একটি প্রেমের ছোটগল্প "বৃষ্টির আকাশ "



একটি প্রেমের ছোটগল্প "বৃষ্টির আকাশ "

গল্পপড়ুয়া ফেসবুক পেজে লাইক করুন : https://www.facebook.com/golpoporuya


(১)

আমার কথায় দেবু মাথা উপর-নীচ করলো। বলল,-" যে কেসে এখন পড়েছিস, সত্যিটাই বলে দেওয়া ভাল।"
-" কিন্তু, ভয় করছে আমার। যদি...."
-" আবার যদি কেন ভাই এর মধ্যে। এক দিন আলাদা করে ঢেকে সব খুলে বল।"
-" সেটাই ভাবছি। বলতেই হবে কথাটা। কিন্তু...।
খ্যাঁক করে উঠে দেবু। -" আবার কিন্তু কি? সত্যি টা তো জানবেই।"
আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলি। বুকের ভেতর থেকে শুকনো হাওয়া বেরিয়ে আসে যেন।

গ্রীষ্মের সন্ধ্যা। এখন সন্ধ্যা ঠিক বলা যায় না। আবার বিকেল ও নয়। একটা মাঝামাঝি অবস্থান চলছে। আকাশে হলুদ, লাল, কালো রঙের অনবদ্য মিশেল। যেন কোনো এক বিখ্যাত চিত্রকরের আনমনা হাতের তুলির টান। ভারী সুন্দর লাগে দেখতে। আমি তাকিয়ে থাকি। বিকেলে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকলে, রঙবাহারি দেখা যায়। ক্লাবের সামনে সবুজ মাঠের উপর বসে আছি আমরা। একটা শান্ত বাতাস দুলকি চলে ভঙ্গিতে ঘাসের মাথা ছুঁয়ে আমাদের গায়ে এসে লাগছে। কিন্তু আমার কি অবস্থা হবে!

আমার নাম ও আকাশ। আকাশ কুমার মিত্র। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। আমার আগে একজন দিদি আছে। আমার থেকে বছর দুয়েকের বড়। এখনো বিয়ে হয়নি। তার নাম মেঘলা। আবার আমি যাকে ভালো বাসি, তার নাম বৃষ্টি। কি অবস্থা ভাবুন! এই মেয়েকে আমি বিয়ে করে আনলে,আমাদের বাড়িটি হবে আবহাওয়া দপ্তরের হেড অফিস। যেখান থেকে প্রতিদিন আকাশ, মেঘলা না, রৌদ্রজ্জ্বল ; বৃষ্টি হবে কি হবে না- তার লাইভ টেলিকাস্ট করা হবে। যাইহোক সে অনেক পরের কথা। এই মুহুর্তে  উপরের আকাশে যতই রঙের মেলা থাকুক না কেন, আমার মনে কালো আলকাতরার মতো কালো প্যাচপেচে রঙ।

মাঠের ঘাস গুলো বেশ লম্বা। একটা সবুজ ঘাসের শিস ছিঁড়ে নিয়ে চিবোতে চিবোতে বলি,-" আমি সত্যিই ভালোবাসি রে।"
দেবু আমার দিকে তাকায়। বলে,-" জানি রে বাবা। তাই বলছি, গরুর মতো ঘাস না চিবিয়ে একদিন আলাদা ভাবে দেখা করে সব বুঝিয়ে বল।"
আমি মুখ থেকে ঘাস ফেলে দিই। কিছুক্ষন চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। আকাশের গায়ে সাদা পাউডার ছড়িয়ে এপ্রান্ত থেকে ও প্রান্তে একটা রকেট চলে যায়। রকেট চোখের আড়ালে চলে যেতেই, দেবুর দিকে ফিরে বলি,- যদি ভুল বোঝে!"
-" কিছু ভুল বুঝবে না।"
-" ভয় করে। যদি ও খুব আঘাত পায়। "
-" তোকে তো বলতেই হবে। না বললে ও দিন ধরা পড়ে যাবি।"
-" হু। ভাবছি। অন্য কোনো প্লান করা যায় না?"
-"ভেবে কোন লাভ নেই। কি প্লান?"
-"যদি অসুস্থতার ভান করে, ওদিন না যাই; কেমন হয়?"
-" ওই  ভুল টা আর করিস না। একটা মিথ্যে ঢাকতে, আর কত মিথ্যের জাল বুনবি? তার থেকে সত্যি টা বলে দে।"
-" হ্যাঁ বলবো।"

