একটি ছোটগল্প " হট প্যান্ট "




গল্পটি সম্পর্কে  : মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় লেখক দের লেখা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে লিখতে।এ গল্পটিও তেমনি আমার প্রিয় লেখক প্রচেত গুপ্তের একটি গল্প থেকে অনুপ্রানিত।শুধু অনুপ্রানিত বলবো না, অনেকাংশে প্লটের মিল আছে।তবে গল্পের বিষয় বস্তু সম্পুর্ন আলাদা। তাই ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই লেখাটা লিখলাম।

গল্প পড়ূয়া ফেসবুক পেজ ঃ http://www.facebook.com/golpoporuya

(১)

বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিরি গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরম।দিনের বেলা যে খুব সূর্যের তাপ, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।তবুও হাঁসফাঁস করে দিন কাটাতে হচ্ছে।বৈশাখের শেষ। আম– কাঁঠাল পাকার পরিবর্তে পচে যাবে বেশি।বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক দেরি।এবছর বৃষ্টি আসবেও কিনা,তাতেও সন্দেহ আছে।বাংলার আবহাওয়া বর্তমান অবস্থা,এমন হাস্যকর যে, কোনো কিছুই সঠিক ভাবে বলতে পারেন না আবহাওয়া দপ্তর।
রাত দশটা বেজে গেছে।গরম কালে এটা কোনো ব্যাপার নয়।বিশেষত শহরের দিকে তো এটা অনেকটা সন্ধ্যা নামার মতো ব্যাপার।ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে।একটা টেবিল ফ্যান ও আছে কিন্তু তাতেও গরম কাটছে না।টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে রমেন বাবু, একটা ধুতি পরে খালি গায়ে বসে স্কুলের খাতা দেখছেন।মাঝে মাঝে টেবিল ফ্যানটা টা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছেন।
একটা হাইস্কুলে পড়ান রমেন বাবু।পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়েস।মাথায় সাদা কালো চুলে ভরা। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা।মুখেও সাদা রঙের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে ভর্তি।একটা মাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এই মাস পাঁচেক হল।মেয়ে পছন্দ করেই,বিয়ে করেছে।রমেন বাবু কোনো জোর করেন নি।আজকাল কার মর্ডান যুগের মেয়ে, তার উপর একটি মাত্র সন্তান তার।প্রথমে একটু জেদাজেদি করলেও,পরে মেয়ের জেদের কাছে হার মানেন।খাটের উপর বসে একমনে অনিমা দেবী টি.ভি তে হালকা আওয়াজে সা রে গা মা পা দেখছেন।অনিমা, রমেন বাবুর স্ত্রী।চল্লিশের কাছাকাছি বয়েস।রমেন বাবু যখন বিয়ে করেন, তখন অনিমা দেবী ক্লাস টেনে পড়তেন।ফ্রক পরে নাকি স্কুলে যেতেন।এসব অনেকদিন আগের কথা।
হঠাৎ ঘরের কলিং বেল টা বেজে উঠল।প্রথমে রমেন বাবু ভাবলেন,পাড়ার ছ্যাদোড় ছেলে গুলোর কাজ।পড়ে ফিরছে,আর এমন রামপাকামি করছে।কিন্তু না, আরও দুবার বেজে উঠল কলিং বেল টা।দরজায় ও ধাক্কার শব্দ হল বার কয়েক।বিরক্ত হয়ে অনিমাদেবী উঠে পড়লেন।
