Skip to main content

প্রাক্তন ~ ছোট গল্প ( স্বদেশ কুমার গায়েন)


আবার অনেকদিন পর বাড়িটার সামনে এলাম। তা প্রায় বছর দুয়েক হবে।এর মাঝে একটি বার ও আসেনি।যদিও একসময় এ বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই যাতায়াত ছিল আমার,সেই বাড়িতে আজ আবার দু'বছর বাদে।আসার কোনো ইচ্ছে ছিল না,তবুও এলাম।ইচ্ছে ছিল না! –কথাটা মনে হয় ঠিক বললাম না,আসলেও কোন মুখে আসবো এ বাড়িতে? কিন্তু আজ আর না এসে পারলাম না! খুব জানতে ইচ্ছে করছিল।
কেন এলাম সে কথা না হয় আপনারা পরেই জানলেন!
কোমর সমান উঁচু পাঁচিল ঘেরা,দোতলা বাড়ি। সামনে ঢোকার জন্য লোহার গেট। আগেও ছিল,
কিন্তু পাঁচিলের উপরে মালতীলতা তো ছিল না। ফুল গুলো খুব সুন্দর লাগে দেখতে।আমার খুব প্রিয়।একটু অবাক হলাম,আমার প্রিয় জিনিষ এখনও এ বাড়িতে থাকে?না, এগুলো আমাকে লজ্জা দেওয়ার জন্যই!
গেট পেরিয়েই লাল খোয়া ছড়ানো সরু রাস্তা। রাস্তার বাঁ পাশে ফুলের বাগান।নানা রকমের ফুল, পাতাবাহারের সমাহার। রঙবাহারি! লাল,নীল,সবুজ,হলুদ,সাদা, গোলাপি কত রঙের।বেশিরভাগ ফুলের নাম আমার অজনা।রাস্তার ডান পাশে একফালি ছোটো ত্রিকোন জায়গা।সবুজ ঘাসে ঢাকা। ছোটো ছোটো করে ঘাস গুলো ছাঁটা।তার উপরে দু'টো চেয়ার পাতা।আগেও ছিল,আর প্রত্যেক বিকেলে ওই চেয়ারের একটা আমার দখলে থাকত। নিজের একটা অস্পর্ষ্ট প্রতিচ্ছবি যেন চেয়ারের উপর দেখতে পেলাম।
দোতলা বাড়িটা একই আছে।শুধু রঙ টা বদলেছে।আগের সেই হলুদ রঙ আর নেই।হলুদ বদলে হয়ে গেছে,আকাশী নীল। আর সেই আকাশী নীল রঙের বাড়িটা যেন আকাশের সাথেই মিশে যেতে চাইছে।খুব অবাক হয়ে গেলাম। মনে পড়ে গেল।একদিন বলেছিলাম,–"আকাশী নীল রঙ টা আমার খুব প্রিয়।তোদের বাড়িটা এমন ম্যাড়মেড়ে হলুদ রঙের করে রেখেছিস কেন রে?"
দরজার পাশে কলিং বেল টার কাছে গিয়ে থমকে গেলাম।খুব টেনসন হচ্ছে আমার।বুক ঢিপ ঢিপ করছে। কিন্তু আমি তো চুরি করতে ঢুকছি না! —তবে টেনসন কিসের?
তবুও বুকের ভেতর টা কাঁপছে। কলিং বেল টা টিপতে গিয়ে,হাত সরিয়ে নিলাম।আজ কত দিন বাদে আবার দেখবো।ওর চোখে চোখ রাখতে পারবো?না! সে ক্ষমতা আমার নেই।একসময় ছিল।ঘন্টার পর ঘন্টা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিতে পারতাম।কিন্তু ওর চোখ থাকতো অন্যদিকে। মেয়েদের দিকে নয়,টেবিলের উপর রাখা পাহাড় প্রমান বই গুলোর দিকে।
দু'বার কলিং বেল টিপলাম।টেনসনে এদিক ওদিক ঘাড় ঘোরাচ্ছি। মিনিট খানেক পর সিঁড়ি দিয়ে কারো দৌড়ে নামার আওয়াজ পেলাম। তারপর দরজাটা খুলল।একটা মেয়ে,হাসি মুখে এসে দাঁড়াল।পরনে গোলাপি রঙের নাইটি। বুকের উপর সাদা রঙের ওড়না।হাতে শাখা,মাথায় লাল সিঁদুর।বয়েষ আমারই মতো হবে।ছাব্বিশ কি,সাতাশ!