কালো হয়ে আসে চারিদিক। মাঠের ঘাস গুলোও রঙ পরিবর্তন করে। ক্লাবের পাশে ঝুরি নামা বুড়ো বট গাছ টিতে  ঘরে ফেরা পাখিদের বিচিত্রানুষ্ঠান শুরু হয়। দুজন উঠে পড়ি। বাড়ির দিকে পা বাড়াই।


(২)

বৃষ্টির সাথে আমার প্রথম দেখা এক বৃষ্টির বিকালে। সেদিন ছিল শনিবার। কিছু জিনিষ ভোলা যায় না। আবার কিছু জিনিষ মন থেকে আপনা আপনি মুছে যায়। আমিও ভুলিনি সেই প্রথম দেখার দিন। এই পাঁচ মাস পর আজও পরিষ্কার মনে আছে।

কলেজের একটা বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিলাম। ঠিক বেরোবার মুখের আকাশ কথা বলে উঠল। চিৎকার করে ডেকে উঠল। সাইকেল টা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি, উত্তরের কোনে কালো মেঘ জমছে। গাছ-গাছালি সব ঝিমিয়ে আছে। তখনই ভেবেছিলাম বৃষ্টি আসবে। আসেনি বৃষ্টি। বৃষ্টি এল মাঝ রাস্তায়। প্রথমে টিপ টুপ টাপ। তারপর ঝমঝমিয়ে। আসেপাশে কোনো  খোলা দোকান দেখতে পেলাম না। সাইকেলের গতি বাড়ালাম। কিছুটা এগিয়ে যেতেই একটা দোকান পড়ল। সাইকেল টা কোনোরকমে স্ট্যান্ড দিয়ে, সামনে ঢালু হয়ে নেমে আসা দোকানের শেডের নীচে ঢুকে পড়লাম। আরও দু'-তিন জন দাঁড়িয়ে আছে। নজরে পড়ল আমার।হঠাৎ বৃষ্টিতে পুরোটাই ভিজে গেছি। মাথাটা হালকা করে ঝাঁকাতেই জল ছিটকালো। তখনই মেয়েটিকে দেখলাম। আমার দিকে চোখ মোটা করে তাকিয়ে আছে। একটা শক লাগলো আমার মনে ভেতর। কি অদ্ভুত মায়াভরা চোখ! কি রুপ!  চোখ ফেরানো যায় না। হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম আমি। মেয়েটিও বৃষ্টিতে ভিজে গেছে। কানের পাশ দিয়ে ভেজা চুল, মেয়েটির খোলা পিটের উপর এসে পড়েছে। ভেজা চুল, ভেজা ঠোঁট, ভেজা চোখের পাতা, ভেজা পিট, ভেজা ত্বক- আমিও ভিজে উঠলাম মেয়েটিকে দেখে। আমার মন ভিজে গেল। চমক ভাঙলো মেয়েটির ধমকে।
-" হাঁ করে তাকিয়ে আছেন কেন? আস্তে মাথা ঝাঁকাতে পারছেন না। জল এসে লাগছে।"
-" সরি!" কাল্পনিক জগত থেকে ধপাস করে বাস্তবে এসে পড়লাম।

বেশ কিছুক্ষন কেটে যায়। বাইরের দিকে তাকাই। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা কালো পিচের রাস্তার উপর পড়ে গলে যাচ্ছে। প্রতিটা বৃষ্টির ফোঁটায় যেন আমি, মেয়েটির মুখ দেখতে পাচ্ছি। আড় চোখে একবার মেয়েটির দিকে তাকালাম। মেয়েটিও বৃষ্টি দেখছে। ও কি বৃষ্টির মধ্যে আমার মুখ দেখতে পাচ্ছে? ধুর কি ভাবছি এসব!
ঘড়ির দিকে তাকায় মেয়েটি। আনমনে বলে,-" কখন যে থামবে বৃষ্টি টা!" তার মুখে একটা বিরক্তিকর চিহ্ন ফুটে উঠে।
-"যে জোরে বৃষ্টি পড়ছে, আরও ঘন্টা খানেক ধরে চলবে বলে মনে হয়।" আমি বলি।
আমার দিকে তাকায় মেয়েটি। আমি হাসি মুখের পজ দেওয়ার চেষ্টা করি। মেয়েটি চোখ ফিরিয়ে আবার বাইরের বৃষ্টি দেখে। কিছুটা হতাশ হই আমি। তবে হাল ছাড়িনা আমি।
-" কোথায় যাবেন আপনি?" আমি জিজ্ঞেস করি।
-" হেলিকপ্টার মোড়। আপনি?" বলে মেয়েটি।
-"আমি, রেল গেট।"
-"ওহ।" মেয়েটি আর কথা বাড়ায় না।

