একটি ছোটগল্প 'মেঘনা '


একটি ছোটগল্প 'মেঘনা '







'মেঘনা '







সকাল ন'টা।ভয়ে ভয়ে হসপিটলের পনেরো নাম্বার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো মেঘনা। ভেতরে তেরো নাম্বার বেডে চোখ রাখলো।জল বেরিয়ে এল চোখ দিয়ে.......

(১)

ছাদের উপর দাঁড়িয়ে একমনে আকাশটিকে দেখছিল মেঘনা।নীল সাদা আকাশ।থোকা থোকা জুঁই ফুলের মতো সাদা মেঘেরা দল বেঁধে উড়ে চলেছে।কোথায় যায় এরা?কোথা থেকে আসে?কি করে ভেসে থাকে?মেঘনা জানে না, মেঘ থেকে কি করে সৃষ্টি হয়।কি ভাবে ভেসে চলে মহাশূন্যে।আগে জানতো।স্কুলে পড়ার সময়।এখন আর সেসব মনে নেই।
মেঘনার মনে প্রশ্ন জাগে।কই মানুষ তো আকাশ দিয়ে আকাশ দিয়ে ভেসে যেতে পারে না!একটু থমকে গিয়ে জিভ কাটলো মেঘনা।মানুষ না পারলেও সুপারহিরো রা পারে।সেদিন অভীকের সাথে বসে টিভি দেখতে দেখতে সে দেখেছিল। কি যেন একটা হিন্দি সিনেমা।নামটা মনে পড়ে না মেঘনার।একটা কালো মুখোশ পরা মানুষ উড়ে উড়ে যাচ্ছিল।
তাই দেখে অভীক বলেছিল,সুপারহিরো রা উড়ে যেতে পারে।মানুষ পারে না।কয়েক মিনিট ধরে, অভীকের কথা টা নিয়ে ভেবেছিল মেঘনা। মানুষ কেন পারে না?সুপারহিরো ও তো মানুষের মতো। তাদের ও দু'হাত,দু'চোখ, দু'পা,দু'কান, ...মানুষের মতো কথা বলে, তাদের ও গার্লফ্রেন্ড আছে,বউ আছে।তবে মানুষ কেন পারে না?মনে মনে অনেক চেষ্টা করেছিল উত্তর খোঁজার।উত্তর পায়নি মেঘনা।
তবে,মেঘনার খুব ইচ্ছে করছিল,অভীকের সাথে হাত ধরে আকাশে ভেসে থাকতে।অভীকের পরনে নীল ড্রেস।মুখে লাল মুখোশ।তারপর দু'জন উড়ে চলে যাবে মেঘের দেশে।বসে গল্প করবে দু'জন।মেঘেদের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটবে। কে আগে যেতে পারে! মনে মনে একটা কপ্লনার চিত্র এঁকে নিয়েছিল মেঘনা। তারপর আবার টিভির পর্দায় চোখ রেখেছিল।

