একটি ভালবাসার গল্প " ভালবাসার বন্ধন"


(১)

অবশেষে বিয়েটা করেই ফেললুম।
টোপর মাথায় দিয়ে,সাত পাকে ঘুরে,শুভদৃষ্টি, অগ্নি,জল,আকাশ, বাতাশ সব কিছুকে সাক্ষী রেখে।বিয়েটা যে করতেই হত,এমনটা নয়। না করলেও চলতো।কিন্তু একটা বিশেষ কারনে বিয়েটা করতে হল।কারন টা পরে বলছি।তার আগে একটু আমার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। আমার নাম সমর ঘোষ।মাঝারি উচ্চতা,শ্যামলা গায়ের রঙ,রোগা-পাতলা চেহারা।গোল গোল চোখ গুলোর উপর জোড়া ভুরু।মাথায় হালকা কালো চুল।মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি।আর নীচের ঠোঁটের উপর একটা কালো তিল
আছে।বয়েস এই চব্বিশের কাছাকাছি।আমি দক্ষিন-পূর্ব রেলে একটা ছোটো-খাটো চাকরী করি।মেদিনীপুর স্টেশনে পোস্টিং।বছর তিনেক হল চাকরী টি পেয়েছি।আমার বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়।খড়গপুর স্টেশন থেকে সাইকেলে মিনিট পনেরোর পথ।খড়গপুর থেকে মেদিনীপুরের দূরত্ব বেশি নয়। তাই প্রতিদিনই বাড়ি থেকে যাতায়াত করি।এই হল মোটামুটি আমার বিজ্ঞাপনহীন জীবনের পরিচয়।
এবার বিয়ে করার কারন টা বলি।
আজ এই চব্বিশ বছর বয়েসে হঠাৎ আমার মরার ইচ্ছে জাগলো। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন-সুসাইড।তবে ইচ্ছে টা হঠাৎ করে জাগেনি।একটু একটু করে মন খারাপ,ভাল না লাগা জমা হতে হতে,আজ সেটা থেকে মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছে হল। তোমরা বলবে,এটা হঠকারিতা। কি অভাব আছে আমার?সত্যিই আমার কিছু অভাব নেই। আর কোনো মেয়ের থেকে প্রেমে হোচট খেয়েও এ সিদ্ধান্ত আমি নিই নি।সে রকম মুর্খ আমি নই। কারন, প্রেম একবার হারালে আবার আসবে। কিন্তু বিশ্বাস? নিজের কাছের মানুষের প্রতি ছোটো থেকে একটু একটু করে গড়ে ওঠা বিশ্বাস, ধারনা,স্বপ্ন যদি এক মুহুর্তে ভেঙে যায়,সব মিথ্যে বলে মনে হয়-তখন সব ভরসা হারিয়ে যায়। সব রঙ হারিয়ে জীবনটা ধূসর হয়ে যায়।কিছু ফিরে আসে না।আর তখনি মৃত্যুদূত এসে বার বার ডাকে। কি হবে এই পৃথিবীতে বেঁচে! তবুও এর পরেও মানুষ বাঁচতে চেষ্টা করে।কোনো একটা অবলম্বন কে আঁকড়ে ধরে-কাউকে ভালবেসে, কারও ভালোবাসায়।গভীর সমুদ্রে একটা মানুষ হাবুডুবু খেতে খেতে ভেসে আসা একটা গাছের গুড়ি দেখতে পেলে একটু বেঁচে থাকার আশা করে,একটা ক্ষীন আলোর দিশা দেখে কিন্তু সে গাছের গুড়ি টি ও ক্ষনিকের আশা জাগিয়ে তার পাশ কাটিয়ে যখন অন্যদিকে ভেসে চলে যায়-তখন মানুষটির মৃত্যু ছাড়া আর পথ থাকে না। আমারও ঠিক একই অবস্থা হল।মৃত্যু ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই। তাই ঠিক করলাম সুসাইড ই করবো।
আর সুসাইড করার আগে বিয়েটা করে নিলাম। তোমারা বলবে, সুসাইডের সাথে বিয়ের কি সম্পর্ক? এ তো একটা মেয়ের জীবন নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়।তোমরা আমাকে খারাপ বলবে, গালাগাল করবে।কিন্তু আমি মেয়েটিকে বিয়ে করলাম তার জীবন গড়ে দেওয়ার জন্য।সেদিন প্লার্টফর্মে বসে ভাবতে ভাবতে বিষয় টি মাথায় এল।আমি তো মরে যাব,কিন্তু কি লাভ তাতে? আমি মারা গেলে,সরকার আমার পরিবার কে কিছু টাকা দেবে।কিন্তু আমার চাকরী টা যে নষ্ট হবে। আর এই বাজারে একটা সরকারি চাকরী জোটানো কি কষ্টের সেটা তোমরা নিশ্চয় বুঝতে পারছো! তাই ঠিক করলাম,আমার চাকরী টা কাউকে দিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু এমনি এমনি তো আর একজনের চাকরী,অন্যজন কে দেওয়া যায় না!তোমরা হয়তো জেনে থাকবে, রেল কর্মচারী রা মারা গেলে তার পরিবারের একজন কে সেই চাকরী দেওয়া হয়।কিন্তু রেলওয়ে বোর্ডের কাছে পরিবার মানে তার বাবা-মা নয়।তাদের কাছে পরিবার হল,স্ত্রী,ছেলে,আর অবিবাহিতা মেয়ে। আমার যেহেতু বিয়ে হয় নি, তাই এখন মারা গেলে চাকরীটা কেউ পাবে না। তাই মরার আগে বিয়েটা করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করলাম।আর প্লান মতোই বিয়ে টা ও সারা হয়ে গেল।এখন আর চিন্তা নেই।আমি মরে গেলে চাকরী টা আমার স্ত্রী পাবে। তারপর সে অন্যকাউকে বিয়ে আবার নতুন সংসার করবে। না,করলেও করতে পারে। সেটা তার ইচ্ছের উপর নির্ভর করবে।যাইহোক, একটা মেয়ের অন্তত ভবিষ্যৎ এ বেঁচে থাকার পথ তো করে দিয়ে গেলাম।তোমারাই বলো,এর থেকে আর পুণ্যের কাজ হয়?

