Skip to main content

|| অভাব || অনুগল্প||~স্বদেশ কুমার গায়েন


গাড়ি এসে থামলো।
সেই সাথে বৃষ্টি নামলো।প্রথমে টিপ টিপ করতে করতে হঠাৎ গিয়ার বাড়িয়ে ঝমঝমিয়ে নেমে এল। দুপুর গড়াতেই মেঘেদের মধ্যে,চোখ রাঙানি,শাসানি,তর্কাতর্কি শুরু হয়েছিল আকাশে।আর এখন সেটা থেমে গিয়ে, অভিমানের জল হয়ে ঝরে পড়ছে।চার চাকার ঝাঁ চকচকে মার্সিডিজ গাড়ির উপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে ফেঁটে ফেঁটে যাচ্ছে।
একটা ছোটো এক চালার পাকা ইটের বাড়ি। শ্যাওলা ধরা ছাদের উপর বেল ফুল, গোলাপ, গাঁদা ফুলের টব বসানো।অনেক দিন রঙ না করায়,বাড়িটির দেওয়ালের ইটের প্লাস্টার চটে গেছে।শ্যাওলা জমে ইট গুলো কালো কালো। কোথাও কোথাও বট গাছের শিকড় ও ঝুরি বেরিয়েছে।বাড়ি টি ঘিরে,চারপাশে ভগ্নপ্রায় পাঁচিল। বেশ কিছু জায়গায় ভেঙেও পড়েছে। সেখানে কাঁটা- লতার ডাল ঝাঁপ করে রাখা। মরচে ধরা লোহার গেট টা আজ মৃত প্রায়।

ঠিক এই মরচে ধরা গেটের সামনে গাড়িটা দাঁড় করালো রনি।পুরো নাম রনিত সেন।ছ'ফুটের কাছাকাছি লম্বা।ফর্সা,চওড়া, মেদহীন শরীর। মাথায় স্পাইক করা কালো চুল। ত্রিশ বছরের চনমনে রনিতের পরনে কালো সুট,সাদা জামা।গলায় ব্রাউন রঙের টাই।আর পায়ে এক জোড়া দামি অফিসিয়াল সু।সেন গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজের একমাত্র কর্ণধর। জন্মের কয়েকদিন পর রনিতের মা মারা যায়।বাবার আদরে মানুষ।তিনি ছোটোবেলা থেকে কোনো অভাব রনিতের রাখেন নি।রনিতের বাবা,রনজয় সেন এই সেন গ্রুপ অফ কোম্পানির প্রতিষ্টতা। ভালোবেসে নিজের স্ত্রীর নামেই প্রতিষ্টানের নামকরন করেছিলেন।
বছর দু'য়েক হয়ে গেল রনিতের বাবাও মারা গেছেন। বাবার মৃত্যুর পর দিন-রাত পরিশ্রম করে নিজের হাতেই প্রতিষ্ঠান কে রাজ্যের মধ্যে প্রথম সারির শিল্পপতি দের পাশে নিয়ে গেছে।এখন প্রতিদিন নেতা, মন্ত্রীদের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেগেই থাকে রনিতের।রাজ্যের বাইরে থেকেও বড় বড় শিল্পপতি রা নানা রকম বিজনেস ডিল করতেও রনিতের কাছে হাজির হয়। বড় বড় বিজনেসম্যান দের ঘুরে বেড়ানোর ফুরসত তেমন মেলে না। তেমনি রনিতের ও হাতে সে সময় নেই।আজ মন্ত্রীদের সাথে,তো কাল অফিসের কাজে সবসময় মিটিং এ ব্যস্ত। তবুও প্রায় প্রতিদিন বিকালে এই সময়টা তার বের করতে হয়। কোনো অদৃশ্য বন্ধন যেন তাকে এই বাড়িটির ভেতর টেনে নিয়ে আনে।

