Skip to main content

একটি ছোটগল্প পড়ুন " ঢপের প্রেম "




আমরা চোখ গুলো বড় বড় করে বললাম, -"তারপর?"

অনি হাসলো।অনির ভালো নাম অনীক পাত্র। পাঁট ফুট আট ইঞ্চির লম্বা চেহারা।রোগা-পাতলা। মাথায় কাঁটার মতো চুল।সরল সাধাসিধে ছেলে। দেখতে মোটামুটি হলেও হাব-ভাব একটু বোকা বোকা ধরনের।সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি বিশ্বাস করে নেয়।সেবার যীশু মজা করেই অনি কে বলেছিল,আমাদের ক্লাসের রিম্পা,তোকে পছন্দ করে। ভালোওবাসে মনে হয়।কথাটা শোনার অনির সে কি,লাজুক লাজুক ভাব।চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল লজ্জায়।তার কিছুদিন পর অনি নিজেই,রিম্পার কাছে সেটা শুনতে গেল। বুঝতেই পারছেন, ব্যাপার টা কি ঘটতে পারে! রিম্পা একটা টর্নেডো তে পরিনত হল।আর সেই ঝড়ে অনি উড়ে এসে পড়ল আমাদের কাছে। আমি বললাম,-" তোর কি কোনো বুদ্ধি-সুদ্ধি নেই? রিম্পার,জ্যান্ত টমক্রুজের মতো একটা বয়ফ্রেন্ড থাকতে,তোকে আবার ভালোবাসতে যাবে কোন দু:খে?"
এই হল অনীক পাত্র।এরকম আরও বোকামোর নিদর্শন আছে ওর।

আমাদের বড় বড় চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে অনি বলল,-"তারপর আর কি! চারিদিকে অন্ধকার।আমি হিসু থামিয়ে,প্যান্টের চেন টেনে শব্দটা অনুসরন করে এদিক-ওদিক তাকালাম..।
মাঝখানে তাল কাটলাম আমি।বললাম,-"সেদিন তোর হাতে তো টর্চ লাইট ছিল।টর্চ মারলি না কেন?"
-"উফ! বলতে দিবি তো!" বিরক্ত হল অনি। তারপর বলতে শুধু করল,-"শব্দটা অনুসরন করে,টর্চের আলো ফেলতেই দেখতে পেলাম।"
-"কি...কি দেখলি!" আমরা সবাই প্রায় সমস্বরে কথাটা বলে উঠলাম।
অনি চুপ করে রইল।আমাদের মতো আপনারাও জানতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন বুঝতে পারছি।


(১)

গল্পটার শুরু কিছুদিন আগে। ক্লাবের ঘড়িতে সাড়ে চারটে।কয়েক জন বন্ধু মিলে ক্যারম পিটছি।হঠাৎ অনি প্রবেশ করলো।পরনে জিনস, আর তার উপরি ভাগে,সবুজের উপর সাদা চেকের ফুল শার্ট।পায়ে অফিসিয়াল সু।চোখে চশমা।ঘরের ভেতর ঢোকার সাথে সাথেই দমকা হাওয়ার মতো একটা পারফিউমের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল সারা ঘরে।যীশুর চোখ ছিল বোর্ডের উপর লাল গুটির দিকে।সেখান থেকে চোখটা সরিয়ে অনির দিকে চেয়ে বলল,-"এরকম ভোজপুরি হিরোদের মতো স্টাইল মেরে কোথায় যাচ্ছ মামা?"
হো হো হো করে হেসে উঠল সবাই।যীশুর সব ভাল,শুধু একটাই দোষ।ভালোকে কোনোদিন ভালো বলে না।ভালো লাগলেও তাকে এমন একটা কিছু বলবে,যে আগুন্তকের মুখ টা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাবে।যীশুর কথায়,অনির মুখের অবস্থা সেইরকম হল।আমার দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো বলল,-" আচ্ছা ভাই, আমাকে কি ভোজপুরি হিরোদের মতো লাগছে?"
আমি বললাম,-"ধুর! ওর কথা ছাড়।ও ভালোজনের কদর করতে জানে না।তোকে একদম বলিউডি হিরোদের মতো লাগছে।"
অনি হাসলো।লাজুক হাসি।মনে হয় ওর বুকটা দশ টাকার বেলুনের মতো ফুলে গেল।আপাতত খেলা থেমে আছে।আমি অনির দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলাম,-"তো,এই বিকেল বেলা, হিরোদের মতো পোজ মেরে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?"
অনি হেসে বলল,-"একটা অ্যাপো আছে ভাই। তারপর আবার সিনেমা দেখার প্রোগ্রাম।"
অ্যাপো!
আমি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বললাম,-"তুই এখনো মেয়েটার পেছনে পড়ে আছিস?তোর কপালে দু:খ আছে।ওই মেয়ে যদি তোকে এক সপ্তাহের মধ্যে বালিগঞ্জ স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের পাশে বাটি হাতে না বসাতে পেরেছে, তো আমি ক্লাবে ঢোকা বন্ধ করে দেবো।"
-"না রে,ও আমায় খুব ভালো বাসে।"
-"ছাই বাসে।ও সব টাকা ঝাড়ার ভালোবাসা। ওরকম মেয়েদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।"

