একটি প্রেমের গল্প " ভালোবাসা "




(১)

–"এইডস!"
সবেমাত্র কফিকাপে চুমুক লাগিয়েছি।গলা দিয়ে আর নীচে নামল না।আল–টাগরায় বেধে গেল।একরকম বিষম খেতে খেতে কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিলাম। সত্যিই তো!বিষম কেন, আমার চেয়ার থেকে উলটে ডিগবাজি খেয়ে নীচে পড়ে যাওয়াই উচিত ছিল।
–"হ্যাঁ, এইডস! তোর ব্লাডটেস্ট করতে হবে।" কালো কালো চোখের উপর থেকে এক টুকরো সোনালি চুল সরিয়ে আমার দিকে তাকালো সৃজিতা।

হালকা সাদা টিউব লাইটের আলো সৃজিতার ঘরে।এই মুহুর্তে আমি সৃজিতার বেডরুমে একটা চেয়ারের উপর বসে আছি।আমাদের সম্পর্কটা টা দু'জনের বাড়ির সবাই জানে। এবং বিয়েও এক প্রকার ঠিক ও হচ্ছে।তাই যখন মাঝে মাঝে এদিকে কোন কাজে আসি, তখন সৃজিতার বাড়ি থেকে ঘুরে যাই।কিন্তু আজ তার কথায়, আমার বিয়ের আনন্দ টা দপ করে ফিউজ কাটা বাল্বের মত নিভে গেল।সৃজিতার বেডের পায়ের দিকে দেওয়ালে একটা বড় করে বাচ্চা শিশুর ছবি লাগানো।কফি খেতে খেতে সেদিকে তাকিয়ে হাসছিলাম।কিন্তু আর হাসব কোথায়?সৃজিতার কথা শুনে,আমার কান্না পেয়ে গেল।
–" এইডস! ব্লাডটেস্ট! তুই আমাকে সন্দেহ করিস, সৃজিতা?"
–"আজকাল কার ছেলেদের আমার একদম বিশ্বাস হয় না,বুঝলি! কোথায় কি সব ঘোটলা করে আছে কে জানে। আর শুধু ব্লাডটেস্ট নয়, কয়েকটা মেডিকেল চেক আপ করতে হবে তোর।তুই আমার ভবিষ্যৎ এর লাইফ পার্টনার হবি,–সব কিছু তো জানা দরকার।"সৃজিতা চাপাস্বরে একটা ঝড় বইয়ে দিল আমার কানের কাছে।
–"বিয়ের করতে গিয়ে মেডিকেল পরীক্ষা দিতে হবে!"
একবার রেলে চাকরী পেয়েছিলাম,সেসময় মেডিকেল পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।ডাক্তারের সামনে মা-ইজ্জত সব শেষ।কিন্তু এটা কি রকম!এ তো 'রামের অগ্নি পরীক্ষা!"
কফি আর মুখে ঢালতে ইচ্ছে হল না।মনে হল কাপ সমেত মাথায়ঢেলে বসে থাকি।এক মিনিট ভাবতে থাকলাম,–এ মেয়ে আমেরিকা, না, চায়না কোন দেশের আবিষ্কার এটা?আমাদের
দেশে তো এ জিনিষ দেখিনি।
–" কিরে! চুপ করে কি ভাবছিস?মেডিকেল চেক আপ করাতে ভয় পাচ্ছিস?" আমার অসহায়,নির্বাক মুর্তি দেখে সৃজিতা হসে বলল।
এটা " ইজ্জত কা সাওয়াল!"আর সহ্য করতে পারলাম না।আমি তো জানি,–আজ পর্যন্ত আমি কোনো মেয়ে কে ইচ্ছেকৃত স্পর্শ করেও দেখিনি। তবে ভয় কি! ভয় এইডস নয়,–যদি মেডিকেল পরীক্ষায় ফেল করি! সৃজিতা কে ছেড়ে কোনো দিন একা একা থাকতে পারবো না।
কফি কাপ টা শক্ত করে চেপে বললাম–" ভয় পাব কেন?তুই যেটা বলবি সেটাই হবে।"
সৃজিতা হাসল।তারপর উঠে আয়নার সামনে গিয়ে কয়েক ঘুরে ফিরে চুল গুলো এলোমেলো আমার দিকে তাকিয়ে বলল,–" তাহলে পরশু,ঠিক সময়ে চলে আসবি হসপিটলে।ফোন যেন না করতে হয়।"
আমি বোকার মতো এক মুহুর্ত বসে রইলাম।তারপর বললাম,-" ওকে,মেরি জান। আজ তবে উঠি।"

