একটি ফ্যান্টাসি ছোটগল্প " পিকে ২ "




প্লাটফর্মের টিকিট কাউন্টার পাশ দিয়ে মেন রোডে ওঠার রাস্তার পাশে রোজ বসে থাকা চেনা ভিকিরি গুলোর দিকে চোখ পড়তেই পা টা থমকে গেল। ক্লাস টেস্টের খাতা গুলো দেখতে দেখতে আজ স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরী হয়ে গেছে। প্রতিদিন যে ট্রেনে ফিরি সেটা আজ আর পেলাম না, অগত্যা পরের চারটে কুড়ির লোকাল টা ধরতে হল। ভিকিরিদের মতো বাটি নিয়ে বসে থাকা লোকটিকে দেখে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হল। গায়ে একটা ছেঁড়া হাফ হাতা গেঞ্জি, নীচের দিকে কালি ঝুলি মাখা অর্ধেক ছেঁড়া সুট। কিন্তু চোখ গুলো যেন কেমন চেনা চেনা, মুখ, কান সব যেন চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছি যেন! গভীর ভাবে মনে করার চেষ্টা করলাম। ছবিটা মনে পড়তেই চমকে উঠলাম,
— পিকে!
সত্যিই তো! সেই পলক না পড়া বড় বড় সাদা চোখ, খাড়া খাড়া কান...গলায় সেই নীল রঙের চকচকে লকেট হার ঝোলানো। আর কোনো সন্দেহ রইল না- এ পিকে ছাড়া কেউ হতে পারে না।কিন্তু ও কলকাতায় এল কি করে? আর ভিকিরি দের মাঝে কি করছে?
ধীরে ধীরে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।হাঁটু মুড়ে বসে পড়লাম।চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলাম,- "তুমি পিকে, না?"
অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল লোকটি। বড় করে চোখ ঘোরালো।তারপর পরিষ্কার বাংলায় বলল,- "হ্যাঁ, সবাই তো তাই বলে। আগে একবার পৃথিবীতে এসেছিলাম,তো সে সময় ও সবাই পিকে বলতো।"
আমার বুকের ভিতর একটা দুরু দুরু উত্তেজনা অনুভব করলাম,—" চুপ।"
আশেপাশের দিকে তাকিয়ে ওর হাত টা ধরে টেনে তুললাম,- "চলো আমার সাথে। "
ও ভ্যাবাচাকা খেয়ে ঠিক সেই একটা হাত কাঁধ থেকে পায়ের সামন্তরালে একইভাবে স্থির রেখে অদ্ভুত ভাবে হাঁটতে লাগল।
- "দিদিভাই, ছাড়ুন।"
আর কে ছাড়ে!
- "এই তুমি বাংলাও জানো?"
— "এখানে এসে শিখতে হয়েছে। না,হলে কেউ টাকা দিতে চায় না যে।"

রাস্তা থেকে একটা ট্যাক্সি তে চেপে সোজা আমার বাড়ির গেটে নামলাম।কলিং বেল বাজালাম। মা দরজা খুলে দিল।আমার সাথে পিকে কে দেখে চিৎকার করে উঠলো।- " রিমি,এ কাকে এনেছিস?একটা পাগল কে ধরে এনেছিস কেন?
