Skip to main content

|| ন্যাচেরাল বিউটি || অনুগল্প || স্বদেশ কুমার গায়েন



রাতে আলো নিভিয়ে শোবার পর বরের গলা জড়িয়ে ধরে তিন্নি বলল,-"আমার সাজ গোজের জিনিষ চাই।কাল থেকে তোমার বোনের মতো সাজবো।...তোমার বোনকে সাজলে কত সুন্দর দেখায়।একসাথে যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাজারে যাই,তখন পাড়ার সবাই তোমার বোনের দিকে হ্যাঁ করে তাকিয়ে থাকে।আমার দিকে কেউ তাকায় না।"
শেষ লাইন টা একটু মুখ গুমরে বলল তিন্নি। সেরকমই শোনালো অমিতের কানে। অমিত তখন আদরে ব্যস্ত।বলল,-"কে বলল তোমার দিকে কেউ তাকায় না।আমি তো সারক্ষন তোমার দিকে তাকিয়ে থাকি।"
-"না,তবুও সাজবো।আমি কোনোদিন সাজিনি। মুখে শুধু একটু ক্রিম আর পাউডার এই টুকুই। মেয়ের কত কিছু সাজের জিনিষ থাকে জানো?"

সাজগোজের ব্যাপারে অমিতের মতো ক্যালাস মার্কা ছেলে কম আছে।নিজেও কোনো দিন ভালো করে সাজিনি।শুধু আব্রু রক্ষা করতে জামা প্যান্ট পরতে হয়,তাই পরে।সে আবার জানবে কি করে! অমিতের বোন জানে সব। তিন্নির গলার কাছ থেকে মুখ সরিয়ে অমিত বলল,-"কত!"
-"তুমি জানো না তাই বলছো।আমি জানি।"

তিন্নি গ্রামের মেয়ে।শিক্ষিত এবং রুচিসম্পন্ন। বাংলা বিষয় নিয়ে গ্রাজুয়েশন পাশ।গড়পড়তা মেয়েদের মতো উচ্চতা।হালকা ফর্সা,চওড়া কপাল,টানা টানা চোখ, সরু ভুরু,পাতলা ঠোঁট। মাথায় ঘন কালো চুল।তিন্নি স্বাস্থ্যবতী,এবং যতেষ্ট আর্কষনীয়। এটা একমাত্র অমিতই বুঝতে পারে।নির্জনে যখন দু'জন বসে থাকে তখন বার বার তিন্নি কে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে তার। তবুও এই সাজগোজ ব্যাপার টা মনে হয় মেয়েদের স্বভাবজাত।সামনে সুন্দরী কাউকে দেখলেই,নিজেকে অসুন্দর ভাবতে শুরু করে। তখন নিজের সব কিছুই খারাপ।তার মতো হতে হবে।তার মতো ড্রেস চাই, তার মতো হেয়ার স্টাইল চাই, সাজগোজ চাই...ইত্যাদি, ইত্যাদি।

অত্যন্ত স্বাধরন পরিবারের মেয়ে তিন্নি।তাই সাজগোজের ব্যাপারে প্রথম থেকেই সে অজ্ঞ। এতকিছু জানতে পারে কলেজে পড়ার সময়। শহরে একটা হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করতো তিন্নি।তার রুমমেট রা অনেক বড় ঘরের মেয়ে। কত কিছু তাদের সাজের জিনিষ! কি সব নাম-আইল্যাস,আইলিয়ার, লিপস্টিক, মাসকারা, কনসিলিয়ার,ব্লাস..আরও কত কিছু।এসব দেখা তো অনেক দূর,নাম ও কখনো শুনিনি তিন্নি।শুধু হালকা লিপস্টিক আর একটু ক্রিম মেখে তার কেটে গেছে।এসব প্রোডাক্ট অমিতের বোনের কাছে আছে।তিন্নি দেখেছে।তবে কখনো মাখতে ইচ্ছে হয়নি।

অমিতের মাথা নাড়িয়ে তিন্নি বলল,-"কি গো, চুপ করে আছো কেন?আমাকে তোমার সাজিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে না?"
চুপ করে রইল অমিত।অমিতের চুপ করে থাকা দেখে,একটু বিষন্ন হল তিন্নি।কিছুসময় পর বলল,-"জানো,আমার এক কলেজ বান্ধবীর বর,তাকে কত কিছু সাজগোজের জিনিষ এনে দেয়। ও তো সব সময় নিজেকে সাজিয়ে রাখে।"

