একটি ছোটগল্প " ফুচকা "






ফুচকা


(১)

হেড মাস্টারের রুম থেকে বেরিয়ে,স্কুলের গেটের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়াল সৌম্যদীপ।সাব-ইনেস্পেকটর সৌম্যদীপ রয়। লোকাল থানার নতুন সাব- ইনেস্পেকটর।ছ'ফুটের উপরে লম্বা, ফর্সা চেহারা,চওড়া কাঁধ,বেশ স্বাস্থ্যবান।মাথায় ছোটো করে করে ছাঁটা কালো চুল।গায়ে খাঁকি রঙের ড্রেস।চোখে কালো সানগ্লাস।বয়েস বত্রিশ কি,তেত্রিশ হবে।মুখমন্ডল তেমনটাই বলে। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলল সৌম্যদীপ।ভুরু কুঁচকে,চোখ দুটো সরু করে তাকালো।ব্যাপার টা বেশ আশ্চর্যের। অবাক করার মতো বটে।স্কুলে এখন টিফিন আওয়ার।শহরের একটা নামি স্কুল এটা। দু'ঘন্টার বেশি হয়ে গেছে, স্কুলে এসেছে সৌমদীপ। সাথে আরও দু'জন পুলিশ আছে। আসলে স্কুলের অডিট সংক্রান্ত একটা ছোটো খাটো সমস্যার ইনেস্পেকসনের দায়িত্ব এসে পড়েছে তার উপর।সাধরনত এসব দায়িত্ব তার থাকে না।কিন্তু ভিজিলেন্স অফিসারের সাথে হেড মাস্টারের ছোটো মনোমালিন্যের জন্য,কেস টা এসে পড়ল তার ঘাড়ে।যদিও আরও একটা ছোটো কাজ আছে।আশে পাশের বাড়ি গুলোর সাথে,স্কুলের সীমানা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ঝামেলা।আর সেই কারনেই আজ এই স্কুলে আসা।আজকাল স্কুলে এরকম ইনেস্পেকসনের কাজে এলে কাজের থেকে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনটা একটু বেশি পরিমানে হয়। ইনেস্পেকসনে আসার আগের দিনই সেই স্কুল কে জানিয়ে দেওয়া।অনেকটা চুরির আগে চোর কে সাবধান করে দেওয়ার মতো।সেই মতো স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে সবরকম ব্যবস্থা করে রাখে।শুধু স্কুল বলে কেন,দেশের সমস্ত সরকারি ডিপার্টমেন্টে এই একই সিস্টেম।সকাল সাড়ে এগারোটায় সৌমদীপ স্কুলে ঢুকতেই,হেডমাস্টার আর ক্লার্ক হাসি মুখে ছুটে এসে পড়ল।-" নমষ্কার স্যার! নমষ্কার স্যার!....আসুন স্যার,........বসুন স্যার!"
সৌমদীপের মনে হয়েছিল,এই মনে হয় দু'জন তার পায়ে এসে পড়ে।তারপর সোজা হেডমাস্টারের রুম।দেড় ঘন্টার আলাপ আলোচনা।তারপর  খাওয়া-দাওয়া।চা,বিস্কুট থেকে শুরু,তারপর বিরিয়ানি,শেষে কচি ডাবের জল দিয়ে ইতি।সৌমদীপ কিছুই ছাড়েনি।খাবার গুলোও ছাড়েনি,হেড মাস্টারকে ও ছাড়েনি। হয়তো আইনি ভাবে কিছু করবে না।ভয় ও দেখায় নি।কিন্তু হাসি মুখে এমন কথার ছুরি চালিয়েছে যে,ওনার সাত পুরুষের কেউ আর হেড মাস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখবে না।তারপর হেড মাস্টারের রুম থেকে বিদায় নিয়ে স্কুলের গেটের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
একজন পুলিশ বলল,-"স্যার এখানে গাড়ি ডাকি?"
চশমা টা হাতের আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে সৌম্যদীপ বলল,-" ফুচকা খাবে,সামন্ত?"
-"ফুচকা!"
অবাক হয়ে সৌম্যদীপের দিকে তাকাল সুবীর কুমার সামন্ত।বলল,-"একটু আগেই তো এত কিছু খেয়ে বেরোলেন।এখন আবার ফুচকা!"
সৌম্যদীপ হাসলো।বলল,-"ফুচকার প্রতি লোভ আমার স্কুল লাইফ থেকেই।আজ আবার সেটা যেন একটু নড়ে চড়ে উঠল।চলো যাই।"
তারপর আরেক জন পুলিশের দিকে তাকিয়ে বলল,-"কি,বিশ্বাস, ফুচকা চলে তো?"
প্রসান্ত বিশ্বাস মাথা থেকে টুপি টা খুলে হেসে বলল,-"একসময় খুব চলতো।কিন্তু এখন আর তেমন খাওয়া হয় না।তবে বউ আর মেয়ে বাইরে বেরোলেই ফুচকা চাই ই-চাই।"
তিন জনেই হেসে উঠল।হা হা হা শব্দে।