- "না মা! পাগল নয়। ও পিকে। "
- "পিকে! "কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে তাকাল রিমির মা।
ঘরের ভেতর ঢুকে,ওকে বাথরুম টা দেখিয়ে দিয়ে বললাম,— "যাও, ওর ভেতরে জল, টাওয়েল আছে চোখ, মুখ, হাত,পায়ে জল দিয়ে মুছে নাও।"
ও বাথরুমে ঢুকে যেতেই, আমি আমার বেডরুমে ঢুকে ড্রেস টা পালটে নিলাম। মনে মনে যেন কেমন একটা আনন্দ হচ্ছে! ভিনগ্রহের একটা প্রানী আজ আমার ঘরে, আমার সাথে।ড্রেস পালটে সোফায় এসে বসলাম।পাঁচ মিনিট ধরে সোফায় বসে আছি, ও এখনো বেরোচ্ছে না। ডাকতে যাব বলে সবে মাত্র বাথরুমের দরজার দিকে তাকিয়েছি,দেখি পিকে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হাতে টাওয়েল টা নিয়ে।চোখ বন্ধ করে খুব জোরে চিৎকার করে উঠলাম,— "ধাৎ তেরি! টাওয়েল টা আগে কোমরে জড়িয়ে নাও। উফ! কি আজব রে! "
ও ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি টাওয়েল টা কোমরে জড়িয়ে নিল।- "দিদি ভাই! পরার কিছু পায়নি।"
— "আচ্ছা ঠিক আছে।"
এ বাড়িতে ছেলে বলতে একা আমার বাবা। আলমারি থেকে বাবার একটা সুট আর জামা বের করে ওকে পরতে দিলাম। ও সোফায় বসল। মা জলখাবার নিয়ে এল।খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, - "তুমি তো তোমাদের গ্রহে চলে গিয়েছিলে তো আবার এলে কেন?
মুখটা যেন বিষন্ন হয়ে গেল পিকের।চোখের কোনে যেন একটা জলের রেখা চিক চিক করে উঠল তার।সেটা আমার চোখ এড়ালো না।মুখটা বোকার মতো এদিক- সেদিক ঘোরাতে লাগলো। তারপর বলল,- "আমি ফিরে গিয়েও থাকতে পারেনি,সারাক্ষন ওই মেয়েটির কথা মনে পড়ত, ওকে খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম।তাই ওর টানেই আবার এসেছি। ওকে এবার সাথে করেই নিয়ে যাব।
অবাক হয়ে গেলাম আমি।
- "তুমি ভালবাসার টানে,তোমাদের গ্রহ থেকে আমাদের গ্রহে চলে এলে?"
- "হ্যাঁ, দিদিভাই।"
— "কিন্তু তুমি কলকাতায় এলে কি করে?"
- "ভুল করে এসে পড়েছি। কত চেষ্টা করলাম দিল্লী যাওয়ার কিন্তু ট্রেন থেকে একটা কালো কোট পরা লোক নামিয়ে দিল। বলল,- দিল্লী যেতে টিকিট লাগবে।"
- "আর ওখানে ভিকিরিদের মধ্যে নোংরা জামাকাপড় পরে বসেছিলে কেন?"
- "কলকাতায় নেমে প্রথমে,ড্যান্সিং কার খোঁজ করলাম, কিন্তু পেলাম না। তাই জামা কাপড় ও টাকাও জুটলো না। তারপর রাস্তার ধারে দেখি একটা অন্ধ থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে,আমি ওর থালা থেকে টাকা গুলো উঠিয়ে নিলাম —সেই প্রথমবার পৃথিবীতে এসে যেমন নিয়েছিলাম। কিন্তু এবার লোকটি ছুটে এসে আমাকে মারতে শুরু করল। বুঝলাম,—এ ব্যাটা অন্ধ নয়। কোনোরকমে ওখান থেকে পালিয়ে বাঁচি। তারপর ওই প্লাটফর্মের পিছনে,এই ছেঁড়া গেঞ্জি আর সুট টা খুঁজে পাই।"
আমার খুব হাসি পেল ,— ড্যান্সিং কার কথাটা শুনে, —" তারপর?"