আমার নির্নয় ভুল ছিল। দশ মিনিট পর বৃষ্টি ধরে আসে। মেয়েটি বলে,-" কি হল, বৃষ্টি যে থেমে গেল! আপনি যে ঘন্টা খানেকের কথা বলেছিলেন।"
যেখানে মুখে কিছু বলা যায় না, সেখানে ফিক করে হেসে দেওয়াটাই বেটার। মেয়েটির কথায় আমিও হাসি। তারপর দোকানের শেডের নীচে থেকে বের হয়ে রাস্তার উপরে দাঁড়াই।মেয়েটির ও সাইকেল আছে। আমি লক্ষ্য করিনি। দোকানের দেওয়ালের পাশ থেকে সাইকেল টা নিয়ে সিটের উপর চেপে বসে মেয়েটি। দুজন সাইকেল চালাই জলভেজা রাস্তার উপর দিয়ে।

আমার বাড়ি রেল গেটের গাছে। রেল গেট টা পেরিয়ে যে রাস্তাটা ডান দিকে ঢুকে গেছে, তার প্রথম বাড়িটা আমাদের। রেল গেট যেতে গেলে হেলিকপ্টার মোড়ের উপর দিয়ে যেতে হয়। সাইকেল চালাতে চালাতে গল্প করি দুজন।
-" আপনার নাম টাই কি জানা হলো না!" হেসে জিজ্ঞেস করি আমি।
-" বৃষ্টি। বৃষ্টি বিশ্বাস। আপনার?" বলে মেয়েটি।
নিজের নাম বলি আমি।-" আমি আকাশ।"
মেয়েটি অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়। ভুরু কোঁচকায়।-" বেশি স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করবেন না।"
-"মিথ্যে বলিনি। সত্যি বলছি, আমার নাম আকাশ।"
-"কি করেন?"
-"গতবছর গ্রাজুয়েশন শেষ হল।গান করি। গীটার বাজাই।"
-"শখ না প্রফেশন? "
-"শখ বলতে পারেন। তবে প্রফেশন আলাদা আছে।"
-" কি,সেটা?"
-" তেমন কিছু নয়। এখন একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করি। ভালো কাজ। আর সরকারি চাকরীর পরীক্ষার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছি।"
-" বাবা! আপনি তো অনেক কিছু করেন!"
মুচকি হাসি আমি। তারপর জিজ্ঞেস করি,-" আপনি কি করেন?"
-" এবছর থার্ড ইয়ার শেষ হল। জ্যুলজি অনার্স। এবার এম.এ করবো।"


হেলিকপ্টার মোড় এসে যায়। সাইকেল থামায় বৃষ্টি। আমিও থেমে যাই। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলে,-"আপনার গান শুনবো একদিন।"
-" ওকে। আবার দেখা হয়ে যেতে পারে কোনো দিন। পাশাপাশি ই তো থাকি। " আমি বলি।
বৃষ্টি হেসে, সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয়। চোখের আড়াল হয়ে যায় এক মুহুর্তে।