(২)

আমাদের বাড়ি থেকে পাঁচ-সাতটা বাড়ির পর, গিরিশ কাকুর বাড়ি।মধ্যবিত্ত পরিবার।পরিবারে এক সময় স্বচ্ছলতা ছিল।তার বয়েসের সাথে সাথে এখন সেটা হারিয়ে গেছে।এখন আর বাইরে কাজেও বেরোতে পারেন না।আমার বাবা আর গিরিশ কাকু অনেকটা বন্ধু ধরনের।ধরন কথাটা ঠিক বললাম না,বন্ধুই হবে।এ পাড়ার পুরানো বাসিন্দা দু'জনই। সন্ধ্যা হলেই,চায়ের দোকানে বসে, চা খাওয়া,আড্ডা দেওয়া, তাসখেলা -এ সবই করে বেড়ায় দু'জন।তাই আমি ছোটো থেকে ওনাকে কাকু বলেই ডাকি। গিরিশ কাকুর একমাত্র মেয়ে নীতু।শ্যামলা, পাতলা গড়ন,ভাসা ভাসা চোখ,পিটের মাঝ বরাবর ছড়ানো ঘন কালো চুল।শান্ত,নম্র স্বভাবের নীতু দেখতে মন্দ নয়।ছোটো বেলায় মা মারা যাওয়ার পর বাবার আদরেই মানুষ নীতু।এবছর বাংলা অনার্স নিয়ে বি.এ পাস করেছে।এখন সকাল বেলা কয়েকটা ছেলে মেয়ে টিউসান পড়ায়,আর চাকরীর পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়।
আমার সাথে নীতুর যে খুব ভাল পরিচয়,তা নয়। পাড়ার মেয়ে,তাই মাঝে মাঝে যাতায়াতের পথে দেখা হয়ে থাকে।আমি কথা বলি না।নীতুই আগে কথা বলে।'কেমন আছ?' এটুকুই।আমি একটা ফ্যাকাশে হাসি হেসে 'ভালো আছি' বলে কাটিয়ে দিই।মাঝে মাঝে কখনো জিজ্ঞেস করি,-"কি পড়াশুনা করছো এখন?"
নীতু হেসে বলে,-"আর পড়াশুনা করি না। টিউসান পড়াই। আর ওই একা একা চাকরীর প্রস্তুতি নিই।"
যখন আমাদের দেখা হয়,এইটুকুই কথা হয়।নীতু হয়তো আরও কথা বলার চেষ্টা করে।কিন্তু আমার ভাবলেশ হীন মুখশ্রী দেখে কিছু বলতে পারে না। একবার চোখের দিকে তাকিয়ে চলে যায়। অবশেষে সেই নীতু কেই বিয়ে করেই ফেললুম। সামাজিক ভাবে।টোপর পরে,সাত পাকে ঘুরে.......।চারিদিকে আলোর রোশনাই। হাসি,হই-হুল্লোড়।বাড়ির একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা! বাবা,মা আত্মীয় স্বজন সবাই খুশি। আনন্দে আত্মহারা।শুধু আমার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা বেরিয়ে এল।