-"এত রাতে আবার কে এল! তুমি বসো,আমি দেখে আসি।"
মিনিট তিনেক পর অনিমাদেবী ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা ব্যাগ। আর পাশে যিনি সাদা সাদা দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছেন,তাকে দেখে রমেন বাবুর কলম থেমে গেল।ভুত দেখলেও তিনি বোধ হয় এতটা অবাক হতেন না।যতটা তিনি মায়ের পাশে, মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এই মুহুর্তে অবাক হলেন। কেনই বা হবেন না! এত রাতে যদি মেয়েকে দুটো বড় বড় ব্যাগ নিয়ে বাপের বাড়ি আসতে দেখেন,তাহলে সব বাবারাই অবাক হয়। খাতা,পেন বন্ধ রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,-" কি ব্যাপার শর্মি! হঠাৎ এত রাতে কাউকে না জানিয়ে ?
আবদুরে গলায় মা' শব্দ করে,শর্মি অনিমাদেবী কে জড়িয়ে ধরলেন।তা তো ধরবেই! সেই ছোটো থেকে রমেন বাবু তার মেয়ের এই অভ্যাস টা দেখে আসছেন।মেয়েদের যত, আবদার, অন্যায়ের প্রশয় তো ওই যায়গায় লুকিয়ে।
–" বারে রে! তুমি কেমন লোক গো, নিজের বাড়ি তে ও মেয়ে আসতে পারবে না?তোমার পারমিশন নিতে হবে?" অনিমাদেবী মেয়ের মাথায় হাত বোলালেন।
তাও ঠিক,রমেন বাবু কথাটা বলে ঠিক করেন নি, সেটা বুঝতে পারলেন।এ বাড়ি তো তার একার নয়! যখন খুশি তার মেয়ে এ বাড়িতে আসতে পারেন।কিন্তু তাই বলে এত রাতে?আবার সাথে বড় বড় দুটো ব্যাগ।কিছুতো একটা গোলমাল পাকিয়েছে।নইলে জামাই কে ছাড়া ও তো বাবার কাছে আসা মেয়ে নয়।আপাতত গত চার মাসে তো সেরকমই দেখে এসেছেন। অনিমাদেবী, মেয়েকে নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন।মা ও মেয়ের হাসির শব্দ এল রমেন বাবুর কানে। তিনি শুধু বিরক্ত হয়নি,তার রাগ ও হচ্ছে।চারিপাশের পরিবেশ টা একটু একটু করে ঠান্ডা হতে শুরু করলেও, কপালে তার ঘাম জমতে শুরু করেছে। কপাল থেকে গড়িয়ে মুখের উপর পড়ছে। চেয়ারে বসে টেবিল ফ্যান টা আরও মুখের কাছে আনলেন।টেবিলের উপর ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাস টা হাতে নিয়ে ঢক ঢক করে সব টা খেয়ে নিলেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে ঘরের ভেতর পায়চারি শুরু করে দিলেন। একবার বার চেয়ারে বসছেন,একবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছেন।খুব অস্বস্তি হচ্ছে তার।কিছুতেই উদ্ধার করতে পারছেন না,মেয়ের এত রাতে চলে আসার কারন!জামাইকে একবার ফোন করবেন? না,সেটাও ঠিক হবে না।যদি খারাপ ভাবে! মেয়ে বাপের বাড়ি গেলে,বাবা তার কারন জানতে চায়,–যদি জামাই এরকম ভাবে,তাহলে বিশ্রী একটা লজ্জার ব্যাপার ঘটে যাবে। তার থেকে ফোন না করাই ভাল। সকাল টা হোক,তার পর মেয়েকে ধরবেন।


