Skip to main content

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম ~ ছোটো গল্প ( স্বদেশ কুমার গায়েন)


(১)
আমি কোনো মেয়েকে বৃষ্টি ভিজতে দেখিনি।  খুব ইচ্ছে করে একটা মেয়েকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখতে।  কোনো এক বিকালে আকাশে খন্ড খন্ড কালো মেঘ জমবে। তারপর ঝম ঝম শব্দে বৃষ্টি নামবে।  শান্ত বৃষ্টি,অঝোর ধারায় নেমে আসবে।মনে হবে, আকাশে মেঘ ভেঙে জলের ধারা নেমে  আসছে। ঠিক যেমন নদীর বাঁধ ভেঙে জল ঢোকে।চারিদিক সাদা হয়ে আসবে। আশেপাশের গাছ পালা গুলো শান্ত শিশুর মতো দাঁড়িয়ে থাকবে। বৃষ্টি ভিজবে তারও।জলভেজা দু'টো ঘুঘু পাখি গুটিশুটি মেরে বসে থাকবে ঘন জলমাখা সবুজ পাতার আড়ালে। চারিদিক শান্ত,নিশ্চুপ।শুধু বৃষ্টির শব্দ।অদ্ভুত সে শব্দ।কান পেতে শুনলে মনের মধ্যে একটা অনুভূতির ঝড় তোলে। মেয়েটি তখন পড়ার  টেবিলে বসে। ক্লাস নোটের খাতা টা বন্ধ করে    দিয়ে,পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাবে। হাত  বাড়িয়ে দেবে বাইরে। এক মুহুর্তে বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে   দেবে তাকে। সারা শরীরে একটা শিহরন। বই-খাতা বন্ধ করে একছুটে সিড়ি দিয়ে উঠে আসবে ছাদের উপর। তখন বৃষ্টির ফোয়ারা ছাদের উপর। ওড়না টা কোমরের কাছে বেঁধে বৃষ্টির কাছে ছুটে যাবে। চোখ দু'টো বন্ধ করে, মুখটা আকাশের দিকে তুলে,হাত দু'টো কে পাখির ডানার মতো মেলে দেবে দু'দিকে। কয়েক পাক ঘুরবে।ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির টোপ তার মোম গলানো মুখের উপর পড়ে ফেটে ফেটে যাবে। চোখের পাতা থেকে টুপ টুপ করে জলে ফোঁটা নেমে আসবে মুখ,পেরিয়ে বুকের উপর। অথবা,ছাদের উপর গোড়ালি ভেজানো জমা জলের উপর দাঁড়িয়ে মেয়েটি জোড়া পায়ে লাফাবে।ঠিক স্কিপিং খেলার মতো। নুপুর পরা পা দিয়ে জল ছিটিয়ে দেবে।তারপর বৃষ্টির শব্দের তালে তালে তার সারা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাচবে।আবোল তাবোল নাচ। সে নাচের স্টেপ হয়তো প্রভু দেবা স্যারের ও অজানা।
যেন এক জলময়ূরী!
আমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে থাকবো।বসেও থাকতে পারি।মুখে মুচকি হাসি। সেই পা দিয়ে ছিটানো জল আমার চোখে মুখে এসে লাগবে। আর দু'চোখ ভরে দেখবো মেয়েটিকে। এতদুর পর্যন্ত ভাবলো অনুপম। আরও কিছুটা হয়তো ভাবতে পারতো।কিন্তু দিদির ধাক্কায় চমক ভেঙে গেল তার।দিদির হাতে একটা প্লেট।প্লেটে কিছু খাবার।সকালের ব্রেকফাস্ট।মুখ বাড়িয়ে দেখল অনুপম।এখনো ধোঁয়া উড়ছে।গরম গরম কচুরী আর আলুর তরকারী। অনুপমের প্রিয় খাবার এটা,বাড়ির সবাই জানে।
দোতলার এই ছোটো ঘর টা অনুপমের।ছোটো ঠিক নয়। মোটামুটি বড়।বেশ পরিষ্কার-পরিছন্ন। দু'মাস হল মাকে বলে এই ঘরে শিফট হয়েছে। আগে নীচের তলার ঘরে থাকতো অনুপম। যদিও দোতলার ঘরে আসার একটা কারন ও আছে। অনুপমের মা বলেছিল,-"না বাবু,একা একা তোকে উপরের ঘরে থাকতে দেবো না।"
অনুপম মায়ের কথার উত্তরে বলেছিল,-"মা,আমি কি এখনো ছোটো নাকি! আর নীচের ঘর টা গুমোট।বাইরের আলো এসে ঠিক মতো ঢুকতে পারে না।"
না,অনুপম ছোটো নয়। অনুপমের বয়ষ এখন তেইশ। তার মা না করেনি। তারপর থেকে দোতলায় এই ঘর অনুপমের।একটা বড় জানালা দক্ষিন দিকে।দরজা দিয়ে ঢুকতেই বাঁদিকে খাট, খাটের পাশের টেবিল রাখা।টেবিলের উপর খাবারের প্লেট টা রেখে অনুপমের দিদি বলল,-"কি রে কি ভাবছিস এত?"
হাসলো অনুপম।-"কই,কিছু না তো!"
-"না,বললে হবে।দিদির কাছে মিথ্যে বলে কোনো লাভ নেই।আমি জানি তুই কি ভাবছিলিস?"
-"কি?"
জিজ্ঞেস করলো অনুপম।
-"তুই ভাবছিস,রুপা কবে ফিরছে?"
অনুপম লাজুক হাসি হেসে বলল,-"মোটেও না।ওর কথা ভাবতে যাব কেন?"
-"জানি,রে জানি,তুই রুপার কথাই মনে মনে ভাবছিলিস। আমি এসে তোকে ডিস্টার্ব করে দিলাম,তাই না? আচ্ছা চলে যাচ্ছি।"
অনুপমের দিদি দরজার দিকে পা বাড়ায়। বেরোনোর আগে একবার থামে।অনুপমের দিকে তাকিয়ে বলে, -"খাবার টা খেয়ে নিবি তাড়াতাড়ি। আমি একটু পরেই আসছি।"
দিদি বেরিয়ে যায়। অনুপম হাতের বই টা খাটের উপর রেখে দেয়। তারপর প্লেট টা হাতে নিয়ে খেতে শুরু করে।
(২)
সকাল থেকেই আকাশ টা মেঘে ঢেকে আছে। ভারী ভারী মেঘ। কোন মেঘ হালকা হয়,কোন মেঘ ভারী হয় সেটা দেখতে পেলেই বুঝতে পারে অনুপম। মেঘেরা কি দু:খ পেলে কাঁদে?আর তখনি বৃষ্টি নামে! না,বর্ষার সময় এলে, মেঘেদের মন ভার হয়!
আকাশের দিকে তাকালে,অনুপমের মেঘ গুলোকে মানুষ বলে মনে হয়। সারি সারি মানুষ গুলো মন খারাপ নিয়ে ভেসে চলেছে।কোথায় যায় এরা? আমেরিকা? না,ব্রাজিল, আমাজনের জঙ্গল? কোথাও না, কোথাও যায়।জানালা দিয়ে বাইরে আকাশের দিকে তাকালে একরকম আবোল তাবোল ভাবে অনুপম। হাবিজাবি যত সব ভাবনা। লাগামছাড়া।
অনুপম খাওয়া শেষ করে প্লেট টা আবার টেবিলের উপর রাখে। জলের বোতল টা হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক জল খায়।তারপর বই টা হাতে তোলে।বই পড়তে ইচ্ছে করে না। শুধু ভাবতে ইচ্ছে করছে। আবার বইটা খাটের উপর রেখে দেয় অনুপম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। একটু পরেই হয়তো বৃষ্টি নামবে।
রুপা,আমাকে মনে পড়ে তোর? না,নতুন বন্ধুদের পেয়ে আমাকে ভুলে গেছিস?
দু'মাস শেষ!
