Skip to main content

প্রেমে পি.এইচ.ডি. ~ ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


"প্রেম, ভালবাসা, মানে কিছু বুঝিস? কোনো অভিজ্ঞতা আছে তোদের ?– প্রেম মানে,গলির মোড়ে ফুচকা খাওয়া নয়, প্রেম মানে সিনেমা হলের কোনের সিট নয়, ভিক্টোরিয়ার ঝোপের আড়াল নয়........."
পাশ থেকে গদা টা তাল কেটে বলে উঠল,– "প্রেম  মানে কি তাহলে, এক সাথে বসে লুডো খেলা?"
গদার মাথায় একটা গাঁট্টা মেরে বঙ্কু দা বলল,– "এই জন্যে তুই তিন বছরে একটা মেয়ে পটানো তো দুরের কথা,মাধ্যমিকের গন্ডি টা পেরোতে পারলি না।..........প্রেম মানে হল, দুজনের প্রতি দু'জনের বিশ্বাস। সুখ, দু:খের সাথী , একটু আত্মত্যাগ, সারাজীবন অপেক্ষা,অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা......."
আমি এবার কথা না বলে থাকতে পারলাম না। বললাম, -"বঙ্কু দা, এ কথা গুলো অনেক বার শোনা,পুরানো ... নতুন কিছু বল।"
বঙ্কু দা একটু গম্ভীর হয়ে বলল,–"হুম।"
কিছুক্ষন থেমে থেকে বলতে শুরু করল,– "প্রেম হল কমপিউটারের ভাইরাসের মতো, একবার আমাদের শরীরে ঢুকলে মাঝে মাঝে সব কিছু হ্যাঙ্গ হয়ে যাবে, অর্থাৎ যখন তখন চুপ চাপ বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকবি । আবার কমপিউটারের মতো তোদের সবকিছু স্লো হয়ে যাবে,মানে পড়াশোনা, খাওয়া দাওয়া, স্নান করা সব চলবে ধীর গতিতে। তবে কি জানিস, ভালবাসায় একটু স্বার্থ থাকা উচিত, নি:স্বার্থ ভালবাসা খুব খারাপ জিনিষ। মানে,সব জিনিষের মতো প্রেম,ভালবাসায় ও নিউটনের তৃতীয় গতি সূত্র থাকা উচিত। অর্থাৎ প্রত্যেক প্রেমের একটা সমান ও বিপরীত মুখি প্রেম থাকবে; এটাই হল স্বার্থ।"
আমরা সবাই একসাথে হো হো করে হেসে উঠলাম। আমাদের পাড়ার সকলের প্রিয় বঙ্কু দা। ভাল নাম অবস্যি একটা আছে, কিন্তু আমরা ছোটো বড়ো সবাই বঙ্কু দা বলেই ডাকি কারন তিনি এখনো বিয়েই করেন নি। বেঁটে-খাঁটো চেহারা, মাথায় খোঁচা খোঁচা চুল, আর দাবাং স্টাইলের গোঁফ। তেত্রিশের কাছাকাছি বয়েষ হলে কি হবে, মন টা এখনো উনিষ কুড়ির মতো ফুরফুরে। প্রেম বিষয়ে বঙ্কুদার অগাদ ফান্ডা, মজার মজার কথা বলে সবাই কে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসিয়ে রাখে। আমরা যারা, নতুন প্রেমে পড়ব পড়ব করছি, তারা সবাই বঙ্কুদার শরনাপন্ন হই টিপস নেওয়ার জন্য।
প্রতিদিন বিকালে খেলার শেষে, বঙ্কু দা কে নিয়ে আমরা সবাই বসে পড়ি মাঠের এক কোনে। শুরু হয় প্রেমের ক্লাস। একদিন বুবাই বলল,—"বঙ্কু দা, একটা মেয়েকে খুব ভালবাসি। কিন্তু কিভাবে বলব ঠিক বুঝতে পারছি না।"
বঙ্কু দা,বুবাই এর দিকে চোখ তুলে তাকাল।– "তোর মতো ভীতু , এ পাড়ায় দুটো নেই। কাল আমার বাড়ি থেকে একটা ঘাস ফুল তুলে মেয়েটাকে দিবি ,আর বলবি আমি তোমার বন্ধু হতে চাই।"
পাশ থেকে আমি বললাম,—"আমার বাড়ি গোলাপ ফুল আছে, গোলাপ ফুল থাকতে, ঘাস ফুল নিয়ে যাবে কেন?"