(২)

অনিমাদেবী এসে ঘরে ঢুকতেই,রমেনবাবু আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না।–" কি ব্যাপার বলোতো! কাউকে না জানিয়ে শর্মি এভাবে চলে এলো? জামাইয়ের সঙ্গে ঝামেলা–টামেলা হয়েছে নাকি?
অনিমাদেবী দরজার ছিটকিনি আটকাতে আটকাতে বললেন,–" আমি কি বলবো বলো? তুমিও যেখানে ছিলে,আমিও সেখানে ছিলাম।ও বাড়িতে কি ঘটছে,সেটা বুঝব কি করে?"
স্ত্রীর মুখে হাসি দেখতে পেলেন।এ হাসি তার খুব চেনা।বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছেন।যখন তার থেকে কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করেন তখন ঠিক এই হাসিটা হাসেন।এই মুহুর্তে ঠিক সেরকম হাসলেন।
–" না মানে, এতক্ষন তো মেয়ের ঘরে ছিলে, মেয়ে কিছু বলেনি?" রমেন বাবু গলাটা একটু শান্ত করে আবদুরে সুর তুললেন।
–" না। কাল সকালে তুমিই জিজ্ঞেস কর।"
এমন ভাবে কথাটা অনিমাদেবী বললেন,তাতে কিছুটা সন্দেহ হল রমেন বাবুর মনে।মনে হল, মেয়ের মা সব জানে,কিন্তু কিছু বলতে চাইছে না।মা আর মেয়ে যদি এক দলে হয়ে যায়,তাহলে সে বাড়িতে বাবার অবস্থা 'ছেড়ে দে মা,কেঁদে বাঁচি' হয়।খাটের উপর বিছানা টা ঠিক করতে করতে অনিমাদেবী বললেন,–" এক মাস পর মেয়ে বাড়ি এসেছে, কোথায় সে ভাল আছে কিনা জিজ্ঞেস করবে,– তা না করে,রাত দুপুরে গোয়েন্দাগিরি শুরু করেছে।"
সত্যিই তো!খুব ভুল হয়ে গেছে। মেয়ে আসার পর থেকে একবারও সে কথা জিজ্ঞেস করেন নি রমেন বাবু।পরিস্থিতির চাপে বেমালুম ভুলে গিয়েছেন।আর ভুল টা ছোটো খাটো নয়, মারত্মক রকম বড় ভুল।এরকম কোনো বাবা কখনো করে! কি ভাবছে তার মেয়েটা এখন? একবার মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখবেন?–না থাক! ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়।আর এখন গিয়ে ভাল আছিস কিনা, জিজ্ঞেস করলে অভিমানে কথা বলা তো অনেক দূর,–ফিরেও তাকাবে না।তার থেকে সকালে জিজ্ঞাসা করা ভাল।

পরীক্ষার খাতা দেখতে আর ইচ্ছে হল না রমেন বাবুর।এরকম অবস্থায় কারও হবার কথা নয়। ঘরের লাইট টা অফ করে দিয়ে স্ত্রীর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি।

(৩)

