ভৌতিক থ্রিলার " এম.এম.এস "


(১)

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে,চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলাম।শীতের সময়।কুয়াশা ভেঙে,রোদ রেলিং এর ফাঁক দিয়ে বারান্দায় এসে পড়ছে।আমি পা দু'টো রোদে ছড়িয়ে দিয়েছি।একটা উষ্ণ অনুভব পেলাম। কিছুক্ষন আগে কাগজওয়ালা,কাগজ দিয়ে গেছে।চায়ের কাপে,একটু করে চুমুক দিচ্ছি,আর কাগজের হেড লাইনে চোখ বোলাচ্ছি।হঠাৎ কলিং বেল টা বেজে উঠল।বিরক্ত হয়ে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে,নীচে নেমে দরজা খুলে দেখি সন্দীপ।এত সকালে সন্দীপের আগমন দেখে একটু অবাকই হয়ে গেলাম।আমাকে দেখে বলল,-"উপরে চ! একটু দরকার আছে।"
সন্দীপ আমার কলেজের বন্ধু।কাছের বন্ধু যেমন হয়,ঠিক তেমন।ও এখন সিনেমার সঙ্গে যুক্ত।না,  অভিনয় করে না।টেলিফিল্ম বানায়।অতটা পরিচিত নয়।উপরে উঠে একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে,সন্দীপ কে বসতে দিলাম।বললাম,-"ভাই, একটু বোস,আমি চা করে আনছি।"
-"আরে না,চা-টা লাগবে না।এখুনি খেয়ে আসছি আমি।" সন্দীপ বলল।
আমি চেয়ার নিয়ে বসে পড়লাম।এখানে একটু আমার পরিচয় দিয়ে নিই।আমার নাম সমীরন মজুমদার।বয়স আঠাশের কাছাকাছি।একা থাকি। বিয়ে-থা করি নি।একটা স্কুলে ক্লার্কের কাজ করি।সন্দীপ আমার দিকে তাকিয়ে বলল,-"একটা সিনেমা বানাবো।তাই তোর কাছে এই সাত সকালে আসা।"
আমি ভুরু কুঁচকে সন্দীপের দিকে তাকালাম।-"টেলিফিল্ম থেকে সোজা সিনেমা! আবার তার জন্যে আমার কাছে ছুটে আসা?"
-"হুম! একটা গল্প চাই সিনেমার জন্যে।"
আমি একটু-আধটু লেখালেখি করি।নিতান্ত শখের বসে।তবে কলেজে পড়ার সময় বেশি করতাম। এখন আর সে ভাবে লেখালেখি হয়ে ওঠে না।
-"কিরকম?"বললাম আমি।
সন্দীপ একটু নড়ে চড়ে বসল।তারপর একটু গলা খাঁকারি মেরে বলল,-" সিনেমা টির গল্পের কেন্দ্রে থাকবে এম.এম.এস।সাথে হরর থাকবে, সেক্স থাকবে.....।"
আমি সন্দীপ কে থামিয়ে দিয়ে বললাম,-"সহজ করে বল না যে, রাগিনী এম.এম.এস তুই বাংলায় বানাচ্ছিস।এত পেঁচিয়ে বলার কি আছে?"
-"না,ভাই।একটু অন্যরকম,সাথে থ্রিল ও থাকবে।" সন্দীপ বলল।
-"সাথে আবার থ্রিল! তোর জবাব নেই ভাই।তো, এই সিনেমার জন্য মুম্বাই থেকে কি সানি লিওন কে উড়িয়ে আনছিস না,বাংলায় নতুন সানি লিওনের খোঁজ পেলি?"
সন্দীপ চেয়ার একপাশ থেকে অন্য পাশে হেলান দিয়ে বলল,-"কাস্টিং এখনো ঠিক হয়নি। প্রোডিউসার পেয়ে গেছি।এখন তোর গল্প হাতে পেলেই কাস্টিং ঠিক করবো।"
-"ওহ! তবে এই কারনেই তোর আগমন।কিন্তু গল্প আর সিনেমার চিত্রনাট্য তো এক নয়!" আমি বললাম।
-"ওটা নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আগে একটা মৌলিক গল্প তো পাই!"
-"সময় লাগবে যে,ভাই।"
-"দিন সাতেকের মধ্যে কাজ টা করে দে।"
-"ও.কে.।চেষ্টা করবো।"
সন্দীপ একটা লম্বা ধন্যবাদ জানিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে চলে গেল।আমি চোখ দু'টো বন্ধ করে চেয়ারে বসে পা দোলাতে লাগলাম।হরর...সেক্স..থ্রিলার.....! হরর....সেক্স...থ্রিলার.....!