আমাকে দেখে অনেকটা অবাক হয়ে গেল। হয়তো ভেবেছিল ওর স্বামী অফিস থেকে ফিরেছে। স্বামীর অফিস ফেরার সময়,সব মেয়েরা মনে হয়, এই ভাবে হাসি মুখে গেট খুলতে ছুটে আসে।
–"কাকে চাই?" মেয়েটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
–"আমার নাম রুপা।শুভজিৎ বাবুর সাথে একটু দেখা করা যাবে?"
শুভ বলেই ডেকে এসেছি সবসময়,কিন্তু এই মুহুর্তে শুভজিৎ না বলে পারলাম না।
–"ওহ! ও তো এখনো অফিস থেকে ফেরেনি।আপনি বরং ভেতরে এসে বসুন,এক্ষুনি এসে পড়বে হয়তো!"
আমার মাথায় সিঁদুর,ও হাতে শাঁখা দেখে, বোধহয় মেয়েটি ঘরে ডাকল। নইলে কোনো অচেনা,অবিবাহিতা মেয়ে এসে যদি কারো স্বামীর খোঁজ করে,তবে যেকোনো স্ত্রীর ভুরু কোঁচকানোর কথা।
একটা ধন্যবাদ জানিয়ে,মেয়েটির পেছন পেছন সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম।
–"আপনি,শুভজিৎ কে চেনেন?" মেয়েটি প্রশ্ন করল।
–"হ্যাঁ! চিনবো না কেন?কলেজের বন্ধু আমারা।"
সোফার উপরে বসলাম।
–"ও মা! তাই নাকি? আপনি একটু বসুন,আমি কফি করে আনি।"
মেয়েটির বয়েষ হয়েছে,কিন্তু অল্পবয়েষের সেই
উচ্ছলতা বর্তমান। ঘরের মধ্যে একটা সুমিষ্ট গন্ধ। চারিদিক দেখতে লাগলাম,অনেক দিন পর।সব কিছু পালটে গেছে। কিন্তু একটা জিনিষ পালটাই নি। চারিদিকে শুধু বই আর বই।আগের থেকে অনেক বেড়ে গিয়েছে।
টিভির পাশে একটা ফোটো দেখতে পেলাম,–শুভ, মেয়েটির গলা জড়িয়ে ধরে আছে।বছর খানেক হল শুভ বিয়ে করেছে। খবরটা আমার কানে গিয়েছিল হাওয়ায় উড়ে। তখন দু:খ পায়নি।এখনও পাই না।কেনই বা বিয়ে করবে না? আমি ছাড়া কি আর কোনো মেয়ে নেই পৃথিবীতে!
আপনারা হয়তো ভাবছেন,আমার পুরানো প্রেম আবার জেগে উঠেছে। তাই ছুটে চলে এসেছি। কিন্তু না! আমার আসার কারন টা আলাদা।সেটা এখন বলবো না।
অন্যের সুখের সংসার ভাঙার মতো,–অতটা খারাপ মেয়ে আমি হতে পারব না।
কলেজের দিন গুলো খুব মনে পড়ল এখন।খুব ভালবেসে ফেলেছিলাম ওর চোখ দু'টোকে। তাকানো টা ছিল যেন খুন– খারাপি ধরনের। মুখের হাসিটার মধ্যে যেন একটা রহস্য ছিল।একটা মেয়েকে কাছে টানার জন্যে এগুলো মনে হয় যতেষ্ট নয়, তবুও আমি সেই রহস্যের জালে আটকে পড়েছিলাম।জালের মধ্যে একটা মাছ ধরা পড়লে যেমন হয়,ঠিক আমার ও সেই হাঁসফাঁস অবস্থা হল।বার বার ছুটে যেতাম ওর কাছে।কলেজের লাইব্রেরি তে ওর সামনে বই খুলে বসে থাকতাম। ওর দু'চোখের গভীরে ডুবে যেতাম।আর শুভ চোখ ডুবিয়ে রাখতো বই এর পাতায়।কিছুদিন পর থেকে আর চোখে নয়,ওর ঠোঁটেও ডুব দিতে খুব ইচ্ছে হল। কিন্তু ও যে চাইতো না!
