Skip to main content

অ্যাডভেঞ্চার গল্প " শিকার " ~স্বদেশ কুমার গায়েন।



গল্পটি সম্পর্কে: এ গল্পটি সত্যজিৎ রয়ের অ্যাডভেঞ্চার  গল্প পড়তে পড়তেই, ওনার থেকেই অনুপ্রানিত হয়ে লেখা।

গোপীনাথপুর গ্রাম টি ছোটো নয়। ছড়ানো ছেটানো মাটির ঘর গুলোর মাঝে, দু একটা পাকা ইটের বাড়ি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামটির পাশ দিয়ে একটা ছোটো নদী দক্ষিন দিকে বয়ে চলে গেছে। নদীটি বিশাল বড় না হলেও, আবার ছোট ও বলা যায় না। বেশীরভাগ মেছো নৌকা, বড় বড় মালবাহী বোট চলাফেরা করে এই নদীটি টি দিয়ে। অবশ্য সেসব ভরা জোয়ারের সময়। নদীটির ওপারে বিরাট এলাকা জুড়ে এক তৃণভোজী জঙ্গল। তৃণভোজী কেন বললাম? আসলে, হরিন,শিয়াল, বনমোরগ, বিভিন্ন পাখি ইত্যাদি ছাড়া হিংস্র কোনো প্রানী এ জঙ্গলে নেই।আর শীতের মরসুমে পরিযায়ী পাখির দল সারা বন টাকে মুখরিত করে তোলে। তবে এই এই কথা টা একমাত্র সুবিমল বাবুই ভালো বলতে পারেন। কারন জঙ্গলের সাথে তার গভীর একটা সম্পর্ক আছে। এবার একটু সুবিমল বাবুর কথায় আসি।

গ্রামটির ঠিক মাঝখানে একটা প্রাইমারী স্কুল। এটা হয়তো গ্রামের অনেক মানুষই জানেন না। কিন্তু সুবিমল বাবু যেদিন এই গ্রামে পা দিয়েছিলেন তার কয়েক সপ্তাহ বাদ বুঝে গিয়েছিলেন-স্কুলটি ঠিক গ্রামের মাঝে। গত পনেরো বছর ধরে সুবিমল বাবু এই স্কুলে ভূগোল পড়াচ্ছেন। লম্বা চওড়া চেহারা,ফর্সা, বয়স  চল্লিশের কাছাকাছি। কিন্তু চেহারা তে বয়েসের ছাপ স্পষ্ট নয়। ভূগোলের শিক্ষক হওয়াতে, বন, জঙ্গল, পাহাড়, পর্বত, নদী নালা, ইত্যাদির উপর একটা অন্যরকম টান অনুভব করেন। এছাড়া তার অন্য একটা পেশা আছে, পেশা বলা ভুল নেশাই বলা যায়,– পাখি শিকার করা। প্রতি রবিবার তার নিজস্ব এয়ারগান বন্দুক নিয়ে ওই নদী পার হয়ে জঙ্গলে যান পাখি শিকার করতে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল আহত পাখিদের বাড়ি এনে শুশ্রূষা করে আবার ছেড়ে দেন।

