Skip to main content

জানালা ও প্রেম ~ ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]


আজ অনেকদিন পর জানালা টার কাছে এসে দাঁড়ালাম,তা প্রায় বছর সাতেক হবে। দু'হাতে বন্ধ জানালার ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া ডালা দুটো খুলতেই ক্যাঁচ করে কথা বলে উঠল। আমার হাতের পরশ যেন চিনতে পেরেছে।বাইরে থেকে একটা ঠান্ডা বাতাশ যেন ছিটকে এসে আমার মুখে পড়ল।

এই জানালা দিয়েই তো প্রথম তোমাকে দেখেছিলাম। ভুল বললাম, তুমি আমাকে প্রথম দেখেছিলে। আমি তো তোমাকে দেখেছিলাম তারও আগে এক অপরাহ্ণ বেলায়। সেদিন আকাশ টা যেন হলুদ মেখেছিল সারা গায়ে। অনেক টা নববধূর মতো। দখিনের শির শির বাতাশের দোলায় শিরিষের শুকনো বাদামি পাতা গুলো ঘুরপাক খেতে খেতে এসে পড়ছিল, তোমার চোখে,মুখে,জামায়। আর আমি দুচোখ ভরে দেখছিলাম তোমাকে । সেদিনের সকাল টা আমার আজ ও মনে পড়ে। বই নিয়ে বসেছিলাম জানালার পাশে। অজান্তেই চোখ দু'টি চলে গিয়েছিল তোমার বাড়িতে। তুমি একদৃষ্টে তাকিয়েছিলে এই অপরিচিত র দিকে। একটা ঠান্ডা হিমবাহ যেন নেমে যাচ্ছিল আমার শিরা দিয়ে। চারটি চোখ এক হতেই, তুমি চোখ নামিয়ে নিয়েছিলে, কিন্তু আমি আর পারিনি। দিনের পর দিন এই জানালার পাশে বসে তাকিয়ে থাকতাম একবার তোমাকে দেখার জন্য। তুমি কখন ঘুম থেকে ওঠো,কখন ঘুমোতে যাও,তোমার টিউশন পড়তে যাওয়ার সময়,পড়ে বাড়ি ফেরার সময়, স্কুল থেকে কখন ফেরো সব টাইম টেবল আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল। সেই সময় আমি সামনে বই খুলে জানালার রড ধরে তাকিয়ে থাকতাম তোমার বাড়ির গেটে। তুমিও আমার তাকিয়ে, মুচকি হেসে বাড়ি ঢুকে যেতে। আর আমার আত্মা যেন একটা শান্তি পেত। তোমার ঐ দৃষ্টি, হাসি আমি মুঠোয় ভরে রাখতাম। গভীর রাতে দরজা, জানালা বন্ধ করে ছড়িয়ে দিতাম আমার ঘরে। সারা রাত তোমার সাথে থাকতাম,তোমার হাত ধরে হাঁটতাম জসীমউদ্দীনের নকসী কাঁথার মাঠে।
ঘরটাতে অনেকদিন কেউ ঢোকে না মনে হচ্ছে। অন্তত এখান থেকে আমি চলে যাওয়ার পর থেকে। চারিদিকে মাকড়শার জাল,ধূলোয় ভরে গেছে। এই তো, বই পত্র গুলো একই ভাবে সাজানো আছে টেবিলের উপরে। ড্রয়ার খুলতেই দেখতে পেলাম চুরি করা তোমার একটা ছবি। এখন হাসি পায় ও সব কথা মনে পড়লে, কত রাত ঘুমানোর আগে তোমার ছবিতে কতবার চুমু খেয়েছি তার ঠিক নেই। শুধু মনে হত এই অধিকার শুধু ঈশ্বর আমাকেই দিয়েছে।