বাড়ি ফিরে ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুক টা লগ ইন করি। ও কে পাব ফেসবুকে! বৃষ্টি বিশ্বাস লিখে সার্চ করি। প্রথমেই নামটাই এসে যায়। যেন নামটি আমারই সার্চের অপেক্ষায় ছিল। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাই। রাতের বেলা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট হয়। মনটা পাখির মতো উড়ে যায়। মেসেজ লিখে পাঠাই। -" হাই! আমি আকাশ।"
তিরিশ সেকেন্ড পর রিপ্লাই আসে। সাথে একটা স্নাইলি।-" বুঝতে পেরেছি।"
-" কিভাবে পারলে?"
-" যেভাবে সবাই পারে।"
খসখস করে টাইপ করি আমি।-"কি করছো।"
-" নাথিং। সবেমাত্র খেয়ে উঠলাম। ইউ?"
-" আমিও নাথিং। খেয়ে জাস্ট শুয়ে পড়লাম।"
সাথে একটা স্মাইলি পাঠালাম।
রাত একটা বেজে কুড়ি মিনিট। তবুও ফোনের কীবোর্ডে খসখস আওয়াজ চলছে। দুটোর সময় শুভরাত্রি জানায় বৃষ্টি। আমিও জানাই। ঘুমিয়ে পড়ি দুজন।

দিনের পর দিন কেটে যায়। বেশ কয়েকমাস পেরিয়েও যায়। আপনি ছেড়ে তুমি হয়। ফেসবুক ছেড়ে ফোন। আমি ভালোবেসে ফেলি বৃষ্টি কে। আমি জানি, বৃষ্টিও আমাকে খুব ভালোবাসে। প্রতিদিন বিকেলে সাইকেল নিয়ে যখন বৃষ্টিদের পাড়ায় ঘুরতে যাই, তখন দেখতে পাই বৃষ্টি কে। বারান্দায়, কখনো বা, পাড়ার মোড়ে, পাড়ার মেয়েদের সাথে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টিকে দেখলে, আমার আকাশে বৃষ্টি নামে। রিমঝিমে বৃষ্টি। ভিজিয়ে দেয় সারা শরীর। কেঁপে উঠি যেন আমি।

সেদিন রাতে বৃষ্টির ফোন আসে। সবেমাত্র খেয়ে শুয়েছি। আলোটা এখনো অফ করা হয়নি। ফোনটা রিসিভ করে, আবার উঠে আলোটা নিভেয়ে দিই। -"বলো। খাওয়া হল?"
-" হু।তোমার?"
-"আমার ও। এই জাস্ট তোমাকে ফোন করতে যাব ভাবছিলাম আর তুমি আমাকে ফোন করলে।"
-"ভালো লাগছে না।"
মেয়েদের হঠাৎ হঠাৎ মন খারাপ করে জানি। আমার যে করে না, তা নয়। আমি বলি,-" কেন?  কি হল আবার?"
-" তোমার গান শুনে ইচ্ছে করছে। ফোনের মধ্যে শুনে শুনে আর ভালো লাগে না। "
-" তাই বুঝি?"
-"চলো না, কোথাও ঘুরে আসি। কোনো নির্জন জায়গায়। সেখানে তুমি আমাকে গান শোনাবে।"
-"আচ্ছা, কোথায় যাবে?"
-" যেখানে কেউ যায় না।"



হেলিকপ্টার মোড় দিয়ে একটা বড় পিচের রাস্তা চলে গেছে বারুইপুরের দিকে। সেই রাস্তা দিয়ে ১৫ মিনিট সাইকেলে গিয়ে ডান দিকে একটা চওড়া খোয়া বিছানো রাস্তা মাঠের উপর দিয়ে উত্তর দিক ধরেছে। রাস্তাটা শেষ হয়েছে একটা প্লাটফর্মে। চাঁদখালি হল্ট। এখনো চালু হয়নি প্লাটফর্ম টি। কোনো ট্রেন থামে না। ফাঁকা মাঠের উপর একাকী পড়ে আছে প্লাটফর্ম টি। বিকালে আমরা সেখানে যাওয়ার মনস্থির করি।

বিকাল চারটে। এখনো রোদের তেজ কমেনি। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমি। বৃষ্টিদের গলির সামনে গিয়ে ও দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে অবাক হয়ে বলে,-" এই তুমি গীটার নাও নি? গান শোনাবে কি করে?"
-'এই রে!  তোমার সাথে প্রথম বেড়াতে যাওয়ার আনন্দে সব ভুলে গেছি। সরি বৃষ্টি। আচ্ছা, পরে কোনোদিন হবে।"
বৃষ্টি হেসে বলে,-" পরের বার যেন কোনো ভুল না হয়।"
-"জি ম্যাডাম।" আমি মুচকি হাসি। তারপর দু'জন সাইকেলে এগিয়ে যাই।