যেটা স্বপ্নেও কল্পনা করা কঠিন,ঠিক সেটাই হল। অনি শেষপর্যন্ত ক্যাটরিনা কাইফের প্রেমে পড়ল। না,হিন্দি সিনেমার ক্যাটরিনা কাইফ নয়। আমাদের পাড়ার ক্যাটরিনা কাইফ।কথাটা প্রথম যেদিন অনি আমাদের বলেছিল,সেদিন আমাদের কারও বিশ্বাস হয়নি।কিন্তু যেদিন দেখলাম ভিক্টোরিয়ার সামনে হাত ধরে দু'জন দাঁড়িয়ে আছে,সেদিন বুঝেছিলাম কেসটার মধ্যে কিছু গুবলেট আছে।নইলে,এত ছেলে থাকতে, আমাদের গোবেচারা অনি টাকে কেউ মোরগ করে!
ঝিমলি হল আমাদের পাড়ার ক্যাটরিনা কাইফ। তার দিকেএকবার তাকালে চোখে ঝিলমিল লাগবেই।পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চির লম্বা, স্লিম চেহারা। দুধ সাদা গায়ের রঙ।লম্বা মুখ,টানা টানা চোখ, সরু কোমর, ফোলা ফোলা ঠোঁট,মাথায় কালো চুল পিঠের মাঝ বরাবর সাজানো। হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট,আর একটা শর্ট গেঞ্জি পরে যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটে তখন ছেলেদের বুকের ভেতরের প্লেট গুলো সব নড়ে চড়ে, ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।আর সেই মেয়ে যদি আমাদের অনির প্রেমে পড়ে তবে একটু অবাকই হতে হয়! ঝিমলির বাবা বড় বিজনেস ম্যান। আবার আমাদের ক্লাবের প্রেসিডেন্ট।তাই সামনাসামনি আমরা কেউ কিছু বলতে পারিনা।এর আগে যে কত ছেলে, ঝিমলির কাছে ল্যাঙ্গ খেয়ে হাত-পা ভেঙেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।সবথেকে লেটেস্ট, পাশের পাড়ার ঋকের কথাটা ভাবতে আমাদের খুব খারাপ লাগে।ছেলেটা সব সময় এসে আমাদের ক্লাবে পড়ে থাকতো। একবছর ধরে খেয়ে দেয়ে ঝিমলি যখন ঋক কে ছেড়ে দিল, তখন অলরেডি ঋকের হার্টের প্রবলেম এসে গেছে।এখনও নাকি ছেলেটা প্রতি সপ্তাহে ডাক্তারের কাছে হার্ট দেখাতে যায়।সান্ত্বনা প্রাইজ বলতে, একবছরে একটা চুমু।জানি না! আমাদের অনির ভাগ্যে কি লেখা আছে? শেষ পর্যন্ত না,হার্টটা কেই না,সার্জারি করতে হয়!
আমার কথায়,কানে না তুলে অনি বলল,-"না রে,সত্যিকারের ভালো না বাসলে,কেউ প্রতিদিন ওরকম ঘুরতে যায়! আমার সাথে হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে অনেক রাত পর্যন্ত।"