ভাবনার গভীরে ডুব দেয় অনুপম। অনুপমের পাশের বাড়িটা রুপাদের। দোতলার এই ঘরটির জানালা দিয়ে রুপাদের ছাদ টাই শুধু দেখা যায়। অনুপমের ছোটো বেলার খেলার সাথী রুপা।আর বড় বেলার গল্পের সাথী। সেদিন বিকেলে রুপা এসেছিল অনুপমের ঘরে।বলেছিল, -"এরকম বাচ্চা ছেলের মতো করছিস কেন! আমি কি তোকে ছেড়ে সারা জীবনের জন্যে চলে যাচ্ছি?"
-"দু'মাস কম সময়?আমার কাছে দুবছের মতো।"
-"দুর বোকা! আমি পরীক্ষাটা দিয়েই চলে আসবো।"
গ্রাজুয়েশনের পর রুপা বি.এড করছে, অন্ধ্রপ্রদেশের একটা ইউনির্ভারসিটি থেকে। দু'মাস  পরে তার পরীক্ষা। তাই এই দু'মাস রুপাকে  সেখানে গিয়ে থাকতে হবে। সেই জন্যেই চলে যাওয়া।
-"আমাকে ভুলে যাবি না তো?" বলেছিল অনুপম।
অনুপমের থুতনি টা ধরে নাড়িয়ে দিয়ে রুপা হেসে বলেছিল,-"শুধু ভোলা নয়,তোকে ছেড়ে আমি কোনোদিন কোথাও যাব না।এবার তো হাসি মুখে বিদায় দে।"
অনুপম কিছু বলেনি।শুধু হেসেছিল।
হাওড়া স্টেশন থেকে রাতের ট্রেন। রুপা, অন্ধ্রপ্রদেশ চলে যাওয়ার পর দোতলার ঘরে আসার জন্যে বায়না ধরল অনুপম। এঘর থেকে  রুপাদের ছাদ টা দেখা যায়। দোতলায় আসার এটা  একটা প্রধান কারন। জানালা দিয়ে সারক্ষন  রুপাদের ছাদে তাকিয়ে থাকে সে। সেই ছাদে  সকাল হয়,দুপুর হয়,বিকেল গড়ায়,সন্ধ্যা নামে,  রাতে জোছনা আলো খেলা করে। আবার  ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। মনে মনে স্বপ্ন আঁকে  অনুপম। রঙিন ঘুড়ি ওড়ায়। লাল নীল ঘুড়ি।
(৩)
ভোর থেকেই বৃষ্টি নেমেছে। এখনো থামেনি। অবিরাম ধারায়। শান্ত বৃষ্টি। নব্বই ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে বৃষ্টি পড়ে চলেছে।  কোনো ঝোড়ো হাওয়া নেই। আসে পাশের ছাদ,গাছ-পালা গুলো আপন মনে বৃষ্টিতে ভিজছে। অনুপমের ও ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভিজতে।কিন্তু তার মা একদম না করে দেয়। বৃষ্টি ভিজলে নাকি জ্বর আসবে। এ আবার কেমন কথা?
অনুপম ভেবে পায় না।বাইরের উঁচু উঁচু বাড়ি, গাছপালা,রাস্তা ঘাট, ল্যাম্পপোস্ট,সবকিছু বৃষ্টিতে ভিজছে।তাদের তো জ্বর আসে না। কেন জ্বর আসে না তাদের?শুধু মানুষ ভিজলে জ্বর আসে?
হাবিজাবি প্রশ্ন খেলা করে অনুপমের মাথায়। সকালের ব্রেকফাস্ট হয়ে গেছে কিছুক্ষন আগে।  জানালার দিকে মুখ করে বসে আছে অনুপম।হাতে  বই। একটা বাংলা উপন্যাস।এই দু'মাসেও সেটা  শেষ করতে পারিনি।কি করে পারবে?চোখ যে তার  সারক্ষন জানালার বাইরে থাকে।বইটা বন্ধ করে  টেবিলের রেখে দেয়।
রুপা কি এসেছে?