একটা বন্ধ টিকিট ঘর,আর দুটো হালকা সবুজ রঙের প্লাস্টিকের ছাউনি প্লাটফর্ম টির উপর। পিছনের দিকে কোমর সমান ইট দিয়ে গোল করে ঘেরা নারকেল গাছের সারি। গাছ এখনো ছোটো। দুপাশেই খোলা সবুজ মাঠ। একটা ছাউনির নীচে, সিমেন্টের তৈরী করা বসার জায়গা। সেখানে গিয়ে বসি দু'জন। রোদ পড়ে এসেছে মাঠের উপর। গরুর পাল চরে বেড়াচ্ছে। কয়েক জন লোক লাঠি হাতে বসে আছে মাঠের মধ্যে। গরু চরাচ্ছে। দখিনের দিকের খোলা মাঠের উপর দিয়ে বিকেলের বাতাশ হু হু করে ছুটে আসছে। বৃষ্টি আমার দিকে তাকিয়ে বলে,-"একটা গান শোনাও এবার।"
-"কি গান শুনবে বলো!"
-"রবীন্দ্রসঙ্গীত।"
একটু ভাবি আমি। তারপর গান শুরু করি।
" কী আনন্দ, কী আনন্দ, কী আনন্দ
দিবারাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ –
সে তরঙ্গে,ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে
তাতা থৈথৈ , তাতা থৈথৈ, তাতা থৈথৈ।।
মম চিত্তে নৃতে নৃত্যে কে যে নাচে........।

আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে বৃষ্টি।
-"কি হল!" বলি আমি।
-"তুমি সত্যিই ট্যালেন্টেড। এত ভালো গান করো, গীটার বাজাও, আবার চাকরী ও করো!"
-"আর একটা কথা বললে না?"
-" কি কথা?"
-" আমি তোমাকে ভালোও বাসি।"

একটু একটু করে সন্ধ্যা নেমে আসছে মাঠ জুড়ে। দূরের গ্রাম গুলো কালো আসে। আর আমার দিকে সরে আছে বৃষ্টি। খুব কাছে। একহাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে নিজের গলার কাছে টেনে নেয়। ফিসফিস করে বলে, -"আমিও তোমাকে ভালোবাসি।"
শরীর কাঁপে। আমার গলা ধরে আসে। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলি,-" জানো, আমার এটা বিশ্বাস হয় না। আমার মতো এরকম একটা বাজে দেখতে ছেলেকে, তুমি ভালোবাসতে পারো!"
-" ভালোবাসা ওভাবে হয় না। তোমাকে আমার ভালো লাগে, তোমার সাথে আমার সারাদিন কথা বলতে ইচ্ছে হয়, তোমার মন খারাপ থাকলে, আমার মন খারাপ হয়....এটাই ভালোবাসা। আর তুমি সত্যি খুব ভালো গান গাও।" বৃষ্টি হাসে। ঝরঝরে বৃষ্টির মতো।
-"আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?"
-" কখনোও না। তবে কোনোদিন আঘাত দিও না যেন।"
-"সত্যিই আমাকে ভালোবাসো, বৃষ্টি!"
-" বিশ্বাস হচ্ছে না তো? আচ্ছা বিশ্বাস করিয়ে দিচ্ছি। "

আমার মুখের কাছে বৃষ্টির মুখ। ঠোঁটের কাছে ঠোঁট। হাত - পা কাঁপতে থাকে আমার। হার্ট ফেল করবো বলে, একবার মনে হয় আমার। অজ্ঞান হয়ে যেতেও পারি। তবে তার আগেই বৃষ্টি ভেজা ঠোঁট এসে আমার ঠোঁট কে ভিজিয়ে দেয়। নিস্তব্দ হয়ে যাই আমি। লাল বলের মতো সূর্য টাও সেই সময় মাঠের ওপারের গ্রাম গুলোর মাঝে ডুব দেয়।

(৩)

আমি অনেক বার চেষ্টা করেছিলাম সত্যিটা বলতে। সম্পর্ক যত গভীর হয়েছে, তত আমি চেষ্টা করেছি কথা টা বলে দেওয়াই ভালো। কিন্তু বৃষ্টিকে হারানোর ভয়ে বলতে পারি নি যে, আমি গীটার বাজাতে পারি না। আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করি। আমি চাকরীও করি না। বাবার হোটেলে বসে খাই, আর ক্লাবে আড্ডা মারি। কোনো চাকরীর প্রস্তুতি, কোনো ইনকামের ধান্দা নেই অমার জীবনে।