-"তোর টাকা আছে যতক্ষন,ঝিমলির ভালোবাসা ততক্ষন।"
-"ধুর! ঝুম ওরকম মেয়েই নয়। আসলে তোরা ও কে বুঝতে ভুল করিস।"
বীতান আমার পাশ থেকে খ্যাঁক করে উঠল। বীতানের বাড়ি ঝিমলির বাড়ির পাশেই।একদম গায়ে গায়ে।বলল,-"আবার ঝুম,বলা হচ্ছে! আমাকে ওসব বুঝাতে এসো না, চাঁদু।ও কে সেই প্যান্ট না পরা অবস্থা থেকে আমি দেখে আসছি। খুব ভালো করেই চিনি।"
অনি,বীতানের কথার কোনো উত্তর করল না। পকেট থেকে একটা প্যাকেট বের করল। আমাদের সামনে ধরলো। প্যাকেট টার উপর ঝুঁতে পড়লাম আমরা।রঙিন কাগজে মোড়া প্যাকেট।
-"কি আছে এর ভেতর?" আমরা বিস্ময় মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
-"ঘড়ি।আজ ওর জন্মদিন,তাই কিনলাম।কত দাম জানিস?"
-"কত?" কোরাস সুরে বললাম।
-"পাঁচ হাজার টাকা।"
-"পাঁ-চ-চ -হা-জা-র!"
-"হুম।আর আজ এটা দিলে ও দেবে বলেছে।"
-"কি দেবে!" পাঁচ হাজারের থেকে এটা আরও জোরে ধাক্কা মারলো আমাদের।
-"ওই, মেয়েরা ভালোবেসে যেটা দেয়।" বলল অনি।
-"কোনটা রে!"আমাদের কথাটা শোনার জন্যে হার্টবিট বেড়ে গেল।
-"আজ আমাকে কিসি দেবে বলেছে।"
এতক্ষন দম বন্ধ করে ছিলাম। অনির 'কিসি'র কথা সাইকেলের টিউবের মতো ভেতরের হাওয়া বাইরো বেরিয়ে এল।উত্তেজনা উধাও।আমি বললাম,-"ওটা এর আগে অনেকজন কে দিয়েছে। এটা ধরলে হয়তো ফাইভ হ্যান্ড কিস হবে। নতুন করে কিছু মনে করার নেই।"
রনি,আমার ডান পাশে চলে গিয়ে আবার ক্যারম বোর্ডে মন দিল।তারপর বোর্ডের স্টাইক টা হাতে নিয়ে বলল,-"এই ভাবে বাবার ব্যঙ্কের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে,ঝিমলির পেছনে ঢালিস না। বরং আমাদের ক্লাব ঘরে একটা এয়ার কান্ডিশন লাগিয়ে দে।এই ঘড়ঘড়ে ফ্যানের নীচে আর ক্যারম বোর্ড খেলতে ভালো লাগে না।"
যীশু সম্মতি দিল রনির কথায়।-"ঠিক বলেছে রনি।একবার ভেবে দেখ অনি,তোর নামটা ক্লাবের সামনে জ্বলজ্বল করবে।"
মুখটা মেয়েদের মতো বেঁকিয়ে অনি বলল,-"দরকার নেই।ভালোবাসার তোরা কিছু বুঝিস না। আমার নামটা ঝুমের মনে জ্বলজ্বল করলে চলবে।"
কথাটা বলে অনি আর দাঁড়ালো না।দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল।শুধু পারফিউমের গন্ধটা রয়ে গেল।

