নেশার টানে এবার ও বেরিয়ে পড়েছে সে।
কিন্তু সমস্যা টা কি?সমস্যা টা হল,একটা প্রশ্নের উত্তর শুনে প্রীতমের মনে হয়েছে যে,সে ভারতবর্ষে নেই।ভারতবর্ষ না হোক,অন্তত পশ্চিমবঙ্গে নেই সেটা বেশ বুঝতে পারছে।ভুল করে অন্য রাজ্যে ঢুকে পড়েছে। নইলে, এমন একটা সিম্পল প্রশ্নের উত্তর গ্রামের কেউ জানে না!
ঠিকানাটা দিয়েছিল তার বন্ধু অতীন।অতীন রয়। প্রীতমের ক্লাস ফ্রেন্ড।এক সাথে স্কুল,কলেজ, ইউনির্ভারসিটি সব জায়গায় পড়াশুনা করেছে। অতীন এখন স্কুল টিচার।প্রাইমারী নয়,হাই স্কুল। দক্ষিন চব্বিশ পরগনার একটা গ্রামের স্কুলে পড়ায় অতীন।সেদিন সন্ধ্যায় তার কাছে ফোন করতেই,সেই ঠিকানাটা দেয়।তারপর অতীনের দেওয়া ঠিকানা ধরেই এখানে আসা। আসলে, কলকাতার একটা নিউজ চ্যানেলে রিপোর্টার হিসাবে কাজ করে প্রীতম।এই নিউজ চ্যানেলের একটা বিশেষত্ব হল,বেশ কিছু বছর এরা বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামের উপর একটা করে তথ্যচিত্র বানায়।সেই সব গ্রামের মানুষদের ছবি, জীবনযাত্রা,চিন্তাভাবনা,তাদের আচার-আচরন, পোষাক -পরিচ্ছদ, প্রাত্যহিক কর্মিজীবন,সব কিছুকে একটা ফ্রেমে বাঁধানো হয়।আর প্রতিবছর গ্রামে গ্রামে গিয়ে,সেই সব মানুষদের জীবন চিত্র,ডাটা কালেকশনের দায়িত্ব পড়ে প্রীতমের উপর।রবীন দা,বেশ ভালোই জানে যাদের একটু গ্রাম ঘোরার নেশা আছে তারাই এই কাজে পারফেক্ট।চ্যানেলের অনেক স্টাফ আছে যারা এই কাজের কথা শুনলে নাক সিঁটকোয়।গ্রাম! ইস,আলো নেই,গাড়ি নেই,সাপ-খোপ,জল-কাদা পোকামাকড়-আরও অনেক কিছু।তবে প্রীতমের বেশ ভালো লাগে এই কাজটা। তাই রবীন দার রিকোয়েস্ট ফেলতে পারে না। কিন্তু এবার যেন ভুল করে ফেলল।
কি গন্ডগ্রামে এসে পড়ল সে! এর আগে,উত্তর চব্বিশ পরগনা,হাওড়া,পূর্ব মেদিনীপুরের কিছু গ্রাম ঘুরেছে প্রীতম,কিন্তু সেগুলো তেমন কলকাতা থেকে দূরে নয়।কিন্তু এবার যেন একটু বেশী দূরেই এসে পড়ল!প্রীতমের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী ভোর বেলা শিয়ালদহ থেকে ক্যানিং লোকাল,তারপর ক্যানিং থেকে ট্রেকারে পঁইতাল্লিশ মিনিট ধরে সবুজ ধানক্ষেত,গাছপালা, এলোমেলো ঘর বাড়ির মধ্যে দিয়ে কালো পিচে মোড়া রাস্তা দিয়ে একটা অচেনা জায়গা। প্রীতম আশেপাশের কয়েকজন কে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছিল,জায়গাটার নাম চুনাখালি।কি অদ্ভুত সব নাম! এখানকার মানুষরা মনে আগে সব চুনের কাজ করত।মনে মনে ভেবেছিল প্রীতম। কয়েকজন কে সেটা জিজ্ঞেস করতেও ইচ্ছে করছিল,কিন্তু সেটা ভদ্রতার বাইরে চলে যাবে বলে,দমে গিয়েছিল সে। চুনা খালি থেকে এবার গাড়ি রাস্তা শেষ।