Skip to main content

মেয়েটির গল্প ~ ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


– দূর হতভাগা, মুখপোড়া এরকম করে কেউ ডাকে নাকি.....?
কাকটির দিকে রুটি ছিড়ে দিতে দিতে তুলি বলে। কাকটির সাথে তুলির বন্ধুত্ব অনেক দিনের। প্রথম প্রথম কাক টি ভয় পেয়ে উড়ে যেত কিন্তু এখন আর ভয় পায় না। প্রতিদিন সকালে তুলির ঘরের জানালার কার্নিসে এসে বসে কাকটি। তারপর ডেকে ডেকে তার ঘুমটা ভাঙিয়ে দেয়। এই কাক টির জন্যে সে তার মায়ের কাছে অনেকবার বকা খেয়েছে। ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে তুলি ফ্রিজ থেকে রুটি বের করে এনে কাকটিকে খেতে দেয়। তারপর সারাদিন গল্প করে। কাক টি যেন তার মনের কথা সব বুজতে পারে। –কিন্তু আজ এরকম করে ডাকছে কেন?
–" চুপ! চুপ! এরকম ডাকবি না" তুলি কাকটিকে বলে।
কাকটি তুলির কথা শোনে না। ডেকে চলে, যেন এক করুন,বিষাদের সুরে। রুটির শেষ টুকরো টা দিয়ে হুস করে কাকটিকে উড়িয়ে দেয় তুলি।– এরকম, ডাকবি তো আজ আর আমার সামনে আসবি না।
আজ তুলির মনের বাঁধকে যেন এক অসীম আনন্দের ঢেউ এসে ভেঙে দিতে চাইছে। একঝাঁক প্রজাপতি ডানা মেলে দিয়ে দিয়েছে তার মনের বাগানের পাতাবাহার গাছ গুলোর উপর। যেদিন থেকে শুনেছে তার ছোটো বেলার বন্ধু শুভ দেশে ফিরছে,সেদিন থেকে মনের ভিতরে অদ্ভুত আনন্দ। হ্যাঁ,তুলির ছোটো বেলার খেলার সাথী, পড়ার সাথী ,সর্বক্ষনের সাথী শুভ,... সেই নার্সারি থেকে। তুলির বাবা ও শুভর বাবা অনেক দিনের বন্ধু। দুজন একই অফিসে চাকরী করত,বাড়ি ও করেছিল পাশাপাশি। নিজেদের বন্ধুত্ব টা পরবর্তী কালে তাদের ছেলে মেয়ের মধ্যে এসে পড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে তুলির বিশ্রাম নেই,সারাটা বাড়ি সে নিজের হাতে মনের মতো করে সাজিয়েছে। দশ বছর পর আজ শুভ আসবে তদের বাড়িতে। মাধ্যমিক পাশ করার পর, পড়াশুনার জন্যে বিদেশে ওর মাসীর বাড়ি যেতে হয়েছিল । তুলির মন দশ বছর আগের সেই দিনটাতে সারা রাত কেঁদেছিল। সেদিনেই প্রথম বার মনে হয়েছিল, শুভ শুধু তার; শুভ কে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে না। দশ টা বছর সে অপেক্ষা করে আছে,– অনেক বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে এই দশ বছরে কিন্তু কাউকেও পছন্দ হয়নি। শুভ এলে এই সারপ্রাইজ টা তাকে দেবে।


সারাটা রাত ঘুম হয় না তুলির। আলমারি থেকে তাদের স্কুল লাইফের দুজনের জয়েন ফোটো টা বের করে আনে। ছোট্ট শুভর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি পায়। কত রাত সেই ছোট্ট শুভর কপালে, চোখে, মুখে ,ঠোটে চুমুর রেখা এঁকে দিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই। – শুভ এখন কেমন দেখতে হয়েছে ,কে জানে? হয়তো কথায় কথায় শুধু ইংরাজি বলবে। শুভ কে সে 'তুই' বলবে না 'তুমি' বলবে! ....মনে মনে তুলি ভাবে আর হাসে।
আচ্ছা, শুভ যদি তাকে চিনতে না পারে! না চিনতে পারাটাই তো স্বাভাবিক। সেই ছোট্ট তুলি তো আজ আর ছোটো নেই,বড় হয়ে গেছে। যদি তাকে দশ বছর আগের মত মনে না রাখে! তার সাথে কথা না বলে? — ধুর! কি সব ভাবছি! এরকম হতে পারে না। ছোটো বেলার বন্ধু তারা। আমার মন টাই না বাজে খুব। ছবি টাকে বুকের উপর রেখে ঘুমিয়ে পড়ে তুলি।