–"মা,আরেকটু চাউমিন দিয়ে যাও!"
বারান্দায় চেয়ারে বসে হাঁক পাড়ল শর্মি।শর্মির বয়েস বেশী নয়, তেইশ পেরিয়ে চব্বিশে পড়ল দু'মাস আগে। উচ্চতা পাঁচ ফুট দু'ইঞ্চি। চিকন, ফর্সা শরীর।বাচ্চা,বাচ্চা টাইপের গলু গলু মুখ টি অতি সুন্দর।বিয়ে হলেও যে এখনো তার ছেলেমানুষি যাইনি,সেটা তার কর্মকান্ড থেকে বোঝা যায়।গায়ে একটা নীল গেঞ্জি আর,হাঁটুর উপর ওঠা একটা ছোটো প্যান্ট পরে চেয়ারে বসে, হাতে চাউমিনের প্লেট নিয়ে পা দোলাচ্ছে। হাত দশেক দূরে রমেনবাবু বসে আছেন হাতে পেপার নিয়ে।পেপার টা হাতেই ধরে আছেন,মন টা আছে মেয়ের দিকে।
মেয়েটা তার এখনো ছোট্টোটি আছে।এ বাড়ি এলেই এই সব ড্রেস পরবে।অনেকবার বারন ও করছে, বিয়ের পর এসব পরতে নেই; কিন্তু তার কথা শোনার মত মেয়ে ও নয়।নিজের স্ত্রী ও তার কথা কম শোনেন,মেয়েটাও ঠিক মায়ের মতো হয়েছে। মাঝে মাঝে মেয়ের দিকে আড়চোখে চাইছেন।কোনো হেলদোল নেই তার মনে। নিশ্চিন্তে মনে চাউমিন খেয়েই চলেছে।এমন ভাব যেন কিছু টি হয় নি।
অনিমাদেবী চায়ের কাপ নিয়ে সামনে আসতেই, রমেন বাবু চাপা স্বরে বললেন ,–"তুমি,কি গো! বিয়ের পর মেয়ে এই সব ড্রেস পরে,আর তুমি চুপ করে আছ?"
অনিমাদেবী মুচকি হাসলেন।চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেন।আবার অস্বস্তি শুরু হল রমেন বাবুর।কিছুতেই মেয়ের কাছে কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারছেন না। অনেক সময় পর, চা টা শেষ করে,মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,–"শর্মি,অরুন কেমন আছে?
অরুন রমেন বাবুর একমাত্র জামাই।সরকারি চাকুরে।বাবা মারা যাওয়ার পর,মাকে নিয়ে নিজের কাঁধেই সংসারের সব দায়িত্ব নিয়েছে। এরকম ভদ্র,শান্ত ছেলে এ বাজারে মেলাই ভার।
–"জানিনা।" শর্মি উত্তর করল।
অবাক হলেন রমেনবাবু।ঠিকই ধরেছিলেন,কিছু একটা গোলমাল পাকিয়ে এসেছে।
–"অরুন কে একটু সঙ্গে আনতে,পারতিস।"
–"আমি চলে এসেছি,ও বাড়ি থেকে।আর যাব না।"
আরেকটু হলে চেয়ার থেকে পড়ে যেতেন রমেনবাবু।কোনোরকমে সামলে নিলেন।বিয়ের পাঁচ মাস হয়নি,এখুনি ঝামেলা!গতকাল রাত থেকে যেটা ভেবেছিলেন,ঠিক সেটাই হল।পেপার টা চার–পাঁচ ভাঁজ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,–কারন টা কি জানতে পারি?"
শর্মি প্লেট টা নামিয়ে রেখে আবদুরে গলায় বলল,–"আচ্ছা বাবা! তুমি বল,হট প্যান্ট পরা কি দোষের?আর তাছাড়া তো আমি নিজের ঘরের ভেতরই তো পরেছিলাম।ছাদের উপর তো আর উঠিনি।"
মেয়ের কথা শুনে,রমেনবাবুর চোখ গুলো বড় বড় হয়ে গেল।নতুন বউ শ্বশুরঘরে গিয়ে হট প্যান্ট পরেছে! লজ্জায় চোখ,মুখ লাল হয়ে গেল রমেন বাবুর।কি ভাবছে ও বাড়ির মানুষ!
শর্মি বলতে থাকল,–"তোমার বেহানের এসব ভাল লাগেনি। ছেলেকে ফোন করে বলে দিয়েছে। রাতে তোমার জামাই অফিস থেকে ফিরে বলল যে আমি যেন আর কখনো এ সব ড্রেস না পরি।আমিও বললাম–কেন পরব না?বেশী কিছু বললে,তোমার মা কেও পরাবো। এরপর তোমার জামাই কি বলল জান? বলল,–সাট্ আপ! আর কিছু বলেনি।আমিও সঙ্গে সঙ্গে সাট দ্য ব্যাগ এবং ওপেন দ্য ডোর দিয়ে বেরিয়ে চলে এলাম।"
কিছুক্ষন থামল শর্মি।তার পর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,–"ঠিক করি নি মা?"
অনিমাদেবী হাসলেন।তারপর শর্মির বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন,–" ঠিক করেছিস।তোর বাবা তো আমাকে বিয়ের পর সালোয়ার কামিজও পরতে দেই নি।"
রমেন বাবু মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললেন,তার মেয়ের কান্ড শুনে। কড়া ভাষায় স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিলেন,–" তুমি আজই বিকালে, মেয়েকে নিয়ে ওদের বাড়িতে রেখে আসবে।কি ভাবছে বলোতো ওরা!"
–"সেটা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না বাবা। তোমার জামাই আমাকে না দেখলে,এক মুহুর্ত থাকতে পারে না।ভোর রাতে ফোন করেছিল। আজ অফিস থেকে এখানে চলে আসবে বলেছে, আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।আর সেই সঙ্গে আরও দু'টো হট প্যান্ট কিনে আনবে।"
খিল খিল করে হাসল শর্মি।দাঁত গুলো ঝক ঝক করছে।অনিমা দেবীও মেয়ের সাথে তাল মেলালেন। –"আমাকে একটা দিয়ে যাস।আমিও এই বয়েসে একটু পরে দেখব।"
রমেন বাবু আর বসে থাকতে পারলেন না।অসহ্য লাগছে।মা আর মেয়ের এই কান্ডের মধ্যে তিনিও এক মুহুর্ত বসে থাকতে চান না। চেয়ার থেকে উঠে ঘরে ঢুকে টি.ভি. তে নিউজ চ্যানেল টা চালিয়ে দিলেন।বারান্দা থেকে মা আর মেয়ের জোরে হাসির রব উঠল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.