Skip to main content

হিরো~ অনুগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]




রাতের ডায়মন্ড হারবার লোকাল।
আরেকটুর জন্যে প্রায় ফসকে যাচ্ছিল ট্রেন টি। বোল্টের মতো একটা বিদ্যুৎ গতি ছুটে ট্রেন টিকে ধরে ফেলল অভীক।না পেলেও কোনো ক্ষতি ছিল না।পরে আরও অনেক ট্রেন আছে। কিন্তু একটুর জন্যে ট্রেন মিস করে,প্লাটফর্মে বসে থাকতে তার মোটেই ভালো লাগে না।

ব্যাগটা পিট থেকে নামিয়ে উপরের বাঙ্কারে তুলে দিয়ে একটা জানালার পাশের সিটে বসে পড়ল অভীক।ফুর ফুর করে ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগলো চোখে মুখে।কজ্বি উঠলে হাত টা চোখের সামনে এনে দেখল,ঘড়িতে দশটা বাজে। প্রায় ফাঁকা কামরা।রাত তেমন নয়, তবুও এসময় গাড়িতে অত ভিড় থাকে না। তার উপর আজ রবিবার।তাই একটু বেশিই ফাঁকা কামরা। একবার সারা কামরায় চোখ বুলিয়ে নিল অভীক। হাতে গুণে জনা ছ'য়-সাতেক লোক হবে। সবার ভেতর ঝিমোনে ভাব।শুধু একটি মেয়ে সোজা হয়ে বসে আছে।মেয়েটির দিকে একপলক তাকিয়ে থাকলো অভীক।কত আর বয়েষ হবে! উনিশ কি কুড়ি।পরনে একটা ব্লু জিনস আর সাদা টপ।কোলের উপর একটা কলেজ ব্যাগ।সম্ভবত টিউসান পড়ে ফিরছে।তার সোজাসুজি অপর পারের জানালার পাশে বসে আছে মেয়েটি।আশে পাশের সিট ফাঁকা।কেউ বসে নেই।চোখ দুটো জানালার বাইরে মেয়েটির। মুখটা স্পর্ষ্ট দেখা যাচ্ছে না।ঘন কালো চুলের আড়ালে,সেটা ঢেকে আছে।অভীকের ইচ্ছে হচ্ছিল একবার সেই মুখ টি দেখতে।কিন্তু উঁকি ঝুঁকি মারার চেষ্টা করলো না।




ঢাকুরিয়া প্লাটফর্মে ট্রেন থামতেই ছেলে গুলো উঠলো।তিন-চারটে ছেলে।ছেলে গুলো যে বকাটে,সে তাদের দেখলেই বোঝো যায়।কারও চুল হানি সিং স্টাইল,কারও বাদশা স্টাইল,কারও পিছন দিকে চুল নেই, তো আবার কারও কানের পাশে।একবার ছেলে গুলোকে পরখ করে দেখে নিল অভীক।
কামরায় উঠে ছেলে গুলো মেয়েটিকে ঘিরে বসে গেল।কেউ আবার মেয়েটির সামনেই দাঁড়িয়ে পড়ল।তারপর শুরু হল নানান কথা- সাইজ, বড়, ছোটো.........নানান ধরনের কথা।ট্রেনের ঝমঝম শব্দের মধ্যে এগুলোই কানে এল অভীকের।

আরও কয়েকটা স্টেশন পার হল।আরও কিছু লোক উঠল ট্রেনে।কিন্তু কারও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।ছেলে গুলো তাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকল।বরং আগের থেকে আরও বেশি।মেয়েটি এক ভাবে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে। একবার উঠে,সেখান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল।কিন্তু পারল না।নীরবে বসে রইল।


নরেন্দ্রপুর প্লাটফর্মে ট্রেন থেমে আছে।পরের সোনারপুর স্টেশনে অভীক নামবে।আর সহ্য হল না।সিট ছেড়ে উঠে মেয়েটির পাশে গিয়ে মোটা স্বরে ছেলে গুলো কে উদ্দেশ্য করে বলল,-"এই এখানে কি হচ্ছে?অনেকক্ষন থেকে দেখছি।"
একটা কালো মত,স্বাস্থবান ছেলে অভীকের দিক তাকালো।-"কে বে তুই? যা হচ্ছে তাতে তোর কি!" একটা ধাক্কা মেরে অভীক কে সরিয়ে দিল।

ট্রেন নরেন্দ্রপুর ছেড়ে দিয়েছে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটা নাম্বার ডায়েল করলো অভীক।-"হ্যালো! স্যার আপনি অফিসে আছেন!...হ্যাঁ আমি অভীক বলছি।শুনুন না, ডায়মন্ড হারবার লোকাল কত নাম্বার প্লাটফর্মে ঢুকছে,প্যানেলে ফোন করে জেনে নিন।তারপর তিন জন স্টাফ কে পাঠিয়ে দিন।শিয়ালদহের দিকে থার্ড কামরায়।...এখানে একটা মেয়েকে, কয়েকটা ছেলে খুব ডিস্টার্ব করছে।..হ্যাঁ আমিও আছি।কিন্তু অন ডিউটি তে নেই তো, তাই।"
ফোনটা কেটে পকেটে রেখে দিল অভীক। তারপর ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,-"সোনারপুর চ'।তারপর আমি কে জানতে পারবি।আর.পি.এফ এর দু'ঘা লাঠি পড়লে ঠিক চিনে যাবি।"
মেয়েটিও একটু ভরসা পেয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটির দিকে তাকালো অভীক।বলল,-" আপনি কোথায় নামবেন?"
-"সোনারপুর।" বলল মেয়েটি।
-"কোনো ভয় নেই।আমি আছি।" অভীক চোখে চোখ রাখলো মেয়েটির।
ছেলে গুলো আর বসতে পারলো না।উঠে দাঁড়িয়ে অভীকের হাতে পায়ে পড়লো।সবার মুখ অনেকটা আলুর চিপসের মতো।কোরাস কন্ঠে বলে উঠল,-"স্যার! ভুল হয়ে গেছে আমাদের। ক্ষমা করে দিন।আর কোনো দিন,এভুল হবে না।"
তারপর এদিক ওদিক সরে পড়ল।