- "খাওয়ার জন্যে হাতে টাকা, পয়সা নেই। দিল্লী যাওয়ার টিকিটের ও অনেক দাম। হঠাৎ দেখলাম,প্লাটফর্মের বাইরে ওই লোক গুলো বসে আছে,আর সবাই টাকা দিয়ে যাচ্ছে।আমিও ভাবলাম, বাহ! বসে বসেই টাকাও ইনকাম করা যায়!.....তাই বাটি হাতে ওখানে বসে পড়লাম।"
হো হো হো হো করে হেসে উঠলাম আমি।
- "তুমি আমাদের দেশে কত পপুলার জানো? তোমার রং নাম্বার সবার মনে গেঁথে গেছে, আর তুমিই বসে ভিক্ষা করছ? এবার থেকে তুমি আমার কাছে থাকবে।"
- "সে আমি জানি না দিদি ভাই।আমি শুধু ওই মেয়েটির কাছে যেতে চাই? "
ওর বাচ্চাদের মতো করুন মুখটির দিকে তাকিয়ে আমার মন টা কেমন হয়ে গেল। সত্যি কথাটা বলে দিলাম,— "মেয়েটি তো তোমার ভাল বন্ধু ছিল,আর ও বন্ধুর মতোই তোমাকে ভালবাসত। তুমি চলে যাওয়ার পর, মেয়েটি তো তার বয়ফ্রেন্ড কে বিয়ে করে নিয়েছে।"
জলভরা চোখটি নিয়ে ও এদিক ওদিক তাকাতে লাগল পিকে। ওর চোখ দিয়ে যেন রামধনু রঙের জল গড়িয়ে পড়ছে। গলার কাছ টা কাঁপছে, মনে হয় ভেতরে ভেতরে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছে। এই প্রথম চোখের সামনে বসে এলিয়েনের কান্না দেখছি।তাও আবার ভালবাসার জন্যে। ভালবাসা বোধহয় শুধু এই পৃথিবীর প্রানীর মধ্যে নেই, হয়তো সারা বিশ্ব সংসারের কোনায় কোনায় ছড়িয়ে আছে। ওর পাশে গিয়ে হাত টা ধরে সান্ত্বনা দিলাম। ও বাচ্চা দের মতো মুখ গুমরে গুমরে কাঁদতে লাগল।

পরদিন রবিবার ,তাই স্কুল ছুটি। পিকে কে সাথে নিয়ে ঘুরতে বেরোলাম,— যদি ওর মন টা একটু হাল্কা হয়। বেরোনোর আগে বুঝিয়ে দিলাম, চোখের পলক ফেলে কথা বলবে, আর হাত দুটো স্থির রেখে হাঁটবে না,—তোমাকে যেন কেউ চিনতে না পারে। আর ওর লকেট টা খুলে আমার আলমারির মধ্যে সযত্নে রেখে দিলাম। বাসের সিটে ওকে পাশে নিয়ে বসলাম। ফোনটা বের করে ভাবলাম ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিই। না! থাক, সবাই জেনে গেলে ঝামেলা হতে পারে।চ্যাটে বন্ধুদের কেও জানালাম না।
- "দিদিভাই ওটা কি? কি করছ?" প্রশ্ন করলো পিকে।
- "এটা,হল ফোন। ফেসবুক করছি। হ্যাঁ, আর একটা কথা,এবার থেকে তুমি আমাকে রিমি বলে ডাকবে।"
- আচ্ছা।রিমি, ফেসবুক কি ?কোনো বই টই নাকি।এখানে আসার পর রাস্তার পাশে কুড়িয়ে পাওয়া কয়েকটা বই পড়েছিলাম।বেশ মজাদার।"
— "ফেসবুক হল,সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। বন্ধু, পরিজন সবার সাথে কথা বলা যায় এখানে। ফেসবুকে আমার প্রায় শ'পাঁচেক বন্ধু ও আছে।"
ও আমার ফোনের উপর চোখ দুটো বড় করে মুখ বাড়াল,-" কই! কোথায় বন্ধু? দেখতে পাচ্ছি না তো! "
- "আরে বোকা! এখানে দেখা যায় না কাউকেও। শুধু যোগাযোগ রাখা যায়।"
- "তাহলে, সে বন্ধু হবে কি করে? যাকে চেনোনা, দেখোনি সে কিভাবে বন্ধু হবে? বন্ধু মানে তো একসাথে বসে কথা বলা,আড্ডা দেওয়া, ঘুরে বেড়ানো।"
কি উওর দেব ভেবে পেলাম না। বাস থেকে নেমে এখন ফুটপাত দিয়ে হাঁটছি।হাঁটতে হাঁটতে ফেসবুক সম্পর্কে পুরো ব্যাপার টা ও কে বোঝালাম।ও বুঝেও গেলো।তারপর বলল,- " সেদিন দেখলাম ছেলে মেয়েরা একসাথে বসে আছে প্লাটফর্মে, অথচ কেউ কারও সাথে কথা বলছে না, সবার চোখ আর হাত ফোনের উপর।"
- "হা হা হা হা...ওরা সব আমার মতো ফেসবুক করছিল, হয়তো।"
- কলকাতায় আসার পর থেকে, প্রতিদিন চোখে পড়ত, -বাবার বাইকের পিছনে চেপে যাচ্ছে মেয়ে গুলো,আর ফোনে কি সব টেপাটিপি করছে।"
ওর কথা গুলো শুনলেই কেমন হাসি পায়। বললাম,— "ওরাও, এই একই কেস। অনেকে আবার অচেনা প্রেমিকের সাথেও কথা বলে।"
হো হো হো করে হেসে উঠল পিকে।বলল- "ফেসবুকে ভালবাসাও হয় নাকি?"