(২)

একটা সপ্তাহ কেটে গেলে।সন্দীপের চাহিদা মতো একটা গল্পও মোটামুটি লিখে ফেলেছি। আমার গল্পের পাঁচটি মূল চরিত্র।পাঁচ জনই বন্ধু। তিনটি মেয়ে এবং দু'টি ছেলে।এখন গল্পটা তোমাদের আগে শোনাই।
-"জায়গা টা খুব নির্জন,তাই না রে ঋষি?" রিমি চারি পাশে তাকিয়ে বলল।
-"এরকম নির্জন জায়গাই তো ঘোরার পক্ষে ভাল।কেমন একটা গা ছমছমে ব্যাপার থাকে।" সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে ঋষি বলল।স্নেহাও ঋষির সাথে যোগ দিল।বলল,-"ঠিক বলেছিস। এরকম জায়গা আমার ও প্রিয়।এর সাথে আরও যদি একটা ভূত ভূত ব্যাপার থাকে!"
-"তুই চুপ কর।সামনে ভূত এলে তো ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবি।" মুখ বেঁকালো রিমি।
-"অত ভয় নেই আমার,বুঝলি।এরকম জায়গা না অনেক দেখা আছে।"স্নেহা ও চেঁচালো।
একটু দূরে একটা মেহগনি গাছের নীচে রাজীব আর পিউ দাঁড়িয়ে আছে।মোবাইলে ছবি তুলছে দু'জন।এখন বেশ কিছুদিন কলেজ বন্ধ।তাই পাঁচ বন্ধু সমুদ্রে ঘুরতে এসেছে।এখনো হোটেলে উঠি নি। ব্যাগ নিয়ে সোজা ঘুরতে বেরিয়েছে। বিকেল বেলা ঘোরার পক্ষে সব থেকে আর্দশ সময়।তাই একটা বিকেল তারা নষ্ট করতে চায় না।
এদিক টা একটু নির্জন।মানুষ-জন তেমন আসে না।মানুষের হাঁটা রাস্তা দেখলেই বোঝা যায়।এ রাস্তা তেমন নয়।গাছের শুকনো ঝরা পাতায় ভর্তি।হাত চারেক চওড়া রাস্তা দিয়ে পাঁচজন হাঁটতে লাগল।দু'পাশে গাছ-গাছালির ছায়া। গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যটা মাঝে মাঝে উঁকি দিচ্ছে। বেশ কিছুটা হাঁটার পর জায়গাটা যেন আরও নির্জন হয়ে এল।পাখিদের ডাক থেমে গেল। রাস্তাটা সরু হয়ে সমুদ্রের দিকে নেমেছে বলে মনে হল পিউ র।পিউ দাঁড়িয়ে পড়ল।বলল,-"চল,এদিকে গিয়ে আর লাভ নেই।তার থেকে বরং হোটেল খুঁজি।"
রাজীব,পিউর কথা গায়ে না মেখেই বলল,-"আরে!  চল না আরেকটু। এসেই যখন পড়েছি, এদিক টা ঘুরেই যাই।"
সবাই রাজীবের কথায় সবাই মাথা নাড়ালো। ঠান্ডা জলো হাওয়া এসে গায়ে লাগছে।ওরা রাস্তা ধরে আরও নামতে শুরু করলো।নির্জনতা আরও বেড়ে গেল আগের থেকে।গাছ-গাছালি ও ঘন হয়ে এল। আরও কিছুটা হাঁটার পর একটু দূরেই সমুদ্র দেখতে পেল।সন্ধ্যা নামছে।লাল সূর্য টা একটু পরেই যেন গভীর সমুদ্রে ডুবে যাবে।
-"ওয়াও..ও...ও..ও।উফ! কি সুন্দর দৃশ্য!" ওরা পাঁচ জন লাফিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
রাজীব ফোনের ফন্ট ক্যামেরা টা অন করে বললো,-"চল! একটা সেলফি হয়ে যাক।"
একটু একটু করে কালো হয়ে আসছে চারিপাশ। হঠাৎ বাড়িটা নজরে এল সবার প্রথমে ঋষির।-"আরে দেখ, ঐ একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে।"
সবাই ঘুরে তাকালো।-"তাই তো!"
-"চল ওখানে যাই দেখি।"ঋষি বললো।
 বাড়িটির দিকে এগিয়ে গেল ওরা।বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো একলা দাঁড়িয়ে আছে বাড়ি টা।ওরা পাঁচজন সামনে গিয়ে অবাক হয়ে গেল।
-"আরে! এ তো কারও বাড়ি নয়। হোটেল।কিন্তু লোকজন তো দেখছি না! কেউ আসে না নাকি?" রিমি বিস্মৃত হল।
বারান্দার গেট খোলা।হোটেলের বারান্দায় গিয়ে উঠল পাঁচজন।-"কেউ আছেন ভেতরে?"রাজীব হাঁক পাড়লো।
কোনো উত্তর এল না।রাজীবের গলা প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।দরজা ছিটকিনি ধরে বারকয়েক নাড়ালো স্নেহা।-"ওই হ্যালো! ভেতরে কেউ আছেন?"
এবারেও কোনো সাড়া এল না।আশাহত হয়ে পাঁচজন বাইরে হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ালো। চারিপাশে দেখতে লাগলো।এখান থেকে সমুদ্রর পাড় বরাবর জনবহুল বীচ চা দেখা যাচ্ছে অস্পর্ষ্ট। সন্ধ্যা নামতে একটু বাকি।হোটেলের পেছনে দূর থেকে কেউ আসছে বলে মনে হল ঋষির।কিছু সময় পর একটা কালো,বেঁটে মতো লোক পাঁচজনের সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলো তাদের।
-"কাকু! এই হোটেলের কি মালিক থাকে না? রাজীর জিজ্ঞেস করলো লোকটি কে।
-"তোমরা কারা?"
-"বেড়াতে এসেছি।"
-"চলে যাও তাড়াতাড়ি এখান থেকে।এ হোটেলে কেউ থাকে না।"
লোকটি কথটা বলেই,হনহনিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে তার ভয়ার্ত,মুখটা কারও নজরে এড়ালো না।
-"ধুর লোকটা পাগল মনে হয়।" ঋষি কথাটা বলে আবার হোটেলের বারান্দায় গিয়ে উঠল।

