Skip to main content

ফেকবুক ~ অনুগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


রাজ সেন, শহুরে স্মাট ছেলে। ফর্সা, লম্বা চেহারা; দেখতে সিনেমার হিরোর মতো,–এককথায় বলতে গেলে হ্যান্ডসাম বয়। ফেসবুকে তার অসংখ্য মেয়ে বন্ধু। বেশ কিছু দিন হল রাজের আর ফেসবুক করতে ভাল লাগছে না। সেই রাত জেগে প্রতিদিন একই চ্যাট,— হাই,...কি করছ? ..কেমন আছ?...হামম...তারপর গুড নাইট দিয়ে শেষ।..সো বোরিং....।
হঠাৎ করেই ইচ্ছেটা জাগলো রাজের মনে। ইচ্ছে হল,ফেসবুকে একটা মেয়ের নাম দিয়ে ফেক প্রোফাইল তৈরী করবে। কথা মতোই কাজ, একটা সুন্দরী মেয়ের ছবি দিয়ে প্রোফাইল তৈরি করল,– নাম দিল মোহিনী সেন। রাতে এসে ফেসবুক টা অন করতেই অবাক হয়ে গেল রাজ। প্রায় শ’খানেক ছেলেদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। -সত্যি আজকের দিনে এত মোরগ আছে?  মনে মনে ভাবল সে।
বেছে বেছে কতগুলোর ছেলের রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করল সে।এরমধ্যে একটা ছেলের  প্রোফাইল রাজের মনে ধরল,— নাম সুরজ।  ম্যাসেজ অপসানে গিয়ে রাজ লিখে পাঠাল, – হাই! সুরজ।
সঙ্গে সঙ্গে ওপার থেকে রিপ্লাই এল,– হ্যালো! মোহিনী।
মনে মনে খুব হাসি পেল রাজের। যাক একটা মোরোগ পাওয়া গেল। শুরু হল চ্যাটালাপ ...রাতের পর রাত। বেশকিছু দিন চ্যাটিং চলার পর খুব ভাল বন্ধু ও হয়ে গেল তারা। এক এক সময় রাজের মনে হত, এ সব ঠিক হচ্ছে না কিন্তু একজন কে বোকা বানিয়ে বেশ মজা লাগছিল তার। সুরজ ও যেন তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, রাজ ও মোহিনী সেজে দুরন্ত প্রেম চালাচ্ছে। একদিন সুরজ বলল,– মোহিনী, চল আমরা দেখা করি।
অনেক ভেবেচিন্তে রাজ,থুড়ি মোহিনী সেদিন বলেছিল,– বেশ কবে দেখা করবে বল?

একই শহরে থাকে তারা। সুতারং দিন ঠিক হল এক রবিবার,বিকেল পাঁচ টা। চিলড্রেন পার্ক। রাজের মনে মনে আনন্দই হচ্ছে, সবাই মেয়েদের সাথে দেখা করতে যায় আর সে কিনা একটা ছেলের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছে।
আজ সেই রবিবার। নীল টিশার্ট টা পরে ঠিক পৌনে পাঁচটায় চিলড্রেন পার্কে পৌছাল রাজ । পার্কের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখতে পেল ছোটো ছোটো শিশুরা খেলছে,বসার জন্য কোনো বেঞ্চ ফাঁকা নেই। শুধু বড় মেহগনি গাছটির নীচের বেঞ্চে একটি মেয়ে বসে আছে। রাজ আস্তে আস্তে সে দিকে এগিয়ে গিয়ে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসে পড়ল। আড় চোখে কয়েকবার দেখল মেয়েটিকে,বেশ সুন্দরী। তার ফেসবুকে এত মেয়ে বন্ধু আছে কেউ এত সুন্দরী নয়। মেয়েটির সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে করতে লাগল সে । বাঁ হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রাজ দেখল পাঁচ টা বাজে।এদিক-ওদিক দেখতে লাগল সে-সুরজ, ঢপ দিল না তো! মনে মনে ভাবল ।
-"কাউকে খুঁজছেন?"– মেয়েটি হঠাৎ জিজ্ঞেসা করল। রাজ চোখ তুলে তাকাল মেয়েটির দিকে।অপরূপ সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে।
-"না...মানে আমার এক বয়ফ্রেন্ড আসার কথা।"উত্তর করলো রাজ।