মেঘনার, মেঘ খুব ভাল লাগে।তবে,মন ভার করা মেঘ নয়।মন ভালো করা মেঘ।কালো কালো মেঘ মন ভার করে দেয়।ওদের মনে অনেক দু:খ।তাই ওরা কাঁদে।আর সাদা গুলো মন ভালো করে দেয়।মেঘেরাও মন ভালো করে দেয়!সবার দেয় কি না জানে না মেঘনা।তবে মেঘনার মন ভাল করে দেয়।তাই প্রতিদিন ছাদে উঠে একদৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেঘেদের ভেসে যাওয়া দেখে।নিজেও মনে মনে মেঘের সাথে ভেসে যায়।তবে মাঝে মাঝে কালো মেঘের সাথেও ভেসে যেতে ইচ্ছে করে মেঘনার। কারন কালো মেঘে বৃষ্টি হয়।মেঘনার ইচ্ছে করে ভাসতে ভাসতে হিমালয়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তে।বা,উড়তে উড়তে আমাজনের বুকে ঝর ঝর ঝর শব্দে...বরিষণ।মেঘ থেকে বৃষ্টি হয় মেঘনা জানে।দশম শ্রেনীতে ভূগোলের শিক্ষক পড়িয়েছিল।তারপর ইচ্ছে থাকলেও আর পড়াশুনা এগোয়নি।এগারো ক্লাস পড়ার পরই ইতি টেনে দিয়েছিল।মেঘনার, বৃষ্টি হয়ে অভীকের উপর ঝরে পড়তে ভালো লাগে। ভিজিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।কিন্তু অভীকের বৃষ্টি একদম ভালো লাগে না।অভীক বলে,যাদের বাইরে বেরোতে হয় না, তারাই ঘরে বসে বৃষ্টি দেখে নেকামি করে।কাব্যি করে।কবিতা লেখে। কি এমন ভালো লাগা আছে বৃষ্টিতে?অভীকের কথায় মন গুমরে বসেছিল মেঘনা।সারা দুপুর। কিছু খায়নি।
সেই দিন বিকেলে বৃষ্টি নেমেছিল।বিকেল ঠিক নয়।সন্ধ্যের একটু আগে।চারিপাশ সাদা করে বৃষ্টি।বৃষ্টির সাথে হালকা হাওয়া।অল্প আলো চারিদিকে।মেঘনার হাত ধরে ছাদের উপর উঠেছিল অভীক।আসে পাশের ছাদে কেউ নেই। বৃষ্টির দাপটে উত্তর দিকের নারকেল গাছের ডাল নুইয়ে এসে পড়ছিল ছাদের উপর। অভীকের অনাবৃত বৃষ্টি ভেজা শরীর,এই প্রথম ছুঁয়ে দেখেছিল মেঘনা।শরীর ছুঁতেই একটু কেঁপে উঠেছিল সে।তারপর চোখ বন্ধ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অভীকের বুকে।অভীক ও আদর করে দিয়েছিল বৃষ্টির মধ্যে।কিছুই মনে পড়ছিল না তাদের।সব ভুলে গিয়েছিল,তারা এখন কোথায়? শুধু অভীকের ঠোঁট ঘুরে বেড়াচ্ছিল, মেঘনার, ঠোঁট,গাল, কপাল,ঘাড়ের উপর।ভাগ্যিস আসেপাশের ছাদে কেউ ছিল না। নইলে, কেলেঙ্কারির একশেষ হত! সেদিনের কথাটা ভাবলে মেঘনার মন হেসে ওঠে।একটু একটু লজ্জাও করে।তা করুক।একটু লজ্জা করা ভাল।লজ্জা পেলে রোমান্টিসিজম ভালো হয়।


আকাশ ভেঙে বিকেলের রোদ নেমেছে।ক্ষনে ক্ষনে রঙ বদলাচ্ছে আকাশের শামিয়ানা। অনেকটা মডেলিং করা মেয়েদের শাড়ীর মতো। শেষ বিকেলের একটা ঠান্ডা হাওয়া উড়ে আসছে বড় ঝাঁকড়া বকুল গাছের উপর দিয়ে। হাত দু'টো কে দু'দিকে ছড়িয়ে দেয় মেঘনা। একটা আলিস্যি ছাড়ে।পাশের ছাদে একটা বাচ্চা ছেলে ঘুড়ি উড়াচ্ছে।সেই ঘুড়ির দিকে তাকায় মেঘনা। যেন একটা পাখি, আকাশে কোলে লাফাচ্ছে।ওই যা কেটে গেল! মেঘনা হাত উঁচু করে হাসে বাচ্চাটির দিকে ফিরে।বোকার মতো কিছুক্ষন আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে নীচে নেমে যায় বাচ্চাটি।
সন্ধ্যা নামে আকাশ লাল করে।কাজ থেকে অভীকের ফেরার সময় হয়ে গেছে।একটা কোম্পানির ম্যানেজার পদে কাজ করে অভীক। বেশ ভালো কাজ।মাইনেও মন্দ নয়।বিয়ের আগে অন্য একটা কোম্পানি তে কাজ করতো অভীক।অতিরিক্ত খাটুনি,আর বসের খিটখিটানির জন্যে ছেড়ে সে চাকরী ছেড়ে দিয়েছে।এখন নতুন কোম্পানি,তাই একটু দেরি করে বাড়ি ফেরে।আরও কিছুক্ষন ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে মেঘনা।আজ অভীকের মা-বাবা কেউ বাড়িতে নেই।বড় ছেলের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছে। তাই একটু বেশিক্ষন ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে মেঘনা। সন্ধ্যার পরের আকাশ টা আরও মায়াময় লাগে। স্ট্রিট লাইট গুলো দপ করে একসাথে জ্বলে ওঠে।সেই চিত্র চোখে বাঁধিয়ে রাখে মেঘনা।মনে হয় কালো কাগজে,রঙিন তুলির টান।......কখন আসবে অভীক টা? ভালো লাগে না মেঘনার। বিরক্ত হয়ে নীচে নেমে যায়।