(২)

স্কুলের গেট থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে কয়েক পা হাঁটলেই,পাঁচিলের দেওয়াল ঘেঁষে ফুচকার স্টল। বেশ বড় স্টল।তিনজন ছেলে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছে।তবুও দিয়ে উঠতে পাচ্ছে না।টিফিন আওয়ার,তাই এত ভিড়।সৌম্যদীপ দেখে বুঝতে পারল স্কুলের সব ছেলে-মেয়েই এখান থেকে ফুচকা খায়।সৌমদীপ আর দু'জন পুলিশ এগিয়ে গেল স্টলটির দিকে।অনেক ছাত্রছাত্রী ঘিরে আছে স্টলটিকে।বড়,ছোটো মিলিয়ে সব ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা আছে। সৌম্যদীপ রা সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই,স্টলের একটা লম্বা করে, হানি সিং স্টাইলে কাটা চুলের ছেলে বলল,-"আসুন স্যার! চঞ্চলদার স্পেশাল ফুচকা।"
ঢং ঢং ঢং করে স্কুলের ঘন্টা পড়ল।তার মানে টিফিন আওয়ার শেষ।একটু একটু করে ভিড় কমতে শুরু করবে এবার।প্রশান্ত,সৌম্যদীপের দিকে তাকিয়ে বলল,-"স্যার,সামনের ওই ফাঁকা স্টল টি তে চলুন না।এখানে যা ভিড়!"
সামনে একটা ফুচকার স্টল নয়।দু'টো ফুচকার স্টল।কিন্তু সেখানে কেউ নেই।এক,দু'জন আছে। কিন্তু তারা খাচ্ছে কম,গল্প করছে বেশি। প্রশান্তের কথায় সৌমদীপ হেসে বলল,-" আরে! এত ব্যস্ত কিসের?এখানকার ফুচকা নিশ্চয় খুব ভাল।নইলে এত ভিড় হয় নাকি?"
পাশ থেকে একটা,ক্লাস এইট কি, নাইনের মেয়ে হেসে বলল,-"পুলিশ কাকু,এই স্টলের ফুচকা সব থেকে বেস্ট।একবার খেলে বুঝতে পারবেন।"
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সৌম্যদীপ হাসলো।ভিড় এখন অনেকটাই কমেছে।সৌম্যদীপরা একদম স্টলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।একটা বেঁটে ফর্সা মতো ছেলে তিনজনের হাতে তিনটে পাত্র দিল। না,আলাদা তো তেমন কিছুই নেই।ফুচকা যেমনই লাগে ঠিক তেমনই লাগলো সৌম্যদীপের।আরও কয়েকটা ফুচকা খাওয়ার পর,হানি সিং চুলের ছেলেটিকে সৌম্যদীপ জিজ্ঞেস করলো,-"তোমার এই ম্যাজিক টা কি?"
ছেলেটি ফুচকা দিতে দিতে বলল,-"কি ম্যাজিক স্যার!"
-"এই যে,পাশে দু'টো ফুচকার স্টল আছে।কিন্তু স্কুলের সব ছেলে মেয়ে গুলো তোমার স্টলের ফুচকা খায়।"
ছেলেটি ফুচকার মধ্যে আলু দিতে দিতে বলল,-"চঞ্চল দার ফুচকা,এ এলাকায় পরিচিত নাম। বিয়ে বাড়ি,থেকে যেকোনো অনুষ্টান বলুন, চঞ্চলদার ফুচকা পাবেন।আর আমি স্কুলের ছেলে-মেয়েদের এক দু'টো বেশিও দিই ভালোবেসে,তাই ওরা আমার এখানেই আসে।"
-"ওহ! তো,তুমিই কি সেই চঞ্চল দা?"
ছেলেটি হেসে বলল,-"হ্যাঁ,স্যার।আমার নাম চঞ্চল দাস।"
দু'জনের কথার মাঝে,প্রশান্ত বিশ্বাস বলল,-" এই একটু টকজল দাও তো দেখি বেশী করে।"
-"স্যার, আসলে টকজল কমে এসেছে, আর এখনও অনেক বাকি, তাই একটু অল্প করে দিচ্ছি।কিছু মনে করবেন না স্যার।" বলল ছেলেটি।

