একটি প্রেমের গল্প " গোলাপ "


(১)

শূন্যে ভেসে আছি।মহাশূন্যে নয়।এই মুহুর্তে আমার মাটিতে পা নেই....।

কিছুক্ষন আগে দমদম বিমান বন্দর থেকে প্লেন টা ছাড়ল।তাই প্লেন টা এখন লম্বা গ্যাস বেলুনের মতো ভেসে আছে। সাথে আমিও।এই প্রথম আকাশ পথে সফর আমার। যদিও এর আগে বাংলার বাইরে গিয়েছি,তবে সেটা ট্রেন পথে। প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে,এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছি।মনে পড়ল কথাটা।ভুলে গেলাম নাকি? ধড়ফড় করে উঠল বুকের ভেতর টা।তাড়াতাড়ি ব্যাগের চেন টা খুলে,ভেতরে হাতড়ালাম।কোথায় গেল...কোথায় গেল?
অবশেষে খুঁজে পেলাম,গোলাপ ফুল টা।লাল রঙের ফুল।তবে পাপড়ি গুলোতে লালচে রঙ আর নেই, কালচে হয়ে গেছে।মড়া পাতার মতো। তিন দিন হয়ে গেল ফুলটা,ফেলে দিতে পারি নি। সবুজ পাতা গুলো শুকিয়ে এসেছে।পুরানো হয়ে গেলে সব জিনিষেই,একটা মরচে পড়ে,কিছুটা রঙচটা হয়,তবু স্মৃতি গুলো তাদের কে চিরসবুজ রেখে দেয়।কিছুক্ষন অপলক দৃষ্টিতে গোলাপ ফুলটি কে দেখলাম।চোখের সামনে একটু একটু করে ফুল টা ঘুরাচ্ছি।সাথে আমার মাথা টিও ঘুরছে..........!
এবার আমার একটু পরিচয় দিই।
আমার নাম পলাশ বিশ্বাস।সে বিশ্বাস করুন বা নাই করুন।পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির কাছাকাছি উচ্চতা। বয়েস এখনও ছাব্বিশ পেরোই নি। হালকা ফর্সা,রোগা গড়ন,মাথায় কালো চুল।টাটা কোম্পানির অফিসে একটা সন্মানীয় পদে,তিন বছর হল চাকরী করছি।কাজ একটু বেশী থাকলেও,বেতন ভাল।প্রতিদিন অফিসের স্পেশাল বাসে,সকাল দশ টায় অফিসে ঢুকি, আবার সন্ধ্যায় সেই বাসেই বাড়ি ফিরি।বাবা আর মা কে নিয়ে ছোট্টো পরমানু সংসার।

(২)

