Skip to main content

গার্লফ্রেন্ড ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]



অনেক'টা জোর পূর্বক ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে রাগে গজ গজ করতে করতে সোফায় এসে বসে পড়লাম। টি.ভি তে নিউজ চ্যানেলটা অন করে বললাম,— "এটা তুই ঠিক করলি না। "
— "কোনটা?"
— "এই যে, আজ যেটা হচ্ছে।"
এবার একটু শুরু থেকে বলি,তাহলে আপনারা বুঝতে পারবেন। তানিয়া আমার গার্লফ্রেন্ড। ওকে ছোট্ট করে তানি বলে ডাকি আমি। ঠিক গার্লফ্রেন্ড বলতে যা বোঝায় ,ও আমার কাছে সেরকম নয় । আসলে ওর বয়ফ্রেন্ড নাকি আমি। সেই অর্থেই ও আমার গার্লফ্রেন্ড। তানি আর আমি একদম ছোটোবেলার বন্ধু। একই ফ্লাটের, পাশাপাশি থাকি আমরা। আমার বাবা আর ওর বাবা একই অফিসে কাজ করত। এক সাথে দুজন বিয়ে করার পর এই ফ্লাটেই উঠেছিল। পরবর্তী তে তাদের বন্ধুত্ব টা আমাদের মধ্যেও প্রসারিত হয়েছিল। তাই ছোটোবেলা থেকে আমার আর তানির মধ্যে অবাধ মেলামেশা। ও আমার পড়াশুনা, খেলাধুলা, হাসি আনন্দের, সুখ দু:খের,অসুখ-বিসুখ,সবসময়ের সাথী— একেবারে বন্ধুর মতো। ও কে আমার মেয়ে বলে কখনো মনে হয়নি। আজ বড় হয়েও আমরা সেই একই রকম আছি।


ছোটোবেলা থেকেই আমি একট ভীতু, হাঁদাভোদা টাইপের। কম কথা বলি, জলের মতো গড় গড় করে কথা বলতে পারি না। আর তানিয়া হয়েছে ঠিক আমার উল্টো। ছোটোবেলায় তবুও একটু বেটার ছিল কিন্তু বড় হওয়ার পর একদম বাঁদরি হয়ে গেছে। হ্যাঁ,মাঝে মাঝে আমার রাগ হলে ওকে বাঁদরি বলি। নন স্টপ মিউজিক চ্যানেলের মতো সারক্ষন কানের কাছে বক বক করতে থাকে। কিভাবে আমাকে রাগানো যায় সারক্ষন তার প্লান তৈরি করে। এই চব্বিশ বছর বয়েসে ও ওর মনটা সেই ছোট্ট বেলার মতো কোমল, ফুরফুরে।

দক্ষিন কলকাতার একটা প্রাইভেট কোম্পানি তে অ্যাকাউন্টের কাজ করে তানিয়া। আমিও একটা ছোটো বেসরকারি স্কুলে পড়াই। প্রতিদিন বিকালে বাড়ি ফেরার পর ওর প্রধান কাজ আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া। ওর স্কুটির পিছনে আমাকে বসিয়ে সারা কলকাতা ঘুরে বেড়ানো যেন ওর কাজ। ওর স্কুটি তে আমি উঠতে চাইতাম না ভয়ে। এত জোরে চালাত মনে হত আমি হাওয়ায় উড়ছি। আর যেখানে সেখানে হঠাৎ ব্রেক কষত। নিজেকে সামলাতে না পেরে ওকে জড়িয়ে ধরতাম। পিছন ফিরে তানি বলত,—"নিজের ব্যালেন্স টা এখনও নিজেও রাখতে শিখলি না।"
আমার রাগ হত।— "এই ভাবে ব্রেক কষলে কার ব্যালেন্স ঠিক থাকে বলতো?" বলতাম আমি।
তানি হেসে বলত ,—" তাহলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বোস।"

আমাদের বাড়ির দিক থেকে আমাদের এই মেলামেশায় কোনো বাধা ছিল না। পার্ক, রেস্টুরেন্ট, কফিশফ সব জায়গায় বসে আমরা গল্প করতাম। খাবার বিল কখনও আমাকে দিতে দিত না, ওই সব মেটাতো। এরকম গার্লফ্রেন্ড পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার। আর আমার ও সেই ভাগ্য হয়েছিল। এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল, কিন্তু আমার সমস্যা টা হচ্ছিল অন্য জায়গায় । পরে বলছি সে কথা।