কিন্তু এই কাক টাই যত নষ্টের গোড়া। সকাল থেকেই শুধু ডেকেই চলেছে। মন টা খারাপ হয়ে যায় তুলির। কাকটির উপর আজ খুব রাগ হয় তুলির । একটু আগে শুভ ফোন করেছিল প্লেন থেকে নেমে। মায়ের সাথে কথা হয়েছে। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা আগে তাদের বাড়ি এসে নাকি একটা সারপ্রাইজ দেবে। কি সারপ্রাইজ দেবে, শুভ?
আজ তার মনটা কেমন অদ্ভুত আচরন করছে। সারা শরীরে পারফিউম এর গন্ধ ছড়ায় তুলি, আজ যেন অন্যরকম সেজেছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় সে। নিজের অজান্তেই হেসে উঠে। নিজের ঘর টাকে ভাল করে দেখে তুলি।সবকিছু ঠিকঠাক সাজানো হয়েছে কিনা! শুভ এলেই সেই ছোটোবেলার মতো ছুটে আগে তার ঘরে চলে আসবে । দরজা হালকা বন্ধ করে বসে থাকে সে। তারপর কত গল্প হবে। অনেক জমানো গল্প।


বাড়ির গেটের বাইরে গাড়ি থামার শব্দ। শুভ এসছে। – ছুটে গিয়ে দেখব?  না, থাক। একটু অপেক্ষা করি। তুলি ভাবে।
শুভর কথা একটু একটু শোনা যাচ্ছে। গলার স্বর টা আগের থেকে যেন একটু মোটা হয়েছে।
— "মাসীমা, তুলি কোথায় ?"
– "ওর, ঘরে বসে আছে। মনে হয় লজ্জা পাচ্ছে।" মায়ের গলার আওয়াজ পায় তুলি।
সিড়ি দিয়ে ছুটে ওঠার শব্দ। তুলির মনে একটা হাসির ঝিলিক কাটে। ছুটে এসে ঘরে ঢোকে শুভ। –" এই, তুই এখনো ঘরে বসে আছিস! সারপ্রাইজ আছে তোর জন্যে। তুই আশীর্বাদ না করলে আমরা সুখী হব কি করে?"
তুলির হাত টা টেনে নেয় শুভ। সিড়ি দিয়ে নীচে নামতে থাকে। একটা ফর্সা, লম্বা, সুন্দরী সোনালির চুলের মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ায়।
— "আমার হবু বউ। কেমন হয়েছে বল?" বলে শুভ।
তুলি কিছু বলতে পারে না। শুধু মেয়েটিকে নমষ্কার করে। বুকের মধ্যে বরফের পাহাড় গলতে শুরু করেছে, একটু পরেই আছড়ে পড়বে উত্তাল সমুদ্রে। শুভ রা চলে গেলে ছুটে এসে নিজের ঘরে ঢোকে তুলি। কাক টা জানালার কার্নিসে বসে আছে। আবার ডাকতে শুরু করেছে, সেই করুন, বিষাদের সুরে,— কাঁ! কাঁ!
কাঁ!.......কাঁ!...তুলি আর কাকটিকে উড়িয়ে দেয় না।।
স্বদেশ কুমার গায়েন ( ২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি প্রেমের গল্প " অসমাপ্ত প্রেমের পাঁচ বছর পর "

(১) মাঝে মাঝে মনে হয়,জীবনে ভালবাসা কেন আসে,আর আসলেও কেনই বা চলে যায়? যদি চলে যায়,পরে কি আবার তাকে ফিরে পাওয়া যায়? হয়তো বা যায়। আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। যদিও বা পাওয়া যায়,তাকে কি নিজের করে নেওয়া যায়?সবাই পারে না, কেউ কেউ পারে। এটা তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।গল্প শুরুর আগে হয়তো অনেক বকবক করে ফেললাম! আপনারা হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। যাইহোক এবার আসল গল্পটা বলি। যেদিন প্রথম কলেজে উঠলাম,সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম এ মেয়ে আমার পড়াশুনার বারোটা বাজানোর জন্যই এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাংলা ডিপার্টমেন্টের এত ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ের মধ্যেও,সে যে আলাদা করে সবার কাছে চোখে পড়ার মত।আর দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার ও চোখে পড়ে গেল।সদ্য আঠেরো তে পড়েছি। মনের মধ্যে একটা শিহরন, রোমান্স,উশখুশ, ফ্যান্টাসি ভাব যে তৈরী হচ্ছিল সেটা ভালই টের পাচ্ছিলাম। ওরকম দুধের মতো গায়ের রঙ, টানা–টানা চোখ,মাথার ঘন কালো চুল পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো,উন্নত বুক,চিকন চেহারা দেখলে মনের ভেতর একটা ভূমিকম্প, উথাল পাথাল তরঙ্গমালা তৈরী হয়। সে যেন বন্য হরিনী! স্থির,শান্ত,মনোহরিনী তার চোখের চাহনি ভোলবার নয়।সারা শরীরে, সারাক্ষন একটা চপলতার ভা