(৩)

বিয়ের পর আজ প্রথম অফিস যাচ্ছি।চার দিন ক্যাজুয়াল লিভ ছিল।সকাল বেলা স্নান করে ঘরে ঢুকতেই নীতু বলল,-"আজ এই জামাটা পরে যাবে।তোমার গায়ে দারুন মানাবে।"
সবুজ আর সাদা রঙের ছোটো ছোটো চেক কাটা জামাটা এগিয়ে দিল আমার দিকে।আমি হেসে বললাম,-"কি দরকার এসবের! আমি জামা পরি না।"
-"না,আমি শুনবো না।তুমি এটা পরবেই।"নীতু জেদ ধরলো।
অনেক টা জোর করে জামাটা পরিয়ে দিল।-"দেখো ভালো লাগছে না?"
আমি বড় আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম,-"এ সব আমার মানায় না নীতু।"
-"কে বললো,মানায় না?আমার তো ভালোই লাগছে।"জামার বোতাম গুলো লাগাতে লাগাতে আদুরে গলায় নীতু বলল।
ঘড়িতে সাড়ে আট টা বাজলো।আমি তাড়াতাড়ি ব্যাগটা নিয়ে পিটে ঝুলিয়ে নিয়ে বললাম,-"আজ শিওর ট্রেন মিস হবে।তারপর বাসের ভিড়ে ধাক্কা খেতে খেতে যেতে হবে।"
-"একদিন না,হয় আমার জন্যে ধাক্কা খেলে।" নীতু হাসল।
আমি দরজার দিকে পা বাড়াতেই হাত টা চেপে ধরল।-"একটু দাঁড়াও।"
-"কি হল আবার!" আমি বিরক্ত হয়ে পিছন ঘুরলাম।
আমার সামনে এসে দাঁড়াল নীতু।খুব কাছে। দু'হাতে আমার মাথাটা ধরে আরও কাছে টেনে নিল। আলতো করে একটা চুমু দিল কপালে। হেসে বলল,-"এবার যাও।ধাক্কা খেলেও আর কষ্ট লাগবে না।"
কি পাগল মেয়েটা!আমি মনে মনে বললাম। তারপর বেরিয়ে পড়লাম।সত্যিই ট্রেন পেলাম না।অগত্যা বাসেই উঠে পড়লাম।আজ আমাদের বিয়ের পাঁচ দিন পড়লো। কিন্তু সুসাইড করতে পারছি না।আরও বেশ কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।অফিসে কিছু কাগজ পত্র জমা করতে বাকি আছে।যত দিন না,আমাদের ম্যারেজ সার্টিফিকেট,আর কিছু জরুরি কাগজ পত্র আমার সার্ভিস বুকে যোগ না হচ্ছে,ততদিন আমাকে অপেক্ষা করতে হবে।ক্লার্কের কাছে ফোন করে সব জেনে নিলাম। কি কি কাগজ-পত্র লাগবে।তারপর সব কিছু নিয়মানুসারে জোগাড় করে আজ নিয়ে যাচ্ছি।
বাস থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে অফিসে যেতে হয়। আমিও হাঁটলাম।অফিসে ঢুকতেই সবাই ঘিরে ধরল।
-"কি সব ঠিক ঠাক চলছে তো?"আমি মুচকি হেসে ক্লার্কের ঘরে ঢুকে যাই।
আমাদের ক্লার্ক সুমিত পাত্র মানুষ হিসেবে ভাল। মিশুকে ধরনের।হুগলী জেলায় তার বাড়ি। আমাকে দেখে বসতে বললেন।-"আজই চলে এলে?আর কিছু দিন ছুটি নিতে পারতে।"
আমি হেসে বললাম,-" পরে নেবো। এক সাথে এত ছুটি আর নিলাম না।"
-"তা বেশ করেছো।" একটা ফাইল খুললেন পাত্র বাবু।
আমি ব্যাগ থেকে কাগজ-পত্র গুলো বের করে তার দিকে এগিয়ে দিলাম।
-"কি এগুলো?"পাত্র বাবু আমার দিকে তাকালেন।
-"আমার ম্যারেজ সার্টিফিকেট।আর যেসব কাগজ গুলো বলেছিলেন।প্লীজ এগুলো তাড়াতাড়ি বিল ক্লার্কের কাছে পাঠিয়ে দিন।"
-"ও আচ্ছা! আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।কই,দেখি সব ঠিক আছে কিনা!" উনি সব কিছু দেখে নিলেন।তারপর বললেন,-"ঠিক আছে।আমি যত তাড়াতাড়ি পারি পাঠিয়ে দেবো।"
একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে এলাম আমি।