সোনারপুর প্লাটফর্মে ট্রেন ঢোকার আগে,গতি কমে আসে ট্রেনের।অনেকটাই কমে।ছেলে গুলো ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ে নেমে পালাল। প্লাটফর্মে এসে ট্রেন থামতেই নেমে পড়ল অভীক।পেছন পেছন মেয়েটিও নামলো পিটে ব্যাগ নিয়ে।
-"এই যে,হ্যালো!....শুনছেন।" অভীক কে লক্ষ্য করে পিছন থেকে ডাকলো মেয়েটি।
থমকে দাঁড়ালো অভীক।ফিরে তাকালো মেয়েটির দিকে।কাগজ ফুলের মতো ফিনফিনে মেয়েটির চেহারা।এতক্ষনে ভাল করে লক্ষ্য করলো অভীক।ছুটে এসে অভীকের সামনে দাঁড়িয়ে একটু দম নিয়ে মেয়েটি বলল,-"একটা ধন্যবাদ না নিয়ে চলে যাচ্ছেন যে!"
হাসল অভীক।তারপর সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।মেয়েটি তার পাশে হাঁটছে।
-"আপনি আর.পি.এফ জানলে আগে থেকেই কল করতাম আপনাকে।ছেলে গুলো অনেক্ষন থেকে বিরক্ত করছিল।"হাঁটতে হাঁটতে বলল মেয়েটি।
-"কে আর.পি.এফ!" আশ্চর্য হয়ে মেয়েটির দিকে তাকালো অভীক।
একটু হতবম্ভ হল মেয়েটি।আমতা আমতা করে বলল,-"কেন,আপনি যে আর.পি.এফ! ফোন করে....ছেলে গুলোকে ভয় দেখালেন... আমাকে বাঁচালেন.....।"
অভীক হো হো হো করে হাসল।মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল,-"আমি আর.পি.এফ. নই।ও তো মিথ্যে মিথ্যে বললাম।ভয় দেখাতে।"
-"আর ফোন করা টা...!"
-"সে তো কাস্টোমার কেয়ারে কল লাগিয়েছিলাম।"

চোখ গুলো বড় বড় হয়ে হয়ে গেল মেয়েটির। টিকিট কাউন্টারের পাশে সিঁড়ি ধাপ দিয়ে নীচে নামছিল দু'জন।হতবম্ভের মতো,শানের ধাপের উপর দাঁড়িয়ে পড়ল মেয়েটি।অবাক হয়ে অভীকের দিকে তাকিয়ে আছে।কিছুটা এগিয়ে গেল অভীক।একটা অটো ডেকে নিল।
-"বোসপুকুর যাবে?"
-"হ্যাঁ।বসুন।"বলল অটো চালক।

পিছন থেকে আবার ডাকল মেয়েটি,-"এই হিরো দাঁড়াও; আমিও বোসপুকুর যাব।"


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ছোটগল্প " হট প্যান্ট "

গল্পটি সম্পর্কে  : মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় লেখক দের লেখা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে লিখতে।এ গল্পটিও তেমনি আমার প্রিয় লেখক প্রচেত গুপ্তের একটি গল্প থেকে অনুপ্রানিত।শুধু অনুপ্রানিত বলবো না, অনেকাংশে প্লটের মিল আছে।তবে গল্পের থিম বা, বিষয় বস্তু সম্পুর্ন আলাদা। তাই ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই লেখাটা লিখলাম। গল্প পড়ূয়া ফেসবুক পেজ ঃ  http://www.facebook.com/golpoporuya (১) বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিরি গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরম।দিনের বেলা যে খুব সূর্যের তাপ, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।তবুও হাঁসফাঁস করে দিন কাটাতে হচ্ছে।বৈশাখের শেষ। আম– কাঁঠাল পাকার পরিবর্তে পচে যাবে বেশি।বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক দেরি।এবছর বৃষ্টি আসবেও কিনা,তাতেও সন্দেহ আছে।বাংলার আবহাওয়া বর্তমান অবস্থা,এমন হাস্যকর যে, কোনো কিছুই সঠিক ভাবে বলতে পারেন না আবহাওয়া দপ্তর। রাত দশটা বেজে গেছে।গরম কালে এটা কোনো ব্যাপার নয়।বিশেষত শহরের দিকে তো এটা অনেকটা সন্ধ্যা নামার মতো ব্যাপার।ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে।একটা টেবিল ফ্যান ও আছে কিন্তু তাতেও গরম কাটছে না।টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে রমেন বাবু, একটা ধুতি পরে খালি গায়ে বসে স্কুলের খাতা