আমার বন্ধু প্রীতম ভালো গীটার বাজায়। কলকাতায় গীটার শিখতে যায়। লম্বা লম্বা চুল প্রীতমের। আবার একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে ডাটা এন্ট্রির কাজ করে। প্রীতম বলে, একটা ছোটো খাটো চাকরী, আর  হাতে গীটার থাকলে মেয়েরা পাগল হয়ে ওঠে। পটাতে হয় না, পটে যায়। আর আমি কি করি? আমি শুধু গান করি। তাও আবার হারমোনিয়াম। কোথায় হারমোনিয়াম আর কোথায় গীটার!
তাই বৃষ্টিকে দেখার পর, ও কে পাওয়ার জন্যে মিথ্যে কথা বলি। তারপর একটু একটু করে অনেকবার কথা টা বৃষ্টি কে বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারি নি। ও যদি চলে যায় আমাকে ছেড়ে! আমাকে আর ভালো না বাসে!

আজ সেই পরিস্থিতির তৈরী হয়েছে। ধরা পড়ে গেছি আমি। এখন কি বলবো? ঘটনাটা খুলেই বলি। দিন কয়েক আগে বৃষ্টির ফোন আসে।
আমি ফোন তুলতেই বৃষ্টি বলে,-" সামনের রবিবার তুমি ফাঁকা আছো?"
-" হ্যাঁ আছি।  কেন?"
-" রবিবার সকালে আমাদের বাড়িতে একটা অনুষ্টান আছে। তোমাকে গীটার বাজিয়ে গান গেয়ে শোনাতে হবে। বাবা- মা কে বলেছি, আমার কলেজের এক বন্ধু খুব দারুন গান করে। "
-" কি! গীটার বাজিয়ে গান!"
-" একদম না করবে না। তুমি আমায় গীটার শোনাবে বলেছিলে।"
-" না মানে..আমি.."
-" কোনো এক্সকিউজ নয়। তুমি রবিবার আমাদের বাড়িতে আসছো, এটা কর্নফাম।"
ফোন কেটে দেয় বৃষ্টি। আমি আহত পাখির মতো চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ি। আর এক দিন পর রবিবার। কি করবো আমি?

দেবু সত্যি কথাটা বলতে বলেছিল। কিন্তু বৃষ্টি সত্যি টা শুনলে খুব আঘাত পাবে। ও নিজেই আমাকে বলেছিল,যেন কোনোদিন আঘাত না দিই। অনেক ভেবে চিন্তে আবার একটা পরিকল্পনা মাথায় আসে আমার। এটাই বলবো বলে ঠিক করি। শনিবার রাত এগারোটার দিকে ফোন করি বৃষ্টি কে। ফোন রিসিভ হয়। ওপার থেকে বৃষ্টির গলার আওয়াজ পাই। -" বলো।"
-" বৃষ্টি, গান প্রাকটিস করতে গিয়ে, এখুনি আমার গীটারের কর্ড ছিঁড়ে গেছে। কি হবে এখন? খালি গলায় করলে হবে না?"
বিরক্ত হয় বৃষ্টি। -"কি যে করো না! গীটার বাজাও না, যুদ্ধ করো? "
-" আমি কি করব বলো!"
-" চিন্তা করো না! তুমি কাল এসো তো। আমি একটা গীটার জোগাড় করে রাখব।"
-"অ্যাঁ! না মানে, বৃষ্টি আমার কথা শোনো..."
আমাকে থামি দেয় বৃষ্টি। বলে,-" কোনো কথা শুনবো না। তুমি কাল আসবে। আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব।"
ফোনটা কেটে যায়। আমার মাথা ধরে আসে। কাল ওর বাড়িতে গিয়ে প্রথমেই আলাদা করে সব বলতে হবে। নইলে সন্মানের এক ছিঁটে ফোঁটাও বাকি থাকবে না।

(৪)