(৪)

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে ঘরে ঢুকতেই,ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো নীতু।আরেকটু হলেই খাটের উপর পড়ে যাচ্ছিলাম।কোনো রকমে সামলে নিলাম নিজেকে।
-"কি পাগলামো হচ্ছে নীতু! ছাড়ো কেউ দেখে ফেলবে।পাশের ঘরে বাবা-মা আছে।"আমি
বললাম।
-"দেখলে কি! আমি কি অন্য কাউকে জড়িয়ে ধরছি নাকি? আমি তো আমার বর কে জড়িয়ে ধরেছি।"
-"আচ্ছা। ঠিক আছে। কিন্তু এখন ছাড়ো। দেখো,ঘামে সারা শরীর ভিজে গেছে।"
-"তা তে কি হয়েছে? ঘাম ভাল।"
এ মেয়ে শিওর পাগল! আমাকে একটুও দুর্বল হলে চলবে না।আরও শক্ত হতে হবে।
-"তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও।আমি কিছু খাবার করে আনি।" নীতু আমার ব্যাগটা টেবিলের উপর রেখে বলল।
-"সেটাই ভাল। " আমি হেসে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম।
পাঁচ মিনিট পর বেরিয়ে এসে দেখি,নীতু কিছু খাবার নিয়ে বসে আছে।আমাকে দেখে হাসলো।
-"আমি নিজে হাতে বানিয়েছি এটা।"
আমি খেতে শুরু করলাম।মন্দ লাগেনি।নীতু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।-"কেমন হয়েছে?"
-"ভাল।তুমি একটু নাও।"
আমি প্লেট টা নীতুর দিকে এগিয়ে দিলাম।নীতু ভেবেছিল,আমি চামচে করে ওর মুখে তুলে দেব।কিন্তু আমি সেটা করলাম না।সে আমার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে বসে রইল।

আরও সাত দিন কাটলো।আজ অফিস শেষে পাত্র বাবুর সাথে দেখা করলাম।দেখা মিলল।-"আমার কাগজ গুলো পাঠিয়েছেন?"
-"হ্যাঁ।তার পরের দিনই পাঠিয়ে দিয়েছি।" পাত্র বাবু বললেন।
আমি একটা ধন্যবাদ জানালাম।
-"তুমি চিন্তা করো না! এবার থেকে ফ্যামিলি পাস ই পাবে।আর হ্যাঁ, মেডিক্যাল কার্ড টি ও ইসু করিয়ে নিও।" পাত্র বাবু হাসলেন।
আমি আবার ও একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। একটা শান্তি পেলাম বুকের ভেতর।আর টেনসন নেই।প্লার্টফর্মে এসে ট্রেনে চেপে বসলাম। ট্রেন ছাড়তে এখনো মিনিট দশেক বাকি।কিছুক্ষন বাদে ট্রেন ছাড়লো।নীতু কি খেতে পছন্দ করে? আজ খড়গপুরে নেমে তাই নিয়ে যাব।মনে মনে ভাবলাম আমি।