আমরা প্রতি রবিবার গঙ্গার ধারে বেড়াতে যেতাম। অনন্ত জল রাশির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে বসে থাকতাম দুজন। ও এমন এমন সব ইয়ার্কি করত,মজা করত-আমার রাগ হত খুব। আমি বলতাম,
— "তানি, দেখ তুই একটা মেয়ে।তোর মুখে এসব কথা মানায় না।"
ও আমার কানটা ধরে টেনে জড়িয়ে ধরে বলতো,— "দেখ অভি, সব জায়গায় মাস্টার মাস্টার ভাব নিবি না। তুই আমার ভবিষৎ এ বর হবি; তোর সাথে এই সব ইয়ার্কি মারবো না তো কার সাথে মারব?"
এই বার আমার সমস্যা এল। 'বর হওয়া' টাই আমার সমস্যা। কান টা ছাড়িয়ে নিয়ে বলতাম,
— "তোকে আমি বিয়ে করতে পারব না।"
— "কেন?"
— "আমার বিয়েতে এলার্জী আছে।"
— "কই কোথায় ? জামাটা খোল দেখি।"
— "দেখ, সব সময় ইয়ার্কি মারবি না। তোকে কত বার বলেছি, তুই আমার ছোটোবেলার বন্ধু; তোর সাথে এক খাটে শুতে পারব না।"
— "খাটে শুতে কে বলেছে? খাটের নীচে শুবি।" বলেই হো হো করে হাসত।
আমি আরও রেগে যেতাম। আসলে আমাকে রাগিয়ে ও দারুন মজা পেত। ওকে কত বার বুঝিয়েছি, আমি তোর বন্ধু হয়ে থাকতে চাই। স্বামী হতে পারব না। কিন্তু ও বুঝতে চায় না। আবার ওকে কাছ ছাড়া করতেও আমার মন কেমন করত।
একদিন তানি রাগ করে বলল,— "তোকে বিয়ে করতে হবে না।আমি অন্য কাউকে বিয়ে করে অন্য কোথাও চলে যাব।"
আমি জানি, ও আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না। শুধু আমাকে ভয় দেখিয়ে রাজী করানোর জন্য এ সব বলছে। আমি ও কে রাগাবার জন্য বললাম,-"আচ্ছা! ঠিক আছে চলে যা।"
ওর চোখের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলাম, রাগে ফুঁসছে। চোখ, মুখ লাল হয়ে উঠেছে। এবার কিছু চড়, কিল, ঘুষি আমার গায়ে এসে পড়বে। মেরে ,ধরে , কান টেনে, হাঁটুর গুতো দিয়ে শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজী করাতে পারল না। অগত্যা শেষ অবলম্বন,বাড়ি গিয়ে আমার মাকে বলল,— "জেঠিমা, আমি অভি কে বিয়ে করব।"
ব্যাস! আমার খেল খতম। আমার মা বাবার বিরুদ্ধে আমি কোনোদিন কথা বলতে পারিনি। তাই চুপ করে বিষয় টা মেনে নিতে হল। আসলে আমাদের বাড়ি থেকে যেন আগে থেকেই সব ঠিক ছিল। শুধু আমাদের বড় হওয়ার অপেক্ষায় বসে ছিলেন ওনারা। শেষ পর্যন্ত তানি, আমাকে বিয়ে করেই ছাড়ল। মহা ধুমধামের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন হল। অনিচ্ছা থাকার সত্বেও বিয়ের পিঁড়িতে বসলাম । শুভদৃষ্টির সময় তানি আমার দিকে তাকিয়ে বলল,—"  কেমন দিলাম !"