দশটা করে ফুচকা খাওয়া হয়ে গেছে তিন জনের।আরও একটা নিয়ে সৌম্যদীপ বলল,-"এত ফুচকা কখন তৈরী করো?"
-"ভোর থাকতেই কাজে লেগে যাই স্যার।আমার বাড়িতেই তৈরী করি। তারপর সাড়ে ন'টা বাজতেই এখানে চলে আসি।"
-"বাহ! তাহলে তো আপনার ফুচকা বানানো দেখতে হয়।পরিষ্কার-পরিছন্ন করে বানাও তো? তবে কোনো অনুষ্টানে আমিও অর্ডার করতে পারি!"
-"সে বিষয়ে একদম ভাববেন না স্যার।আপনি নিজে গিয়েও দেখে আসতে পারেন।"
সৌম্যদীপ হেসে বলল,-"আচ্ছা,এবার ফুচকা বন্ধ করো।পনেরো টা হয়ে গেলে।আর তোমার ফোন নাম্বার টা দাও।আমি ফোন করে নেব।
ছেলেটির নাম্বার নিয়ে ফোনে সেভ করে নিল সৌম্যদীপ ।তারপর টাকা মিটিয়ে,রাস্তার একপাশে রাখা জিপ গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

(৩)

-"অনেক দিন পর আপনার ইচ্ছেতে ফুচকা খাওয়া গেল।"সামন্ত বলল।
জিপ গাড়ি পিচ রাস্তা ধরে থানার দিকে চলেছে।এবড়ো খেবড়ো রাস্তা।ঢিমে তালে চলছে গাড়িটা।সৌম্যদীপ একটু চিন্তা গ্রস্থ হয়ে বলল,-" একটা জিনিষ লক্ষ্য করেছো সামন্ত ,স্কুলের ছেলে মেয়ে গুলো কিন্তু আর কোথাও যায় না।শুধু ওই স্টল থেকে ফুচকা খায়।
বেশ ইন্টারেস্টিং!"
ইস্টারেস্টিং এর কোনো কিছু খুঁজে পেল অন্য দু'জন।এপাশ থেকে বিশ্বাস বলল,-"পরিচিতি স্যার!কেউ একবার পরিচিতি পেয়ে গেলেই এমন হয়।আর দু'একটা ফুচকা ফাউ দিলে তো বাচ্চারা সেখানে যাবেই।"
-"তাই?"
-"তা,নয় তো কি!অনেকদিন থেকে ফুচকা নিয়ে বসছে তো,নতুন কেউ এলে সেখানে চান্স পাওয়াই মুসকিল।"
সৌম্যদীপ হেসে বলল,-"তা ঠিকই বলেছো, বিশ্বাস।"

থানার সামনে এসে থামলো জিপ গাড়ি।গাড়ি থেকে নামলো তিনজন।তারপর থানার ভেতর ঢুকে গেল।

পরদিন আবার গাড়ি নিয়ে বের হল সৌমদীপ।নতুন সাব-ইনেস্পেকটর হওয়ার এই একটা জ্বালা।প্রতিদিন একবার এ থানা,ও থানা, সে থানা করতে হয়।এলাকা ঘুরে দেখতে হয়। যদিও ঘুরতে বেশ ভালোই লাগে সৌম্যদীপের।আজকে তার সাথে শুধু সামন্ত আছে।স্কুলের সামনে দিয়ে গাড়ি যেতেই, গাড়িটি কে থামাতে বলল সৌম্যদীপ।ড্রাইভার রাস্তার একপাশে দাঁড় করালো গাড়িটা।
সামন্ত ,সামনে ঝুঁকে গিয়ে বলল,-"কি হল,স্যার?"
সৌম্যদীপ হাসল।বলল,-"আজ ফুচকা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না?আমার তো ইচ্ছে করছে।"
-"ইচ্ছে তো করছে।কিন্তু, কাজ টা!"
সৌমদীপ জিপ থেকে নেমে বলল,-"কোনো কিন্তু নয়! আগে ফুচকা,পরে কাজ।"

