Skip to main content

ছেলেটি~অনুগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]





(১)
প্রতিদিন কলেজ থেকে ফেরার পথে ছেলেটিকে  দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা  দাড়ি। গোল মুখ।লম্বাটে,পাতলা গড়ন।মাথায়  কোঁকড়ানো কালো চুলে ভরা। এলোমেলো চুল।  অনেকটা লতা গুল্ম,গুচ্ছমূলের মতো।বয়েস খুব  বেশি হলে বাইশ কি তেইশ হবে।
আমাদের বাড়ি থেকে আট–দশটা বাড়ি আগে  পায়রায় খোপের মতো একটা একতলা বাড়ি।  কোমর সমান উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভগ্নপ্রায়  পাঁচিল।বেশ কয়েক জায়গায় ইট খসে গিয়ে  ফাঁকা হয়ে গেছে,এবং অর্ধেক ভাঙা ইট গুলো  দাঁতের মতো বেরিয়ে আছে।পাঁচিলের গায়ে
মরচে ধরা লোহার গেট টা ধরে, ভেতরে প্রতিদিন ছেলেটি দাঁড়িয়ে থাকে।গত একমাস ধরে তাই দেখছি। প্রথম প্রথম ব্যাপার খেয়াল করিনি। সত্যিই তো! এরকম শ্যওলা ধরা বাড়ি,মরচে ধরা গেটের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।

সেদিন আকাশ টা মেঘলা করে ছিল।যেকোনো মুহুর্তে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে পারে।তার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে ঠান্ডা হাওয়ায়।দ্রুতো পায়ে হাঁটছিলাম বাড়ির দিকে।পিঠের কলেজ ব্যাগ টা ঝপ ঝপ করে শব্দ করছে।হঠাৎ ছেলেটিকে নজর পড়ল।তার দিকে তাকাতেই, চোখ সরিয়ে নিল সে। ছেলেটি কি আমাকে দেখছিল? নিশ্চই দেখছিল!
নইলে চোখ সরিয়ে নিল কেন?

(২)

আমার কলেজ লাইফ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বি.এস.সি, থার্ড ইয়ার। ফাইনাল পরীক্ষার ও বেশি দেরী নেই।তাই লাস্ট কয়েক মাস একটু কলেজ যাচ্ছি।স্যার দের থেকে সাজেসান আর প্রাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য।আর কলেজ থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন এই কান্ড।
আরও এক মাস কাটলো।তবুও ছেলেটিকে দেখি।সেই একই ভাবে প্রতিদিন দাঁড়িয়ে।একটা নিষ্পাপ দৃষ্টি।আমিও আড়চোখে,এক পলক তাকিয়েই বাড়ি মুখো হাঁটা লাগাই। ছেলেটির মুখে স্মিত হাসি।এখন বেশ বুঝতে পারি,ছেলেটি আমাকে দেখার জন্যই রোজ দাঁড়িয়ে থাকে।এক পলক ছেলেটিকে দেখেই বোঝা যায়,তার সরু সরু গোল চোখ গুলো যেন কিছু বলতে চাইছে। হিজিবিজি কি সব হয়তো লেখা আছে তার চোখের পাতায় বা মনের ডায়রী তে।কিন্তু সাহস পাচ্ছে না,সে গুলো বলার।আমিও চাই না সেই সাহস জন্মাক ছেলেটির মধ্যে। কোনোদিনও যেন ছেলেটি কিছু বলতে না পারে।

(৩)

এই ভাবে আরও কিছুদিন কেটে গেল।আমার ফাইনাল পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেছে অনেক দিন। ঘরেই থাকি। আর ও দিকে যাই না। জানি না! ছেলেটি এখনো দাঁড়িয়ে থাকে কিনা? হয়তো প্রথম প্রথম কিছুদিন থাকবে তারপর,আমাকে আর যেতে না দেখে বিমর্ষ হয়ে ঘরে ঢুকে যাবে।

দু'মাস কাটলো।

আজ আমার বিয়ের গাড়ি গেল বাড়িটির সামনে দিয়ে।আজ ও ছেলেটিকে দেখলাম,সেই মরচে ধরা লোহার গেট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ভেতর থেকে এক চাহনিতে দেখলাম।ফ্যাকাশে মুখ,চোখ দু'টো যেন জলে টলমল করছে।মনে মনে ভাবলাম,কি অদ্ভুত ছেলে রে বাবা!