- "হ্যাঁ, হয়তো! কেন হবে না?"
- "চেনা মানুষ কে তাই, বোঝা যায় না, সে ভাল না খারাপ?আর, অদেখা, অচেনা মানুষ কে কি করে বিশ্বাস কর তোমরা?"
— "পিকে! এটা আমিও বুঝতে পারি না।"
ও একের পর এক বলতে থাকে,
—"আমাদের গ্রহে ভালবাসা মানে নির্মল আনন্দ। সেখানেও ছেলে মেয়ে একে অপরকে ভালবাসে, হাত ধরে ঘুরতে যায়,সবুজ ঘাসের মাঠে বসে গল্প করে, ঝরনা দেখে,সূর্যাস্ত দেখে...তারপর যে যার বাড়ি ফিরে যায়।"
- "আচ্ছা, তোমাদের গ্রহে ভালবাসা মানে দু:খ নয়?"
— "হ্যাঁ, অনেকে দু:খ পায়। যারা কারও ভালবাসা পেয়ে ও ছেড়ে দিয়ে আরও ভালকিছুর সন্ধানে যায়- তারাই দু:খ পায়। তবে কেউ ভালবেসে প্রতিহিংসা, প্রতারনা করে না। আমি ও তো ঠিক এই কারনেই আজ দু:খ পেলাম।"
আমরা এখন ময়দানের সবুজ ঘাসের উপর বসে আছি। ওর রং নাম্বার পরিচয় আমরা আগে পেয়েছি,কিন্তু সত্যিকারের প্রেমিকের রূপ এই প্রথম দেখলাম। দূরে একদল ছেলেমেয়ের দিকে হাত দেখিয়ে বলল,
- "ওই দেখ, ওরাও হয়তো ফেসবুকে নেশাক্ত। এরা মনে মনে ভাবছে, আমার অনেক বন্ধু আছে! কিন্তু এদের কেউ নেই। এরাই সব থেকে বড় নি:সঙ্গ। একটা দিন আসবে,এরা নিজেদের পরিবার, পরিজন, পরিচিত বন্ধুবান্ধব সব ভুলে, অন্ধকার ঘরে একা ফোন নিয়ে বসে থাকবে আর বলবে,- আমার সাতশো বন্ধু আছে, আমার বারোশো বন্ধু আছে।..একটা মানসিক রোগীতে পরিনত হবে।এক সময়  এই গ্রহ হয়তো বোবা অথবা অন্ধ হয়ে যাবে।
সত্যি! তো ওর কথা গুলোও একেবারে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দিনের বেশীর ভাগ সময়, ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে, আমারই চোখের দৃষ্টি শক্তি কমে এসেছে বলে মনে হয় মাঝে মাঝে। চুপ করে পিকের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।পিকে বলতে থাকলো...