বেড সুইচ টা জ্বালিয়ে দিল অমিত।এখন তিন্নির গুমরে থাকা মুখ টা দেখা যাচ্ছে। কপালের উপর থেকে চুুল গুলোকে কানের উপর তুলে দিয়ে অমিত বলল,-"প্রকৃতি কে কখনো বাইরে থেকে সাজানো যায়? দেখেছো তুমি? প্রকৃতি নিজে নিজেই সেজে ওঠে, আপনা থেকেই সুন্দর। বসন্ত এলে নিজেকে ফুলে ভরিয়ে তোলে, বৃষ্টিতে শরীর ভিজিয়ে নেয়,গ্রীষ্মের দখিনা বাতাশে ফুর ফুর করে ডানা মেলে......বাইরে থেকে কোনো মানুষ তুলির টান দিয়ে তাকে সাজাতে পারে না।সে নিজেই এত সুন্দর যে, সবাই তাকে হিংসে করে।সে মুখোশ না লাগিয়েও চিরন্তন সুন্দর। ......তুমিও হলে ওই প্রকৃতির মতো। ন্যচারাল বিউটি।.. শীতের সময় তুমি যখন সোয়েটার আর টুপি মাথায় দাও,খুব সুন্দর লাগে।বৃষ্টিতে ভিজলে,ভেজা শরীর,ভিজে চুলে আরও সুন্দর হয়ে ওঠো তুমি।গরমের ঘামে সিক্ত শরীর আকর্ষনীয় হয়ে ওঠে।সৌন্দর্যতা,ভেতরের জিনিষ,বাইরে থেকে যতই পালিশ করো না কেন, একসময় সেটা উঠে যাবেই।আর তখন আসল চেহারাটা বেরিয়ে পড়বে। ডিএসএলআর ক্যামেরার লেন্সে তুমি যতই সুন্দর হও না কেন, মানুষের চোখের লেন্স টাই আসল।সেখানে ফাঁকি দেওয়ার কোনো যায়গা নেই।"

তিন্নির মাথা গুলিয়ে গেল।কি বলবে,সে কিছুই বুঝতে পারলো না।অমিতের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলো।তারপর অমিত কে কাছে টেনে নিয়ে তার বুকে মুখ লুকালো।তিন্নির মনে হল, অমিত আর অমিত নেই।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শেষের কবিতা' র অমিত রায় হয়ে গেছে-"ফ্যাশানটা হল মুখোশ,স্টাইলটা হল মুৃখশ্রী।"


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

আমাদের নূতন ফোটোগ্রাফি ব্লগ সাইট ভিসিট করুন। ব্লগে প্রবেশ করতে লিঙ্কে ক্লিক করুন।www.picsalove.blogspot.com


Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ছোটগল্প " হট প্যান্ট "

গল্পটি সম্পর্কে  : মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় লেখক দের লেখা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে লিখতে।এ গল্পটিও তেমনি আমার প্রিয় লেখক প্রচেত গুপ্তের একটি গল্প থেকে অনুপ্রানিত।শুধু অনুপ্রানিত বলবো না, অনেকাংশে প্লটের মিল আছে।তবে গল্পের থিম বা, বিষয় বস্তু সম্পুর্ন আলাদা। তাই ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই লেখাটা লিখলাম। গল্প পড়ূয়া ফেসবুক পেজ ঃ  http://www.facebook.com/golpoporuya (১) বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিরি গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরম।দিনের বেলা যে খুব সূর্যের তাপ, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।তবুও হাঁসফাঁস করে দিন কাটাতে হচ্ছে।বৈশাখের শেষ। আম– কাঁঠাল পাকার পরিবর্তে পচে যাবে বেশি।বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক দেরি।এবছর বৃষ্টি আসবেও কিনা,তাতেও সন্দেহ আছে।বাংলার আবহাওয়া বর্তমান অবস্থা,এমন হাস্যকর যে, কোনো কিছুই সঠিক ভাবে বলতে পারেন না আবহাওয়া দপ্তর। রাত দশটা বেজে গেছে।গরম কালে এটা কোনো ব্যাপার নয়।বিশেষত শহরের দিকে তো এটা অনেকটা সন্ধ্যা নামার মতো ব্যাপার।ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে।একটা টেবিল ফ্যান ও আছে কিন্তু তাতেও গরম কাটছে না।টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে রমেন বাবু, একটা ধুতি পরে খালি গায়ে বসে স্কুলের খাতা