অনেক কাগজ পত্র সরিয়ে আমার ডায়রী টা বের করলাম। যেভাবে, ছিল সেভাবেই আছে, কেউ ছুয়েও দেখিনি । তোমার সাথে প্রথম কথা বলার দিন টা মনে পড়ল। সেও এক আবির রাঙা বিকেলবেলা। নীল পাড় দেওয়া সাদা শাড়ি, আর ছোটো ছোটো চুলে অদ্ভুত সুন্দর লাগত তোমাকে। স্কুল থেকে ফিরছিলে, রেল লাইন টা ক্রশ করতেই দেখা তোমার সাথে।
– "কোথায় যাচ্ছ তুহিন দা ?"
তোমার সামনে পড়ে আমার হার্টবিট যেন হঠাৎ বেড়ে গেল, মনে হল আমার সারাটা শরীর কাঁপছে। ভালবাসার মানুষের সামনে পড়লে সবার ই বোধ হয় এমন হয়! কোনোরকমে সেদিন বলেছিলাম,– "পড়তে যাচ্ছি।"
আর কোনো কথা বলতে পারিনি। এরপর থেকে যতদিন তোমার সামনে হয়েছি,আমার বুকের ভিতর টা দপ দপ করেছে।পুরানো ডায়রী পড়তে সবারি ভাল লাগে,তাই আজ একের পর এক পাতা উলটে যাচ্ছি। আপনাদের হয়তো আর পড়তে ভাল লাগছে না,— সেই একই ন্যাকা ন্যাকা প্রথম প্রেম।
কি করব বলুন! মনে যা আসে তাই লিখি। এতটা যখন পড়লেন, কষ্ট করে আরেকটু পড়ুন।...... তোমার স্পর্শ প্রথম অনুভব করেছিলাম তোমাদের বাড়িতে এক ঝড়ের রাতে। ঘর থেকে বেরোনোর সময় হঠাৎ তোমার হাত টা আমার হাতে লেগে গিয়েছিল। চমকে উঠে তাকিয়েছিলাম তোমার দিকে। ভালবাসার স্পর্শে যে এত সুখ আছে কোনোদিন বুঝিনি। এরপর থেকে আর নিজেকে খুঁজে পায়নি, হারিয়ে ফেলেছিলাম আমার অস্তিত্ব। তোমার ইচ্ছের উপর যেন বাঁধা পড়ে গেলাম। বুঝলাম আমি আর নেই, সবটাই তুমি হয়ে গেছ।
আরও কয়েক টা পাতা উলটালাম,ডায়রী পাতাতে আর কিছু লেখা নেই, হয়তো লিখতে মন চায়নি তখন, কিন্তু মনে আছে সব কিছু স্পষ্ট।


তারপর আরও অনেক দিন কেটে গেল । এই জানালা দিয়ে ই তো তোমাকে দেখেছিলাম নববধূর সাজে। ধপ ধপে সাদা শরীর টার উপরে লাল বেনারসি টা কি সুন্দর মানিয়েছিল,আর পাশে তোমার বর কে। ভাগ্যিস তুমি আমাকে না করে দিয়েছিলে, নইলে এত ভাল জোড়ি কখনও দেখতে পেতাম না। আমার আজ লজ্জা করছে। ছি! তোমার পাশে আমি দাঁড়ালে উঁই এর ঢিবির মতো লাগত। যা করেন ঈশ্বর হয়তো ভালর জন্যেই করেন । বেশীক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারিনি তোমাদের দিকে, মনে হচ্ছিল একটা একটা তির জানালার গরাদ ভেদ করে আমার শরীরে প্রবেশ করছে। প্রচন্ড একটা যন্ত্রনা অনুভব করলাম, এক ঝটকায় জানালা টা বন্ধ করে দিলাম। আর কোনোদিন খুলিনি।
অন্ধকার ঘরে একা একা এক যন্ত্রনায় পুড়ে শেষ হচ্ছি। কারন আমি শুধু তোমাকে হারায় নি। আমি হারিয়েছিলাম আমাকে, আমার অস্তিত্ব কে। আমার ফিরে আসার আর কোনো রাস্তা ছিল না। সবাই বলতো এ যন্ত্রনা ভুলে থাকার এক মাত্র উপায় মদ। এই প্রথম বার সেটা হাতে তুলে নিলাম কিন্তু যন্ত্রনা কমল কই? রাগে, কষ্টে, অভিমানে সব বোতল আছড়ে ভেঙে ফেললাম। না! এ সব আমাকে যন্ত্রনা থেকে মুক্তি দিতে পারবে না। সুসাইড! আত্মহত্যা একমাত্র পারবে আমাকে মুক্ত করতে।কিন্তু কিভাবে? আমি তো ভীতু! দিনের পর দিন একটু একটু করে ঘুমের ওষুধ কিনে জমাতে লাগলাম।