(৩)

সন্ধ্যা নেমে গেছে।তবে পুরোপুরি অন্ধকার নয়। আবছায়া দেখা যাচ্ছে।
-"বা! ভালোই হল।ফ্রিতে এরকম থাকার যায়গা কোথাও পাওয়া যাবে না।"পিউ বলে উঠল।
রিমি,পিউর কথায় সায় দিল না।-"যাই বল, অচেনা জায়গায় এভাবে থাকা ঠিক নয়।আর তাছাড়া,আলো নেই, জল নেই,বাথরুম আছে কিনা তারও ঠিক নেই...!"
-"আরে টেনসন করছিস কেন? হোটেল থাকবে আর বাথরুম থাকবে না! আর আমাদের কাছে মোমবাতি,ইর্মাজেন্সী লাইট আছে। আর সমুদ্রের জল স্নান করার জন্য আর খাওয়ার জল যা আছে রাতে হয়ে যাবে,বাকি টা দিনের বেলায় ভাববো।"ঋষি একটা লম্বা বক্তৃতা ঝাড়লো।
দরজা টা জোরে ঠেলতেই ক্যাঁচ করে একটা বিকট শব্দ হল।পিউ ভয়ে রাজীবের হাত চেপে ধরল। পিউর হাত টা ছাড়িয়ে,রাজীব ব্যাগের চেন খুলে মোমবাতি আর দেশলাই বের করলো। ফস করে দেশলাই ঠুকে মোমবাতি জ্বালালো। বেশি বড় নয় হোটেল টা।তবে বেশ পরিষ্কার পরিছন্ন।ডান দিকে রিসেপসান।বাঁ দিকে উপরে ওঠার সিঁড়ি।সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো পাঁচজন। উপরে টানা লম্বা বারান্দা। সারি সারি ঘর।সামনে টা মনে হয় ফাঁকা।সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া আসছে। একটা ঘরের দরজা ঠেললো রাজীব।একটা সুগন্ধ এল নাকে। কোনো ঘরে মানুষের বসবাস থাকলে যেরকম গন্ধ আসে, ঠিক সেরকম।মনে হল কিছুদিন আগেই এই ঘরে কেউ থেকে গেছে।
পাঁচজনই বারান্দা থেকে ঘরের ভেতর ঢুকলো। মোমবাতির আলোয় পুরো ঘরটা দেখা যাচ্ছে। সুন্দর করে সাজানো।বেশ পরিষ্কার-পরিছন্ন খাট-বিছানা।মনে হয় বেশি দিন হয়নি হোটেল টা বন্ধ হয়েছে। রিমি খাটের উপর লাফিয়ে পড়ল।-"এ ঘরটা আমার।"
এ ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের ঘরে ঢুকলো ওরা। এখানে দু'টো ছোটো খাট রাখা আছে।তার পাশের ঘরে একটি খাট।ঘর গুলো বেশ সাজানো গোছানো।ওরা ঠিক করল,রিমি একা ও ঘরে থাকবে আর পাশের ঘরে স্নেহা ও পিউ। পরের টি তে ঋষি আর রাজীব।

