Skip to main content

তিস্তা রায়ের ছোট গল্প 'মন তার খেয়ালিনী'




 (১)

শুভ্র ডব্লিউ.বি.সি.এস অফিসার৷ স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, আঠাশ বছর বয়স,সরকারি হেভিওয়েট কোয়ার্টার, গাড়ি,বাড়ি, মা,বাবা সঅঅব আছে তার শুধু মিষ্টি একটা বউ বা প্রেমিকা ছাড়া!!
অ্যাদ্দিনে বিয়েটা হয়েই যেত হয়তো দেখাশুনো করে কারণ ওর মায়ের শরীরের অবস্থা খারাপ,তাড়াতাড়ি ছেলেকে থিতু করতে চান৷হায় রে!শুভ্র ভাবে,যদি বছর দুয়েক আগে চাকরি পেয়েই বিয়েটা করে নিত ও,তাহলে আর এত ঝামেলা পোহাতে হত না!
মুর্তিমান ঝামেলাটির নাম সুচরিতা সেন! যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী...অসম্ভব জেদি,রাগী আর খামখেয়ালি!

আলাপটাও হয়েছিলো অদ্ভুতভাবে৷ গরমের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি গিয়ে এক দূরসম্পর্কের দিদির বিয়েতে গিয়েছিল ও৷সেখানেই সুচরিতার মা নিজে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর মেয়ের সাথে৷পড়ন্ত বিকেলের হলুদ আলোয় শুভ্র দেখেছিল ছোটো স্টেপকাট চুল,দোহারা চেহারা আর মিষ্টি হাসি নিয়ে একটা মেয়ে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে হাত!


তারপর কেটে গেছে পুরো এক বছর৷অফিস থেকে সারাদিন খেটেখুটে এসে রাতে শুভ্র আনমনে অপেক্ষা করে ফেলে একটা ফোনের জন্য,যদিও জানে সেটা আসার চান্স পাঁচ শতাংশ।নিজেই ফোন করে কিছুক্ষণ পরে...সুচি ধরলে বেশ ভালোভাবে কথা বলে, কিন্তু বেশিরভাগ দিনই ধরে না!শুভ্রর মাঝেমাঝে ওর কথা শুনে মনে হয়, সুচরিতা হয়তো ওকে পছন্দ করে, পরক্ষণেই আরেকটা কথা শুনে যায় সে ভুল ভেঙ্গে!
কখন যে ওর মুড কেমন থাকবে সেটা ও নিজেই জানে কিনা সন্দেহ!আর ওর সামনে এলে বা কথা বলার সময় শুভ্রর সব স্মার্টনেস উবে যায়!তবু কয়েকবার মিনমিন করে বলেছিল দেখা করার কথা,সুচি রাজি হয়নি!আবার একদিন ভরদুপুরে কলেজ থেকে ফোন করে বললো,কিছুই নাকি ভাল্লাগছে না,সিনেমা দেখতে যাবে!শুভ্রর অফিসে সেদিন প্রচুর কাজ থাকা সত্ত্বেও পড়িমরি করে সোনারপুর থেকে ট্রেন ধরে যাদরপুর চলে এল!তারপর সুচি এল পাক্কা পনের মিনিট পরে!স্টেশনে দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিট কথা বলার পর শুভ্র যখন জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবে সিনেমা দেখতে,সুচরিতা অম্লানবদনে কপালে নেমে আসা চুলগুলো সরিয়ে বলে দিল,"অ্যাকচুয়ালি আজকের দুপুরটা খুব বোরিং ছিল!তারপর তোমাকে দেখতেও ইচ্ছে করল একটু!!তাই ডাকলাম৷বাট এখন মাইন্ডটা একদম রিফ্রেশড্ হয়ে গেছে!সো এখন আর কোথাও যাব না!চলো বাই,প্রচুর পড়া আছে!"
শুভ্র হাঁ করে তাকিয়ে ছিলো খানিকক্ষণ,তারপর দেখতে পেয়েছিলো সবুজ কুর্তি আর জিন্স পরা ওর প্রথম ভালোলাগা হারিয়ে যাচ্ছে ভিড়ের ভিতর...