(২)

-"তোর মোরগ টা যে এখনো এল না!"ঝিমলির দিকে তাকিয়ে বলল মেয়েটি।
-"আরে ঠিক আসবে।একটু ওয়েট কর।" ঝিমলি একবার ঘড়ির দিকে চাইল।তারপর চোখ জানালা দিয়ে বাইরে দিল।
-"তুই কিন্তু এটা ঠিক করছিস না।ছেলেটি সত্যি সত্যি তোকে ভালোবাসে হয়তো।এভাবে এতটা ওকে ঝেড়ে খাস না।" ঝিমলির ডানপাশে বসে থাকা চোখে চশমা দেওয়া মেয়েটা বলল।
-"চুপ কর তো।ভালোবাসলে,বয়ে গেল।এরকম সুযোগ সব সময় আসে না।"নাক সিঁটকে বলল ঝিমলি।
রেস্টুরেন্টের ভেতরটিতে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব।খুব একটা ভিড় নেই।এরকম সময় ভিড় ও হয় না। সন্ধ্যা থেকে হয়তো হবে।আশেপাশের টেবিল গুলোতে কিছু লোকজন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো বসে আছে।একটা টেবল ঘিরে ঝিমলি আর তার চারজন বন্ধু এসে বসে আড্ডা মারছে।একটু পরেই,অনি এসে ঢুকলো।
-"সরি!.. সরি!..একটু লেট হয়ে গেল।" অনি হেসে বলল।
-"অনি,এত লেট করলে কেন তুমি?" একটু ঠোঁট ফুলিয়ে বলল অনি।
-"সরি,ঝুম।"
তারপর চেয়ারে বসে রঙিন প্যাকেট বের করলো অনি।-"ঝুম,তোমার জন্মদিনের উপহার।"
ঝুমকে হাত দিতে হল না।বন্ধু রাই আগে টেনে নিয়ে খুলে ফেলল প্যাকেট টা।-"ওয়াওও! কি সুন্দর ঘড়ি রে।কত দাম এটার?" সবাই সমস্বরে বলে উঠল।
-"পাঁচ হাজার" বলল অনি।
-"পাঁ-চ-চ-হা-জা-র!" কেউ কেউ হায় হায় করে উঠল।ইস! আমার বয়ফ্রেন্ড টা যদি এরকম হত!
অনীক তেমন কিছু বলল না।লজ্জাবতী গাছের মতো নুইয়ে পড়ল।তারপর ওয়েটার কে ডাকল।
-"বলুন স্যার!" ওয়েটার সামনে এসে দাঁড়ালো।
ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে,অনি বলল,-"তোমরা কে কি খাবে, অর্ডার করে দাও।আমি তো জানি না,তোমাদের কি পছন্দ!"
ঝিমলি অনির দিকে তাকিয়ে হাসল।মুচকি হাসি।বলল,-"তুমি কি ভালো গো।তোমাকে আগে কেন ভালোবাসি নি আমি!"
-"মানুষ চিনতে তুই ভুল করিস।এত দিনে একটা সত্যিকারের মন খুঁজে পেলি রে।আমাদের গুলো সব হাড় কিপটে।" পাশ থেকে ঝিমলির একটা বন্ধু বলল।
অনিও হাসল।লাজুক লাজুক হাসি।টেবিলের উপর আঙুল বাজাতে বাজাতে বলল,-" ভালোবাসলে, মানুষ সব পারে।আর সামন্য গিফট, খাওয়ানো কোনো ব্যাপার নাকি!"
কিছুক্ষন পর খাবার এল প্লেটে।খাওয়া শেষ করে ওরা যখন বেরোলো,তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। রেস্টুরেন্টের বাইরে বেরিয়ে ঝিমলি তার বন্ধুদের উদ্দেশ্য বলল,-"এই, তোরা গাড়ি ধরে চলে যা।আমরা সিনেমা দেখতে যাব।"
ফুটপাত ধরে কিছুটা হাঁটলো ওরা।তারপর একটা ট্যাক্সি ধরল।ট্যাক্সি তে উঠে অনি দুষ্ট হাসি হেসে বলল,-"আমার গিফট টা কিন্তু বাকি আছে ঝুম।"
অনির চোখের দিকে তাকলো ঝিমলি।দুষ্টমি চোখে বলল,-" একটু সবুর কর।অত ব্যস্ত হলে হয়।এসব জিনিষে ব্যস্ততা করতে নেই।সিনেমা হলে যাচ্ছিতো.....।"
আর কথা বলল না অনি।আরও বেশ কিছুক্ষন পর ট্যাক্সি গিয়ে থামলো,সিনেমা হলের সামনে।


(৩)