(৪)

রাত ন'টা বেজে গেছে।বাইরে অন্ধকার পুরোপুরি।চারিদিক নিস্তব্দ।একটা অদ্ভুত নির্জনতা ঘিরে রেখেছে বাড়িটিকে।স্নেহা আর পিউর ঘরে বসে আড্ডা দিতে লাগলো পাঁচজন। ব্যাগে করে যে যা খাবার এনেছিল,সেগুলো খেতে খেতে গল্প করতে লাগলো।
-"বেশ হোটেল টা পেয়ে গেলাম। খরচ অনেক কমে গেল।"স্নেহা বলল।
-"আরে হোটেল টা বড় কথা নয়। এরকম ভাবে থাকার অভিজ্ঞাতা আর কোনোদিন পাব!"ঋষি একটা চিপসের প্যাকেট খুললো।
-"দেখ,ভাই ভূত-ফূত আমি কখনো বিশ্বাস করেনি।এখানে যদি দেখতে পাই মন্দ হয় না।" রিমি বলল।
হো হো হো করে হেসে উঠল সবাই। মনে হল সারা হোটেল টাই যেন হেসে উঠল সাথে সাথে।
-"আরে বিয়ারের বোতল গুলো আন।আমার ঘুম পাচ্ছে। খেয়েই ঘুমাবো।"পিউ হাই তুললো একটা।
ঋষি বেরিয়ে গেল।পাঁচ মিনিট পর তিনটে বিয়ারের বোতল নিয়ে ফিরে এল।একটা নিজেদের কাছে রেখে, দু'টো এগিয়ে দিল ওদের দিকে। চিয়ার্স! বলে উঠল সবাই।যখন বিয়ারের বোতল শেষ হল,তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে।রিমি উঠে ওর ঘরে গেল।-"বাই। গুড নাইট সবাই কে।
ঋষি আর রাজীবও গুড নাইট জানিয়ে নিজেদের ঘরে চলে গেল।

ঘটনাটা ঘটল সকালে।ঋষির ডাকাডাকি তে ঘুম ভেঙে গেল রিমির।বাইরে এসে বলল,-"কি রে! এত হাঁক-ডাক করছিস কেন?"
-"এটা কি রিমি?আর কে ছিল রাতে তোর সাথে, বল!"
 অবাক হয়ে রিমি বলল,-"আমার ঘরে আর কে থাকবে!"
-"একটা আননোন নাম্বার থেকে এম.এম.এস এসেছে। এই ঘরেই শুট করা।কে এই ছেলেটা? তোর সারা শরীর চষে বেড়াচ্ছে!"
-"কি বলছিস উলটো পালটা?" ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখতেই,মুখে দু'হাত চেপে পিছিয়ে গেল রিমি।
স্নেহা আর পিউ পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।তারা দু'জন ও চোখ রাখতেই অবাক হয়ে গেল।রিমি দু'চোখ বন্ধ করে রেখেছে।পরনে প্যান্টি আর টেপ।ছেলেটির মুখ দেখা যাচ্ছে না।সম্পুর্ন উলঙ্গ।রিমির সারা শরীরে ঠোঁট দিয়ে ঘষছে ছেলেটি। হাত দু'টো ফর্সা শরীরের আনাচে কানাচে।
-"তোরা দেখছিস কেন?" ফোনটা কেড়ে নিল পিউ। তার পর খাটের উপর মাথা নীচু করে বসে থাকা রিমি কে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করলো,-"কাল রাতে তুই শুধু টেপ আর প্যান্টি পরে শুয়ে ছিলিস?
পিউ উপর নীচে মাথা নাড়লো। মানে,হ্যাঁ।কাঁদতে কাঁদতে বললো,-"বিশ্বাস কর,আমি এর কিছুই জানিনা।কাল রাতে একটু ঘুমটা বেশি গাঢ় হয়ে গিয়েছিল।"
স্নেহা,রিমির কাছে গিয়ে,ওর মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিল।-"কাঁদিস না।কিছু হবে না! কিন্তু কে এই ছেলেটি?"
পরষ্পরের মুখের দিকে তাকালো সবাই।ঋষি এগিয়ে এসে সান্ত্বনা দিল রিমি কে।-"তুই চিন্তা করিস না! আমি দেখছি ব্যাপার টা। দরকার হয় পুলিশে যাব।"