আসলে সুচরিতা সেন খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে,সে চায় না মাত্র বাইশ বছর বয়সে বিয়ে করে একজন পুরুষকে নিয়েই ভাবে বিভোর হয়ে থাকতে!তার চেয়ে পড়াশুনা,ফেসবুক,লেটনাইট হোস্টেল আড্ডা,ছেলে বন্ধুদের নিয়ে হইহই করা,মিটিং মিছিলে সামিল হওয়া এই তো ভালো...তবে মাঝেমাঝে মনের ভিতর অন্য পাখিও গান গায়..তখন মনে হয়, সত্যিই নিজের একটা কেউ থাকলে হোতো...সেদিন শুভ্র ফোন করলে সুচি সুন্দর করে কথা বলে...সুচির বাবা মাও বলেন শুভ্র নাকি গ্রামের ছেলে..খুব সরল..

শুভ্র যেদিন ভয়ে ভয়ে ওকে সারাজীবন একসাথে থাকার কথা বলে ফেলেছিল,সেদিন ও মনে মনে খুব হেসেছিলো!অদ্ভুত ভীতু ছেলে তো!সুচির প্রথমেই মনে হয়েছিলো হ্যাঁ বলে দিই,কিন্তু হেসে বলেছিল,"এসব একদমই ভেবো না!তোমার প্রোপোজাল হয়ত কোনোদিনই গ্র্যান্টেড হবে না আমার কাছে!অন্য মেয়ে খোঁজো!"
                      (২)

"ইয়েস৷"
"হ্যালো আপনি কী সুচরিতা সেন বলছেন?"
-"হ্যাঁ আপনি কে?"
-"আমি কে তা আপনার জানার দরকার নেই!আপনি প্লিজ শুভ্রকে ছেড়ে দিন৷আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না!"
-"হোয়াট?"
-"প্লিজ প্লিজ!আপনি ওকে না ছাড়লে ও আমাকে বিয়ে করবে না!আপনার জন্যই ও আমাকে অ্যাকসেপ্ট করবে না!আমার একটাই অনুরোধ,ছেড়ে দিন ওকে!"
-"কে বলছেন আপনি?হ্যালো হ্যালো.."
যাহ্ কেটে দিলো!ঘুম থেকে উঠেই বিকেলবেলা এই উড়ো কলটা সুচির পুরো মেজাজটাই দিলো বিগড়ে৷প্রচন্ড রেগে ও শুভ্রকে ফোন করলো৷সুইচড্ অফ!
"কল মি হেল!আরজেন্ট!!"মেসেজটা পাঠিয়ে ও ভাবতে বসলো এসবের মানেটা কী!
একটা অচেনা মেয়ে এভাবে ফোন করে...ছি ছি!বলে ছেড়ে দিন!যেন ধরে রেখেছে ও শুভ্রকে!
 রাত সাড়ে দশটা অবধি জীবনে কোনোদিন যেটা করেনি সেটা করলো সুচি৷শুভ্রকে ৪০-৪৫বার কল!প্রত্যেকবার সেম!সুইচড্ অফ!
রাগের চোটে মার সাথে বিনা কারণে একটু ঝগড়াও করলো! শেষমেষ দশটা পঁয়তাল্লিশ  এ ফোন করে শুভ্রর ব্যগ্র গলা,"কী হয়েছে সু?এত্তোবার ফোন্?এনি প্রবলেম অকারস্?"
মনের রাগ আর বিরক্তি মনে চেপে ঠান্ডা গলায় সুচির জবাব,"নো৷আচ্ছা শুভ্র,আমি কী তোমাকে ধরে রেখেছি?"
-"অ্যাঁ?কী বললে?"
-"বাংলা বোঝোনা?আমি কী তোমাকে ধরে রেখেছি বলে তোমার মনে হয়?"
-"যাব্বাবা!কী সব বলছো!ধরে রাখবে কেন?!"
-"একটা মেয়ে আজ আমাকে ফোন করে বললো যে আমি তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছিনা বলে নাকি তুমি তাকে বিয়ে করতে পারছো না!"
-"মেয়ে?কোন্ মেয়ে?"
-"ন্যাকা সেজোনা শুভ্র৷দ্যাখো,তুমি যেখানে খুশি যা খুশি করতে পারো বাট আমাকে যেন কেউ ডিস্টার্ব না করে তোমার জন্য!ক্লিয়ার?"
-"আচ্ছা ঠিক আছে ঠিক আছে!তুমি আমাকে নাম্বারটা দাও,আমি দেখছি৷আর প্লিজ মাথা গরম কোরো না,প্লিজ৷"
-"হুহ্!"
খানিক পরে শুভ্রর ফোন, "হ্যাঁ তোমাকে মিতা ফোন করেছিল!বাট এসব বলল কেন বুঝলাম না!"
-"কে মিতা?"
-"আরে মিতালি৷ফেসবুকে আলাপ,আমাদের কলেজেই পড়ত,জুনিয়র৷"
-"বাহ্ বাহ্ ফেসবুকে তাহলে এইসব হচ্ছে!খুব ভালো!"
-"আরে নানা খুব কমই কথা হয়েছে৷আর আগেরদিনও কফিশপে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো,দেখলাম খুবই ভদ্র৷"
-"অসাধারণ!!মিতালি হয়ে গেছে মিতা,কফিশপে হঠাৎই দেখা হয়ে যাচ্ছে,সে আবার আমাকে ফোন করছে নাম্বার জোগাড় করে!!
হেই লিসন,ইউ শুড নট কিপ এনি রিলেশন উইদ মি!আর কক্ষনো ফোন করবে না আমাকে,নেভার!"
ফোনটা অফ করে বিছানায় আছড়ে পড়ে সুচরিতা....          
                       (৩)
মাত্র একমাসের মধ্যেই হয়ে গেল বিয়েটা।না শুভ্র নয়, একরকম শুচির জোরাজুরিতেই।সেই ঘটনার তিনদিন পর,শুভ্র যখন অনুশোচনায় প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ ভোরবেলা একটা মেসেজ এল,"প্রোপোজাল ইজ গ্র্যান্টেড!"