(২)

বন্ধুর দাদার বিয়ের রিসেপসানে গিয়ে প্রথম মেঘনা কে দেখেছিল অভীক।অভীকের বন্ধুর নাম সুমন।কলেজের সব থেকে কাছের বন্ধু,তাই নিমন্ত্রনে আর না করতে পারিনি অভীক।সুমনের বৌদির ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি।সদ্য যুবতী।পরনে আকাশি নীল রঙা শাড়ি।শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে ব্লাউজ।ফর্সা মোমের মতো মুখের উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে।মাথায় ঘন কালো চুল।কিছু চুল ঘাড়ের পাশ দিয় ঘুরে এসে বুকের উপর পড়েছে।একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল অভীক।চোখ সরাতে পারছিল না।বার বার চোখ চলে যাচ্ছিল মেয়েটির দিকে।লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট বলে যদি কিছু থাকে,অভীকের মনের মধ্যে সেই রকম কিছু একটা গোলমাল পাকালো।সুমন কে কাছে ডেকে নিল অভীক।বলল,-"এই,ওই মেয়েটি কে রে?তোর বৌদির পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে।"
-"ওর নাম মেঘনা।আমার পাশের বাড়ির রমেন কাকুর মেয়ে।"বলল সুমন।সুমন একটু চলে যেতেই,আবার মেয়েটির দিকে তাকালো অভীক। চোখ সরাতে ইচ্ছে করলো না।
কি মায়াময় চোখ! ওই চোখের অতলে ডুবে যেতে ইচ্ছে করলো অভীকের।

অভীক তখন মাস্টার ডীগ্রী কমপ্লিট করে,সদ্য নতুন কোম্পানি যোগ দিয়েছে।বাড়ি থেকে বিয়ের কথা বলছিল তার বাবা-মা।মেঘনার কথা মা কে বলল অভীক।প্রথম দেখায় মেঘনা কে তাদের পছন্দ হলেও,পরে না করলো অভীকের বাবা-মা।বিয়েতে রাজী হতে চাইলো না।জোর করল অভীক।-"মা, আমি মেঘনা কে ভালবেসে ফেলেছি।"
অভীকের কথায় হাসলো তার মা।ছেলেকে ডেকে হেসে বলল,-"তুই বিয়ে করবি,তোর পছন্দ হলেই হল।আমরা আর কত দিন!"
এরপর একটা শুভ দিন দেখে ধুমধামের সাথে বিয়ে হয়ে গেল অভীকের।



অভীকদের দোতলা বাড়ি।অাবির রঙের উপর হালকা নীল রঙের বর্ডার টানা।বিয়ের পর এ বাড়িতে এসেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল মেঘনার।
মেঘনার বেডরুম টা দোতলায়।দখিনের জানালার ওপারে খোলা আকাশ।ফুরফুর করে হাওয়া ঢোকে।চুল টা ছেড়ে দিয়ে,খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে মেঘনা।মনে মনে অভীক কে নিয়ে হারিয়ে যায় ওই আকাশের মধ্যে।অনেক স্বপ্ন আঁকে। ফুল সজ্জার প্রথম রাতে,অনেক গল্প করেছিল অভীক।নানা রকম গল্প।ওদিন রাতে একটু ভয়ে ভয়ে ছিল মেঘনা।শুধু ভয় নয়।ভয় আর টেনসন মিলিয়ে মিশিয়ে।আজ রাতে কি করবে অভীক!অভীক কিছুই করিনি।অনেক রাত অবধি গল্প করেছিল।অন্ধকারে অভীকের মুখের দিকে চেয়ে গল্প শুনে ছিল সে।তারপর ভোর রাতের দিকে অভীকের গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিল।