শুভ যে আমাকে ভালবাসতো না,–তা নয়।ও আমাকে পাগলের মতো ভালবাসতো।তবে আমি যেভাবে চাইতাম,সেভাবে নয়। আমি ওকে নির্জন ঘরে একলা পেতে চাইতাম।ওর শরীরে,নিজের শরীর কে মিশিয়ে দিতে ইচ্ছে করতো বার বার।সব ছেলেরাও তো এটাই চায়!
কিন্তু শুভকে দেখে মনে হতো, ও অন্য ছেলেদের মতো নয়।একটু আলাদা।ও যে চাইতো,গোধুলি বেলায় একটু আমার কাঁধে মাথা রাখতে। বিকেলের হলুদ রোদ গায়ে মেখে,ছায়া নিবিড়,শীতল রাস্তার মধ্যে দিয়ে আমার হাত ধরে হাঁটতে ওর নাকি খুব ভাল লাগতো।
আজ বুঝতে পেরেছি,প্রত্যেকের ভালবাসার আলাদা একটা ধরন থাকে। মৌলিকতা থাকে।যেটার জন্যে মানুষটিকে,অন্য মানুষের থেকে আলাদা করে চেনা যায়,মনে রাখা যায়। প্রায় বিকেলে ওদের বাড়িতে ছুটে চলে যেতাম।সামনের সবুজ ঘাসের উপর বসে গল্প করতাম। কিন্তু এরকম বই পাগল ছেলের সঙ্গে কি করে সময় কাটানো যায়?
রাগ করে এতদিন বলেই ফেললাম,–"তুই বই বেশী ভালবাসিস না,আমাকে বেশী ভালবাসিস?" কি বোকা আমি দেখুন! বই কে নিজের সতীন বানিয়ে ফেললাম।
আজ এ কথা ভাবতে,সত্যিই লজ্জা পাচ্ছে।শুভ হেসে বলতো,–"বই।" খুব রাগ হতো।কলেজের তৃতীয় বর্ষে এসে মনটা ঘুরে গেল আমার।
অনেক টা ঘুরতে বাধ্য হল।কেনই বা ঘুরবে না?এরকম একটা বই প্রীতি ছেলের সাথে থাকলে,সত্যিই বোর হতে হয়। বিশেষত আমার মতো মেয়েকে।একটু একটু করে শুভ হারিয়ে যেতে থাকলো।আর সেই জায়গা এসে জুড়ে নিল সৌনক। কাঁধে গীটার,চোখে সবুজ চশমা,
মাথায় স্পাইক করা চুল,–এক কথায় মেয়েদের মাথা ঘোরানো ছেলে।
আমারও মাথা ঘুরে গেল। কলেজের প্রোগামে তার গীটার হাতে পারফর্মেন্স দেখে,পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হল আমার। এক সাথে শুধু,বাংলা(পাশ) সাবজেক্ট এর ক্লাস করতাম। আড়চোখে তাকাতাম।বেশ কিছুদিন পর ভালবেসে ফেলল আমাকে। আমি যেভাবে ভালবাসা পেতে পছন্দ করতাম ঠিক সেই ভাবে।শুভ দুরে সরে গেল অনেক।
আজও স্পর্ষ্ট সেই দিন টার কথা মনে আছে। শুভর সঙ্গে যেদিন,সমস্ত সম্পর্ক কেটে দিলাম, সেদিন ওর দু'চোখে জল দেখতে পেয়েছিলাম। এর আগে কোনো দিন দেখিনি। আমার বুক টিও হাহাকার করে উঠিনি।কি নিষ্টুর আমি!