গাড়ির দরজা খুলে রাস্তায় নামে রনিত।বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয়।মাথা বাঁচাতে মাথার উপর হাত রাখে সে। রাজারহাটের কাছে নিজস্ব তিনতলা অফিস রনিতের। গাড়ি নিয়ে যখন অফিস থেকে বেরিয়েছিল তখন, আকাশ মন গুমরে ছিল। তারপর টিপটিপ করে শুরু হয়,পরে ঝমঝমিয়ে আসে।মাথার উপর হাত দিয়ে গেট ঠেলে ছুটে বাড়ির ভেতর ঢোকে রনিত।বারান্দায় ওঠে।
-"কে?"ভেতর থেকে একটা মেয়ের গলা ভেসে এল।
রনিত ঘরের ভেতর গিয়ে দাঁড়ায়। ছোটো একটা ঘর।খুব বেশি জিনিষ পত্র নেই ঘরের ভেতর। একটা খাট, টেবিল,ও ঘরের ডান কোনে একটা আলমারি দাঁড় করানো।তবে বেশ পরিষ্কার-পরিছন্ন।সেলাই এর মেসিন বন্ধ করে,প্রনতি উঠে এল।একটা চেয়ার টেনে রনিতের দিকে দিয়ে বলল,-"তুমি কেন এসেছো আবার?"
-"এরকম বলছো কেন প্রনতি?আমি আসতে পারি না?"
রনিত অবাক হয়ে গেল।
-"না,পারো না।দেখ,তোমার কাছে হাত জোড় করছি,তুমি আর এ বাড়িতে এসো না।তোমার এই আসা যাওয়া,পাড়ার কেউ ভালো চোখে দেখে না।মন্দ ভাবে সবাই।মা,বাইরে বেরোলে কথা শোনায়।প্লীজ! মা, আসার আগেই তুমি চলে যাও...।"
প্রনতি চোখ থেকে চশমা টা খুলে টেবিলের উপর রাখলো। রনিত নিশ্চুপ রইল।বেশ কিছুক্ষন কথা বললো না।কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল।কিন্তু তার আগেই পকেটের ফোনটা বেজে উঠল।পকেট থেকে ফোনটা বের করে রিসিভ করলো রনিত।-"হ্যালো!"
-"স্যার! একটা কোম্পানি থেকে এসছে,আপনার সাথে দেখা করতে চায়।"
-"আজ হবে না,বলে দাও।"
-"বড় ডিল আছে স্যার!"
-"ভাড় মে যাক ডিল।বলো,আর কেউ কোনোদিন যেন না আসে।"
রনিত রেগে উঠলো।ফোনটা কেটে দিল।
-"এরকম করছো কেন,তুমি!" প্রনতি, রনিতের কাছে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। চুপ করে রইল রনিত।চোখ দুটো তার পায়ের দিকে।প্রনতি আবার বলল, -"দেখো,এরকম পাগলামি করো না। আচ্ছা,তোমার কিসের অভাব আছে বলোতো?-তিন তলা প্রাসাদের মতো বাড়ি তোমার।সুইমিং পুল, টেনিস কোর্ট,নিজস্ব পার্ক.....। কতগুলো গাড়ি আছে তার ঠিক নেই! চাকর-বাকর,অঢেল টাকা-পয়সা।.......আর কি চাই তোমার?"
রনিত চোখ তুলে প্রনতির দিকে তাকালো।বাইরে ঝড়ের দাপটে, গাছপালা গুলো যেমন অসহায় তেমনি,এক অসহায়তা,আকুলতা ভরে উঠল রনিতের চোখে।বলল,-"তুমি ঠিক বলেছো, সত্যিই তো,আমার ওই তিনতলা প্রাসাদের মধ্যে সব কিছুই আছে।তবুও প্রতিটা মুহুর্তে আমি কিসের একটা অনুপস্থিতি টের পাই।আমি সেটা বুঝতে পারি।....আজ সত্যিই আমার কোনো কিছুরই অভাব নেই-শুধু ভালোবাসার অভাব ছাড়া। যেটার জন্যে ওই তিন তলা প্রাসাদ একটা জড়বস্তু,স্পন্দন হীন, প্রানহীন মৃতের মতো পড়ে আছে। তাই তো সব কিছু ছেড়ে এই কুঁড়ে ঘরে, তোমার কাছে ছুটে ছুটে চলে আসি...।" রনিতের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো রনিত।
বাইরে ঝড়ের গতি অনেকটাই কমেছে।সেই সাথে বৃষ্টির দাপট ও। দরজার দিকে পা বাড়ালো সে। ছোটো একটা টান অনুভব করলো। পেছন থেকে,রনিতের হাতটা চেপে ধরলো প্রনতি। প্রনতির চোখেও জলের রেখা।

স্বদেশ কুমার গায়েন(২০১৬)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ভূতুড়ে প্রেমের গল্প " ভূত হওয়ার পর "

(১) শালা! মরেও শান্তি পেলাম না! এই দেখুন,ভূত হয়ে বাবলা গাছের ডালে বসে আছি।এখন রাত ক'টা বাজে,কে জানে! ঘুম ঘুম পাচ্ছে।একটা ঘড়ির ব্যবস্থা যদি থাকত, তবে অন্তত বুঝতে পারতাম,ভোর হতে আর কত বাকি? সদ্য ভূত হয়েছি,তাই এখনো রাতের বেলা ঘুমের নেশাটা কাটেনি।তারপর মাথায় উপর টেনসন,বালির বস্তার মতো চেপে আছে। শালা! বলে কিনা,এখন প্রেম করতে হবে! আরে প্রেম কি,কলম করা গাছের আম নাকি? যে, গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়ালাম,আর টকাস করে হাত দিয়ে পেড়ে খেয়ে নিলাম।জীবিত অবস্থায় যেটা হল না,সেটা নাকি এখন মরে গিয়ে করতে হবে! আবার বড় গলায় বলা,এটা এখানকার রুল। অপূর্ন কাজ গুলো এখানে পূর্ন করা।গুলি মারি তোর রুলের পিছনে....। আপনাদের মাথাও নিশ্চয় গুলিয়ে যাচ্ছে,আমার কথা শুনে।আমারও গিয়েছিল।তাহলে একটু আগে থেকে বলি শুনুন।যেদিন ট্রেনে তলায় মাথা দিয়ে,মাটির সাথে চিপকে গেলাম,হাড়-মাস সব দলা পাকিয়ে গেল-সব লোক তখন এসে আমার আইডেনটিটি খুঁজতে লাগলো,আর তখন আমি সোঁ সোঁ করে উড়ে যাচ্ছি।কোথায় যাচ্ছি,আমি নিজেও জানি না।শুধু উড়ছি। এতক্ষন নিশ্চয় নীচে আমার খন্ড খন্ড বডি নিয়ে পরীক্ষা- নিরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে।কেউ বলবে সুসাইড,কেউ বলবে অ্যাক্সিডেন্