বঙ্কু দা, বিরক্ত হয়ে বলল,–"ওই টিকলুর বাবার তো গোলাপ ফুলের বিজনেস, তো তাই বলে সব মেয়েরা কি টিকলুর পিছনে লাইন দিয়েছে? ইউনিক চাই ইউনিক! বুঝলি কিনা? গোলাপ ফুল তো সবাই দেয় কিন্তু এটা হল নিজেকে অন্যের থেকে একটু আলাদা করা।"
বঙ্কুদার সাথে কথায় পেরে ওঠা আমাদের কাজ নয়। কিছু না কিছু একটা যুক্তি বের করে আনবে। তাই চুপ করে শুনে যাওয়াই ঠিক। একবার,আমাদের পাড়ার টোটোন, পিউ নামের একটা মেয়ের পেছনে দু মাস ঘুর ঘুর করেও কিছুতেই পটাতে পারল না। গলির মোড়ে, টিউসন যাওয়ার পথে, স্কুলের পথে, মেয়েটিকে কত হেনস্তা সইতে হয়েছে। একদিন তো মনে হল মেয়েটি এই জুতো খুলল বুঝি! সেদিন সবাই ছিলাম বলে কোনোরকমে বেঁচে গিয়েছিল টোটোন। অগত্যা কোনো পথ না দেখে বঙ্কুদার শরনাপন্ন হল। সমস্যা টা শোনার পর বঙ্কু দা বলল—"আচ্ছা, টোটোন মেয়েটি তোকেই ভালবাসবে কেন?
– "কেন মানে! আমার যে এত বড় মন আছে।"
– "মন তো রামের ও আছে, হরির ও আছে; তবে তোর মন কে ভালবাসবে কেন?"
টোটোন এবার মাথা চুলকাতে লাগল। বঙ্কু দা পাশে বসা ভোলার টাকে হাত বোলাতে বোলাতে বলল,– "গাধার দল, আগে মেয়েদের সন্মান করতে শেখ,ভালবাসবি পরে।"
এই জন্যেই বঙ্কু দাকে আমাদের এত ভাল লাগত। প্রেমের জটিল সমস্যা যেন বীজগনিতের ফরমূলা দিয়ে সমাধান করে দিত।
অন্য আরেক দিনের ঘটনা। সেদিন ও এক সাথে সবাই বসে ক্লাস চলছে। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমাদের ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চের ভজ, কি করে আমাদের ফার্স্ট গার্ল জুলির এর প্রেমে পড়ে গেল। শুনে তো আমরা সবাই হাঁ হয়ে গেলাম। সমস্যা টা এসে বঙ্কু দা কে বলতেই, ফিঁক করে হেসে পড়ল সে। বলল,-"পাসপোর্ট , ভিসা আছে তোর?"
– "মানে?"
– "মানে হল গিয়ে, মেয়েটার যে মনের দেশে যে একট ঘুরতে যাবি তার পাসপোর্ট, ভিসা আছে? লাস্ট বেঞ্চে বসে সারা ক্লাস না ঘুমিয়ে, কিছু না পারিস ফার্স্ট বেঞ্চে বসে মাস্টারের দিকে তাকিয়ে থাক। যদি মেয়েটার মনে তোর জন্যে একটু সিমপ্যাথি তৈরি হয়।"
বঙ্কুদার কথা শুনে ভজ বোকার মতো চেয়ে রইল। আমরা সবাই মুচকি মুচকি হাসতে লাগলাম। আমাদের গদার অভ্যাস ছিল কথার মাঝখানে বিরক্তিকর কথা বলে বঙ্কুদার কথার সুর, তাল লয় নষ্ট করা। বলল,–"আচ্ছা, বঙ্কু দা, তোমার তো প্রেম সম্পর্কে অগাদ ফান্ডা কিন্তু আজ পর্যন্ত তোমাকে কোনো মেয়ের সাথে দেখিনি কেন, বিয়ে ও করোনি কেন?"