বয়ফ্রেন্ড! মেয়েটি ভাল করে দেখতে লাগল রাজ কে। মনে মনে ভাবল,সমকামী নয়তো ছেলেটি!
-"না না আপনি যা ভাবছেন তা নয়,মানে একটা ফেসবুক ফ্রেন্ড, তবে সে ছেলে"— হেসে বলল রাজ।
-"ও! আচ্ছা। ব্যই দ্য ওয়ে,আমি রিয়া।আপনি?"
একটা স্মার্ট ভাব নিয়ে নিজের নামটা বলল রাজ। বেশ কিছুক্ষণ আলাপ পরিচয়ের পর মেয়েটি ঘড়ির দিকে তাকাল। -"আপনি একা একা এখানে বসে আছেন কেন?"রাজ জিজ্ঞেস করল।
-"না! মানে, আমার একটা গার্লফ্রেন্ড আসার কথা ছিল। সে আমাকে খুব ভালবাসে।" মেয়েটি বলল।
রাজ অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে চাইল।মনে মনে ভাবল,মেয়টি লেসবিয়ান নয়তো.....?
-"না!আপনি যেটা ভাবছেন সেটা নয়। আসলে আমি একটা মেয়েকে ফেসবুকে মুরগি বানিয়েছি, সে জানে আমি ছেলে।" বলল মেয়েটি।
রাজের খুব হাসি পেল মনে মনে। সে ও তো এক মোরোগের জন্য এখানে এসেছে। কিন্তু সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল কেউ এল না। পকেট থেকে ফোন টা বের করে ফেসবুক টা অন করল সে। এই তো! সুরজ কে অনলাইন দেখাচ্ছে।সঙ্গে সঙ্গে একটা ম্যাসেজ করল রাজ,– সুরজ তুমি কোথায়?
ওপার থেকে রিপ্লাই এল,— এই তো চিলড্রেন পার্কের মেহগনি গাছের নীচে বেঞ্চটাতে বসে আছি লাল ড্রেস পরে। তুমি কোথায় মোহিনী?
রাজ চোখ তুলে চাইল মেয়েটির দিকে।সে ফোন হাতে করে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে। পরনে লাল কামিজ। খুব লজ্জা পেল রাজ। ভাবল আস্তে আস্তে উঠে চলে যাই। কিন্তু শেষ রিপ্লাই সে করল,– আমিও তো তোমার পাশেই বসে আছি নীল ড্রেস পরে।
মেয়েটি এবার চোখ তুলে রাজের দিকে তাকালো। দুজনই দুজন কে দেখছে অবাক হয়ে। ব্যাপার টা বুজতে বাকি নেই কারও। নিজেদের পাতা জালে,নিজেরাই বন্দি।এক মিনিট চুপচাপ। তারপর দুজনই হো হো হো করে হেসে উঠল। পার্কের আলো গুলো জ্বলতে শুরু করেছে। শিশুদের খেলাও থেমে গেছে অনেক আগেই । মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে বলল,– "চলুন সামনের কফিশপে বসে গল্প করা যাক।"
রাজ আর না করতে পারল না। দুজন পাশাপাশি হাঁটছে,আর মৃদু মৃদু হাসছে। হয়তো দুটি মন আবার সত্যিকারের প্রেমে পড়ে গেল।
স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি প্রেমের গল্প " অসমাপ্ত প্রেমের পাঁচ বছর পর "

(১) মাঝে মাঝে মনে হয়,জীবনে ভালবাসা কেন আসে,আর আসলেও কেনই বা চলে যায়? যদি চলে যায়,পরে কি আবার তাকে ফিরে পাওয়া যায়? হয়তো বা যায়। আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। যদিও বা পাওয়া যায়,তাকে কি নিজের করে নেওয়া যায়?সবাই পারে না, কেউ কেউ পারে। এটা তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।গল্প শুরুর আগে হয়তো অনেক বকবক করে ফেললাম! আপনারা হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। যাইহোক এবার আসল গল্পটা বলি। যেদিন প্রথম কলেজে উঠলাম,সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম এ মেয়ে আমার পড়াশুনার বারোটা বাজানোর জন্যই এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাংলা ডিপার্টমেন্টের এত ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ের মধ্যেও,সে যে আলাদা করে সবার কাছে চোখে পড়ার মত।আর দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার ও চোখে পড়ে গেল।সদ্য আঠেরো তে পড়েছি। মনের মধ্যে একটা শিহরন, রোমান্স,উশখুশ, ফ্যান্টাসি ভাব যে তৈরী হচ্ছিল সেটা ভালই টের পাচ্ছিলাম। ওরকম দুধের মতো গায়ের রঙ, টানা–টানা চোখ,মাথার ঘন কালো চুল পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো,উন্নত বুক,চিকন চেহারা দেখলে মনের ভেতর একটা ভূমিকম্প, উথাল পাথাল তরঙ্গমালা তৈরী হয়। সে যেন বন্য হরিনী! স্থির,শান্ত,মনোহরিনী তার চোখের চাহনি ভোলবার নয়।সারা শরীরে, সারাক্ষন একটা চপলতার ভা