-" ফেসবুক সম্পর্কে তুমি যেমন বললে, তাতে আমার মনে হয় এটা মানসিক চাপই বাড়ায় বেশী।"
-" কিরকম? " প্রশ্ন করলাম আমি।
-" যেমন ধরো, তুমি একটা ছবি আপলোড করতে,  অথবা কেউ তেমন লাইক করলো না, তোমার মন খারাপ হল, মনের উপর চাপ বাড়লো। আর কেউ খারাপ কমেন্ট করলো। সেটাও তোমার মনের উপর এফেক্ট ফেলল। সবার সেলফি তে কত লাইক, তোমায় টায় নেই।"
ঠিকই তো! আমারই তো এরকম হয় মাঝে মাঝে।কেউ লাইক না করলে মন খারাপ লাগে। তখন চুপ করে বসে থাকি।কিছু করতে ইচ্ছে করে না।

রাতে বাড়ি ফিরে খাওয়ার পর ওকে নিয়ে ছাদে উঠলাম।চাঁদের আলোয় ওর মুখটা খুব মায়াময় লাগছে ।কেন জানিনা, খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করল ওকে। ওর চোখ দুটোতে যেন সবসময় ভালবাসার বৃষ্টি ঝরে পড়ছে।ভালবাসার জন্যে একটা শহর থেকে অন্য শহরে, বা একটাদেশ থেকে অন্যদেশে যাওয়া যায়। কিন্তু ও একটা অন্য গ্রহ থেকে আমাদের এই গ্রহে চলে এল।
দশ বারো দিন হয়ে গেল,ওর সাথে গল্প করতে করতে, ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে,ওকে যেন কেমন ভালবেসে ফেললাম। খুব আপন মনে হল আমার। ভাবলাম, একদিন রাতে ওর পাশে থাকি, ওকে আদর করি। ফেসবুক কমিয়ে দিয়েছি,তার জন্যে একবার ও দু:খ পায়নি, কারন বন্ধুত্বর মানে টা ওই আমাকে শিখিয়েছিল।একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি, সোফায় বসে ও মুখ গুমরে গুমরে কাঁদছে। মা বলল,-" রিমি, দেখ তোর পিকের কি হয়েছে!"
আমি ব্যাগ টা রেখে ওর পাশে বসলাম। হাতটা ওর হাতের উপর রেখে জিজ্ঞেস করলাম,-" কি হয়েছে?"
ও চোখের জল মুছে বলল,—"আমার গলার লকেট হার টা দাও।আমি বাড়ি যাব।"
চমকে উঠে হাত টা সরিয়ে নিলাম আমি। বুকটা আমার কেঁপে উঠল,-" কেন....?"
— "ওই মেয়েটার কথা খুব মনে পড়ছে খুব। এখানে থাকলে ওকে কোনোদিন ভুলতে পারব না।"
আমার খুব কান্না পেল, ওর জন্যে নয়,আমার নিজের জন্যে। ওকে আমি হারাতে পারব না কোনোদিন।খুব ভালবেসে ফেলেছি। ওর হাত টা আবার চেপে ধরলাম,অসহায় ভাবে ওর মুখের দিকে তাকালাম। আমার ভালবাসা টা ও বুঝতে পারল কি না ,জানি না!
রাত বারো টা। আমাদের বাড়ির পাশে ক্লাবের মাঠটিতে দুজন দাঁড়িয়ে আছি। ওর হাতে সেই লকেট টা, সবুজ সিগন্যাল দিচ্ছে। আকাশের দিকে তাকালাম দুজনই। একটা উজ্বল আলোর রেখা আমাদের দিকে নেমে আসছে। মুহুর্তের মাঠে এসে নামল যন্ত্র টা। আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। যন্ত্রটার একটা দরজা খুলে গেছে। ও আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল। ছুটে গিয়ে ওকে আমার বুকে চেপে ধরলাম।ও নিশ্চুপ, নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল না। কাঁদতে কাঁদতে কানে কানে বললাম,—" মনে পড়লে, আবার এসো আমার কাছে।"
হঠাৎ ও হাতের লকেট টা নিয়ে আমার গলায় পরিয়ে দিল,- "যখন আমাকে দেখতে ইচ্ছে হবে ,তখন ছাদে উঠে এই সুইচ টা অন করে,ঐ আকাশের দিকে তাকাবে; সঙ্গে সঙ্গে বুঝে যাব, পৃথিবী থেকে কেউ যদি আমাদের সিগন্যাল দেয়,তবে সেটা তুমিই। তখন আমাকে ঐ দূরের আকাশে দেখতে পাবে।"
আস্তে আস্তে যন্ত্রটা উপরে উঠছে। আলোটা মিলিয়ে যাচ্ছে মহাশূন্যে।জলভরা চোখে তাকিয়ে আছি।আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু ও ভালবাসা চলে যাওয়ার পথে।


    স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.