এ কথা শুনে বঙ্কু দা কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। মনে মনে ভাবলাম, এবার বঙ্কু দা কে কথার জালে আটকানো গেছে। কিছুক্ষন চুপ করে রইল সে। তারপর মুচকি মুচকি হাসতে থাকল। তারপর অদ্ভুত একটা প্রসঙ্গ তুলে বলল,-"আচ্ছা, তোরা কখনো মার্ক জুকারবার্গ কে ফেসবুক করতে দেখেছিস, বা শুনেছিস-মানে ফেসবুকে ঘোরাঘুরি, চ্যাট এইসব?"
আমরা একবাক্যে বললাম,– "কই না তো!"
যার ফেসবুক সম্পর্কে অগাদ ফান্ডা তার ও সব ফেসবুকে ঘুরতে, চ্যাট করতে ভাল লাগে না। তেমনি আমার ও প্রেম সম্পর্কে অগাদ ফান্ডা তাই প্রেম ট্রেম করতে ভাল লাগে না। আমরা সবাই হাঁ করে বঙ্কু দার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এবার ও একটা অদ্ভুত যুক্তি বের করে আনল।
– "সবাই হাঁ করে থাকিস না। মুখটা বন্ধ কর, নইলে মশা ঢুকে যাবে।" এই বলে বঙ্কু দা হন হন বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল।
তবে সত্যি কথাটা পরে আমরা সবাই জেনেছিলাম। আর তখন বুঝেছিলাম বঙ্কু দা প্রেমে পি.এইচ. ডি. কোথা থেকে করেছিল? আসলে,বঙ্কু দা আমাদের পাড়ার একটা মেয়েকে খুব ভাল বাসত কিন্তু বলার সাহস হয়ে উঠেনি। হঠাৎ করে মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর থেকে আর কোনোদিন সে বিয়ে থা করেনি।
স্বদেশ কুমার গায়েন ( ২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ছোটগল্প " হট প্যান্ট "

গল্পটি সম্পর্কে  : মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় লেখক দের লেখা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে লিখতে।এ গল্পটিও তেমনি আমার প্রিয় লেখক প্রচেত গুপ্তের একটি গল্প থেকে অনুপ্রানিত।শুধু অনুপ্রানিত বলবো না, অনেকাংশে প্লটের মিল আছে।তবে গল্পের থিম বা, বিষয় বস্তু সম্পুর্ন আলাদা। তাই ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই লেখাটা লিখলাম। গল্প পড়ূয়া ফেসবুক পেজ ঃ  http://www.facebook.com/golpoporuya (১) বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিরি গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরম।দিনের বেলা যে খুব সূর্যের তাপ, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।তবুও হাঁসফাঁস করে দিন কাটাতে হচ্ছে।বৈশাখের শেষ। আম– কাঁঠাল পাকার পরিবর্তে পচে যাবে বেশি।বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক দেরি।এবছর বৃষ্টি আসবেও কিনা,তাতেও সন্দেহ আছে।বাংলার আবহাওয়া বর্তমান অবস্থা,এমন হাস্যকর যে, কোনো কিছুই সঠিক ভাবে বলতে পারেন না আবহাওয়া দপ্তর। রাত দশটা বেজে গেছে।গরম কালে এটা কোনো ব্যাপার নয়।বিশেষত শহরের দিকে তো এটা অনেকটা সন্ধ্যা নামার মতো ব্যাপার।ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে।একটা টেবিল ফ্যান ও আছে কিন্তু তাতেও গরম কাটছে না।টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে রমেন বাবু, একটা ধুতি পরে খালি গায়ে বসে স্কুলের খাতা