Skip to main content

অমানুষ~ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]




ফোনের রিং এর শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল আকাশের। ঘুম জড়ানো চোখেই ফোনটা রিসিভ করল সে।— "হ্যালো!"
ওপার থেকে দিদির গলার আওয়াজ শুনতে পেল।— "ভাই, তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়। বাবার শরীর টা ভাল নেই রে।"
অনেকদিন ধরেই আকাশ শুনে ছিল বাবার শরীর টা ভাল যাচ্ছে না।বয়েস ও অনেক হয়েছে। মন টা খারাপ হয়ে গেল আকাশের। তাড়াতাড়ি ফ্রেস হয়ে, ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল। পাঁচ টা তিরিশের শিয়ালদহ লোকাল, তারপর আবার শিয়ালদহ থেকে বারুইপুর লোকাল।
স্টেশনে ঢুকেই ট্রেনের হর্নের শব্দ পেল আকাশ। ছুটতে ছুটতে কোনোরকমে, একটা কামরায় উঠে জানালার ধারে সিটে বসে পড়ল। প্লাটফর্ম ছেড়ে দিয়েছে ট্রেন,একরাশ ঠান্ডা বাতাস জানালা  ঘর্মাক্ত মুখে আছড়ে পড়ল। হঠাৎ কথাটা মনে পড়ল আকাশের।— আজ তো আরোহী কে হসপিটল থেকে আনার দিন। বাবার অসুস্থতার খবর শুনে কথাটা বেমালুম ভুলে গিয়েছে সে।
এবার একটু আগে থেকে শুরু করা যাক। আরোহী সেন, আমার গল্পের নায়িকা। ইংরেজী অনার্স, দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী, সুশ্রী, শহুরে স্মার্ট মেয়ে। গায়ের রং ধবধবে সাদা না হলেও, একেবারে আবার কালো ও বলা যায় না। চিকন চেহারা, মুখটা একদম বাচ্চাদের মতো।

গ্রাজুয়েশন শেষ করে একটা হাইস্কুলে চাকরী পেয়েছিল আকাশ। উওর চব্বিশ পরগনার ছোট্টো শহর বসিরহাটে। আর আরোহী দের বাড়িতেই সে উঠেছিল। সাধরনত বাড়িতে অবিবাহিতা মেয়ে থাকলে কোনো বাবাই ব্যাচেলার ছেলেদের ঘর ভাড়া দেয় না। কিন্তু আকাশ কে দেখে হয়তো তার, শিক্ষিত, সভ্য,ভদ্র মনে হয়েছিল। তার উপর আবার স্কুল মাস্টার, তাই কোনো সন্দেহ ছিল না। নতুন চাকরী জীবন দারুন উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল আকাশের। কিন্তু একদিন হঠাৎ মনে হল, আরোহী তারদিকে, একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে,মাঝে মাঝে হাসেও। ইংরাজি র শিক্ষক হওয়ার জন্য, আরোহী মাঝে মাঝে, আকাশের কাছে, পড়া বুঝে নিতে আসে; অবস্যি বাবার অনুমতি নিয়েই। কিন্তু বই এর পাতার থেকে, আরোহীর চোখ বেশী থাকত আকাশের চোখের দিকে। পড়াশুনা,আর ক্যারিয়ারের ব্যাস্ততায় আকাশ কোনদিন মেয়েদের ভাল করে দেখেনি। কিন্তু আজ আরোহীর মায়াবী চোখ দুটো যেন, তার শরীরের ভেতর প্রেমের হরমোন কে ক্ষরন করে দিল। আরোহীর হাসি মুখটা দেখলেই মনের ভেতর কেমন একটা ভাললাগা তৈরি হত। আর সেই ভাললাগা কখন যে ভালবাসায় পরিনত হল,তা আকাশ নিজেও বুঝতে পারলো না।

বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। আরোহী এখন আর আকাশের ঘরে ঢুকতে অনুমতি নেয় না। ঘরে ঢুকে সোজা বেডের উপর গিয়ে বসে পড়ে, কখনো বা শুয়ে শুয়ে বিভিন্ন বই পড়ে।আকাশের মিষ্টি ব্যবহারে আরোহীর বাড়ির লোক ও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই এই মেলামেশা, তারা দেখেও না দেখার ভান করত।
একদিন বিকেলে আরোহী বলল,— "চলো না, আকাশ দা, ইচ্ছামতী নদীর ধার থেকে বেড়িয়ে আসি।"
নদীর নাম টা বইয়ে পড়েছিল আকাশ। কোনোদিন যাওয়া হয়নি। আজ সেটা নিজের চোখেই দেখল। নদীর তীরেই ছোট্ট পার্ক ,নানান রকম ফুল আর পাতাবাহারের সমাহার। মাঝে মাঝে বসার জন্য চেয়ার পাতা, আর সামনেই বিস্তৃত জলরাশির কুল কুল ধ্বনি। পাশেই রামধনুর মতো বাঁকানো ব্রিজ টা, বড় নদীটার দুই পার কে সংযুক্ত করেছে। হলুদ, সবুজ ,সাদা পাতাবাহারের গাছটির পাশের বেঞ্চে বসল দুজন। চারিদিকেই প্রেমিক প্রেমিকাদের ভিড়। বিকেলের হলুদ মাখা আকাশের নীচে বসে, আকাশের হাতটা নীজের কোলের উপর নিল আরোহী,আর মাথাটা আকাশের কাঁধে রাখল।
— "আকাশ দা, আমাকে কোনোদিন ছেড়ে যাবে না তো?"
নদীর ওপার থেকে গাঙ পাখির তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল। আরোহীর দিকে চাইল আকাশ।
—" না! কোনোদিন যাব না।"

এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। একদিন স্কুলে হঠাৎ আরোহীর বাবার ফোন পেয়ে, হসপিটলে ছুটে গেল আকাশ। আরোহী বেডে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, বাইরে চেয়ারে আরোহীর মা, বাবার জলভরা চোখ। কলেজ থেকে ফেরার পথে অ্যাক্সিডেন্ট। বাসের চাকাগুলো পা দু'টো একদম পিষে দিয়েছে । আকাশ ভিতরে গিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলল। ডাক্তার কে জিজ্ঞেস করতে, ডাক্তারবাবু বললেন,— "সরি মি: আকাশ। আমারা অনেক চেষ্টা করেছিলাম। পা দুটো হাটু থেকে কেটে বাদ দিতে হবে।"
বুকের ভেতরটা কেঁদে উঠল আকাশের।সেদিন হসপিটলে র নির্জন ঘরে আকাশ কে জড়িয়ে ধরে, আরোহী খুব কেঁদেছিল।
— "তুমি সারা জীবন আমার সাথেই থাকবে।" আরোহীর মাথাটা খুব জোরে বুকে চেপে ধরে জলভরা চোখে বলেছিল আকাশ।
আর আজ হল সেই দিন। প্রায় কুড়ি দিন পর আরোহীকে হসপিটল থেকে রিলিজ করবে। আকাশ নিজেই তাকে নিতে আসবে বলেছিল। কিন্তু সকালবেলা বাবার শরীর অসুস্থের সংবাদ পেয়েই সব ভুলে ছুটতে হল।


গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আকাশ দেখতে পেল, বাড়ির ভেতর অনেক ভিড়। বুকের ভেতর টা হু হু করে উঠল তার। আকাশের বাবা, সুধাংশু বাবু এপাড়ার একজন গন্যমান্য লোক, তাই তার অসুস্থতা র খবর পেয়ে অনেকে এসেছেন। হাতের ব্যাগ টা ফেলে আকাশ দৌড়ে গেল, বাবার কাছে। এখনো বেঁচে আছে হয়তো তার জন্য। বাবার হাতে হাত রাখল আকাশ।
— "আমার একটা কথা, রাখবি বাবু?"
— "বলো! কি কথা?"
— "তুই জয়িতা কে বিয়ে করিস। ও খুব ভাল মেয়ে, তোর মায়ের ও খুব পছন্দ ওকে।"
আকাশের বাবার বন্ধুর মেয়ে জয়িতা। ছোটো বেলার বন্ধু ওরা, এক সাথে, খেলাধূলা, পড়াশুনা সব করেছে, কিন্তু তাই বলে এক সাথে দুজন এক ঘরে থাকবে, এটা কখনো ভাবতেই পারেনি আকাশ। তার বাবা কোনো কথা শুনতে চাইনি। এই নিয়ে আগেও কথা হয়ে ছিল কিন্তু, চাকরী না পাওয়ায় আকাশ রাজী হয়নি।
বাবার কথায়, আকাশের বুকের ভেতরে যেন হাজার টা হাতুড়ির বাড়ি এক সাথে পড়ল। অজান্তেই বাবার হাত থেকে, নিজের হাতটা সরিয়ে নিল আকাশ। আরোহীর করুন মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল, আর সেই সাথে ছোটো বেলায় বাবার কাঁধে উঠে ঘোরার স্মৃতি চিত্র।
— "কি রে! বল বিয়ে করবি তো?" আবার প্রশ্ন।
আকাশ নিরুত্তর। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ মালা যেন আকাশের মনের বেলাভূমিতে একের পর এক আছড়ে পড়ছে। দিদি ছুটে এল,— "ভাই! চুপ করে আছিস কেন?"
চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল পড়তে লাগল আকাশের। দিদিকে জড়িয়ে ধরল, কি করে এখন আরোহীর কথা বলবে। মনের মধ্যে যেন শয়তান,আর দেবতা যুদ্ধ শুরু করেছে। মায়ের অসহায় মুখটার দিকে একবার চাইল আকাশ। বাড়ি ভর্তি লোক সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। বাবার শেষ ইচ্ছে টাও পূরন করল না আকাশ। মৃত্যু সজ্জায় মিথ্যে প্রতিশ্রুতি বাবাকে দিতে পারল না। আরোহী কে কোনোদিন সে কষ্ট দিতে পারবে না।

দুপুরে একটা কান্নার রব উঠল। আকাশের বাবা, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

কাশফুল ~ ছোটোগল্প [ Bengali Short Love Story ]

কাশফুল ~ ছোটোগল্প [ Bengali Short Love Story ] — "এবার পূজোয় আসবি তো?" - "কি করব বল! অফিস থেকে একদম ছুটি দিতে চাইছে না।" — "তুই সব সময় অজুহাত দেখাস।" - "বিশ্বাস কর,আমি অফিসার কে অনেক রিকোয়েস্ট করলাম কিন্তু আমাকে সাতটা কথা শুনিয়ে দিল।" —" ভাল লাগে না আমার! কত ভাবি পূজোর সময় তোর হাত ধরে সারা কলকাতা টা ঘুরবো, তোর পাশে বসে অষ্টমীর অঞ্জলি দেব.....।" - "আমার ও খুব ইচ্ছে করে, পূজোটা তোর সাথে কাটাতে।" ফোনের ওপার টা এক মহুর্তের জন্য নিস্তব্দ হয়ে গেল। বললাম—"কি ,রে রাগ করেছিস?" — "না! তোর চাকরীটাই খারাপ। আমি চাকরী টা পেয়ে গেলে তোকে আর ও কাজ করতে দেব না।" - "তাহলে আমার পরিবার, কে দেখবে ?" — "আমি দেখব।" -' আর তোর পরিবার?" - "সেটাও আমি।" — "এত দায়িত্ব নিতে পারবি?" — "তুই আমার কাছে থাকলে, আমি সব পারব।" - "পাগলি একটা!" - "প্লিজ ! আয় না এবার পূজোতে!" - "দেখি একবার শেষ চেষ্টা করে!" —"থাক তোর আসতে হবে না