নদী পথের শুরু। অতীনের কাছে যখন জায়গাটার নাম শুনেছিল, তখন তার মনে হয়েছিল সেখানকার লোকজনেরা সাত পুরুষ ধরে কেউ না কেউ, জেলের ভাত হজম করেছে।তাই জায়গাটার নাম সাতজেলিয়া।গুগলে অনেক সার্চ মেরে জায়গাটি সম্পর্কে কোনো আপডেট পাইনি প্রীতম।ব্যাপারটা অস্বাভিকের কিছু নয়।এরকম একটা অজ পাড়া গাঁ সম্পর্কে গুগলে কিছু ইনফরমেশন লেখা থাকবে,সেটা ভাবাটাই একটা ভুল।
চুনাখালি থেকে ভটভুটিতে প্রায় সাড়ে চার ঘন্টা জল সাওয়ার করে সাতজেলিয়ায় এসে বুঝতে পারল,জায়গাটি সম্পর্কে তার ধারনা ভুল। এখানকার মানুষজন জেলের ভাত নয়,সাত পুরুষ ধরে নদীতে মাছ ধরে আসছে।অর্থাৎ তাদের প্রধান জীবিকা নদীতে মাছ ধরা।যারা মাছ ধরে তাদের কে 'জেলে' বলে।আর তার থেকেই বোধ হয় জায়গাটির নাম সাতজেলিয়া। ভুল ও হতে পারে।সবসময় যে সব ধারনা ঠিক হবে তার কোনো মানে নেই।আসলে,ভটভুটিতে আসার সময় প্রীতম দেখেছিল,দুপাশের নীলরঙা আকাশের মাঝে সোনালী রঙের রোদের চিরিক। সবুজ গাছের জঙ্গল, কোথাও সূদুর ফাঁকা জায়গা, অন্তহীন জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ।নদী গর্ভে মেছো নৌকার সারি।নুইয়ে পড়া বুনো গাছের ডাল নদীর জলে,আর গ্রামের মেয়ে,বউ রা নদীর পাড়ে কোমর সমান জলে জাল টেনে চলেছে।গ্রামে ঢোকার আগেই প্রীতম একটা তথ্য ভালো ভাবে পেয়ে গেছে যে,এখানকার মানুষদের মূল প্রফেশন হল,মাছ ধরা। হাতের ঘড়িতে তখন প্রায় দুপুর দুটো।নদীর পাড়ে একটা বাজার মতো।জেটি ঘাটে কিছু মানুষের ভিড়।সারি সারি আরও অনেক ভটভুটি,জেটি ঘাট কে ঘিরে।বেশির বাঁশ বোঝাই।প্রীতম ভটভুটির সরু করে কালো ছেলেটি কে জিজ্ঞেস করলো,-"এটাই কি সাতজেলিয়া?"
ছেলেটি জেটি ঘাটের একটা বড় সিমেন্টের থামের গায়ে কাছি বাঁধতে বাঁধতে বলল,-"হ্যাঁ। নেমে পড়ুন।বোট আর যাবে না।"
জেটি ঘাটের উপর নেমে পড়ল প্রীতম। চারিদিকে ভালো করে দেখল।সবাই সবার কাজে ব্যস্ত।তারপর কিছুটা হেঁটে বাজারের মধ্যে গেল।বাজারে বেশীর ভাগ মাটির দোকান।খড়ের চাল।এখন দুপুর বেলা,তাই বেশির ভাগ দোকান বন্ধ।কিছুটা হেঁটে ডান দিকে ঘুরতেই একটা মোড় মতো দেখতে পেল প্রীতম।কিছু পায়ে টানা রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।রিক্সা গুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রীতম বলল,-" গ্রামের ভেতরে নিয়ে যাওয়া যাবে?"
লোক গুলো সবাই প্রীতমের দিকে চাইল।উপর থেকে নীচ পর্যন্ত।অনেক টা ভূত দেখার মতো। এক ছেঁড়া ময়লা,গেঞ্জি পরা বয়ষ্ক লোক এগিয়ে এসে বলল,-"কোতায় যাবেন বাবু?"