আজ ওদের ফুলশয্যা। ওইযে সুচি..মাথা হাঁটুতে গুঁজে খাটের উপর ফুলকুমারী হয়ে বসে আছে! ..চঞ্চল,পাগলী মেয়েটা কবে এত লাজুক হয়ে গেল কে জানে!কিন্তু এ কি?!ঘরে ঢোকার আগে আবার শুভ্র কাকে ফোন করছে!!
-"স্যরি রে মিতা!বিয়ের টেনশনে তোকে ফোন করার কথা একদম ভুলে গেছিলাম!সত্যি রে,আজকের দিনটা তুই ছাড়া কেউ আনতে পারত না!"
-"কী যে বলিস দা!বৌদি আসলে তোকে খুবই ভালোবাসত!আমি তো জাস্ট একটু উস্কেছিলাম!"
-"থ্যাঙ্কু রে!থ্যাংক ইউ সো মাচ্ বোনু!আচ্ছা রাখি,ও ওয়েট করছে!"
-"হুমম হুমম যা!বেস্ট অব লাক কিন্তু!"
শুভ্র ওর ছোটোবেলার বন্ধুর বোন মিতালিকে বিয়েতে ইনভাইট করতেই পারত!কিন্তু করেনি৷
কারণ.........

সুচরিতা খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে!


লিখেছেন তিস্তা রায়

Comments

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি থ্রিলার গল্প " খুনি "

বাংলা থ্রিলার গল্প - ' খুনি '  আমি একটা খুন করেছি। ভুল বললাম,একটা নয় দু'জন কে।নৃশংস খুন যাকে বলে,ঠিক তেমন।তবে খুন টা বড় কথা নয়। খুন তো যে কেউ করতে পারে।আমার মনে হয়েছিল,ওদের দু'জনের বেঁচে থাকা উচিত নয়, তাই খুন করেছি।কিন্তু মজার ব্যাপার হল,পুলিশ আমাকে ধরতে পারছে না।প্রতিদিন পুলিশের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি,খুনি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও বলে দিচ্ছি, কিন্তু তার পরে ও পুলিশের ধরার ক্ষমতা নেই।এই দেখুন,এখন থানায় এসে বসে আছি....। (১) গল্পটা তাহলে একটু আগে থেকেই বলি।বছর খানেক আগের কথা।সেদিন আমাদের বিবাহবার্ষিকী।এক বছর পুর্ন হল আমাদের বিয়ের।সকাল থেকে মন টা বেশ ভালোই।এদিন সবারই মন ভালো থাকে।আমারও আছে।এ দিন এলেই বিয়ের সেই কথা মনে পড়ে।বাড়ি জুড়ে কত মানুষ জন,আলোর রোসনাই,সানাই এর সুর, মেয়েদের উলুধ্বনি,সাত পাকে ঘোরা,শুভদৃষ্টি, কান্নাকাটি আরও অনেক কিছু।সবেমাত্র এক বছর,তাই হয়তো আমার এত কিছু মনে আছে। পুরানো হলে হয়তো থাকবে না।আবার থাকতেও পারে। ভোর থেকে উঠেই ব্যস্ত অসিত।আমার দিকে তার থাকানোর সময় নেই।ঘড়িতে আট টা বাজে। এখনো পর্যন্ত শুধু একটা মাত্র চুমু।ভালো লাগে এরকম! রাতে অসিত