মাস ছ'য়েক পর বাবা–মার কাছে আসছি।  আমার বাড়ি ঢোকার রাস্তায় মাথায় একটা  ছোটো দোকান পড়ে। সকাল–সন্ধ্যা চা,বিস্কুট  খাওয়ার ভিড় পাড়ার বুড়ো গুলোর।দূর থেকে  ছেলেটিকে দেখে চিনতে পারলাম।সেই  এলোমেলো কোকড়ানো চুল।দোকানের সামনে  দাঁড়িয়ে এক জনের সাথে,হাত নেড়ে অঙ্গ–ভঙ্গি  করে কি যেন বোঝাচ্ছে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ  বলছে না।কিছু সময় পর ছেলেটি চলে গেল।
ছেলেটি চলে যেতেই আমি দ্রুতো লোকটিকে  গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,–"দাদা,ওই ছেলেটি কি  কথা বলতে পারে না? বোবা নাকি?"
লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলল–"হ্যাঁ, ছেলেটি বোবা।কেন বলুন তো?"
আমার বুকের ভেতর টা দুমড়ে– মুচড়ে উঠল। আর কিছু না বলে, হতবম্ভের মতো রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। সেই শ্যাওলা ধরা বাড়ি, আর মরচে পড়া গেটের সামনে গিয়ে আমার পা থমকে গেল।বুকের ভেতর টা কেমন কেঁপে উঠল।ছেলেটি আজ আর দাঁড়িয়ে নেই।তবুও যেন মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি,ছেলেটি যেন এসে দাঁড়িয়েছে গেটের সামনে।ঠোঁটের আগায় অনেক জমানো কথা। বিড়বিড় করছে ঠোঁট দু'টো।একটা আকুলতা।কিছু বলতে পারছে না...!
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ছোটগল্প " হট প্যান্ট "

গল্পটি সম্পর্কে  : মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় লেখক দের লেখা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে লিখতে।এ গল্পটিও তেমনি আমার প্রিয় লেখক প্রচেত গুপ্তের একটি গল্প থেকে অনুপ্রানিত।শুধু অনুপ্রানিত বলবো না, অনেকাংশে প্লটের মিল আছে।তবে গল্পের থিম বা, বিষয় বস্তু সম্পুর্ন আলাদা। তাই ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই লেখাটা লিখলাম। গল্প পড়ূয়া ফেসবুক পেজ ঃ  http://www.facebook.com/golpoporuya (১) বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিরি গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরম।দিনের বেলা যে খুব সূর্যের তাপ, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।তবুও হাঁসফাঁস করে দিন কাটাতে হচ্ছে।বৈশাখের শেষ। আম– কাঁঠাল পাকার পরিবর্তে পচে যাবে বেশি।বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক দেরি।এবছর বৃষ্টি আসবেও কিনা,তাতেও সন্দেহ আছে।বাংলার আবহাওয়া বর্তমান অবস্থা,এমন হাস্যকর যে, কোনো কিছুই সঠিক ভাবে বলতে পারেন না আবহাওয়া দপ্তর। রাত দশটা বেজে গেছে।গরম কালে এটা কোনো ব্যাপার নয়।বিশেষত শহরের দিকে তো এটা অনেকটা সন্ধ্যা নামার মতো ব্যাপার।ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে।একটা টেবিল ফ্যান ও আছে কিন্তু তাতেও গরম কাটছে না।টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে রমেন বাবু, একটা ধুতি পরে খালি গায়ে বসে স্কুলের খাতা