প্রীতম অল্প কথায় তাদের কে সব বুঝিয়ে বলল। আমি একজন টিভি চ্যানেলের রিপোর্টার।গ্রামের মানুষ,তাদের জীবন যাত্রা,কথা-বার্তা,চলা-ফেরা, সব কিছু নিয়ে চ্যানেল থেকে একটা তথ্যচিত্র বানানো হবে।তাই আসা। লোক গুলো নিজেদের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো।প্রীতম বুঝতে পারল,ব্যাপার টা তারা কেউই বুঝতে পারেনি। তাই ব্যাগ থেকে ভিডিও ক্যামেরা টা বের করে তাদের কে দেখিয়ে বলল,-" এই ক্যামেরা দিয়ে সবার ফোটো তুলে নিয়ে গিয়ে টিভি তে দেখানো হবে।"
-"আমাদের টিবি তে দেকাবেন?"বয়ষ্ক লোকটি আশ্চর্য হয়ে বলল।
প্রীতম নীচের কাজ শুরু করে দিল।বলল,-"সবাই নিজের নিজের ভ্যানে গিয়ে বসুন।আমি যেসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো,তার উত্তর দেবেন।"
সবাই তাই করল।প্রত্যেকের সামনে ক্যামেরা নিয়ে গিয়ে,তাদের নাম, কাজ,বাড়িতে সবাই কি করে, ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো।
মিনিট পনেরো পর বয়ষ্ক লোকটির ভ্যানে চেপে গ্রামের দিকে চলল প্রীতম।পাকা ইটের,মোটামুটি চওড়া রাস্তা।দুপাশে খোলা মাঠের মাঝে আগোছালো ঘর বাড়ি।সবুজের ছোঁয়া।নদীর নোনা হাওয়া চোখে মুখে এসে লাগছে। প্রীতম লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো,-"এই বয়েসে, পায়ে টানা রিকসা চালাতে কষ্ট হয় না?"
লোকটি প্যাডেল করতে করতে বলল,-"কষ্ট হলি আর কি করবো বাবু!এক ছেলে ছিল,নদীতি মাচ ধরতি যায়ে কুমিরি ট্যানে লিয়ে গেল।আর তার মুক দেকিনি।সেই ভয়ে বউ আর নদীতি নামতি দেয় না।"
একটু কষ্ট হল প্রীতমের।রিক্সা করে চলতে চলতে একটা জিনিষ লক্ষ্য করলো,এলাকাটি তে এখনো বিদুৎ ঢোকেনি।এর আগে বেশ কয়েকটা গ্রামে গিয়েছে। সেখানে বিদুৎ ছিল, নয়,বিদ্যুতের খুঁটি পোতা ছিল।কিন্তু এলাকাটি তে কিছুই নেই।চারিদিকে বেশ ভালো করে চোখের আঁচড় কেটে দেখলো প্রীতম।প্রায় আধ ঘন্টা চলার পর একটা বড় বট গাছের কাছে এসে থামলো রিক্সা।রিক্সা চালক বলল,-"এবার নামুন বাবু।চলে এয়েচি।ওই মাটির এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে আর রিকসা যাবে না।"
রিক্সা থেকে নামল প্রীতম।হাতের ঘড়ির দিকে থাকলো সে।পৌনে তিনটে বাজে।বট গাছের পাশ দিয়ে একটা মাটির রাস্তা চলে গেছে গ্রামের ভেতরে।ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে সেই রাস্তায় নামলো প্রীতম।উঁচু-নীচু রাস্তা।আকাশে রোদের ছটা থাকলেও,সে রোদের তেমন তেজ নেই।ক্যামেরা টা বের করে চারিপাশে কয়েকটি গাছ,পাখির খচাখচ ছবি তুলে নিল প্রীতম।তারপর ক্যামেরা টা ব্যাগে ঢোকালো।শিমুল তুলোর মতো মেঘে পড়ন্ত বিকেলের আলো পড়ে চকমক করছে। বেশ পরিষ্কার পরিবেশ।আরও কিছুটা হাঁটলো প্রীতম।সারি সারি মাটির বাড়ি। খড়ের ছাউনি দিয়ে ছাওয়া।বেশ কিছু টালির ঘর ও দেখতে পেল প্রীতম।মাঝে মাঝে নালা পুকুর,খানা-খন্দ টাইপের।