Skip to main content

আমাদের পাড়ার সুমন ~ ছোটোগল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন ]



              

ক্লাবে ঢুকেই সুমন কে কাঁদতে দেখে অবাক হয়ে গেলাম।এত বড় আধ দামড়া টা আবার কাঁদে কেন!

সুমন টা এমনই।যেদিন আমাদের পাড়া ছেড়ে চলে গেল,সেদিন আমাদের জড়িয়ে ধরে কি কান্না! আমার চোখেও জল এসে গিয়েছিল সেদিন। কিন্তু এতদিন পর কান্নার কি কারন?আজ কি আনন্দে কাঁদছে!
-কি বে কখন এলি? আমি সুমন কে জিজ্ঞেস করলাম।
ক্লাব ঘরের পুব দিকের জানালার পাশে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার রাখা। তার উপর বসে আছে সুমন। চোখে জল। আমি আবার সুমনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,-"কি বে কাঁদছিস কেন?হল টা কি তোর?"
পাশে সন্তু,রুপম,দেবু,সঞ্জু রা ক্যারম পিটছে। আমার দিকে না তাকিয়েই দেবু বলল,-"দেখ,এতদিন পর এল,
আর ব্যাটা সেই থেকে কেঁদেই চলেছে!"
ওপাশ থেকে সন্তু ফোড়ন কাটলো-"পুরানো পাড়ায় এসে,বাবুর মনে হয় পুরানো প্রেমের কথা মনে উঠেছে!"
ওরা চার জনই হেসে উঠল।