আজ সন্ধ্যাবেলা ক্লাবে ঢুকতেই অনিকে আগে থেকেই দেখতে পেলাম।টি.ভি তে খেলা দেখছে। আজ তাহলে ব্যাটা,নিশ্চয় ছুটি নিয়েছে।নইলে এমন সন্ধ্যা বেলা তো ওর পাত্তা পাওয়ার কথা নয়। আমাকে দেখেই দাঁত বের করে হাসল অনি।আমি চেয়ারে বসেই বললাম,-"কি ব্যাপার ভাই,আজ তোর অফ ডে নাকি?"
-"হু।আজ ঝুমের গানের ক্লাস থাকে।"আমার দিকে তাকিয়ে বলল অনি।
-"আর সেদিন 'কিসি' কেমন খেলি?"
আমার এই প্রশ্নে টি.ভি র পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকালো অনি।বলল,-"ধুর!কিসি হয়নি।এমন একটা সিনেমা দেখতে ঢুকলাম, সারাক্ষণ স্ক্রিনে আলো।একটু অন্ধকার হলো না!ঝুম আবার রোমান্টিক মুহুর্ত না এলে কিসি করতে পারে না।"
আমরা হেসে উঠলাম।হাসি থামিয়ে আমি বললাম,-"সত্যি অনি,তুই একটা বোকা।মেয়েটা তোকে নিয়ে টেবল টেনিস খেলছে আর তুই সেটা বুঝতে পারছিস না?"
থ্রিলার গল্পের নায়কের মতো হেসে অনি বলল,-" আমি অত বোকা নই রে।"
আমি হাসবো না,কাঁদবো বুঝতে পারলাম না। বীতান পাশ থেকে বলল,-"তোর মনে আছে অনি, ক্লাস এইটে একটা মেয়ে তোর সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে,গা ঘেষে বসে প্রেম প্রেম ভাব দেখিয়ে তোর টিফিন খেত।আর তুই না খেয়ে দিয়ে দিতিস।মেয়েটা শেষ পর্যন্ত তো টিফিন আনাই ছেড়ে দিল! "
-"ধুর,তখন ছোটো ছিলাম।" অনি হেসে বলল।
আমার আর সহ্য হল না।বললাম,-"তুমি মাল টা সেই একইরকম আছ। কোনো পরিবর্তন হয়নি। নইলে ঝিমলির মতো পরজীবীর পিছনে কেউ ইনভেস্ট করে?ওটা পুরো চিট ফান্ড একটা। কোনো রিটার্ন নেই।"
অনি মুচকি মুচকি হেসে,পা নাড়াতে নাড়াতে বলল,-"যতটা ভাবছিস ততটা বোকা আমি নই। তবে গল্পটা শোন।"
গল্প!
আমাদের চোখ কপালে উঠল।সবাই একসাথে বললাম,-"কি গল্প?"
অনি বলতে শুরু করলো।....সেদিন আমাদের ক্লাবের পিকনিকের কথা মনে আছে?পিকনিক সেরে রাত দশটার দিকে যখন আমাদের বাড়ির গলির মুখে যখন ঢুকলাম,তখন রাস্তা টা অন্ধকার।বেশির ভাগ ইলেক্ট্রিক পোস্টের লাইট ভেঙে যাওয়ায়,গলিটা অন্ধকারই থাকে। আমিও সেই সুযোগে পাশের ড্রেনে হিসু করতে দাঁড়ালাম। ঠিক তখন পাশ থেকে আওয়াজ টা এল।দুটো মানুষ জড়াজড়ি করলে যেমন আওয়াজ হয়,ঠিক তেমন। আমরা চোখ গুলো বড় বড় করে বলল,-"তারপর?"
অনি হাসলো।আমাদের বড় বড় চোখ গুলোর দিকে তাকিয়ে অনি বলল,-"তারপর আর কি! চারিদিকে অন্ধকার।আমি হিসু থামিয়ে,প্যান্টের চেন টেনে শব্দটা অনুসরন করে এদিক-ওদিক তাকালাম..।
মাঝখানে তাল কাটলাম আমি। বললাম,-"সেদিন তোর হাতে তো টর্চ লাইট ছিল।টর্চ মারলি না কেন?"
-"উফ! বলতে দিবি তো!"বিরক্ত হল অনি। তারপর বলতে শুধু করল,-"শব্দটা অনুসরন করে,টর্চের আলো ফেলতেই দেখতে পেলাম।"
-"কি...কি দেখলি!" আমরা সবাই প্রায় সমস্বরে কথাটা বলে উঠলাম।
অনি কিছুক্ষন চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করল।....দেখি,আমার জেঠুর মেয়ে,আর ঝুমের দাদা চাকুমচুকুম করছে।আমাকে দেখেই সরে দাঁড়ালো।ওদের মুখ গুলো সব এক মুহুর্তে শুকিয়ে গেল।
-"মিতু দি,তুই এখানে?এত রাতে? এখনো পড়ে বাড়ি ঢুকিস নি?আমি টর্চ মেরেই বললাম।
মিতু দি আমার কাছে এসে হাতে-পায়ে ধরার মতো করে বলল,-"সোনা,ভাই আমার,বাড়িতে গিয়ে যেন কাউকে বলিস না।বাবা মেরে ফেলবে আমাকে।"
বেশ দারুন একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম।আমি হেসে বললাম,-"সে না হয় বলবো না।কিন্তু ফ্রি তে কত দিন আর কাজ করবো?"
-"কি চাই বল?"দিদি বলল।
-"তেমন কিছু না,আমার মাঝে মাঝে হপ্তা দিলেই হবে।"
মিতু দি,ঝুমের দাদা কে কাছে ডেকে বলল,-"দেখো না,ও কি বলছে!বাড়ি গিয়ে একবার বলে দিলে, আমাদের প্রেম আর হবে না।বাবা এমনিতেই রাগী,প্রেম-ট্রেম একদম পছন্দ করেন না।আর আজ যেটা হল,সেটা শুনলে.....। "
সে ব্যাটার ও মুখ দেখলাম,চুন হয়ে গেছে। তারপর ঝুমের দাদাকে সব বুঝিয়ে দিলাম,কি করতে হবে। ব্যাস! আর কি! তারপর থেকে দাদার থেকে টাকা নিয়ে,তার বোনের সাথে প্রেমের খেলা চলছে।
অনি এক টানা কথা বলার পর মুখ বন্ধ করলো। আর আমাদের মুখ হাঁ হয়ে গেল।বুঝতে পারলাম, অনি আগের থেকে অনেক উন্নতি করছে।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Comments