একদিন পরের রাত।সেদিন রাতে বৃষ্টি পড়ছিল। ভ্যাপসা গরমের পর হালকা বৃষ্টি।এরকম গরমের পর হালকা বৃষ্টি হলে বেশ ভালো লাগে। একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আসে।সন্ধ্যা থেকেই আকাশে মেঘের দৌড়াদৌড়ি দেখেছিল মেঘনা। তখনই ভেবেছিল বৃষ্টি আসবে।অবশেষে বৃষ্টি এল।বৃষ্টি এল রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর।শোয়ার সময়।মাথার সামনের জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে,অভীকের পাশে এসে শুয়ে পড়ল মেঘনা। তার দিকে তাকিয়ে আছে অভীক।ভুরু নাচালো মেঘনা।
-"আলোটা!"
আবার উঠে পড়ল মেঘনা।অলোর সুইচ টা অফ করে দিয়ে,আবার অভীকের পাশে এসে শুয়ে পড়ল।মেঘনা কাছে আসতেই জড়িয়ে ধরল অভীক।আচমকা আক্রমনে একটু অবাক হলেও,বেশ খুশি হল মনে মনে।গালে, ঠোঁটে চুমু খেলো অভীক।ধীরে ধীরে মুখ টা বুকের উপর নেমে এল।কেঁপে উঠল মেঘনা।চোখ বন্ধ করে রইল।ব্লাউজের হুকে হাত দিল অভীক। একটা একটা করে খুলে ফেলল।মেঘনার লজ্জা করছিল খুব।চোখ খুলতে পারলো না।বেশ কিছুক্ষন আঁচড়,কামড় চলার পর,অভীক বলল,-"আমাকে ভালোবাসবে তো মেঘনা?"
মেঘনা নিশ্চুপ।পরম আদরে অভীকের মাথাটা নিজের বুকে জোরে চেপে ধরল।বাইরে বৃষ্টির শব্দ।আর ভেতরে দু'টো শরীর মিশে গেল। প্রথমবার।

বিয়ের মাস খানেক কেটে গেছে।প্রতিদিন জানালা দিয়ে খোলা  আকাশের দিকে তাকিয়ে এইসব কথা মনে পড়ে,খিল খিলিয়ে হেসে ওঠে মেঘনার মন।বেশ ভাল লাগে তার।

অভীকদের বাড়িতে মেম্বার বেশি কেউ নেই।শুধু অভীকের বাবা আর মা।দাদা বৌদি অন্য জায়গায় থাকে।মা -বাবা কে নিজের কাছে রেখেছে অভীক।প্রথমে মেঘনা কে পছন্দ না করলেও,এখন নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসে।মেঘনা কে রান্না করতে দেয় না অভীক।রান্নার জন্যে একজন লোক রেখে দিয়েছে।মেঘনা শুধু হেল্প করে।




(৩)

বাইরে থেকে দরজার হ্যান্ডেল টা ধরে একটু টেনে ছেড়ে দিলে,ভেতরের ছিটকিনি চা খুলে যায়।প্রতিদিনের মতো দরজা খুলল অভীক।
আজ আর মেঘনা কে ডাকলো না।দরজা টা খুলে একটু দাঁড়ালো।বুকের ভেতর একটা চিনচিনে যন্ত্রনা শুরু হয়েছে।দম নিতে একটু অসুবিধা হচ্ছে।তার শ্বাস কষ্টের সমস্য যে ছিল না,তা নয়।সে অনেক বছর আগে।ডাক্তার দেখানোর পর  আর কোনোদিন হয়নি। অনেকদিন পর আজ যেন কষ্ট হচ্ছে।
অফিসের লাস্ট আওয়ারে বুকের কাছে একটা ব্যাথা করে উঠেছিল অভীকের।অতটা আমল দেয় নি।কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে যন্ত্রনা টা বেড়েছে।

ভেতরে ঢুকে সোফার উপরে বসে পড়ল অভীক। মেঘনা ছুটে এসে প্রতিদিনের মতো অভীকের বুকের উপর মাথা দিল।হাসল অভীকের দিয়ে চেয়ে।অভীক ও হাসার চেষ্টা করল।কিছুসময় পর মেঘনা উঠে চা করতে গেল।দশ মিনিট পর দু'কাপ চা আর ঠান্ডা জল এনে অভীকের পাশে বসল সে।অভীক বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে বসে আছে।ঠান্ডা জল খেতেই একটু আশ্বস্ত হল অভীক।চায়ের কাপে চুমুক দিল।এখন অনেক টা ভাল লাগছে।আর দমের কষ্ট নেই।