সুমনের বাড়ি আমাদের এখানে নয়। নদীয়া জেলার, কল্যানী শহরে। কলকাতায় আত্মীয় বলতে,তার একমাত্র মাসীর বাড়ি।পঞ্চম শ্রেনী থেকেই আমাদের সাথে এখানকারই স্কুলে ভর্তি হয় সুমন।সেই থেকে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত আমরা অভিন্ন হৃদয়ের বন্ধু।তারপর টুয়েলভ পাশ করার পর নিজের বাড়ি চলে গেল। এই পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার দিন খুব কেঁদেছিল। সুমন ছেলেটি এমনিতেই ভাল। সহজ-সরল।তবে একটু বোকা ধরনের।এরকম সাদাসিধে ছেলে আমি খুব কমই দেখেছি।লম্বা, রোগা-পাতলা চেহারা।মাথায় লম্বা চুল,চোখের মনি গুলো একটু সাদা।পড়াশুনাতে ও আমাদের সবার আগে ছিল।
এই সুমন শেষ পর্যন্ত আমাদের পাড়ার মেয়ে তিতলির প্রেমে পড়ল। বলা ভালো,প্রেমে পাগল হয়ে গেল।তিতলি হল আমাদের পাড়ার হর্টথ্রব গার্ল।ক্লাস নাইন থেকে কত জন যে পিছনে লাইন দিয়েছে,আর লেঙ্গি খেয়ে হাত-পা ভেঙেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।কথা-বার্তায় যেমন স্মার্ট,তেমন চালাক-চতুর। তবে আমরাও এ সব মেয়েদের পাত্তা দিতাম না।শুধু সুমনই গলে পড়ল।
তখন ক্লাস ইলেভেন এ পড়ি আমরা।আর আমাদের স্কুলে শুধুমাত্র ইলেভেন ও টুয়েলভে মেয়েরা ভর্তি হতে পারতো।তিতলি ও আমাদের সঙ্গে ভর্তি হল।আর সুমনের ও হৃদয় নেচে উঠল।
-"জানিস,আজ তিতলি আমার কাছে নোট চেয়েছে।কি সুন্দর হেসে কথা বলছিল! কি মিষ্টি হাসি!"
ক্লাসে জানালার পাশে বসে কবি কবি একটা ভাব নিয়ে বলেছিল সুমন।
-"ওটা মিষ্টি নয়,তেতো।তিতলি যেদিন তোর মুখে তেঁতুল ঘষে দেবে,অন্য কারও সাথে ঘুরবে সেদিন বুঝবি!" আমি বলেছিলাম।
-"তুই চুপ কর তো।তিতলি ওরকম মেয়ে নয়।ও খুব ভাল।"
তিতলি কিরকম মেয়ে,সেটা সুমন টের পেয়েছিল দ্বাদশ শ্রেনীর প্রথম দিকে।প্রেমে হাবুডুবু খেতে খেতে একদিন একটা চিরকুট লিখে তিতলির ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল।
ব্যাস! অ্যাটম বোম্ব টা বিস্ফোরন হল টিফিনের সময়।সুমন কে আলাদা করে ডেকে,তিতলি কি যে বলেছিল,আমরা জানিনা।তারপর থেকে সুমন কিছুদিন গুম মেরে গেল।কথা বলতো না।মাঝে মাঝে ক্লাবে এসে চোখের জল ফেলতো।
আমরা ও কে সান্ত্বনা দিতে থাকলাম।-"তিতলি গেছে তো কি হয়েছে? এখনো টিনা,মৌমি,
সঙ্গীতা রা আছে!"
ও রেগে গিয়ে বলতো,"কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে হবে না!"
পনেরো দিন পর থেকে সুমন আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।হাসি,আড্ডা, খেলা ধূলা নিয়ে মেতে উঠল। পড়াশুনায় বেশি করে মন দিল।আর কখনো মুখে তিতলির নাম ও আনতো না।
সেই সুমন আজ প্রায় দেড় বছর পর আমাদের পাড়ায় এসেছে।আর এসেই আবার কান্না-কাটি শুরু করে দিয়েছে।আমি সুমনের কাছে গিয়ে
হেসে বললাম,-"কি বে,এবার বাড়ি গিয়ে আবার কারও কাছে লেঙ্গি খেলি নাকি?"
-"ধুর না!"সুমন বলল।
-"তবে?"
-"আজ তিতলি কে দেখলাম গাড়ি থেকে নামতে। সাথে একজন মধ্য বয়স্ক মহিলা।"
-"তো,কি হয়েছে?"
চোখের জল মুছে সুমন বলল,-" তিতলি প্রেগনেন্ট।"
সঞ্জু সবে ক্যারমের স্টাইক টা দিয়ে সাদা গুটিকে হিট করেছিল।সুমনের কথা শুনে, মুহুর্তের মধ্যে চারজন আমাদের দিকে ফিরে স্ট্যাচু হয়ে গেল।আর স্টাইকটা কাঠবোর্ডে তিন বার ধাক্কা খেয়ে একটা পকেটে পড়ে গেল।
-"ও এই জন্যেই তুই কাঁদছিস?খুব দু:খ হচ্ছে তোর?"
সুমন চুপ করে রইল।আমি একটু থেমে,আবার বললাম,"কোথায়,তুই বাবা হচ্ছিস ভেবে,থুড়ি তোর এক্স গার্লফ্রেন্ড মা হতে যাচ্ছে-মিষ্টি খাওয়াবি;তা নয়,বসে বসে কাঁদছিস।বোকা পাঁঠা একটা!"
-"হু! আমি তো এখন বোকা। "
আমি একটু ফিসফিসিয়ে বললাম,-" কি বে,মনের ভেতর একটা ক্ষীন আশা এখনো ছিল নাকি? কিন্তু প্রেগনেন্ট দেখে সব জলে গেল!"
আমার কথা শুনে সবাই হো হো হো হেসে উঠল।সুমন চোখ গুলো বড় বড় করে আমার দিকে তাকালো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সন্তুকে সরিয়ে ক্যারম বোর্ডের পাশে দাঁড়ালো।