Popular posts from this blog

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

একটি ছোটগল্প " হট প্যান্ট "

গল্পটি সম্পর্কে  : মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে আমার প্রিয় লেখক দের লেখা থেকে অনুপ্রানিত হয়ে লিখতে।এ গল্পটিও তেমনি আমার প্রিয় লেখক প্রচেত গুপ্তের একটি গল্প থেকে অনুপ্রানিত।শুধু অনুপ্রানিত বলবো না, অনেকাংশে প্লটের মিল আছে।তবে গল্পের থিম বা, বিষয় বস্তু সম্পুর্ন আলাদা। তাই ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়েই লেখাটা লিখলাম। গল্প পড়ূয়া ফেসবুক পেজ ঃ  http://www.facebook.com/golpoporuya (১) বেশ কিছুদিন ধরে বিচ্ছিরি গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরম।দিনের বেলা যে খুব সূর্যের তাপ, সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।তবুও হাঁসফাঁস করে দিন কাটাতে হচ্ছে।বৈশাখের শেষ। আম– কাঁঠাল পাকার পরিবর্তে পচে যাবে বেশি।বৃষ্টি আসতে এখনও অনেক দেরি।এবছর বৃষ্টি আসবেও কিনা,তাতেও সন্দেহ আছে।বাংলার আবহাওয়া বর্তমান অবস্থা,এমন হাস্যকর যে, কোনো কিছুই সঠিক ভাবে বলতে পারেন না আবহাওয়া দপ্তর। রাত দশটা বেজে গেছে।গরম কালে এটা কোনো ব্যাপার নয়।বিশেষত শহরের দিকে তো এটা অনেকটা সন্ধ্যা নামার মতো ব্যাপার।ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটা বন বন করে ঘুরছে।একটা টেবিল ফ্যান ও আছে কিন্তু তাতেও গরম কাটছে না।টেবিলের পাশে একটা চেয়ারে রমেন বাবু, একটা ধুতি পরে খালি গায়ে বসে স্কুলের খাতা