একটি প্রেমের গল্প " পুজোর প্রেম "



—"পুজোর পাঁচ দিনে পাঁচ টা মেয়ে পটাতে না পারলে,আমার পুজোটা ভাল কাটে না রে।"
একটা গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে যেন মৃত্যু শোক প্রকাশ করল দীপ।আমার খুব হাসি পেল। যদিও প্রতি বছর এই একই ডায়ালোগ শুনে আসছি ওর মুখ থেকে। পাশ থেকে মুন টা টকাস করে বলে উঠল— "গত বছরের পুজোয় জুতোর বাড়ি টা কি এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি?"
খ্যাক করে উঠল দীপ।"— আরে ছাড় তো! মেরেছো জুতোর বাড়ি, তাই বলে কি প্রেমে আড়ি?বিসর্জনের দিনই ওই জুতোর দাগ জলে ধুয়ে দিয়েছি।"
মুন একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল,—"দেখ, এবছর বছর, আরও দুচারটে বেশি জুতো উপহার পাস কিনা! "
— "তুই কি বুঝবি রে, পাগলি! মেয়েদের জুতোর বাড়িতেও একটা প্রেম আছে। তুই কিছু বুঝিস প্রেমের? কাউকে ভালবেসে দেখেছিস কোনোদিন?"
মুন ও ছাড়বার পাত্রী নয়। বলল,—"তোদের মতো উল্লুক ছেলেদের আমার ভালবাসতে বয়ে গেছে।"
নাও শুরু হয়ে গেল, দুজনের মধ্যে। মাঝখানে আমি নীরব দশর্ক হয়ে, একবার এর মুখের দিকে, এক বার ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছি।ওই যে আরেকজন আসছে হন্তদন্ত হয়ে আসছে। দেখি কি সংবাদ এনেছে!
—"মামু, আসছে সে। আমার স্বপ্নের পরী।"
আমরা সব একসঙ্গে রনির দিকে ঘুরে গেলাম। —"কে?"
— "আছে, মামু আছে। নীল পরি। আমার মাসীর মেয়ে তার একটা বান্ধবীকে নিয়ে এবার এখানে আসছে।"
ওহ! একটা দম ছাড়লাম।আমাদের মুখের নির্লিপ্ত ভাব দেখে রনি কিছুটা দমে গেল। প্রতি বছর সেই একই কেস।চেনা নেই, জানা নেই, যাকে চোখেও দেখেনি;সেই ওর স্বপ্নের পরী হয়ে যায়। মুন,রনির দিকে তাকিয়ে বলল,—" আগে প্যান্টের চেন টা এঁটে নে ,তার পর প্রেম করিস।"
আমরা সবাই হো হো হো করে হেসে উঠলাম। রনি থতমত খেয়ে গেল,—"দেখ, মুন তোকে কতবার বলেছি ছেলেদের মাঝে থাকবি না।"
—" একশ বার থাকব। তাতে তোর কি........?"
বিরক্ত হয়ে গেলাম আমি। এদের নিয়ে আর পারব না। ছেলেমানুষি টা সেই ছোটো বেলার মতই রয়ে গেল। আমরা এই চার রত্ন একেবারে জামা, প্যান্ট না পরা থেকেই বন্ধু। বড় হয়েও আলাদা হয়নি। মুন মেয়ে হলেও আমাদের সাথে ও দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে মুন কে জিজ্ঞাসা করলাম,—"সকাল থেকে পলাশ দা, কে তো দেখছি না!"
দীপ আমার মুখের দিকে তাকাল।—"এই, পলাশ দার মাসীর মেয়ে টা আসবে তো এবার? এক বছরে না জানি কত বড় হয়েছে! "
—" হ্যাঁ, আসবে বলেছে। তোর জন্যেও নতুন এক জোড়া জুতো ও কিনে আনছে ।"— মুন, মুখ টা কতকটা বিকৃতি করে বলল।
—" উফ! এ মেয়ে টাকে আর সহ্য করা যাচ্ছে না।" বিরক্ত হয়ে বলল দীপ।
এই পুজোর কয়দিন, আমাদের এরকম ঝগড়া , খুনসুটি চলে প্রতিবছর। পুজোর দিন গুলো এই জন্যে সত্যি খুব মজার হয় আমাদের।পলাশ দা আমাদের দলের পান্ডা। তাই পলাশ দাকে সঙ্গে নিয়েই পুরো প্যান্ডেল টা সাজিয়ে ফেলেছি আলোয় আলোয়।আমাকে সব দিকেই খেয়াল রাখতে হচ্ছে।
সপ্তমীর দিনের ঘটনা। বিকালে প্যান্ডেলে এসে দেখি, তিন রত্ন আগে থেকেই বসে আছে। রনির মুখটা বাংলার পাঁচ হয়ে গেছে। আমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ,রনিকে বললাম,—" কি কেস?"
পাশ থেকে দীপ বলল,—" আর, বলিস না, ওর নীল পরী এসছে। কিন্তু ওর থেকে নাকি এক হাত লম্বা। ওকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না।"
বেচারা রনির মুখটা দেখে আমার খুব কষ্ট হল। প্রতি বছর কিছু না কিছু একটা সমস্যা ওর হবেই। দীপ আমাকে বলল,—" চ’ জয়, রনি নিয়ে একটু ঘুরে আসি। নতুন আইটেম কিছু এল কিনা?"