বৃষ্টিদের বাড়িটা দোতলা। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এল টাইপ প্যাটার্ন। আমি পাঁচিলের গেট খুলে ভেতরে ঢুকি। কলিং বেল টিপি। বৃষ্টি এসে দরজা খুলে দেয়। ভেতর থেকে অনেক কথা- বার্তার আওয়াজ পাই। দরজা দিয়ে ঢুকতেই ডান দিকে উপরে ওঠার সিঁড়ি। বৃষ্টি হেসে বলে,-" আমরা তোমার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।"
বৃষ্টির মা এগিয়ে আসে আমাদের দিকে। বলে-' দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরো চলো। তোমার গান শোনার জন্য সবাই অপেক্ষা করে আছে। এই বৃষ্টি, আকাশ কে ভেতরে নিয়ে যা।"
কথাগুলো বলে বৃষ্টির মা, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। কিছু বাচ্চা বাচ্চা ছেলে মেয়ে এসে আমার চারিদিকে জড়ো হয়। বৃষ্টি বলে,- চলো। "
ঘরের ভেতর এগিয়ে যায় বৃষ্টি। কথাটা বলতে পারি না। আমার বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ শুরু করে দিয়েছে। আমি বৃষ্টির পিছন পিছন অনাসৃষ্টির মতো ঘরের ভেতরে যাই।


এত বড় একটা শক খাবো আমি নিজেই বুঝতে পারিনি। সোফার পাশে একটা টি পয় টেবিল রাখা। তার উপর হালকা গোলাপি বেড কভারের উপর একটা হারমোনিয়াম বসানো। অবাক হয়ে বৃষ্টির দিকে তাকাই আমি। চোখে দিয়ে ইশারা করে ওখানে বসতে বলে বৃষ্টি। আমি তবুও দাঁড়িয়ে থাকি। বৃষ্টি বলে,-" কি হল, যাও তোমার মিউজিক ইনস্ট্রুমেন্ট তো রেডি।"
কি করে জানল বৃষ্টি! আমার মাথা ঘোরে।কাঁপা কাঁপা পায়ে গিয়ে বসে পড়ি। সবার সাথে আলাপ হয়। অনেক গল্প হয়। একটু ভয় কেটে গেছে আমার। হালকা জল-খাবারের পর বেশ কয়েকটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনাই। বৃষ্টির অনুরোধে আরও কয়েকটা গান গাইতে হয়। সবাই বেশ তারিফ করে আমার। বিশেষ করে বৃষ্টি মা।

এই মুহুর্তে দোতলার বারান্দায় আমি আর বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছি। আর কেউ নেই। চুপ চাপ আমি।  ওর মুখের দিকে তাকাতে পারছি না। নিজেরই লজ্জা লাগছে। সামনের পাঁচিলের গায়ের কাঁঠাল গাছটির দিকে তাকিয়ে থাকি। নীরবতা ভেঙে বৃষ্টি কথা শুরু করে।-" তোমার সাথে পরিচয় হওয়ায় কিছু মাস বাদে আমি জানতে পারি তুমি সব মিথ্যে বলেছো। তোমার পাড়ায় আমার এক কলেজের বান্ধবী থাকে, তার থেকেই জেনেছি। তখন রাগ হয়েছিল খুব। কিন্তু তোমাকে আমি ছেড়ে যেতে পারিনি। খুব ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তাই আমি চাইতাম, তুমি নিজেই আমাকে সত্যিটা খুলে বলো।"
 -"সত্যি টা আমিও বলতে চেয়েছি বার বার তোমাকে।  কিন্তু এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলাম তোমায় যে,তোমাকে হারানোর ভয়, তোমাকে আঘাত দেওয়ার ভয় আমাকে পিছু টেনে রেখেছিল। অনেক চেষ্টা করেও আমি পারছিলাম না তোমাকে সত্যিটা বলতে।" বৃষ্টির মুখের দিকে তাকাই আমি।

বৃষ্টি ও আমার দিকে তাকায়। শান্ত চাহনি। ঠোঁটের কোনায় হাসি। আমার ও হাসি। কিছুসময় এক ভাবে তাকিয়ে থাকি দুজন। বৃষ্টিই কথা বলে,-" এর পর থেকে আর কিছু লুকাবে না।"
আমি হেসে বলি,-" জি ম্যাডাম।"

দুটো ঘুঘু পাখির ঝটপটির শব্দ আসে কাঁঠাল গাছের পাতার ভেতর থেকে।



স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.