(৫)

দুপুরে ওরা সমুদ্রে নামে।স্নান করে। তারপর সবাই মিলে,দুপুরের আর রাতের খাবার আনতে যায়। এই বিচ্ছিন্ন হোটেল থেকে,সমুদ্রের পাড় ধরে পনেরো মিনিট হেঁটে গেলেই,আসল সী-বীচ পড়ে।ওরা পাঁচজন সেখানে যায়।হোটেল থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়।আর রাতের জন্যে পাঁচ প্যাকেট বিরিয়ানি নেয়।সাথে বিয়ারের বোতল নিতে ভোলে না। ফোন গুলোও চার্জ করে নেয়।হোটেল থেকে বেরিয়ে ওরা হাঁটতে থাকে।গল্প করে।ওদের বাসার সামনে আসতেই সেই লোকটির সাথে দেখা হয়।গতকালের সেই কালো,বেঁটে করে লোকটি।
-"তোমরা এখনো আছো এখানে? সব মরবে তোমরা।" লোকটি বলল।
ঋষি গিয়ে লোকটিকে চেপে ধরল।-"আচ্ছা, ব্যাপারটা কি বলুন তো! আপনি এভাবে ভয় দেখাচ্ছেন কেন?"
লোকটি একটু শ্বাস নিয়ে বলতে শুরু করলো...। কিছুদিন আগে,তোমাদের মতো একটা ছেলে আর মেয়ে এখানে ঘুরতে এসেছিল।এই হোটেলের তেরো নাম্বার রুমেই ছিল।সকালে দুজনরই উলঙ্গ মৃতদেহ পাওয়া যায় ওই ঘরের খাটের উপর।কেউ খুন করে রেখে দিয়েছে। তারপর থেকে কেউ আর এই হোটেলে থাকতে পারে না।ওই মৃত্যুর পর থেকে আজব আজব ঘটনা ঘটতে থাকে। অনেকেই বলে,ছেলেটিকে নাকি তারা দেখেছে.....।
লোকটি কে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল রাজীব।-"যত সব গাঁজাখুরি গল্প!"
লোকটি ধমক খেয়ে ভয়ার্ত চোখে পালালো।
-"তোর আজকের দিনে এসব ভূত প্রেত বিশ্বাস হয়?"হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে স্নেহা কে জিজ্ঞেস করে রাজীব।
-"ধুর,একদম না।কিন্তু এই ঘটনাটা আজব লাগলো।" বলল স্নেহা।
উপরে ওঠার সিঁড়ি কাছে আসতেই থমকে দাঁড়ালো পাঁচজন।উপরের বারান্দা থেকে একটা আওয়াজ আসছে।খট খট শব্দ।অথবা,কেউ বুট জুতো পরে পায়চারি করছে উপরে।সবাই মুখচাওয়া চাওয়ি করলো।সিঁড়ি দিয়ে পা টিপে টিপে উপরে উঠতে থাকলো পাঁচজন।বারান্দায় উঠে কাউকে দেখতে পেলো না।দরজার পাল্লা টা হাওয়ায় খট খট আওয়াজ করছে।একটা দম ফেললো পাঁচ জন।রিমির রুমের সামনে গিয়ে চোখ দাঁড়িয়ে গেল সবার।এই তো সেই তেরো নাম্বার রুম! লোকটি এই রুমের কথাই তো বলেছিল!
-"রিমির এম.এম.এস এর ছেলেটি, সেই মারা যাওয়া ছেলেটি নয়তো?" ঋষি কথাটা বলে একটা সিগারেট ধরালো।
স্নেহা ধমক দিয়ে উঠল।-"চুপ কর তো।আচ্ছা আজ আমি থাকবো রিমির ঘরে।দেখি,কোন ভূতের ব্যাটা আসে?"
-"না,তোকে একা থাকতে দেবো না। আমরা দু'জন ও থাকবো।" রাজীব বলে উঠল।
-"তোরা থাকবি কেন? থাকলে পিউ থাকবে।" স্নেহা,পিউর দিকে তাকালো।-"কি পারবি না থাকতে?"
পিউ মাথা উপর-নীচ করলো।
-"আচ্ছা,সেটাই ভালো হবে।"কথাটা বলে,নিজের রুমের দিকে গেল ঋষি।ভেতরে ঢুকতেই চেঁচিয়ে সে উঠল।সবাই ছুটে গেল সেদিকে।খাটের উপর ঋষি আর রাজীবের ব্যাগ যেন,কে লন্ডভন্ড করে রেখে দিয়েছে।অবাক হয়ে গেল সবাই।দিনের বেলা তাহলে এখানে কেউ আসে নিশ্চয়!