রাগ করে বলেছিলাম,–"তুই তোর বই নিয়ে থাক।আমি চললাম। তোকে কোনোদিন,কোনো মেয়ে ভালবাসবে না।তুইও কোনো মেয়েকে সুখি করতে পারবি না।"
ও আমায় বাঁধা দেয়নি।কোনো কথা বলেনি।শুধু ওর চোখ দুটো ছলছল করছিল।হতভাগী! এরকম ভুল টা করিস না,–সেদিন একথা টা বলার মতো কেউ ছিল না আমার পাশে।
সৌনক কে বিয়ে করেছি এই দু'বছর হল।কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যে বুঝে গেলাম,'চক চক করলেই সব সোনা হয় না।' সৌনক ছিল সেইরকম,– চক চক করা ইমিটেসনের জিনিষ।
–"কফি!"
মেয়েটি সামনে এসে দাঁড়ালো।হাত বাড়িয়ে কফির কাপ টা নিয়ে একটা চুমুক দিলাম।টি.ভি. টা ছেড়ে দিয়ে বলল,–"আপনি টি.ভি.দেখতে থাকুন।আমি একটু টিফিন বানাই,– ও এলে তিন জন মিলে খাওয়া যাবে।"
মেয়েটি আবার চলে গেল।কই,মেয়ে টি কে তো অসুখি আছে বলে মনে হচ্ছে না! বেশ সুখেই আছে। দেওয়ালের গায়ে একটা ফোটো দেখতে পেলাম।শুভর ফোটো। কলেজ লাইফের।সেই কলেজের মেহগনি গাছের নীচে তোলা ছবি। আজ শুভকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করল।তবে
বিছানায় নয়,–এই দু'বছর বিছানায় অনেক কাটিয়েছি।বিছানার সুখ টা হঠাৎ করেই কবে চলে গেল,বুঝতে পারিনি।আজ খুব ইচ্ছে করল শুভর হাত ধরে হাঁটতে।লাল পলাশের বনের ছায়ায়।হলুদ নদীর বাঁকে। সবুজ ঘেরা তেপান্তরে। জল শালুকের দেশে। লাল কাঁকর ঢাকা উপত্যকায়।উলুখাগড়ার ঘন নির্জনতায়।
কলিং বেলের শব্দে চমক ভাঙল। মেয়েটি ছুটে বেরুলো কিচেন থেকে। সিড়ি দিয়ে ছুটে নীচে নেমে গেল। এবার দরজা খুলেই হয়তো,শুভকে বুকে জড়িয়ে নেবে। তারপর চিবুকে একটা আলতো করে চুমু খাবে।শুভ ও হয়তো মেয়েটিকে জড়িয়ে নেবে। ফর্সা কাঁধের পাশে ঠোঁট ছোঁয়াবে।
ইস!কি সব ভাবছি আমি? আর করলেও বা কি!
কপালে আমার ঘাম জমছে।উপরে ফ্যান ঘুরছে তবুও আমার অসহ্য লাগছে। না! আর বেশীক্ষণ থাকা যাবে না।কথাটা জিজ্ঞেস করেই তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে।রুমাল দিয়ে ঘাম মুছলাম।
মেয়েটি আর শুভ আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।আমাকে দেখে শুভ অবাক হয়ে বলল,–" কেমন আছিস রুপা? অনেক দিন পর দেখলাম।"
–"তোমরা গল্প কর,আমি টিফিন টা আনি!" মেয়ে টি আবার কিচেনে গিয়ে ঢুকলো।
আমি কোনোরকমে শুভর চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বললাম,– "ভাল। তুই কেমন আছিস?"