কাল রাতে আসার কথা ছিল রুপার।অনুপম সেটা জানে। কিন্তু সকাল থেকে বৃষ্টিটা যেভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেছে, তাতে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না
-"অনুপম।"
দরজায় একটা খট করে আওয়া হল। পিছন ঘুরে তাকালো অনুপম।
-"আমি এসে গেছি?" হাসি মুখে দাঁড়িয়ে রুপা।
অল্প জলভেজা শরীর।কপালের উপর এলোমেলো কালো চুল গুলো থেকে টুপ টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে।হয়তো বৃষ্টির মধ্যেও বাড়ি থেকে,এবাড়িতে আসতে গিয়েই ভিজে গিয়েছে রুপা। অনুপম মনের মধ্যে যেন একটা ভালোলাগার ঝড় উঠেছে।সেই সাথে বৃষ্টি।হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলো,-"কেমন আছিস তুই? তোর পরীক্ষা কেমন হল?"
-"দুটোই, ভাল।" হাসল রুপা।তারপর অনুপমের পাশে এসে দাঁড়ালো।
বাইরে বৃষ্টির বেগ যেন আগের থেকে একটু বেড়েছে।সেই বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে অনুপম বলল,-"এই বৃষ্টির মধ্যে তুই এলি কি করে? ভিজে গেছিস তো।"
-"চলে এলাম।তোকে দেখতে আমার ইচ্ছে হচ্ছিল না,বুঝি!" রুপা বলল।
তারপর কিছুক্ষন থেমে অনুপমের কাঁধে হাত রেখে রুপা আবার বলল,-" খুব জোর বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে।বৃষ্টি দেখবি?"
অনুপম উপর নীচে মাথা নাড়ালো। তার মানে হ্যাঁ। রুপা বুঝতে পারলো। তারপর হুইল চেয়ার টা ধরে আস্তে করে ঠেলে জানালার একদম কাছে নিয়ে গেল অনুপম কে। জন্ম থেকেই পঙ্গু অনুপম।নিজে নিজে দাঁড়াতে পারে না। একজনের কাঁধে ভর দিয়ে,এক পায়ে দাঁড়াতে হয়।
-'কেমন লাগছে,বাইরের পরিবেশ টা?"রুপা জিজ্ঞেস করলো।
অনুপম রুপার দিকে তাকালো। বলল,-"বৃষ্টি ভিজবো।আমাকে ছাদে নিয়ে চল।"
-"না।একদম না।জেঠিমার বারন।" বলল রুপা।
-"তুই একবার গিয়ে বল,মা বারন করবে না।প্লীজ!" আবদুরে গলায় বলল অনুপম।
ভালোবাসার মানুষের আবদার পুরন করার মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ থাকে। যেটা আর কোনোকিছুর মধ্যে পাওয়া যায় না।'দেখছি' বলে নীচে চলে গেল রুপা।
দু'মিনিট পর আবার এসে ঘরে ঢুকলো।-"পারমিশন হয়ে গেছে।তবে বেশীক্ষন নয়।"
(৪)
হুইল চেয়ার থেকে নেমে এক হাতে রুপার গলার কাছে জড়িয়ে ধরল অনুপম। রুপা একহাত দিয়ে অনুপম কে ধরে রেখেছে।-"আস্তে আস্তে আমাকে ধরে চল।"বলল রুপা।
ওরা দু'জন ছাদে উঠল। মুহুর্তের মধ্যে বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিল। সারা শরীরে একটা শিহরন জেগে উঠল অনুপমের। একটা স্বর্গীয় ভালোলাগা।বৃষ্টির ঝাপটায় অবাধ্য চুল গুলো চোখের উপর নেমে  আসছে অনুপমের।হাত দিয়ে সেগুলো উপরে তুলে দিল রুপা।