রাগে আমার সারাটা শরীর জ্বলতে লাগল। বিয়ে তো ভালভাবেই শেষ হল। আর আজ সেই ফুলসজ্জা-মানে বিয়ের প্রথম রাত।ফুলসজ্জা শব্দটা শুনলে সবার মনে কেমন একটা অনুভূতি হয়। আমার কিন্তু সে'সব হচ্ছে না। বরং ঠিক তার উল্টো ,রাগ হচ্ছে খুব তানির উপরে। তাই সোফায় বসে টি.ভি তে নিউজ দেখছি ফুলসজ্জার রাতে। তানি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে।
—" কি,রে কোথায় ঘুমাবি? খাটের উপর আমার পাশে, না খাটের নীচে?"
এরকম মজায় হাসব ,না কাঁদব কিছুই বুঝতে পারছি না। তাই চুপ করে রইলাম।
তানি আবার বলল,—"নিউজ চ্যানেল টা অন্তত বন্ধ কর। বাইরে থেকে যদি কেউ শোনে আজ রাতে তুই নিউজ দেখছিস,তাহলে কাল সকালে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।"
রাগের মধ্যেও আমার হাসি পেল। তানি,আয়নার সামনে থেকে সরে এসে আবার বলল,— "তুই হাঁদার মতো বসে থাক ,আমি শুয়ে পড়ছি।"
আমি অসহায়ের মতো তার দিকে চেয়ে বললাম,— "দেখ তানি , আমি তোর পাশে শুতে পারি। কিন্তু তুই কথা দে,আর কিছু করতে বলবি না!"
তানি হাসতে হাসতে শোফায় আমার পাশে এসে বসল। রিমোট টা নিয়ে টি.ভি টা অফ করে দিল। তারপর ওর দুহাত দিয়ে, আমার মাথাটা ধরে বলল,—"হাঁদারাম একটা! তুই আমাকে যেভাবে ভালবাসতে বলবি, আমি তোকে সেই ভাবে ভালবাসব। কিন্তু তোকে ছেড়ে ,তোকে না দেখে কোনোদিন আমি থাকতে পারব না রে।"
আমার মনটা কেমন হয়ে গেল। তানির স্পর্শ আগে কোনোদিন এমন ভাবে অনুভব করিনি। অপলক দৃষ্টিতে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ এর আলোটা চলে গেল আর সেই সাথে ঘরের টিকটিকি টা তিনবার ঠিক ঠিক ঠিক করে করে উঠল।
আমি কেমন যেন ভয় পেয়ে তানি কে জড়িয়ে ধরলাম। একটা ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া আমার কপালে স্পর্শ করল। সারাটা শরীরে একটা ভাললাগার অনুভূতি ছড়িয়ে গেল।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি প্রেমের গল্প " অসমাপ্ত প্রেমের পাঁচ বছর পর "

(১) মাঝে মাঝে মনে হয়,জীবনে ভালবাসা কেন আসে,আর আসলেও কেনই বা চলে যায়? যদি চলে যায়,পরে কি আবার তাকে ফিরে পাওয়া যায়? হয়তো বা যায়। আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। যদিও বা পাওয়া যায়,তাকে কি নিজের করে নেওয়া যায়?সবাই পারে না, কেউ কেউ পারে। এটা তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।গল্প শুরুর আগে হয়তো অনেক বকবক করে ফেললাম! আপনারা হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। যাইহোক এবার আসল গল্পটা বলি। যেদিন প্রথম কলেজে উঠলাম,সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম এ মেয়ে আমার পড়াশুনার বারোটা বাজানোর জন্যই এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাংলা ডিপার্টমেন্টের এত ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ের মধ্যেও,সে যে আলাদা করে সবার কাছে চোখে পড়ার মত।আর দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার ও চোখে পড়ে গেল।সদ্য আঠেরো তে পড়েছি। মনের মধ্যে একটা শিহরন, রোমান্স,উশখুশ, ফ্যান্টাসি ভাব যে তৈরী হচ্ছিল সেটা ভালই টের পাচ্ছিলাম। ওরকম দুধের মতো গায়ের রঙ, টানা–টানা চোখ,মাথার ঘন কালো চুল পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো,উন্নত বুক,চিকন চেহারা দেখলে মনের ভেতর একটা ভূমিকম্প, উথাল পাথাল তরঙ্গমালা তৈরী হয়। সে যেন বন্য হরিনী! স্থির,শান্ত,মনোহরিনী তার চোখের চাহনি ভোলবার নয়।সারা শরীরে, সারাক্ষন একটা চপলতার ভা