(৫)

রাতে খাওয়ার পর শুয়ে পড়লাম।বাইরে চাঁদের আলো।পশ্চিমের খোলা জানালা দিয়ে আমাদের বেডের উপর পড়েছে। আজ কি পুর্নিমা? জোসনালোকে ভাসছে গাছপালা গুলো। জানালার পাশেইএকটা পাতি লেবু গাছ। জোনাকি পোকা ঘিরে ধরে আছে। আজই আমার শেষ দিন।কাল থেকে আর কেউ আমার দেখতে পাবে না।অজান্তেই চোখের কোনে জল চলে এল।
নীতু ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।তারপর জানালার একটা পাল্লা বন্ধ করে দিল।চাঁদের আলো আর ঘরে ঢোকে না।জোনাকি পোকা দেখা যায় না।আমার পাশে এসে কাত হয়ে শুয়ে বলল,-"কি হয়েছে তোমার?এভাবে কপালের উপর হাত দিয়ে শুয়ে আছো কেন?"
-"কই,কিছু না তো।"কপালের উপর থেকে হাত নামাই আমি।
-"শরীর খারাপ নাকি তোমার?এরকম বিষন্ন লাগছে কেন তোমাকে?"নীতু আমার কপালে হাত রাখল।
আমি হাসার চেষ্টা করলাম।বললাম,-"কিছু হয়নি, নীতু।"
-"না,কিছু তো হয়েছে।আমাকে বলো।বেশ কিছুদিন ধরে তোমাকে মনমরা দেখছি।আমার থেকে সব সময় দূরে দূরে থাক।আচ্ছা,আমাকে বিয়ে করে তুমি খুশি হও নি?"
ঘরের ভেতর নাইট বাল্বের হালকা আলো।আমি নীতুর দিকে ফিরে ওর কপালে হাত বোলাই।চুল গুলো কপালের উপর থেকে সরিয়ে দিই।তারপর বললাম,-"কোথায় দূরে থাকি?এই তো তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।"
ও চুপ করে থাকে।কিছু সময় পর আবার বলি,-"নীতু!"
-"বলো।"
-"আমি মরে গেলে কষ্ট হবে তোমার? "
চমকে ওঠে নীতু।আমার হাত চেপে ধরে।-"ওমা! একি কথা,তুমি মরবে কেন?কি হয়েছে তোমার, সত্যি করে বলো।"
-"মানুষ তো চিরকাল বাঁচে না।"আমি হাসার চেষ্টা করলাম।
-"সেটা ঠিক।তবে তুমি এখন কেন এসব বলছো? আর তুমি মরে গেলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো? কার মুখের দিকে তাকাবো?সন্ধ্যা বেলা ছুটে গিয়ে কাকে জড়িয়ে ধরে আদর করবো?আমার খুব কষ্ট হবে,সমর। এসব কথা একদম মুখে আনবে না।"
-"তাই বললে কি হয়! সবাই কে একদিন চলে যেতে হয়।তবুও মানুষ কে নতুন করে বাঁচতে হয়।"
-"না,তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না।"
-"যেতে তো আমাকে হবেই।"মনে মনে বললাম আমি।কিছুক্ষন চুপ করে থাকি।
-"কি হল,তুমি চুপ করে আছো কেন?আগে বলো,আমাকে ছেড়ে তুমি কোথাও যাবে না!" নীতু শুধালো।
-"আমায় কেউ ভালোবাসে নি,নীতু!" আমি ফিসফিসে,অস্পর্ষ্ট গলায় বললাম।
-"কে বললো এ সব কথা? আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি সমর।আর সারা জীবন ভালোবাসবো তোমায়।"
হালকা আলোয় আমি ওর চোখের দিকে তাকালাম।একটা ভয় দেখতে পেলাম -আমাকে হারানোর।একটা ভালোবাসা দেখতে পেলাম- আমাকে কাছে টানার।নীতু আমার আরও কাছে সরে এল।বলল,
-"কি হয়েছে তোমার?আজ এরকম কথা কেন বলছো?আমার কিন্তু খুব ভয় করছে।"
-"এমনি।"আমি হাসলাম।
-"আর এরকম কখনো বলবে না। আমার কষ্ট লাগে।দেখবে,তোমাকে খুব ভালোবাসবো,আর আদর করে দেব।"