বিরিয়ানি আর বিয়ার রাতে বেশ জমে গেল। স্নেহা আর পিউ বেশি বিয়ার খেল না।আজ মোটেই ঘুমানো যাবে না! ঘড়িতে রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। সবার চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু।স্নেহা আর পিউ উঠে সেই তেরো নাম্বার রুমে চলে গেল। রাজীব আর ঋষি চলে এল নিজেদের ঘরে।
-"কোনো অসুবিধা হলে ডাকিস?"যেতে যেতে বলল ঋষি।
মোমবাতি টা নেভাতেই একটা কালো অন্ধকারে ডুব দিল হোটেল টা।শশ্মানপুরীর মতো নিস্তব্দতা। একটু একটু করে হাওয়া বইছে।মনে হল,অশরীরী প্রেতাত্মা দের নিশ্বাস-প্রশ্বাস।দূর থেকে হু হু শব্দে ছুটে আসছে।

(৬)

সকালে রাজীবের চেঁচামেচি তে ঘুম ভেঙে যায় স্নেহার।সাথে পিউ ও জেগে ওঠে।দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে দু'জন।
-"এটা কি পাঠিয়েছিস তুই, হোয়াটঅ্যাপস এ? আবার ও একটা এম.এম.এস।দশ মিনিটের ভিডিও ক্লিপস। রাজীবের ফোনে চোখ রাখতেই, চেঁচিয়ে উঠলো দু'জন।
-"এটা কি করে হল? বিশ্বাস কর,আমি তোকে কিছুই সেন্ড করেনি। কাল রাতে অনেক জেগে থাকার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কিভাবে যেন ঘুম এসে গেল!" স্নেহা কাঁদতে কাঁদতে বললো।
রিমি ছুটে এল পাশের ঘর থেকে।চোখ রাখলো রাজীবের ফোনে।স্নেহা আর পিউ পাশাপাশি শুয়ে আছে।দু'জনই ঘুমন্ত।সেই অশরীরী উলঙ্গ ছেলেটি।ভিডিওটা এমন ভাবে করা,ছেলেটির মুখ দেখা যাচ্ছে না।স্নেহার সারা শরীরে ঠোঁট ঘষে যাচ্ছে সে। আর একটা হাত পাশের ঘুমন্ত পিউর শরীরের অলি গলি খেলে বেড়াচ্ছে। কিছু সময় পর,স্নেহা কে ছেড়ে পিউর শরীরের উপর চড়লো ছেলেটি।
রিমি বন্ধ করে দিল ভিডিও টা।ধপ করে বসে পড়লো বারান্দায়। পিউ এখনো কাঁদছে।-"কি হবে এবার!লোকটি তাহলে ঠিকই বলেছিল।এ ঐ অশরীরী ছাড়া আর কারও কাজ নয়।"
-"আমার সব যেন গুলিয়ে যাচ্ছে!" ঋষিও ধপ করে বসে পড়লো,রিমির পাশে।ফস করে একটা সিগারেট ধরালো।তারপর ধোঁয়া ছেড়ে বলল,-"আচ্ছা,আজ রাতে আমরা থাকবো এই ঘরে, দেখি কি হয়! এর শেষ দেখে ছাড়বো আমি!"
-"আর যদি ভূত হয়?"রিমি প্রশ্ন করলো।
-"সেটাও ভালো।জানতে তো পারবো,কাজ টা তার।" ঋষি সিগারেট টা ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে।
-" আর এক মুহুর্তে আমি এখানে থাকবো না।" বলল স্নেহা।চোখের জল মুছলো।
-" ভয় পাস না, আমরা দু'জন থাকবো আজ।"