শুভ, বাটি থেকে মাছ টা থালায় নিয়ে বলল, –"রাই, তোকে মনে হয় ভাল বাসে!"
চমকে উঠলাম আমি।আজকাল খুব চমকে উঠি। মিথ্যে বলব না,ঘুমের ভেতর ও অনেকবার চমকে উঠেছি।রাই নামটা শুনলেই চমকে উঠি। রাই,সম্বধে কেউ কথা বললে,কান খাড়া শুনি। আমার খুব ভাল লাগে। কেন লাগে? সেটা বলতে পারব না।তবে লাগে। ওর সম্পর্কে কেউ ভাল ভাল কথা বললে,মনের ভেতর আনন্দ হয়। যেন ফুল ফোটে।রামধনু ফুল। আশ্চর্য লাগল আপনাদের? রামধনু ফুল! আসলে,লাল, নীল, হলুদ,সবুজ,সব রঙের ফুল এক সাথে ফোটে। তাই আমি রামধনু ফুল বলি।তেমনি কেউ খারাপ বললে,আমার রাগ হয়। খাওয়া থামিয়ে শুভর দিকে তাকিয়ে বললাম,–"ধুর! কি যে বলিস না!"
সামনে ওকে আমি 'ধুর' বললাম,কিন্তু মনে মনে কথাটা শুনে খুব ভাল লাগল।ও যেন আরও এরকম বলে।রাই সঙ্গে আমাকে জড়িয়ে কোনো কথা শুনতে খুব ভাল লাগে।
–"কি ধুর! তোর দিকে মাঝে মাঝে কিরকম ভাবে তাকিয়ে থাকে,হাসে,তোর সাথেই তো সব থেকে বেশি কথা বলে!"
–"আরে! ওর বাড়ি আমার পাড়ার কাছাকাছি তো,তাই বলে হয়তো।"
–"তা,কি করে হবে বস! তুলির, বাড়িও তো আমার পাড়ায়,কিন্তু কই আমার দিকে তাকিয়ে ও হাসেও না।"
অফিসে এখন টিফিন আওয়ার চলছে। ক্যান্টিনের কোনের একটা টেবিল,আমার প্রতিদিন বুক থাকে। সকাল বেলা,বাড়ি থেকে হালকা টিফিন করে দুপুরের খাবার টা ক্যান্টিন থেকেই খেয়ে নিই।এখানে স্বাস্থ সম্মত,পরিষ্কার পরিছন্ন সব খাবারই পাওয়া যায়।সুলভ মূল্যে। মাছ,মাংস,ডিম থেকে শুরু করে ডাল, সয়াবিন, সবজি,রুটি সব।শুভর কথায় একটু লজ্জা পেলাম।
–"তাকালেই,একটু হেসে কথা বললেই ভালবাসা হয় নাকি?"
–"ভালবাসার শুরু হয়।"
আমার শুনতে খুব ভাল লাগছে।মন টা হালকা হচ্ছে।মনে হচ্ছে,কোনো কষ্ট,দু:খ,যন্ত্রনা নেই আমার ভেতর। কিসের চাপ অফিসে? কই কোনো চাপ নেই তো!
–"না রে, ওর মনে ও সব নেই।বন্ধু হিসেবেই কথা বলে।"
আমি গ্লাস থেকে এক ঢোক জল খেলাম।
–"ভালবাসার শুরু টা তো, বন্ধুত্ব দিয়েই হয়।"
শুভকে আমি,কোনো কথা বলে হারাতে পারছি না।আমার সব কথার বিপরীতে,একটা করে যুক্তি বের করে আনছে।হারাতে পারছি না? না,হারাতে চাইছি না? বলুক,ও যত খুশি বলে যাক।
–"সেটা ঠিক।...কিন্তু ...!"
–"আর কোনো কিন্তু নয় বস!
তাড়াতাড়ি প্রোপোজ টা করে ফেল দেখি–একটা হালকা পার্টি হয়ে যাক।"
বিষম খেলাম।শুভ,জলের গ্লাস টা এগিয়ে দিল আমার দিকে। প্রোপোজ! মাথার মধ্যে সব তালগোল পাকিয়ে গেল।বেসিনে গিয়ে হাত– মুখ ধুয়ে নিলাম।রুমালে মুখ মুছতে মুছতে শুভর দিকে তাকিয়ে বললাম,–"ও সব ভাই,আমার দ্বারা হবে না।প্রোপোজ শব্দটা শুনেই আমার, কেমন মাথা ঝিমঝিম করছে।"
–"সব হবে।ভালবাসা মানুষ কে সাহসী করে।"
দার্শনিকের মতো একটা ডায়ালোগ ঝাড়লো শুভ।ও এসব ভাল পারে। শুভ কে যে,কেন অফিসের বেশিরভাগ মেয়েরা পাত্তা দেয় না– সেটা মাঝে মাঝে আমার ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।অতিরিক্ত ওভার স্মার্ট,না মেয়েরা কোনো সাহয্য নিয়ে গেলেই–হাঁ করে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকে বলে। তবে প্রেম সম্পর্কে যে,ওর ফান্ডা আছে সেটা আমি ভালরকম জানি।

(৩)