আমি ওর থেকে সরে আসার চেষ্টা করি।পারি না। আমাকে জোরে কাছে টেনে নেয়।তারপর মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে।নীতুর বুকের আঁচল সরে যায়।ওর শরীরের গন্ধ আসে আমার নাকে।এতটা কাছে আগে কখনো আসি নি।ওর একটা হাত আমার চুলের ভেতর।ঠোঁট দুটো কপাল ছুঁয়ে আছে।আমার চোখে জল চলে আসে।একটু একটু করে ভিজিয়ে দেয় ওর শরীর সে জলের ফোঁটা।আমি চুপ করে থাকি। ঠোঁট দু'টো কপাল থেকে নেমে আমার সারা মুখে,কাঁধে ঘুরে বেড়ায়।
-"তোমাকে ছেড়ে আমি কি করে থাকবো সমর? আর কাউকে এরকম আদর করতে পারবো না।" ওর ঠোঁট দু'টো আমার ঠোঁটের ভিতর নেমে আসে।

দু'টো রাতজাগা পাখি ডানা ঝাপটায়।

(৬)

সকাল পৌনে ন'টা।আজ আমার ডিউটি সকালে।লাইন চেকিং-মেদিনীপুর থেকে কাঁসাই পর্যন্ত।কাঁসাই ব্রিজের পাশে একটা গাছের নীচে বসে আছি।পকেট থেকে ফোনটা বের করে রুপসী বাংলা এক্সপ্রেসের লাইভ আপডেট দেখি- গোকুলপুর স্টেশন ছেড়েছে।একটু পরেই রুপসী বাংলা ঢুকবে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে উঠি। চারিদিকে একবার তাকাই।কেউ নেই।আমাকে মোটেও দুর্বল হলে চলবে না।আমি আর কারও কথা ভাববো না।আমাকে মরতেই হবে।
ট্রেনের হর্নের শব্দ পাই।গাছের নীচ থেকে হেঁটে গিয়ে রেল লাইনের পাশে দাঁড়ালাম।এক্সপ্রেস টা খুব কাছে চলে এলেই,আমি শরীর টা রেল লাইনের উপর ছেড়ে দেব।তারপর আমার শরীর টা ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে পড়বে। পিষে যাবে, লাইনের কালো খোয়া গুলোর সাথে।দূর থেকে এক্সপ্রসের ইঞ্জিন বগি দেখতে পাই।সেই সাথে তীব্র হর্নের শব্দ।আমার মাথা ঘুরে আসে।কানের পাশে বার বার একটা গলার আওয়াজ ভেসে আসে। "......তুমি মরে গেলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো?....সন্ধ্যা বেলা ছুটে গিয়ে কাকে জড়িয়ে ধরে আদর করবো?.......আমার খুব কষ্ট হবে সমর।....তোমায় খুব ভালোবাসবো।...তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেব না......।নীতুর হাসি মুখ টা আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।.....-"একটু ধাক্কা না হয়,সহ্য করলে আমার জন্যে!"
আমি দু'হাতে চোখ রগড়াই।ওর মুখ টা কেন আমার চোখের সামনে থেকে যাচ্ছে না?কেন বার বার ও কে দেখতে পাচ্ছি?আমি মরতে পারবো না......কখনোই পারবো না। আমি বাঁধা পড়ে গেছি।আমাকে বাঁচতে হবে শুধু ওর জন্য.....।

সামনে দিয়ে ঝড়ের গতিতে রুপসী বাংলা এক্সপ্রেস টা বেরিয়ে গেল।কয়েক পা পিছিয়ে এলাম।

সমাপ্ত


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.