–"আমি তো ভালই আছি।এই অফিস আর ছোট্টো সংসার।দিব্যি কেটে যাচ্ছে।"শুভ ব্যাগ টা রেখে সোফার উপরে বসে পড়ল।
আমি হেসে বললাম,–" সে তো দেখতেই পাচ্ছি। সুন্দরী বউ পেয়েছিস!"
হো হো হো হো করে হেসে উঠল শুভ।তারপর
বলল,–"তুই একা এলি কেন? সৌনক কে তো সঙ্গে আনতে পারতিস?"
আমিও হাসার চেষ্টা করলাম।শুভর মতো হো হো হো করে নয়।একটা বিষন্ন হাসি।টিফিন এল। কিছুটা মুখে দিয়ে বললাম,–"এবার উঠি রে।রাত
হয়ে এল।"
–"চল তোকে গেট অবধি এগিয়ে দিয়ে আসি।" শুভ আমার সাথে গেট পর্যন্ত এল।কোনো কথা বলতে পারলাম না। আমার যেটা জিজ্ঞেস করার,যেটা দেখার,সেটা দেখা হয়ে গেছে।
–"মাঝে মাঝে এসে ঘুরে যাস।"পেছন দিক থেকে শুভ বলল।
আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।একটু হাসার চেষ্টা করলাম। কিছু বলতে পারলাম না। কি বা বলতে পারতাম? কিছুই না।

বাস স্টান্ডে দাঁড়িয়ে আছি।রাত নেমেছে কালো পিচের রাস্তায়। আকাশে তারা উঠেছে।চুনি বাল্বের মতো ঝিকমিক করছে।বাস আসতে এখনো দেরী আছে।কাঁধ থেকে ব্যাগ টা নামিয়ে, ভেতর থেকে কাগজ টা বের করলাম।ডিভোর্স পেপার। সৌনকের সাথে আজই ডিভোর্স পেপারে সই করে,সেখান থেকে সরাসরি শুভর বাড়িতে চলে এসেছি। না! ওর কাছে আশ্রয় নিতে নয়,–ও কেমন আছে, সেটা দেখার জন্য। চোখে জলের ধারা নেমে এল।কারও চোখের জলের কারন হতে নেই,–আজ সেটা বুঝতে পারলাম।একদিন নিজেকেও কাঁদতে হয়।বাস এসে থামার শব্দ হল।
জল ভরা চোখে উঠে পড়লাম বাসের ভেতর।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

কাশফুল ~ ছোটোগল্প [ Bengali Short Love Story ]

কাশফুল ~ ছোটোগল্প [ Bengali Short Love Story ] — "এবার পূজোয় আসবি তো?" - "কি করব বল! অফিস থেকে একদম ছুটি দিতে চাইছে না।" — "তুই সব সময় অজুহাত দেখাস।" - "বিশ্বাস কর,আমি অফিসার কে অনেক রিকোয়েস্ট করলাম কিন্তু আমাকে সাতটা কথা শুনিয়ে দিল।" —" ভাল লাগে না আমার! কত ভাবি পূজোর সময় তোর হাত ধরে সারা কলকাতা টা ঘুরবো, তোর পাশে বসে অষ্টমীর অঞ্জলি দেব.....।" - "আমার ও খুব ইচ্ছে করে, পূজোটা তোর সাথে কাটাতে।" ফোনের ওপার টা এক মহুর্তের জন্য নিস্তব্দ হয়ে গেল। বললাম—"কি ,রে রাগ করেছিস?" — "না! তোর চাকরীটাই খারাপ। আমি চাকরী টা পেয়ে গেলে তোকে আর ও কাজ করতে দেব না।" - "তাহলে আমার পরিবার, কে দেখবে ?" — "আমি দেখব।" -' আর তোর পরিবার?" - "সেটাও আমি।" — "এত দায়িত্ব নিতে পারবি?" — "তুই আমার কাছে থাকলে, আমি সব পারব।" - "পাগলি একটা!" - "প্লিজ ! আয় না এবার পূজোতে!" - "দেখি একবার শেষ চেষ্টা করে!" —"থাক তোর আসতে হবে না