দুদিন পরের ঘটনা। ক্লাবে আড্ডা চলছে জোর কদমে। ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে তর্ক চলছে। হঠাৎ অমিত এসে ঢুকলো।হাতে একটা মিষ্টির প্যাকেট। মুখে হাসি।দাঁত গুলো বেরিয়ে আছে।-"বন্ধুগন,সবাই একটু মিষ্টি মুখ করুন। কথা দিয়েছিলাম,বাবা হলে সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবো।"
তারপর সুমনের দিকে তাকিয়ে বলল,-" আরে সুমন! তুই কবে এলি?এই নে মিষ্টি ধর।যাক তুই ভালো দিনেই এসেছিস।"
সুমন মিষ্টি হাতে নিয়ে বলল,-"শালা! কেমন আছিস?বিয়ে করলি তো,একটা খবর ও দিলি না! একেবারে বাবা হওয়ার খবর নিয়ে এসেছিস?"
-"ভালোই আছি।আর সময় হয়নি রে। হঠাৎ করেই সব হয়ে গেল। দূরের কাউকে বলতে পারিনি।"
অমিত মিষ্টির প্যাকেট টা চেয়ারের উপর রেখে দিল। তারপর একটা ব্যস্ত ব্যস্ত নিয়ে বলল,-"এখন চলি রে। একটু কাজ আছে।মিষ্টি টা সবাই খেয়ে নিবি।বিকেলে দেখা হবে।"
অমিত ঝড়ের গতিতে ঢুকেছিল, আবার সেই গতিতে বেরিয়ে গেল।
সুমন মিষ্টির অর্ধের কামড়ে মুখের ভেতর নিয়ে
বলল,-"আবে! মাল টা এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে নিল? আবার বাপ ও হয়ে গেল!"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম,-"টি-টোয়েন্টি যুগ ভাই! হাতে এখন সময় খুব কম।"
-"তো, কাকে বিয়ে করলো বলতো? প্রেমের চক্কর ছিল নাকি? সেরকমও তো কোনোদিন শুনিনি। " বলল সুমন।
প্যাকেট থেকে একটা মিষ্টি মুখে পুরে সুমনের দিকে তাকিয়ে রুপম বলল,-"তুই শালা একটা গবেট! তোর এক্স গার্লফ্রেন্ডের মা হওয়ার কারন তো অমিত ই।"
আমরা সবাই হেসে উঠলাম।হাতের অর্ধেক মিষ্টিটা সবে মুখে পুরতে যাচ্ছিল সুমন।থেমে গেল হাত। বোকার মতো চেয়ে রইল আমাদের
দিকে। বুঝতে পারছি,ওর রাগ হচ্ছে। রেগে গিয়ে বলল,-"আগে কেন বললি না?"
-"তুই আরও দু:খ পাবি তাই।"বললাম আমি।
সুমন মিষ্টি সমেত হাত টা মুখের কাছ থেকে নীচে
নামালো। আমি ওর অবস্থা দেখে বললাম,-"ভাই,মিষ্টি টা ফেলিস না।হাজার হোক তোর এক্স তো! যদি ভালো-মন্দ কিছু হয়ে যায়!"
সুমন কিছু বলল না।মিষ্টি টা আবার মুখের ভিতর ঢুকিয়ে নিল।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ভূতুড়ে প্রেমের গল্প " ভূত হওয়ার পর "

(১) শালা! মরেও শান্তি পেলাম না! এই দেখুন,ভূত হয়ে বাবলা গাছের ডালে বসে আছি।এখন রাত ক'টা বাজে,কে জানে! ঘুম ঘুম পাচ্ছে।একটা ঘড়ির ব্যবস্থা যদি থাকত, তবে অন্তত বুঝতে পারতাম,ভোর হতে আর কত বাকি? সদ্য ভূত হয়েছি,তাই এখনো রাতের বেলা ঘুমের নেশাটা কাটেনি।তারপর মাথায় উপর টেনসন,বালির বস্তার মতো চেপে আছে। শালা! বলে কিনা,এখন প্রেম করতে হবে! আরে প্রেম কি,কলম করা গাছের আম নাকি? যে, গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম,আর টকাস করে হাত দিয়ে পেড়ে খেয়ে নিলাম।জীবিত অবস্থায় যেটা হল না,সেটা নাকি এখন মরে গিয়ে করতে হবে! আবার বড় গলায় বলা,এটা এখানকার রুল। অপূর্ন কাজ গুলো এখানে পূর্ন করা।গুলি মারি তোর রুলের পিছনে....। আপনাদের মাথাও নিশ্চয় গুলিয়ে যাচ্ছে,আমার কথা শুনে।আমারও গিয়েছিল।তাহলে একটু আগে থেকে বলি শুনুন।যেদিন ট্রেনে তলায় মাথা দিয়ে,মাটির সাথে চিপকে গেলাম,হাড়-মাস সব দলা পাকিয়ে গেল-সব লোক তখন এসে আমার আইডেনটিটি খুঁজতে লাগলো,আর তখন আমি সোঁ সোঁ করে উড়ে যাচ্ছি।কোথায় যাচ্ছি,আমি নিজেও জানি না।শুধু উড়ছি। এতক্ষন নিশ্চয় নীচে আমার খন্ড খন্ড বডি নিয়ে পরীক্ষা- নিরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।কেউ বলবে সুসাইড,কেউ বলবে অ্যাক্সিডেন্