দুপুরে সমুদ্র থেকে স্নান করে এল ওরা।রাজীব তোয়ালে দিয়ে চুলের জল মুছতে মুছতে বলল,-"আজ তোরা তিন জন গিয়ে খাবার নিয়ে আয়। আমরা ঘর পাহারা দেব।দেখি, কোন ব্যাটা আসে!"
ওরা তিন জন বেরিয়ে গেল খাবার আনতে।মাঝ পথে গিয়ে রিমি দাঁড়িয়ে পড়লো।-"যাহ! ফোনটা আনতে ভুলে গেলাম।তোরা এগোতে থাক,আমি এক ছুটে ফোনটা নিয়ে আসছি।"
ওরা দু'জন এগিয়ে যায়।রিমি আবার হোটেলে ফিরে এল। চল্লিশ মিনিট পর ওরা দু'জন খাবারের প্যাকেট,আর জলের বোতল নিয়ে ফিরে আসে হোটেলের দিকে।রিমি কে রাস্তার পাশে একটা গাছের নীচে বসে থাকতে দেখে।
-"কি রে,তুই গেলি না কেন?" পিউ রিমির পাশে এসে জিজ্ঞেস করে।
-"মাথা টা ঝিম ঝিম করছিল।তাই আর যাই নি।"বলল রিমি।
-"শরীর খারাপ নাকি?" স্নেহা জিজ্ঞেস করলো।
-"না! ঠিক আছি।চল,রুমের দিকে।"
ওরা তিন জন ওদের হোটেলে এসে ঢুকলো।

(৭)