দু'টো রাস্তার মোড় মতো একটা জায়গায় এসে থামলো সে।একটা মাটির বাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে দোকান।প্রথমে সেরকম টাই মনে হয়েছিল প্রীতমের। তারপর ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলো, দোকানটি বাড়ির ভেতরেই।সামনে নারকেল পাতার ছাউনি করে দেওয়া।তার নীচে একটা লম্বা বেঞ্চ। বেঞ্চের উপর কয়েকজন লোক বসে আছে। প্রীতম ব্যাগ টা পিঠ থেকে নামিয়ে বেঞ্চের একপাশে গিয়ে বসলো। পাঁচমিশালি দোকান।নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ থেকে,বিস্কুট, কেক,লজেন্স সব কিছুই আছে। ব্যাগ থেকে জলের বোতল টা বের করে, দোকানদার কে বলল,-" একটা বিস্কুটের প্যাকেট দিন তো।"
আশে পাশের লোক গুলো যে তারদিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে, সেটা বেশ বুঝতে পারলো প্রীতম।ব্যাপার টা স্বাভাবিক।অজ পাড়া গাঁয়ে হঠাৎ,সুট,বুট,চো খে সানগ্লাস,পিঠে ব্রান্ডেড ব্যাগ,হাতে ট্যাব-এরকম কাউকে হঠাৎ দেখলে সবাই ঘুরে তো তাকাবেই! বিস্কুটের প্যাকেট টা খুলে একটা মুখে দিল প্রীতম।তারপর পাশে বসে থাকা একজন রোগা বয়ষ্ক লোককে জিজ্ঞেস করলো,-"এই গ্রামটা কত বড়?"
লোকটি উত্তরের বদলে একটা প্রশ্ন করলো,-"আপনি কোতা থেকে আসচেন বাবু?"
প্রীতম হেসে বলল,-"আমাকে বাবু বলার দরকার নেই।কলকাতা চেনেন আপনারা?"
সবাই পরষ্পরের দিকে চাইলো।এমন ভাব,মনে হয় নাম টা তারা প্রথম শুনছে।একজন মাথা চুলকে বলল, নামটা তার শোনাশোনা লাগছে। এই প্রশ্নের উত্তর শুনেই প্রীতমের মনে হয়েছিল,সে ভারতবর্ষে নেই।ভারতবর্ষে  না হোক,অন্তত পশ্চিমবাংলায় নেই সেটা বেশ বুঝতে পারছে। নইলে, বাংলার মধ্যে থেকে এমন একটা সিম্পল প্রশ্নের উত্তর গ্রামের কেউ জানে না!
কলকাতা থেকে যে,সে কত দুরে এসে পড়েছে, এবার সে বুঝতে পারলো।তারপর সে বললো,-" আমার নাম প্রীতম চক্রবর্তী।একজন সাংবাদিক। কলকাতা থেকে আসছি।"
-"কলকাতা থেকে!"
প্রায় অসম্ভব কাজ এটা,সেরকম মুখ করে একজন বললো।বিস্কুটের প্যাকেট টা শেষ করে, জলের বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল খেল প্রীতম।তারপর বোতল টা ব্যাগে ঢুকিয়ে ক্যামেরা বের করে, সবাই কে নিজের কাজ সম্পর্কে সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিল প্রীতম।সবার চোখে মুখে হাসির ঝিলিক।দোকারদার ভদ্রলোক দরজা খুলে বাইরে এসে বলল,-"আমাদের কে টিবি তে দেকাবে?"
তারপর একটা মেয়ের নাম ধরে হাঁক দিল,-"শ্যামলী,বাইরি এসে দেক মা,কলকতার বাবু এয়েচেন,আমাদের সবার ছবি তুলে নিয়ে যাবেন...টিবি তে দেকাবে।"
একটা সতেরো আঠেরো বছরের মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো।শ্যামলা রঙ,স্বাস্থ্যবতী,তবে ঘষা-মাঝার অভাবে চেহারায় মলিনতার ছাপ। মেয়েটিকে কাছে টেনে নিয়ে লোকটি বলল,-" আমার এক মাত্র বিধবা মেয়ে।ওর স্বামীরে জঙ্গলে বাগে খেয়েছে।ও কে টিবি তে দেকাবেন?"