সুবীর কুমার সামন্ত ও গাড়ি থেকে নেমে পড়ল সৌম্যদীপের পেছনে পেছনে। তারপরসৌম্যদীপ কে উদ্দেশ্য করে বলল,-"আপনি,ছাত্র জীবনে যে ফুচকা পাগল ছিলেন, সেটা এখন দেখেই বোঝা যাচ্ছে।"
কিছু বলল না সৌম্যদীপ।হাসল শুধু।
দু'জন ফুচকা স্টলটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কয়েকটা একদম বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে ফুচকা খাচ্ছে। সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়ে এরা।স্টলের ছেলে গুলো চিনতে পারলো দু'জন কে দেখে।
সৌম্যদীপ নিজে হাতেই একটা পাত্র তুলে নিয়ে হানিসিং চুলের ছেলেটির দিকে চেয়ে বলল,-"তোমার ফুচকার জবাব নেই ভাই। দেখো,আবার টেনে আনলো আমাদের।"
ছেলেটি একটি ফুচকা ফাটিয়ে তার মধ্যে আলু দিতে দিতে বলল,-"বললাম না,স্যার চঞ্চলদার ফুচকা সেরা।এই জন্যেই তোসবাই আমার এখানে খায়।কোনো অনুষ্টানে দরকার পড়লে, ফোন করবেন।"

আজ বেশী খেল না।সকালে খেয়েই ডিউটি তে বেরিয়েছিল সৌম্যদীপ। কিন্তু ফুচকা দেখে
আর লোভ সামলাতে পারলো না।মনে হচ্ছে যেন,ফুচকা তাকে টানছিল।পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে সৌম্যদীপ ছেলেটিকে হেসে জিজ্ঞেস করলো,-"কত দিন এই স্কুলের সামনে একা রাজ করছো?"
ছেলেটি ভেবে বলল,-"তা,স্যার প্রায় বছর তিনেক হয়ে গেল।"
-"ওহ।"
সৌম্যদীপ টাকা বের করে ছেলেটির হাতে দিতে গেল।ছেলেটি নিতে চাইল না।-"না,স্যার আজ থাক না।অন্যদিন দেবেন।"
অনেকটা জোর করেই টাকা গুলো ধরিয়ে দিল সৌম্যদীপ ।আজকাল পুলিশের ড্রেসে বাজারে কিছু কিনতে গেলে অনেক দোকানি দাম নিতে চায় না।কিন্তু সৌম্যদীপ সেটা পছন্দ করে না। ছেলেটিকে টাকা মিটিয়ে আবার জিপ গাড়িতে চেপে বসল দু'জন।ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।

(৪)

বেশ কয়েকদিন পর।নিজের রুমে চোখ বন্ধ করে বসে আছে সৌম্যদীপ।নিঝুম হয়ে ভাবছে।শেষ পর্যন্ত তাকেও টানছে! ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে তার কাছে।বেশ ভাবাচ্ছে ও।
কি হতে পারে?কি এমন ম্যাজিক?
অনেক রাত পর্যন্ত ভাবলো সৌম্যদীপ।অনেক রকম সন্দেহ,উত্তর,মনের কাছে পেয়েছে।বেশির
ভাগ পছন্দ হয়নি তার।কিন্তু একটা সন্দেহ তার বেশ মনে ধরেছে।আর সন্দেহটা যদি ঠিক হয়, তবে তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার।হতেই পারে এরকম। না,হওয়ার তো কিছু নেই।যদি সত্যিই এরকম হয়! তাহলে তো সর্বনাস! না,মনে সন্দেহ রাখা একদম ঠিক না।সারারাত এপাশ-ওপাশ করে ভোরবেলা সুবীর কুমার সামন্ত কে ফোন লাগালো সৌম্যদীপ।-"হ্যালো! স্যার বলুন।"ফোনের ওপার থেকে বললো সামন্ত।
সৌম্যদীপ বলল,-"চঞ্চল দাস! ফুচকা!মনে আছে তো?তাড়াতাড়ি ওর বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করো।"
-"কেন! কি হল!"
-"পরে বলছি।তুমি ওর বাড়ির সামনে গিয়ে আমাকে ফোন করবে।"
-"আপনার কাছে তো,ওর ফোন নাম্বার আছে।ফোন করে জেনে নিতে পারেন।"
-"না,ফোন করলে হবে না।তুমি তাড়াতাড়ি কাজ টা করো।"
সকাল পৌনে সাত টার সময় ফোন এল সৌম্যদীপের কাছে।সামন্তর ফোন।ফোনেই ঠিকানা বলে দিল সামন্ত।প্যান্ট টা পরে, জামাটা মাথায় গলালো সৌম্যদীপ।তারপর ড্রাইভার কে ডেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।থানা থেকে আরও দু'জন পুলিশ কে তুলে নিল।পনেরো মিনিট পর নির্দিষ্ট ঠিকানায় জিপ গিয়ে থামলো।সামন্ত দাঁড়িয়ে আছে।
সৌম্যদীপ জিপ থেকে নেমে বলল,-"কোন বাড়ি টা?"
ডান হাত দিয়ে রাস্তার ওপারের বাড়িটা দেখিয়ে দিল সামন্ত।পুলিশ দু'জন কে বাড়ির গেটের কাছে দাঁড়াতে বলল সৌমদীপ।তারপর সামন্ত কে উদ্দেশ্য করে বলল,-"চলো,আমার সাথে।"
সৌমদীপের পিছন পিছন ছুটলো সামন্ত।
ঘরটা ছোটো নয়।মোটামুটি বড়।সেই ঘরে ঢুকে ছেলেটি কে চিনতে পারল সৌম্যদীপ। আরও কয়েকজন আছে।সম্ভবত এরা বাড়ির লোক।
ফুচকা তৈরী করছে সবাই।এত সকালে পুলিশ কে দেখে থতমত খেয়ে উঠে পড়ল চঞ্চল।বলল,-"স্যার!আপনি এখন!ফোন করে আসবেন বলেছিলেন.......!"
সৌম্যদীপ হেসে বলল,-"না,তেমন কিছু নয়।এ পথেই যাচ্ছিলাম, শুনলাম এটাই তোমার বাড়ি।তাই ভাবলাম একটু দেখা করেই যাই।"