ঘটনাটা ঘটল রাত দু'টোর সময়।দু'টো ও হতে পারে,আড়াইটে ও হতে পারে।মেঘনার ঘুম ভেঙে গেল একটা যন্ত্রনার শব্দে।চোখ খুলে দেখল অভীত কাতরাচ্ছে।ঝটপট উঠে আলোটা জ্বালিয়ে দিল মেঘনা।খাটের উপর অভীকের কাছে এসে এসে দেখল,তীব্র যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে অভীক।বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে।কি করবে, কিছুই বুঝতে পারলো না মেঘনা।অভীকের মাথাটা কোলের উপর তুলে, করুন আকুতি তে বলতে চাইলো,-"কি হয়েছে তোমার?এরকম করছো কেন?"
মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুলো না মেঘনার।আবার একটা  তীব্র কথা বলার চেষ্টা।তবুও কিছু বলতে পারলো না।কি করে পারবে সে?মেঘনা জন্ম থেকেই বোবা।মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ ই করতে পারে না।আর এই জন্যেই অভীকের বাবা-মা প্রথমে বিয়ে রাজী হতে চায় নি।কিন্তু অভীক যে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল।

খাটের উপর যন্ত্রনায় ছটফট করছে অভীক। মেঘনা খাট থেকে নেমে,টেবিলের ড্রয়ারের ভেতর থেকে ফোন নাম্বারের ডায়রী টা বের করলো।খুঁজে খুঁজে অভীকের দাদার বাড়ির নাম্বার টা বের করলো।তারপর ছুটে গেল টেবিলের দিকে।একটা ল্যান্ডফোন রাখা টেবিলের উপর।নাম্বার ডায়েল করলো মেঘনা। রিং হয়ে গেল।কেউ ওঠালো না।তিনবার রিং হওয়ার পর ওদিকে ফোন ওঠালো অভীকের মা।-"হ্যলো কে?"
মেঘনা মুখ দিয়ে বলার চেষ্টা করলো,আমি মেঘনা।কিছুই বেরুলো না তার মুখ দিয়ে।বার কয়েক হ্যালো হ্যালো করে ফোন রেখে দিল অভীকের মা।চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে মেঘনার।আবার ডায়েল করলো নাম্বার।এবার ফোন ওঠালো অভীকের বাবা।-"হ্যালো কে!"
পাগলের মতো ফোনের সামনে হাত দিয়ে শুধু অঙ্গ ভঙ্গি করে বোঝানোর চেষ্টা করলো মেঘনা। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলো না।ফোনের ওপার থেকে,শুনতে পেলো,অভীকের বাবা বলছে,-"ছোটো বাবুর কিছু হয়নি তো?হয়তো বৌমা ফোন করেছে।কিছু বলতে পারছে না।"
একটু আশার আলো দেখলো মেঘনা।ফোন কানে ধরে,মাথা উপর নীচে করতে লাগলো। তার মানে 'হ্যাঁ'।কিন্তু কে বুঝবে তার কথা!

ফোন রেখে ছুটে গেল অভীকের পাশে।মাথাটা বুকের কাছে চেপে ধরল।মাথা হাত বুলিয়ে দিল।কিছুতেই কিছু হল না।এক এক বার ছুটে গেল বারান্দায়।যদি কাউকে দেখতে পায়! কি করবে সে?কিছুই তো চেনে না।কোথায় যাবে? কার কার কাছে যাবে,এত রাতে?অভীকের মাথার কাছে এসে বসে পড়ল,মেঘনা।কোলের উপর তুলে নিল অভীকের মাথা।চোখবেয়ে জলের ধারা নেমেছে।বুক ফুটে একটা যন্ত্রনা বেরিয়ে আসছে।তবুও মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বলতে পারলো না।অভীকের বুকে, মাথায় হাত বোলাতে থাকলো মেঘনা।মেঘনার মন বলছে, কিছু হবে না তোমার।কিছু হতে দেবো না তোমাকে।আমার ভালোবাসাই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।একটু একটু করে অভীকের শরীর নিস্তেজ হয়ে এল।

ভোর রাতের দিকে,অভীকের বাবা-মা এসে  ছেলে কে হসপিটলে নিয়ে গেল।

(৪)
সকাল ন'টা।ভয়ে ভয়ে হসপিটলের পনেরো নাম্বার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।ভেতরে তেরো নাম্বার বেডে চোখ রাখল।চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল মেঘনার।দু:খের জল নয়। খুশির জল।চোখ মেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে অভীক।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

No comments

Powered by Blogger.