মাসখানেক পর এক পূর্নিমার রাত। নিস্তব্দ চারিদিক, পাশের বাবলা গাছটিতে একটানা ডেকে চলেছে ঝিঁঝিঁ পোকার দল। আর ঘরের ভিতর যন্ত্রনা দগ্ধ আমি একটা অসহায় প্রানী। একটু একটু করে জমানো ট্যাবলেট সব এক সাথে খেয়েনিলাম। জানালাটা তার রড দিয়ে হয়তো আমাকে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পারিনি। খুব ঘুম পেয়ে গেল আমার,আস্তে আস্তে ঢলে পড়লাম বিছানার কোলে। মুক্ত আজ আমি,............চির নিদ্রায় শায়িত।

দীর্ঘ সাত বছর পর আবার ঘরটিতে প্রবেশ করলাম,অশরীরে। সেই তোমার বিয়ের রাতের বন্ধ জানালা টা আবার খুলে দিয়েছি তোমায় দেখার জন্যে। আমায় যেন চিনতে পেরেছে জানালা টা । ক্যাচ ক্যাচ করে কথাও বলছে। ওই তো! আজও তোমাকে দেখতে পাচ্ছি। একটা ছোট্ট ছেলে তোমাকে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। একদম তোমার মতো দেখতে। আজ আর আমার রাগ হয় না, দু:খ কষ্ট হয় কিছুই হয় না; আমি আজ সব কিছুর বাইরে। জানালা টা দিয়ে ফুরফুর করে বাতাশ ঢুকছে। মরচে ধরা রড গুলো যেন প্রান ফিরে পেয়েছে। ফ্যাকাসে পাল্লা দুটো টেনে আবার বন্ধ করে দিই । আমি ছাড়া যেন আর কেউ এ জানালা দিয়ে কোনোদিন তোমাকে না দেখে।
স্বদেশ কুমার গায়েন
( ২০১৫)

Comments

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি প্রেমের গল্প " অসমাপ্ত প্রেমের পাঁচ বছর পর "

(১) মাঝে মাঝে মনে হয়,জীবনে ভালবাসা কেন আসে,আর আসলেও কেনই বা চলে যায়? যদি চলে যায়,পরে কি আবার তাকে ফিরে পাওয়া যায়? হয়তো বা যায়। আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। যদিও বা পাওয়া যায়,তাকে কি নিজের করে নেওয়া যায়?সবাই পারে না, কেউ কেউ পারে। এটা তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।গল্প শুরুর আগে হয়তো অনেক বকবক করে ফেললাম! আপনারা হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। যাইহোক এবার আসল গল্পটা বলি। যেদিন প্রথম কলেজে উঠলাম,সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম এ মেয়ে আমার পড়াশুনার বারোটা বাজানোর জন্যই এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাংলা ডিপার্টমেন্টের এত ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ের মধ্যেও,সে যে আলাদা করে সবার কাছে চোখে পড়ার মত।আর দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার ও চোখে পড়ে গেল।সদ্য আঠেরো তে পড়েছি। মনের মধ্যে একটা শিহরন, রোমান্স,উশখুশ, ফ্যান্টাসি ভাব যে তৈরী হচ্ছিল সেটা ভালই টের পাচ্ছিলাম। ওরকম দুধের মতো গায়ের রঙ, টানা–টানা চোখ,মাথার ঘন কালো চুল পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো,উন্নত বুক,চিকন চেহারা দেখলে মনের ভেতর একটা ভূমিকম্প, উথাল পাথাল তরঙ্গমালা তৈরী হয়। সে যেন বন্য হরিনী! স্থির,শান্ত,মনোহরিনী তার চোখের চাহনি ভোলবার নয়।সারা শরীরে, সারাক্ষন একটা চপলতার ভা