অবিরাম ধারায় জল নামছে আকাশে চোখ থেকে। ছাদের কার্নিশ ধরে দাঁড়িয়ে আছে অনুপম।সারা   ছাদে বৃষ্টির ঝম ঝম শব্দ।তার সামনেই দাঁড়িয়ে   আছে রুপা।মুখে হাসি। সাদা সাদা দাঁত গুলো   দেখা যাচ্ছে।ওড়না টা কোমরে বেঁধে নিল  রুপা।  তারপর চোখ দু'টো বন্ধ করে,আকাশের দিকে  তাকিয়ে,হাত দু'টো কে পাখির ডানার মতো মেলে  দিল।কয়েক পাক ঘুরলো।অবিশ্রান্ত বৃষ্টির টোপ  রুপার মোম গলানো মুখের উপর পড়ে ফেটে ফেটে  যাচ্ছে। ছাদের উপর গোড়ালি পর্যন্ত জল জমেছে। রুপা জোড়া পায়ে লাফালো। একবার,দু'বার,তিনবার... অনেকবার।ঠিক স্কুল স্পোর্টসে স্কিপিং খেলার মতো। জল ছিটকে অনুপমের চোখে মুখে এসে লাগছে।আর সেই সাথে এক অসীম ভালোলাগার পরশ।
একদৃষ্টে রুপার দিকে তাকিয়ে আছে অনুপম। হাসি টা মুখে নয়,মনের মধ্যে।এই প্রথম কোনো মেয়েকে সে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখছে।কি যে ভালো লাগছে তার বোঝানোর ক্ষমতা নেই। বৃষ্টির মধ্যে জলপরীর মতো লাগছে রুপাকে।
যেন এক পেখম মেলা ময়ূরী!
অনুপমের খুব ইচ্ছে করছে,রুপাকে কোলে করে উঁচু করে তুলতে। পাগলামো থামিয়ে অনুপমের কাছে এসে দাঁড়ালো রুপা।বুকের ভেতর জড়িয়ে নিল অনুপম কে। খুব জোরে। চারটে চোখে অপলক দৃষ্টি।
নীচ থেকে অনুপমের মায়ের গলার আওয়াজ ভেসে এল,রুপা,এবার নেমে আয়!
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Comments

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি থ্রিলার গল্প " খুনি "

বাংলা থ্রিলার গল্প - ' খুনি '  আমি একটা খুন করেছি। ভুল বললাম,একটা নয় দু'জন কে।নৃশংস খুন যাকে বলে,ঠিক তেমন।তবে খুন টা বড় কথা নয়। খুন তো যে কেউ করতে পারে।আমার মনে হয়েছিল,ওদের দু'জনের বেঁচে থাকা উচিত নয়, তাই খুন করেছি।কিন্তু মজার ব্যাপার হল,পুলিশ আমাকে ধরতে পারছে না।প্রতিদিন পুলিশের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি,খুনি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও বলে দিচ্ছি, কিন্তু তার পরে ও পুলিশের ধরার ক্ষমতা নেই।এই দেখুন,এখন থানায় এসে বসে আছি....। (১) গল্পটা তাহলে একটু আগে থেকেই বলি।বছর খানেক আগের কথা।সেদিন আমাদের বিবাহবার্ষিকী।এক বছর পুর্ন হল আমাদের বিয়ের।সকাল থেকে মন টা বেশ ভালোই।এদিন সবারই মন ভালো থাকে।আমারও আছে।এ দিন এলেই বিয়ের সেই কথা মনে পড়ে।বাড়ি জুড়ে কত মানুষ জন,আলোর রোসনাই,সানাই এর সুর, মেয়েদের উলুধ্বনি,সাত পাকে ঘোরা,শুভদৃষ্টি, কান্নাকাটি আরও অনেক কিছু।সবেমাত্র এক বছর,তাই হয়তো আমার এত কিছু মনে আছে। পুরানো হলে হয়তো থাকবে না।আবার থাকতেও পারে। ভোর থেকে উঠেই ব্যস্ত অসিত।আমার দিকে তার থাকানোর সময় নেই।ঘড়িতে আট টা বাজে। এখনো পর্যন্ত শুধু একটা মাত্র চুমু।ভালো লাগে এরকম! রাতে অসিত