— "ভাট, তোরা যা। আমি তোদের মেয়ে দেখা কেসের মধ্যে নেই। কাজ আছে।"
-"হ্যাঁ ,তোরা দুই নিরামিষাশী চুপ করে বসে থাক।" বলল দীপ।
মুন হেসে উঠল। আমি মুন কে বললাম,— "তুই যা ওদের সাথে , এখানে তো আর কোনো কাজ নেই।"
— "কেন ! আমি তোর পাশে বসে থাকলে, তোর বুঝি মেয়ে দেখতে অসুবিধা হয়?"
— "ধুর।"
—" কি ধুর?"
আমি আর কথা বাড়ালাম না। জানি, কথা বলে ওর সাথে আমি পারব না।
অষ্টমী র দিন সকালে প্যান্ডেলে অঞ্জলি দেওয়ার ধুম পড়ে গেল।মুন বলল,— "চল না, অঞ্জলি দিই।"
— " তুই তো জানিস , আমি ও সব দিই না।" বললাম আমি।
—"চল না, একবার দিবি আমার সাথে। প্লিজ...."
আমি মুন কে কনুই এর গুতো মেরে বললাম,— "ঐ দেখ, দীপ টা ঠিক পলাশ দার মাসীর মেয়ের পাশেই বসে পড়েছে।"
মুন হাসল।
রনির দিকে তাকাতেই ,ওর নীল পরী তে আমার চোখ আটকে গেল। ওদের বাড়ির সবাই এক সাথে অঞ্জলি দিতে এসেছে। সত্যি! মেয়েটিকে পরীর মতো লাগছে।পুজোর এই নতুন প্রেম প্রেম আবহাওয়ায় আমার মনের ভিতর কেমন একটা শুরু হয়ে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছিলাম নীল পরীকে , ঘুম ভাঙল মুনের চড়ে।
— "উফ! মারলি কেন!"
— "কি দেখছিস ও দিকে?"
পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম,— "কিছু না।"
মুন আমার হাত ধরে টেনে, অঞ্জলি দিতে বসাল। সন্ধ্যার সময় প্যান্ডেলে আসতেই তেই দূর থেকে দেখি সেই নীল পরী বসে আছে। দীপ, রনি ও পলাশ দার সাথে বসে গল্প করছে। আমি হাল্কা করে চুলের ভেতর আঙুল চালালাম, মুখ টা হাসি করে, রজনীকান্ত স্টাইলে এন্ট্রি নিয়ে মেয়ে টির পাশে বসে পড়লাম।
— "হাই, ! আমি জয়।"
মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,— "আমি স্নেহা।"
ওহ! এত স্নেহপ্রবন মেয়ে আমি দেখেনি।গল্প করতে লাগলাম সবাই মিলে। মুনটা ও কখন এসে আমার পাশে বসেছে, আমি খেয়াল করি নি।পলাশ দার বাড়ির সবাই,ঠাকুর দেখতে এসেছে, তাই পলাশ দা উঠে পড়ল; আর সেই সাথে দীপ টা ও।ওই মাসীর মেয়ে কেস। মুন বুঝতে পেরে দীপ কে বলল,-" দুই, গালে দুটো বড় দেব দেবীর স্টিকার লাগিয়ে সামনে যাস ' পিকে' মুভির মতো। তাহলে জুতোটা আর গালে পড়বে না।"
আমরা হেসে উঠলাম সবাই। নীল পরী মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল,—"জয়, চল একটু ঘুরে আসি।"
আমি তো এই কথার ই অপেক্ষায় ছিলাম। তাড়াতাড়ি উঠতে যাব,কিন্তু মুন টা হাত টা টেনে বসিয়ে দিয়ে, মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলল,— "না, ও যাবে না। আমাদের ভেতরে আরতির কাজ বাকি আছে।তুমি রনি কে নিয়ে ঘুরে এস।"
তারপর, মুন আমাকে আড়ালে টেনে নিয়ে গেল। এদিক টা একটু আঁধার।আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,—" এটা কি হল?
—" তুই ,ওই মেয়েটির সাথে যাবি না।"
— "কেন? "
— "যাবি না, তাই জানি।"
— "কিন্তু কেন ,সেটা বলবি তো!"
মুন রেগে গেল,—"আমি বলেছি, তাই তুই যাবি না।"
—" তুই কে? মুন, পাগলামি করিস না। হাত ছাড়।"
আমি হাত টা ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। মুন, আমাকে টেনে আরও ওর কছে নিল। তারপর চকিতে দুহাতে আমার মাথাটা ধরে আমার ঠোঁঠে, ওর দুটি ঠোঁট ছোঁয়াল।
—" তুই, শুধু আমার সাথে যাবি, আমার দিকে তাকাবি; আর কারও দিকে না।"
ব্যাপার টা এত তাড়াতাড়ি ঘটল যে, আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম। চুপ করে দাড়িয়ে রইলাম। মুন ছুটে বেরিয়ে গেল।
সন্ধ্যা আরতি শুরু হয়েছে। ঢাকের বাদ্যি বাজছে। আমি অল্প আলোয় একা দাড়িয়ে মুনের মুখটা ভাবছি। ওই তো ! মুন আরতি দেখছে ওর বাবা মায়ের সাথে। আমি গুটি গুটি পায়ে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.