একটু আগেই সন্ধ্যা নেমে গেছে। খোলা দরজা দিয়ে সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাশ ঢুকছে।ওরা পাঁচজন গল্প করতে লাগলো ঘরের ভেতর।ঋষি একটা বিস্কুটের প্যাকেট ভেঙে বলল,-" আজ দেখবো, ভূত কখন আসে?আরে ব্যাটা,সাহস থাকলে সামনে এসে লড়াই কর না!"
ঋষি ছেলেটাই এমনিতেই সাহসী। ভূত-প্রেতে কোনো বিশ্বাস নেই। রিমি হাসলো ঋষির কথা শুনে। তারপর বলল,-"তোরা গল্প কর। আমি নীচে টয়লেট থেকে আসছি।"
ফোনের ফ্লাস লাইট জ্বালিয়ে বেরিয়ে গেল রিমি। দশ মিনিট কেটে গেল।পনেরো মিনিট..... কুড়ি মিনিট। রিমি আর এল না।রাজীব হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,-"রিমি এখনো এল না কেন?"
মোমবাতি টা ধরে চার জন সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।-"রিমি,এ্যাই রিমি...।"পিউ হাঁক দেয়।
কোনো সাড়া শব্দ আসে না। টয়লেটের দিকে এগিয়ে যায় ওরা। ভেতরে ঢোকে।কেউ নেই। কিছুক্ষন আগে কেউ টয়লেট করেছেবলেও মনে হয় না।ঋষি ছুটে সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠে।সব ঘর তন্ন তন্ন তরে খোঁজে।না! উপরেও নেই। নীচেও নেই।
-"বাইরে যাই নি তো!" পিউ বলে।
হোটেলে ঢোকার দরজাটা খুলতে গিয়েই,চমকে ওঠে সবাই।বাইরে থেকে কেউ ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছে।রাজীব দরজা ধাক্কাতে থাকে।-"রিমি!" জোরে হাঁক দেয় রাজীব।
দরজা খোলে না।ভয়ে পরষ্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে সবাই।
-"কেউ আছেন বাইরে! শুনতে পাচ্ছেন?প্লিজ! হেল্প।"রাজীব দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে ভয়ার্ত গলায় চেঁচাতে থাকে।
-"ভূত আছে এ হোটেলে! মরবো এবার সব কটাই।"স্নেহা কঁকিয়ে ওঠে।
-"চুপ কর তো সবাই।"ঋষি ধমক লাগায়।
চারজন আবার উপরে ওঠে। ঘরের ভেতর ঢুকে খাটের উপর বসে পড়ে।কোথায় যাবে মেয়েটা?
সারা রাত কারও তেমন ঘুম হয় না। চারজন একই ঘরে থাকে।কোনো ভয়ঙ্কর ও কিছু ঘটে না। ভোর রাতের দিকে চোখ বন্ধ হয়ে আসে সবার।
সকাল বেলা পুলিশের ডাকাডাকি তে ঘুম ভাঙে চারজনের।রাজীব উঠে চোখ রগড়ায়।সামনে চার-পাঁচ জন পুলিশ।তার পাশে রিমি দাঁড়িয়ে। পিউ ছুটে আসে রিমির পাশে। জিজ্ঞেস করে,-"কোথায় ছিলিস তুই?"
-"একটু পরেই বুঝতে পারবি,কোথায় ছিলাম।" বলে রিমি।
দু'টো পুলিশ এগিয়ে গিয়ে ঋষি আর রাজীবের জামার কলার ধরে হিড় হিড় করে টেনে আনে। লম্বা মতো পুলিশ টা সপাটে এক চড় মারে ঋষির গালে।-"এম.এম.এস চক্র চালানো হচ্ছে? ভিডিও শুট করে টাকা ইনকাম?ইন্টারনেটে আপলোড.....চল থানায়,জামা- প্যান্ট খুলে ঠেঙিয়ে ছাল-চামড়া তুলে,তোদের সেই ছবি আমি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেব।"
ঋষির মুখ শুকিয়ে যায়।রাজীব বলে,-"কি প্রমান আছে স্যার, আমরাই এই কাজ করেছি?"
-"আবার প্রমান চাইছিস?"ঠাস করে একটা আওয়াজ হয়,রাজীবের গালে।
-"এই তুমি এদের ভিডিও টা দেখাও তো।"
রিমি নিজের ফোনটা বের করে ভিডিও টা চালায়। স্নেহা আর পিউ মুখ বাড়িয়ে দেয় রিমির ফোনের উপর।ভিডিও চালু হয়...ঋষি আর রাজীব বসে গল্প করছে।-" প্লান টা ভালোই করেছিলাম বেড়াতে আসার আগে! একদম খেটে গেছে।..........দারুন ক্যামেরা করেছিস ভাই ভিডিও টা করতে। আমার মুখটা দেখাই যাচ্ছে না।...... শুধু রিমি,স্নেহা আর পিউর মুখ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ঘুমের ওষুধ আর আছে নাকি?..... বিয়ারের বোতলের সাথে বেশ কড়া ডোজে মিশিয়ে দিতাম।সকালের আগে কারও এমনিই ঘুমই ভাঙতো না।.....তো রাতে ভাঙবে কি করে! উফ! রিমির ক্লিপস টা সুপার হট। মালটার শরীর টাও যা দেখতে না! পুরো মাখন.....হা হা হা। ধুর! পিউ আর স্নেহার সাথে, ওটা আরও হট লাগছে....এক সাথে দু'টো ..... এবার রবিন দা কে বলবি, বেশী টাকা লাগবে কিন্তু!.......আর হ্যাঁ,ওই লোক টা কে কিছু টাকা দিয়ে দিস।ভুতুড়ে গল্প বলিয়ে নিয়ে অনেক সুবিধা হয়েছে আমাদের।"
ভিডিও টা বন্ধ করলো রিমি।
-"প্রমান পেয়েছিস!" কলার ধরে হিড় হিড় করে দু'টো কে নীচে নামালো পুলিশ।তারপর রিমির দিকে ফিরে বললো,-"এই তোমরাও থানায় চলো।"
রাস্তায় যেতে যেতে স্নেহা জিজ্ঞেস করল,-"তুই এই ভিডিও করলি কি করে?"
রিমি বলতে শুরু করলো-"গত কাল দুপুরে তোদের সাথে খাবার আনতে যাওয়ার সময়, আমি যখন ফোন নিতে হোটেলে ফিরি, তখন এই কান্ড ঘটে।উপরে উঠতেই ওদের এই গল্প শুনতে পাই।আর সামনের জানালার পর্দার কাছে দাঁড়িয়ে ভিডিও করি। তারপর এত খারাপ লাগছিল যে, গাছের নীচে গিয়ে চুপচাপ বসে ছিলাম।"
-"তখন কেন,পুলিশে গেলি না কেন?"
রিমি হাসলো।বলল,-"মন টা একদম ভাল ছিল না।ওদের বন্ধু ভাবতাম। গা গুলিয়ে উঠছিল।বমি পাচ্ছিল। তারপর ভাবলাম,ওদেরও একটু ভয় দেখাই।যেন ওরাও বিশ্বাস করে, এখানে সত্যিই ভূত আছে।তাই তো সন্ধ্যায় দরজায় ছিটকিনি দিয়ে গায়েব হয়ে গেলাম।"
"বাব্বা! কি ডেঞ্জারাস তুই।"-পিউ বলল।তারপর  থানার দিকে রওনা দিল ওরা সবাই।
এই হলো মোটামুটি আমার গল্প। সন্দীপের চাহিদা মতো লেখার চেষ্টা করেছি।আর তোমাদের সবার আগে পড়ে শোনালাম।এবার সন্দীপের অপেক্ষা শুধু......!

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

"কলোনি"[ সাহিত্য, আর্ট ] ফেসবুক পেজ টি দেখতে এবং পছন্দ করতে লিঙ্কে ক্লিক করুন : https://goo.gl/Zsi6oT

No comments

Powered by Blogger.