প্রীতম হেসে বলল,-"গ্রামের সবাই কে দেখাবো।"

কাজ শুরু করে দিল প্রীতম।ক্যামেরা বের করে অন করল।তারপর প্রশ্ন করলো,-"আপনারা জানেন, মানুষ চাঁদে গিয়েছে?...দিন দিন কত বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে,মাটির নীচে দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে,গাড়ি রাস্তা,.... এসব জানেন? দেখেছেন কেউ?"
লোক গুলো হাঁ করে প্রীতমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মুখের হাবভাব দেখে বিস্মিত হয়ে আবার বলল,-"কত উঁচু উঁচু বাড়ি জানেন কলকাতায়?"
একজন বুড়ো মতো লোক গিয়ে এল।প্রীতম ক্যামেরা ধরলো সেই দিকে,-"ওসব আমাদের জেনে, দেকে কি হবি বাবু! আমাদের খেতি দেবে?আমাদের এই নদী খেতি দেয়।এই নদী আমাদের মা।আমরা এই নদী চিনি শুদু।"
তারপর আরও একজন বলল,-"শহুরে কাজ দেবে বলে,আমার মেয়েকে একজন নিয়ে গেছেলো, অনেকদিন আগে।সে আর ফিরিনি। বেচে দেচে মনে হয়।কোতায় খোঁচ করবো!"
প্রতিটা মানুষের মনের কথা থাকে। এক এক করে তার যেন সেই মনের কথা বলতে লাগলো। অনেক কথা-বার্তা বলার পর প্রীতম বলল,-" সারা গ্রাম টা এক বার ঘুরে দেখা যায় না?"
প্রীতমের কথায় দোকানদার ভদ্রলোক বললো,-"কেন,যাবে নে বাবু?"
তারপর তার বিধবা মেয়েরদিকে তাকিয়ে বলল,-"যা না শ্যামলী, বাবু কে গেরামটা ঘুরিয়ে দেকা।"


পড়ন্ত বিকেল নেমেছে ধুলো মাখা মাটির রাস্তায়। আকাশ এখন সিঁদুরে লাল। প্রীতমের পাশে হাঁটছে শ্যামলী। কয়েকটি স্কুল ব্যাগ ঘাড়ে করা বাচ্চা পিছু নিল তাদের।সম্ভবত হাতের ক্যামেরা দেখে।প্রীতম সেই বাচ্চা গুলো উদ্দেশ্য করে বলল,-"এই, তোমরা কলকাতার নাম শুনেছো?"
তাদের মধ্যে একজন মাথা চুলকে বলল,-"বইতে পরিচি।কলকাতায় বড় বড় টেরেন চলে।"
প্রীতম বাচ্চাটির ভিডিও করে নিয়ে, মাথাটা ঝাঁকিয়ে দিয়ে হেসে বলল,-" হ্যাঁ,খুব বড় বড় ট্রেন।"
শ্যামলীর সাথে ঘুরে ঘুরে প্রীতম বেশ কিছু মানুষের ভিডিও করলো। শ্যামলীও হেসে হেসে প্রীতম কে সব দেখিয়ে দিচ্ছিল,ওই যে, ও দিক টা তে সুন্দর বনের জঙ্গল।আর ওদিক টা তে বড় নদী।তার কিছুটা ওদিকে বাংলাদেশ।কাল যদি থাকেন তাহলে ওই নদীর দিকে নিয়ে যাব আপনাকে।
প্রীতম হেসে বললো,-"থাকতে তো,ইচ্ছে করে। কিন্তু থাকবো কোথায়?এখানে কি ঘড় ভাড়া পাওয়া যাবে কোন?"