সন্ধ্যা ছ'টা বেজে গেছে।অফিসের বাসে বসে আছি।গড়াতে গড়াতে বাসটি চলছে।
–"কি খবর,আজ এত চুপ চাপ বসে আছিস! মুড অফ নাকি?" রাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।হাসলে ওর দাঁত গুলো দেখা যায়। সাদা,ঝকঝকে।সুন্দর ভাবে, পরিপাটি করে সাজানো দাঁত গুলো। অফিস শেষে আমি আর রাই,এক সাথেই অফিসের বাসেই ফিরি। এক সাথেই নামি। তারপর দু'জন রাস্তার দু'প্রান্তের দিকে চলে যাই।চলে যাওয়ার আগে রাই আমার দিকে তাকিয়ে,একবার হাসে তারপর বলে,আজ,বাই রে! কাল আবার দেখা হবে।
রাই ফর্সা,মাথায় ঘন কালো চুল।বয়েস আমার কাছাকাছি। দেখতে খুব সুন্দর।আর ওর হাসিটা সবকিছুর থেকে সুন্দর।হাসলে গালে টোল পড়ে। যখন হাসে,মনে হয় বিশ্ব জুড়ে যা কিছু সুন্দর জিনিষ আছে–রাই এর হাসির কাছে সে সব তুচ্ছ,যৎসামান্য। ঈশ্বর যে কি দিয়ে মেয়েদের এই হাসি বানিয়েছে! কোনো কিছুর সাথে এর তুলনা হয় না।অতুলনীয়!
বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। রাই এর কথায় ওর দিকে ঘুরলাম।–"তোর ডেট অব বার্থ টা কবে বলবি?"
আচমকা আমি যেন ফিজিক্স থেকে,থেকে সোজা হিস্ট্রি তে চলে গেলাম।আমার প্রশ্নে রাই অবাক হয়ে আমার দিকে চাইল।তারপর বলল,–"কেন? আমার ডেট অব বার্থ জেনে তুই কি করবি?"
–"বল না! তোকে উইশ করব।"
–"পাগল একটা।বলতে পারি তবে একটা শর্তে।"
–"কি সেটা?"
–"অফিসের কাউকে বললে হবে না।তাহলে,কিন্তু সবাই আমাকে পাগল করে দেবে।"
–"ঠিক আছে। বলল না।"
–"সামনের মাসের পাঁচ তারিখ।"
আমার মাথার কম্পিউটারে ডাটা টা এন্ট্রি করে নিলাম।
–"দেখিস,মুখ ফসকে বলে ফেলিস না যেন! তাহলে কিন্তু মাথা টা ধরে নাড়িয়ে দেব।" রাই খিল খিল করে হাসল।
আমি নিশ্চুপ ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু মনের ভেতর টা হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।রাই আমার মাথা ধরবে! কথাটার মধ্যে একটা ভালবাসার গন্ধ আছে। ঠিক জায়গায় এসে,ঘ্যাঁচ করে শব্দ করে বাসটা থামল।নেমে পড়লাম দুজনে।

(৪)

গেট দিয়ে ঢুকতেই,টেউ খেলানো সবুজ মাঠ। রাস্তার দু'পাশে ফুলের গাছ,পাতা বাহার লাগানো। তারপর আমাদের ঝাঁ চকচকে বড় দোতলা অফিস।আমি অফিসে ঢুকতেই শুভ বলল,–"পলাশ,তোকে বড় বাবুর ঘরে ডেকেছে।" আমাদের অফিসের যিনি হেড,তিনি অবাঙালি। তবে অনেক দিন বাংলাতে থেকে,বেশ বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারেন।হঠাৎ আমাকে ডাকার কারন টা বুঝতে পারলাম না। কি কারন থাকতে পারে?
–"দেখ,আমাদের হিরোর জন্য নতুন কোনো ভাল খবর আছে।" চেয়ারে বসতে বসতে রাই টিপ্পনী কাটল।
–"ধাৎ! তোরা কি যে বলিস না!"
ব্যাগ টা রেখে ছুটলাম বড় বাবুর ঘরে।দরজা টা হালকা ঠেলে বললাম,–"আসব স্যার!"
–"আরে এসো....এসো।তোমার অপেক্ষায় বসে ছিলাম।দারুন খবর আছে একটা।"
"দারুন খবর", "তোমার অপেক্ষায়" শব্দ গুলো শুনে আমার মাথা ঘুরে গেল।
–"কী খবর স্যার!" কপালে কিছুটা ভাঁজ পড়ল আমার।
–"আরে! আমাদের মুম্বাই এর ব্রাঞ্চে,একজন বিস্বস্ত,সৎ দায়িত্ববান ছেলের দরকার।আমাকে ওরা ফোন করেছিল,তাই আমি তোমাকেই পাঠাবো ঠিক করেছি।একদম প্রোমোশন সহ।"
–"আমার ট্রান্সফার! মুম্বাই!"
মনের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। প্রোমোশনের জন্য কোনো আনন্দই হচ্ছে না।বার বার মনে হতে লাগল,আমি রাই কে না দেখে একদম থাকতে পারব না। আমার প্রোমোশন দরকার নেই। আমি এখানেই থাকতে চাই।রাই এর পাশে।
–"কি ভাবছো পলাশ?"
–"স্যার! আমি এখানেই থাকতে চাই।আপনি তো জানেন আমার মা–বাবা কে দেখার কেউ নেই!" এসব অবস্থায় ,অফিসার দের কাছে মা–বাবার দোহাই দিয়ে অনেক সহানুভুতি আদায় করা যায়।আমিও সেই পথ নিলাম।
–"সব জানি।
কিন্তু তোমাকে সন্মানীয় উচ্চপদে প্রোমোশন করা হবে।....ভেবে দেখ মাইনে ডবল হয়ে যাবে।"
মাথা নীচু করে রইলাম।রাই এর মুখ টা বার বার মনে পড়ছে।আমার টাকার দরকার নেই।ওখানে থাকতে পারব না আমি।
–"আচ্ছা! তুমি একটু ভাবো।তারপর আমাকে জানিও,কেমন!"
টিফিনে ক্যান্টিনে প্লেটে বসে ভাতের মধ্যে আঙুল ঘোরাচ্ছি।খিদে নেই। দু'টো জিনিষ ঘটলে আমার খিদে পায় না।খুব মন খারাপ হলে,আর খুব আনান্দ পেলে।আজ মন খারাপের জন্য খিদে নেই।শুভ আমায় চেপে ধরল।ব্যাপার টা সব খুলে বললাম।ও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল,–"দেখ,তোর যেটা ভাল মনে হয় সেটা কর।এরকম পদে কিন্তু সবাই,প্রোমোশনের সুযোগ পায় না।"

