Skip to main content

বাবা হওয়ার ভয় ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]

(১)

রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে প্রমিলা বলল,-"মা ফোন করেছিল!"
আমি তখন চিকেনের একটা হাড় দাঁতে ভাঙার চেষ্টা করছি।অফিস থেকে সন্ধ্যায় ফেরার পথে,বাজার থেকে পাঁচশো মাংস কিনে এনেছি। আমি আর প্রমিলা,-বাড়িতে দু'জন মাত্র প্রানী,তাই পাঁচশ মাংসই যতেষ্ট।খারাপ রান্না করে না,প্রমিলা। বেশ ভালই লাগছে আমার। তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছি।
যদিও বউ এর হাতের রান্না,কোনো স্বামীরই খারাপ লাগে না।সে ভালো হোক বা,খারাপই হোক।বউ মন জয় করতে,এটুকু গুনগান করতে হয়। যদিও প্রমিলার গুনগান,আমি খুব ভেবেচিন্তে করি।বিয়ের সাত মাস পর,একটা ঘটনা ঘটেছিল।একদিন রবিবারে ফুলকপি দিয়ে রুইমাছ রান্না করেছিল।এতটাই লবন দিয়েছিল, যে মুখে দেওয়ার মতো নয়।

প্রমিলা জিজ্ঞেস করলো,-"কেমন হয়েছে?"
আমি কেরামতি দেখিয়ে বউ এর মন জয় করতে বললাম-"ভালোই তো।"
আমার মাথারর চুল টেনে প্রমিলা বলেছিল,-"এটা ভাল? মুখে দেওয়া যায়! শুধু মিথ্যে কথা বলা।"
-"আ! ছাড়ো।করছো কি প্রমিলা! শুধু একটু লবন টা কম হলে,ভালো হতো।"আমি বললাম।
-"আর কোনোদিন যেন না শুনি! ভালো হলে ভালো বলবে,আর খারাপ হলে খারাপ।"
সেই থেকে আমি,বউ এর গুনগান একটু ভেবেচিন্তে করি।
-"কি হল,শুনছো!"
প্রমিলা আবার জিজ্ঞেস করলো আমায়।আমার মন তখন মাংসের হাড়ে নিবিষ্ট।জড়ানো গলায় বললাম,-"বলো,কি বলছো।"
-"মা,ফোন করেছিল!"
-"কার মা?"
-"আমার মা।"
আমি চোখ তুলে তাকালাম।
-"কি বললেন উনি?"
-"জামাই,কেমন আছে জিজ্ঞেস করলো!"প্রমিলা বললো।
-"আর মেয়ে কেমন আছে, জিজ্ঞেস করিনি?"
-"এ কেমন কথা,দীপু! সে তো করবেই।"
আমি হেসে বললাম,-"আর কি বললেন,তোমার মা?"
-"অনেক দিন তো হল, এবার নাতি, নাতনির মুখ দেখতে চায়।"
দুম করে বিষম খেলাম।জলের গ্লাস এগিয়ে দিল প্রমিলা।আমি ঢক ঢক করে জল খেয়ে নিলাম।বললাম, -"এত তাড়াহুড়োর কি আছে? নতুন চাকরী।এখনো ঠিক করে গুছিয়ে-গাছিয়ে উঠতে পারলাম না।"
প্রমিলা মুখ ভার করলো।মুখ গুমরে বলল,-"তাড়াহুড়ো কোথায়?বিয়ের দু'বছর হতে চলল।তুমি অফিস গেলে,ঘরে একা একা থাকতে ভালো লাগে না।"
-"তবুও এত তাড়াতাড়ি,আর একটা বছর.....।" আমি ব্যাপার টা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।
প্রমিলা কথা বললো না।চুপ করে রইল কিছুক্ষন।তারপর নিস্তব্দতা ভেঙে বলল,-"আচ্ছা,তুমি ছেলে-মেয়ে নেওয়ার কথা বললে,এরকম করে এড়িয়ে যাও কেন বলতো? অন্য কোনো প্রবলেম নেই তো?"
-"মানে!" আমি চোখ তুলে তাকালাম প্রমিলার দিকে।
-"মানে টা তুমি ভালো করেই বুঝতে পারছো।যদি সমস্যা থাকে তো লজ্জা করো না,আমাকে বলো।তারপর না হয়,ডাক্তারের কাছে যাওয়া যাবে!"
লজ্জা নয়,আমার মাথায় রাগের পোকা গুলো কিলবিল করে উঠল।
রেগে গিয়ে বললাম,-"কি বলছো এসব!"
-"তাহলে তোমার সমস্যা টা কোথায়?মা-বাবা দের তাদের নাতি-পুতি দের মুখ দেখতে ইচ্ছে হয় না?" প্রমিলা ও মুখ ঝামটালো।
-"তোমার মার ইচ্ছে হলে তো আর, তোমার ছেলে-পুলে হবে না।তার জন্যে আমার ইচ্ছে ও দরকার।"
-"হ্যাঁ! বুড়ো হয়ে গেলে তারপর তোমার ইচ্ছে হবে....!" ভাতের থালায় জল ঢেলে,প্রমিলা উঠে ঘরে চলে গেল।
আমি ফ্যাল ফ্যাল করে সেদিকে চেয়ে রইলাম।কি হল হঠাৎ!
-"প্রমিলা! খেয়ে যাও।"হাঁক দিলাম আমি।