-"ওমা!ভাড়া থাকতি যাবেন কেন? আমাদের বাড়িতি থাকবেন।তবে একটু কষ্ট হবে।"
প্রীতম হেসে বলল,-"আজকের রাত টা তো, থাকতেই হবে আপনাদের বাড়িতে।"

সন্ধ্যা নেমে এসেছে।আর ক্যামেরা করা যাবে না। তাই মেয়েটির সাথে প্রীতম,মেয়েটির বাড়ির দিকে ফিরতে লাগলো।হঠাৎ ব্যাপারটা লক্ষ্য করলো, প্রীতম।শ্যামলী যেন একটু বেশিই খুশি। সন্ধ্যার সেই অল্প আলোয়,প্রীতম দেখলো, শ্যামলীর মুখ টা বেশ হাসি হাসি ।ব্যাপার টা খেয়াল হল এবার, দোকানদার লোকটি একটা অচেনা ছেলের সাথে এমন নব যৌবনা মেয়েটিকে ছেড়ে দিল কেন?বাজে কোনো মতলব নেই তো! শেষে রেপ কেসে ফাঁসিয়ে মেয়েটিকে,তার গলায় ঝুলিয়ে দেবে না তো? যাইহোক, এসে যখন পড়েছে সাবধানে থাকতে হবে তাকে।

রাতে শ্যামলীদের বাড়িতেই থাকলো প্রীতম। শ্যামলীদের দু'টো ঘর।তার একটিতে জায়গা করে দিল প্রীতমের।খাওয়া-দাওয়া বেশ ভালই হল।খাওয়া সেরে রাত ন'টার দিকে শুয়ে পড়ল প্রীতম।তার আগে শ্যামলী আর তার বাবা এসে বেশ কিছুক্ষন গল্পও করে গেল।না, মানুষ গুলোকে যেমন ভেবেছিল তেমন নয়।মনে মনে একটু লজ্জাই পেল প্রীতম।ওরা চলে যাওয়ার পর ট্যাব নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।

সকালে কিছু একটার ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল প্রীতমের। চোখ খুলে তাকাতেই,চমকে উঠল।  তিনজন পুলিশ তাকে ঘিরে আছে। আর আশেপাশে কিছুই নেই।কোথায় সে গ্রাম,কোথায় সেসব মানুষজন! সে একটা মাটির টিবির উপর শুয়ে আছে।চারিদিকে ধূ ধূ শূন্যতা। প্রীতম হতবাক হয়ে উঠে দাঁড়ালো।পাশ দিয়ে সেই মাটির রাস্তা আছে।কিন্তু ঘরবাড়ি,মানুষ জন সব কোথায় গেল?মাথা ঘুরতে লাগলো প্রীতমের।
একটা পুলিশ প্রীতম কে জিজ্ঞেস করলো,-"কে আপনি? এখানে শুয়ে আছো কেন?"
প্রীতম প্রথম থেকে সব কিছু খুলে বলল পুলিশ গুলো কে।সব শুনে একটা পুলিশ বলল,-"হ্যাঁ, আগে এখানে একটা গ্রাম ছিল। বছর চারেক আগে নদীর বাঁধ ভেঙে বন্যার জলে গ্রামটি নিশ্চিন্ন হয়ে যায়।অনেক গ্রামবাসী,বাচ্চা-শিশুরা মারা যায়।আর যারা বেঁচে ছিল তারা এ গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছি আর ফেরে নি।"
প্রীতম কি বলবে বুঝতে পারলো না। বিস্ময় জড়ানো গলায় বললো,-" তা কি করে সম্ভব? আমি তো কালই এই গ্রামের মানুষের একটা ভিডিও করলাম।"
ব্যাগ থেকে ভিডিও ক্যামেরাটা বের করল প্রীতম। ভিডিও গুলো চালালো।সবই চললো, কিন্তু কারও মুখ দেখা গেল না।সব নেগেটিভ ছবি হয়ে গেছে।প্রীতমের হাত কাঁপছে। গলা,বুক, পা,সারা শরীর কাঁপতে লাগলো। ফ্যাকাসে মুখে পুলিশ গুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর পুলিশ লঞ্চেই,সাতজেলিয়া জেটি ঘাটে এসে,বাড়ি ফেরার ভটভুটিতে উঠে পড়ল।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.