আজ কিছুক্ষন সৃজিতার মায়ের সাথে কথা বলে, তাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম আমি।


(২)

মাস এগারো আগে সৃজিতার সঙ্গে পরিচয় ফেসবুকে।তারপর আলাপ, বন্ধুত্ব,ভাললাগা থেকে ধীরে ধীরে যেটা হয় আর কি! আপনারা বুঝতে পেরেছেন,তাই আর বললাম না। কলকাতার একটা বেসরকারি হসপিটলের নার্স সৃজিতা।দক্ষিন ২৪ পরগনা জেলার একটা শহরে তার বাড়ি।শহুরে স্মার্ট মেয়ে,ভাসা ভাসা চোখ,মিষ্টি হাসি, কথা–বার্তায় বুদ্ধিমত্তার ছাপ স্পর্ষ্ট।সারক্ষন ফর্সা শরীর টাতে একটা  চার্মিং ভাব।
আমার বাড়িটিও দক্ষিন ২৪ পরগনার অন্যএকটা শহরে।শহর দুটি প্রায় পাশাপাশি। একটা ছোটো খাটো সরকারি চাকরী করি আমি, তাই শুধু প্রতি রবিবার আমাদের দেখা হয়।মাস দ'শেক সেরকমই হচ্ছে।আর দেখা হতে হতে,কথা বলতে বলতে এমন হয়ে গেছে যে,এখন মনে হয়, এ মেয়ের সাথে সারাজীবন কথা না বলে থাকা যায় না।তাই সম্পর্কটা একদম বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে চলে গেছি।সৃজিতার মায়ের আমাকে দেখে খুব পছন্দ হয়।আর মেয়ের মায়ের ছেলে পছন্দ হলে, জানেন তো কি হয়! আমার ও তাই হল।এতদিন চুরি করে দেখা করতে হত, এখন আর সেটা নেই।বাড়িতে ঢোকার পাসপোর্ট পাক্কা।

সৃজিতার সাথে প্রথম দেখা করার দিন টা মনে পরলে আমার বুক টা এখনো ধক করে ওঠে।আমার সারা মুখে ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি,গোঁফ দেখে বলেছিল,–" এক চড় মারব জানিস।সব সময় ফ্রেশ হয়ে থাকবি।"
ভয়ে আমার মুখটা শুকিয়ে গিয়েছিল। কিছু বলার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু মুখ দিয়ে আর বের
হয়নি।ঢোক গিলে খেয়ে ফেলেছিলাম।তারপর থেকে সপ্তাহে দুবার করে সেভিং করতে শুরু করে দিলাম।আর আজ একেবারে ব্লাডটেস্টে,মেডিকেল চেক আপ পর্যন্ত চলে গেল! কি ডেঞ্জারাস মেয়ে রে !
এই জন্যেই ডাক্তারি পড়া,বা ডাক্তারি করা মেয়েদের সাথে প্রেম করতে নেই- এরা কোনোকিছু করার আগে সব কিছু চেক আপ করে নেয়।

(৩)

ঘড়িতে সকাল দশটা।সৃজিতা যে হসপিটলে চাকরী করে সেখানে বসে আছি।ও ভেতরে একটা কাজে ব্যাস্ত মনে হয়। ফোন করলেও তুলছে না।একজন নার্স কে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম,–" দিদি,সৃজিতা ম্যাডাম কি খুব ব্যস্ত আছেন?"
উনি হাতের কাগজ গুলো একের পর এক উলটাতে উলটাতে বললেন,–"হ্যাঁ।দশ মিনিট পর আসবেন।একটু অপেক্ষা করুন।"তারপর হন হন করে নার্স টি অন্যদিকে চলে গেল।