(৫)

আজ পাঁচ তারিখ।রাই এর জন্মদিন।
অফিসের কেউ জানে না।শুধু আমি জানি। সকালে আসার পথে একটা গোলাপ ফুল কিনে এনেছি।লাল রঙ।অফিস থেকে ছুটির পর,ফুল টা ওর হাতে দেব, তারপর 'ভালবাসি' কথাটা জানাবো।আগাম সবকিছু প্লান করে রেখেছি। ক্যান্টিনের কোনের টেবিল টা তে বসে আছি, আমি আর রাই।ও আজ বাড়ি থেকে টিফিন আনি নি। রাই নিজেই খাবারের অর্ডার দিয়েছ। কিছুক্ষনের মধ্যেই চলে আসবে। একটু মনমরা দেখাচ্ছে কি? সেরকমই তো মনে হচ্ছে!
–"রাই,তোর মুড অফ নাকি?এটা ঠিক নয়,তোর জন্ম দিন কিন্তু আজ।"
জন্মদিন কথা টা আস্তে করে বললাম।কেউ যাতে না শুনতে পায়।
–"না,সেরকম কিছু নয়।একটু টেনসনে আছি।" রাই হাসল।
–"টেনসন! কিসের টেনসন!"আমি ওর দিকে সামন্য ঝুঁকে পড়লাম।
রাই হেসে কথা শুরু করল।–"আর বলিস না! আমার ঠাকুমা চুরানব্বই নট আউট।এখন তার নাতজামাই দেখার শখ হয়েছে।বিয়ে করতেই হবে।"
সে তো ভাল কথা।আমি তো তোকেই বিয়ে করতে চাই।–কথাটা বাইরে বের করতে পারলাম না। মুখের ভেতরেই থেকে গেল। হেসে বললাম, –"এর জন্যে টেনসনের কি আছে!"
–"তুই তো জানিস,আমরা ব্রাহ্মন। তাই ব্রাহ্মন ছেলেই দরকার।"
চমকে উঠলাম আমি।বিদ্যুতের শক খেলে যেমন হয়। –"এ যুগে এসেও ,তুই এই সব মানিস?"
–"না রে,আমি এসব কিছু মানি না। কিন্তু মা– বাবা কিছুতেই মানবে না। আর আমি বাবা–মা কে দ্বিতীয় বার কষ্ট দিতে চাই না।তুই জানিস না,– আমার দিদি,বাবা–মার অমতে গিয়ে অন্য কাস্টের ছেলেকে বিয়ে করেছিল।খুব কেঁদেছিল সেদিন বাবা।আমার দেখ খুব কষ্ট হত।বাবা–মা কে কষ্ট দিয়ে,কখনো সুখী থাকা যায় না!"
একটানা কথা বলে রাই থামল।ওর মুখটা খুব ভার লাগছে।ভাতের প্লেট এসে গেছে।কি বলব আমি?সব গুলিয়ে যাচ্ছে।দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন।তবুও হেসে বললাম,–"ভাল তো!একটা ব্রাহ্মন ছেলে দেখে বিয়ে করে নে।"
শেষের দিকের শব্দ গুলো বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এল আমার।
–"তাই ভাবছি।বাবা–মা, ছেলেও একটা দেখে রেখেছে।জানি না কি আছে ভবিষৎ এ। "
রাই হাসার চেষ্টা করল।ফ্যাকাসে হাসি।