(২)
ঘরের ভেতর জোরে ফ্যান ঘুরছে। টিউব লাইট টা অফ করে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। প্রমিলা অন্যদিকে পাশ ফিরে,চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। আমি জানি,ও ঘুমোই নি। আস্তে করে ওর কাঁধের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে গায়ের উপর একটা হাত রাখলাম।প্রমিলা আমার হাত টা সরিয়ে দিল।
বললাম,-"আসলে,আমি বাবা হতে চাই না।"
প্রমিলা আমার দিকে ঘুরে তাকালো।
বলল,-"কেন?"
-" ভয় পাই।আমি চাইনা যে, আমার আরেকটা জেরক্স কপি তৈরী হোক!"
-"কেন?"
প্রমিলার গলায় বিস্ময় ঝরে পড়লো।আমি ওর হাত টা কাছে টেনে নিয়ে বললাম,-"আমি পাপী।নিজের বাবা- মা কে কোনোদিন ভালোবাসি নি।একসময় ওদের দু:খ-কষ্ট দিয়েছি।আমার ছেলে-মেয়েরা ও যদি বড় হয়ে,আমার মতো হয়!"
প্রমিলা হাসলো।বলল,-"তোমার মতো না হয়ে,আমার মতো ও তো, হতে পারে।"
-"তা পারে! কিন্তু তবুও আমার ভয় হয়।" আমি বললাম।
-"ধুর! এত কিছু,এখন তোমার ভাবতে হবে না।ভাগ্যে যেটা থাকবে সেটা হবেই।"

আমি চুপ করে থাকি।অন্ধকারে প্রমিলার চোখের দিকে তাকাই।ওর চোখ দু'টো দেখতে পাই না।শুধু বুঝতে পারি,প্রমিলা আমার আরও কাছে সরে এসেছে।

স্বদেশ কুমার গায়েন(২০১৬)!

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ছোটগল্প " হট প্যান্ট "

গল্পটি সম্পর্কে  : মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় লেখক দের লেখা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে লিখতে।এ গল্পটিও তেমনি আমার প্রিয় লেখক প্রচেত গুপ্তের একটি গল্প থেকে অনুপ্রানিত।শুধু অনুপ্রানিত বলবো না, অনেকাংশে প্লটের মিল আছে।তবে গল্পের থিম বা, বিষয় বস্তু সম্পুর্ন আলাদা। তাই ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই লেখাটা লিখলাম। গল্প পড়ূয়া ফেসবুক পেজ ঃ  http://www.facebook.com/golpoporuya (১) বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিরি গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরম।দিনের বেলা যে খুব সূর্যের তাপ, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।তবুও হাঁসফাঁস করে দিন কাটাতে হচ্ছে।বৈশাখের শেষ। আম– কাঁঠাল পাকার পরিবর্তে পচে যাবে বেশি।বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক দেরি।এবছর বৃষ্টি আসবেও কিনা,তাতেও সন্দেহ আছে।বাংলার আবহাওয়া বর্তমান অবস্থা,এমন হাস্যকর যে, কোনো কিছুই সঠিক ভাবে বলতে পারেন না আবহাওয়া দপ্তর। রাত দশটা বেজে গেছে।গরম কালে এটা কোনো ব্যাপার নয়।বিশেষত শহরের দিকে তো এটা অনেকটা সন্ধ্যা নামার মতো ব্যাপার।ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে।একটা টেবিল ফ্যান ও আছে কিন্তু তাতেও গরম কাটছে না।টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে রমেন বাবু, একটা ধুতি পরে খালি গায়ে বসে স্কুলের খাতা