হসপিটলের মধ্যে বসে থাকতে আমার একদম মন টেকে না।খুব ভয়করে।কেমন একটা অস্বস্তি হয়। তাই যতটা সম্ভব পারা যায় হসপিটল থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি।আজ বার বার মনে হতে লাগল,–জীবনে প্রথমবার কোনো পরীক্ষায় ফেল করতে চলেছি।
মিনিট বারো পর সৃজিতা কে দেখলাম।একদম চিনতে পারিনি।আসলে নার্সদের ড্রেসে আগে কখনো ওকে কখনো সামনে থেকে দেখিনি তো তাই।হাতে সাদা গজ কাপড়, ইনজেকসানের সিরিঞ্জ,আর কিছু ওষুধ। চোখের পলক না ফেলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।–এ মেয়ে নার্স হওয়ার জন্যই এ পৃথিবীতে জন্মেছে।
আমার চোখের সামনে হাত নেড়ে হেসে বলল,–"ওই,ওভাবে কি দেখছিস?"
ফিল্মি স্টাইলে বললাম,–"তোকে।"
–"আর দেখতে হবে না। এবার চল
আমার সাথে।"
আমাকে নিয়ে একটা ডাক্তারের ঘরে ঢুকলো সৃজিতা।
–"আরে এসো এসো।"ডাক্তার বাবু বললেন।যেন আগে থেকে সব ঠিক ঠাক হয়েই ছিল।
চেয়ারে বসে ডাক্তারের কেবিন টা ভাল করে দেখলাম।মনে হচ্ছে মরন কূপে বসে আছি।সৃজিতা,ডাক্তারের সাথে আলাদা করে চাপাস্বরে কথা বলতে লাগল।কিছু কানে এল না।
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করে দিয়েছে অনেক আগে থেকেই।কথা–বার্তা শেষ করে সৃজিতা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাসল।বলল,–" উনি তোর চেক আপ করবেন।
বেস্ট অফ লাক।"তারপর দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।

প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে ডাক্তার কি সব করল আমি তার 'অ, আ..ক,খ' বুঝতে পারলাম না।চল্লিশ মিনিট পর,ডাক্তারের ঘর থেকে বেরিয়ে একটা বড় করে শ্বাস নিলাম।যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।অনেকক্ষন বড় পাথরের নীচে চাপা থাকার পর মুক্তি পেলে যেমন মনে হয় ঠিত তেমন মনে হল।সৃজিতা বাইরেই চেয়ারে বসে ছিল।আমাকে বাইরে বেরোতে দেখে দ্রুতো উঠে এল।– "হয়ে গেল?"
আমি মাথা নীচু করে এক পাশে মাথা কাত করলাম।
–"কি বলল?রিপোর্ট কবে দেবে?"
–"কিছু বলেনি।বুধবার তিনটের সময় আসতে বলল, রিপোর্ট নিয়ে যেতে।"
সৃজিতা আমার চোখে চোখ রাখল।একটু হাসল।তারপর আমার হাত ধরে বলল,–"চল,তোকে বাইরে গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি।"
একটা বিষন্ন হাসি হাসার চেষ্টা করলাম।গাড়িতে ওঠার পর সৃজিতা হাত নাড়ল।বলল –" বুধবার।মনে থাকে যেন।"

(৪)