(৬)

অতিরিক্ত টেনসনে মানুষের ঘুম হয় না।আমার ও সারা রাত ঘুম হল না। উশখুশ করে কাটল। ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি, চোখ লাল হয়ে গেছে।
সকাল দশটায় অফিসে ঢুকে,সোজা দোতলায় চলে গেলাম।দরজা টা হালকা করে ঠেললাম। –"আসব স্যার!"
–"ইয়েস। ওহ পলাশ!...বলো,কি ভাবলে?"
–"আমি রাজী মুম্বাই যেতে।আপনি ব্যবস্থা করুন।"
–"গুড বয়।লেটার তো রেডি আছে, শুধু তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।আর এখুনি তোমার অনলাইনে প্লেনের টিকিট বুক করে দেওয়া হচ্ছে।"
একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম।
ক্যান্টিন টা আজ ফাঁকা ফাঁকা।শুভ কয়েক দিন আসছে না।ছুটি নিয়েছে। রাই ও আজ আমার সাথে বসে আছে।ক্যান্টিনের সুজিত দা কে ডেকে, মাংস ভাতের অর্ডার দিলাম।টেবিলের উপর আঙুল বাজাতে বাজাতে বললাম, –"একটা ভাল খবর আছে।"
রাই আমার দিকে তাকালো।চোখে–মুখে জিজ্ঞাসা লেগে আছে।–"কি খবর রে!"
–"আমি চলে যাচ্ছি।কালই।মুম্বাই নগরী তে।"
রাই অবাক হল।ভাতের প্লেট আর মাংস চলে এসেছে।রাই একটু মাংসের ঝোল ভাতের উপর নিয়ে বলল,–"এই যে,সেদিন বললি যাবি না। আজ আবার উলটে, ডিগবাজি খেলি!"
–"ভাললাম,এখানে থেকে আর কি হবে! একটু মুম্বাই ঘুরে আসি।"
–"তোর বাবা–মা কে,দেখাশোনা করবে কে?"
–"কারও জন্যে কিছু আটকে থাকে না রে। কলেজে, পড়ার সময় হোস্টেলে ছিলাম,–তখন কে দেখত?"
–"ওহ।তবে,তুই চলে গেলে,আমার খুব মন খারাপ করবে। তোর মন খারাপ হবে না?
কোনো দিকে না তাকিয়ে গোগ্রাসে ভাত গিলছি। জবাব দিলাম,–"না,হবে না"
–"তবে কাঁদছিস কেন তুই?"
–"কই,কাঁদছি? খুব ঝাল হয়েছে মাংসের তরকারি তে।তাই মনে হয় চোখে জল এসছে!"
–"ওহ!"
রাই আর প্রশ্ন বাড়ালো না।আমার দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকল।
পরদিন সকালে ব্যাগ পত্তর নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।হাওড়া থেকে ট্যাক্সি ধরে সোজা দমদম বিমান বন্দর।এই মুহুর্তে প্লেনের ভেতর বসে গোলাপ ফুল টাকে চোখের সামনে ঘোরাচ্ছি। রাই কি বুঝতে পেরেছিল,আমি ওকে ভালবেসে ফেলছি? মেয়েরা এসব ক্ষেত্রে খুব সমজদার। একটা সিক্স সেনস কাজ করে,ওদের।গোলাপ টা,মরে থাকা পাখির মতো নেতিয়ে গেছে।সেদিন ফুলটা আর রাই এর সামনে বের করেনি। ফেলেও দিইনি।সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি।চোখটা কেমন ঝাপসা করে এল। এক বুক শূন্যতাকে আঁকড়ে,শূন্যে ভেসে আছি।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.