চঞ্চল হাসার চেষ্টা করল।কিন্তু সে হাসি ভয় পেয়ে
হাসির মতো দেখাল।সারা ঘরটাতে চোখ ঘোরাল সৌম্যদীপ।ঘরের এক কোনে শুকনো ডাল-পালা,শুকনো কাঠের নীচে একটা প্যাকেট দেখতে পেল।সেই দিকে এগিয়ে গেল সৌম্যদীপ।চঞ্চল ছুটে গেল।হেসে বলল-"স্যার ও দিকে,কিছু নেই।ডাল পালা।"
সামন্ত কে ডেকে সৌমদীপ প্যাকেট টা দেখিয়ে বের করার নির্দেশ দিল।শুকনো ডাল-পালা সরালো সামন্ত।একটা নয়,চার-পাঁটপ্যাকেট।সব গুলোই টেনে বের করলো সে।
-"কি আছে,ওর ভেতর বের করো?"সৌম্যদীপের নির্দেশ।
চঞ্চল ভয়ার্ত সুরে বলল,-"কিছু নেই স্যার। ময়দা....।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা প্যাকেট খুলে ফেলল সামন্ত।ভেতরে আরও ছোটো ছোটো সাদা প্যাকেট। তার মধ্যে থেকে একটা তুলে নিয়ে সৌমদীপের হাতে দিল সামন্ত।প্যাকেট টা ভালো করে দেখলো সে। ভেতরে সাদা সাদা গুড়ো গুড়ো কি আছে।সেটা খুলে কিছুটা হাতের
উপর নিল কিছুটা।তারপর হাতটা নাকের কাছে আনলো।যা ভেবেছিল ঠিক তাই।
"হেরোইন!"
চঞ্চলের দিকে তাকিয়ে তার জামার কলার টা ধরে সৌমদীপ বলল,-"তাহলে তোর ফুচকার জনপ্রিয়তার রহস্য এটাই।হেরোইন মিশিয়ে ফুচকা তৈরী! বাচ্চা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে গুলো
কে এই ভাবে শেষ করছিস?"
এক ধাক্কায় জামার কলার ছাড়িয়ে নিল চঞ্চল। পালাবার চেষ্টা করেও পালাতে পারলো না।বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ ধরে ফেলল তাকে।সৌম্যদীপ কড়া সুরে নির্দেশ দিল,-"সব কটাকে ধরে থানায় নিয়ে চল।আর প্যাকেট গুলোকেও গাড়িতে তোলো।"
গাড়িতে যেতে যেতে সৌম্যদীপ সামন্তকে বলল,-"ফুচকা ম্যাজিক টা দেখলে! কেন ওই স্কুলের বাচ্চা গুলো প্রতিদিন ওই একই স্টলের ফুচকা খায়!দিন দিন ওরা নেশা গ্রস্থ হয়ে পড়েছে।"

সত্যিই!ভাবা যায় না।আমি তো বাচ্চা গুলোর কথা ভাবছি। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল সামন্ত।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.