আজ সেই বুধবার।আধ ঘন্টা কেটে গেল। টেনসনে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঘেমে উঠেছে। বার বার পকেট থেকে ফোন বের করে টাইম দেখছি।বিকেল তিনটে চল্লিশ হয়ে গেছে।সৃজিতা
আমাকে বসিয়ে রেখে সেই যে গেল,এখনো তার দেখা নেই।একজন বেঁটে করে মোটা নার্স এসে বলল,–" এখানে অভিজিৎ সেন কে আছে?"
–"আমি।" উঠে দাঁড়িয়ে নার্সটির দিকে তাকালাম।
–"আপনাকে ভেতরে ডাকছেন ডাক্তার বাবু।"
পকেট থেকে রুমাল টা বের করে মুখের ঘাম মুছলাম।তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়ালাম ডাক্তারের ঘরের দিকে।ডাক্তারবাবু আমাকে চেয়ারে বসতে বললেন।রিপোর্ট গুলো ভাল করে উলটে পালটে দেখে বললেন,–" এই নাও তোমার রিপোর্ট গুলো। সৃজিতা কে দেখাবে,ও সব বলে বুঝিয়ে দেবে তোমাকে।"

বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করল।আর করবেই না বা কেন?এরকম পরিস্থিতিতে আমার যে
এখনো হার্টফেল করিনি এটাই অনেক।কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম,–"খারাপ কিছু নেই তো ডাক্তার বাবু?"
রিপোর্ট গুলোর থেকে একটা কাগজ বের করে, ডাক্তার বাবু আমার হাতে দিলেন।তারপর কাগজের উপর মোটা কালির লেখা একটা লাইনের উপর আঙুল ধরলেন।সেটার উপর চোখ রাখতেই বুকের ভেতর টা ধড়াস করে উঠল আমার।ডাক্তারের ঘর থেকে রিপোর্ট গুলো নিয়ে বাইরে বেরোতেই সৃজিতা দেখতে পেলাম। আশেপাশে আর কাউকে দেখলাম না। আমাকে দেখেই ছুটে এল কাছে।সাদা সাদাদাঁত বের করে হাসল।খুব কাছে এসে চাপাস্বরে বলল,–কিরে! এইডস ধরা পড়ল নাকি! আমি জানি তোর ওসব কিছু নেই।" ওর চোখে মুখে একটা দুষ্টুমি খেলে গেল। রিপোর্ট গুলো ওর হাতে দিলাম।সব গুলো এক এক করে দেখতে লাগল।মুখে একটা হাসির রেখা ফুটে উঠল।তারপর সেই কাগজটিতে চোখ রাখতেই,থমকে গেল।ভাল করে বার বার পড়তে লাগল।তারপর আমার দিকে তাকালো।মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা স্বর বেরিয়ে এল।–"ইম্পোটেন্ট! "
(Impotent)

ভেতরে ভেতরে কষ্ট হলেও,একটা বিষন্ন হাসির চেষ্টা করলাম।যেন অনেক কষ্টে হাসিটা ভেতর থেকে টেনে বের করে আনছি।সবথেকে বেশী কষ্ট হল সৃজিতা কে হারাতে হবে ভেবে।অনেক্ষন পর মুখ দিয়ে কথা বেরুলো আমার।বললাম,–" রিপোর্ট গুলো তোর কাছে রাখিস।আমি আসি রে।"

সামনের দিকে পা বাড়াতেই,আমার হাত চেপে ধরল সৃজিতা।–"কোথায় যাচ্ছিস তুই?"
চুপ করে মাথা নীচু করে রইলাম।হঠাৎ আমাকে,ওর কাছে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।আশে পাশে কেউ নেই।মুখ টা আমার মুখের খুব কাছে এনে বলল,–"আমি তোকে খুব ভালবাসি। শুধু তোর সাথেই থাকতে চাই, আর কিছু না।"
আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল।কি বলছে এ মেয়েটা!খুব জোরে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল ওকে।আমার কপালের উপর থেকে চুল গুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল,–" এবার বাড়ি যা।একদম মন খারাপ করবি না। আমি সারা জীবন তোর সাথে থাকব।"

রিপোর্ট গুলো নিয়ে হসপিটলের বাইরে বেরিয়ে এলাম।গোধুলি নেমে এসেছে ধুলো মাখা পিচ রাস্তায়।আকাশ টা একদম পরিষ্কার,ঝকঝক করছে। মেঘেদের কোনো দেখা নেই।

স্বদেশ কুমার গায়েন  (২০১৫)

No comments

Powered by Blogger.