এরকম একটা শীতের রবিবার। বেলা দু টো বাজতেই, সুবিমল বাবু এক কাঁধে বন্দুক,আর অন্য কাঁধে একটা ছোটো জলের বোতলের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ভাঁটার সময় এই নদীটিতে জল থাকে না। বালির চর দেখা যায়। তখন হেঁটে পার হওয়া যায়-এ নদী। আর সুবিমল বাবুর জোয়াট- ভাঁটা সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান। সব সময় খেয়াল রাখেন কখন জোয়ার আর কখন ভাঁটা চলছে? অবশ্য জোয়ার হলেও তেমন কোনো সমস্যা নেই। শুধুমাত্র ঘন্টা দু'য়েক আগে বের হতে হবে আর কি!
সুবিমল বাবু যখন নদীর পাড়ে পৌঁছলেন তখন নদীতে পুরোপুরি ভাঁটা নামেনি। এক হাঁটু জল হবে। প্যান্ট টা হাঁটু পর্যন্ত ভাঁজ করে তিনি নদীতে নেমে পড়লেন। ধীরে ধীরে নদী টি যখন হেঁটে পার হয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করলেন, তখন ঘড়িতে আড়াইটের একটু বেশী বাজে। জঙ্গলে প্রবেশ করতেই একটা অন্যরকম অনুভূতি তৈরী হল তার মনে। আজ জঙ্গল টা এত নিশ্চুপ কেন! একটা পাখিও আজ ডাকছে না। যদিও সুবিমল বাবু বনে প্রবেশ করলেই সমস্ত পাখিরা বুঝতে পেরে চুপ করে থাকে। কিন্তু আজ একটু অন্যরকম মনে হল তার— যেন কোনো এক মায়াবী তার মায়াবলে সারা বন টাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। সুবিমল বাবু ধীরে ধীরে  সামনে এগোতে লাগলেন। পায়ের নীচে শুকনো পাতার মচ মচ শব্দ ছাড়া আর কিছু কানে আসে না। হাঁটতে হাঁটতে বনের অনেক ভিতরে চলে এলেন, কিন্তু একটাও পাখির দেখা পেলেন না। অদ্ভূত তো! এরকম তো কোনদিন হয় নি! গেল কোথায় বনের সব পাখি? সবাই এক সাথে পরামর্শ করে,এ বন ছেড়ে চলে গেছে? সুবিমল বাবুর জেদ চেপে গেল। সব শিকারি মানুষের এরকম অবস্থা হয়। আরও গভীরে প্রবেশ করতে লাগলেন তিনি। কিন্তু পাখি তো দূরের কথা, একটা প্রানীও দেখতে পেলেন না। অবশেষে একটা বড় গাছের নীচে হতাশ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন ।এদিক-ওদিক ঘাড় ঘোরাতে লাগলেন। লতা-পাতার ফাঁক দিয়ে যত দূর তার চোখ যায়। কিছুই দেখতে পেলেন না।  – না! আজ আসাটা পুরো বেকার হয়ে গেল, মনে মনে ভাবলেন সুবিমল বাবু।

শীতের দিন। তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমে জঙ্গলের মধ্যে। তাই বাড়ি ফিরে যাওয়ার মনস্থির করলেন তিনি। বন্দুক টা ঘাড়ে ঝুলিয়ে পিছন দিকে পা বাড়িয়েছেন,হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে একটা শব্দ এল। প্রথমে মনে হল ইঁদুর প্রজাতির কোনো প্রানীর ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ।  সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে সেই ঝোপের দিকে চোখ ফেরালেন সুবিমল বাবু। – একটা পাখি ঝোপের আড়ালে বসে আছে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। শুধু তার রঙিন পালক গুলোই চোখে পড়ছে তার।
সুবিমল বাবুর ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসির ঝিলিক দেখা দিল।– যাক! আজ আর খালি হাতে ফিরতে হবে না। একটা গাছের আড়ালে সরে গিয়ে ঘাড় থেকে বন্দুক টা নামিয়ে পাখিটির দিকে তাক করলেন। ট্রিগার চাপতে যাবেন, ঠিক এমন সময় একটা হরিন সামনে চলে এল। সুবিমল বাবু গুলি চালালেন না, হরিন টি চলে যাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিন মিনিট হয়ে গেল। হরিন টি সরলো না। লতাপাতা খেয়েই চলেছে। সুবিমল বাবু আর অপেক্ষা করলেন না,কারন পাখিটি উড়ে যেতে পারে।আবার  হাতের বন্দুক টা তুলে আবার পাখিটির দিকে টিপ করলেন। গুলি চালাতে যাবেন, ঠিক সেই  সময় ঘটে গেল এমন এক বীভৎস ঘটনা, যা তিনি কল্পনাও করেননি। পাখিটি ঝোপের ভেতর থেকে উড়ে এসে,বিকট স্বরে গর্জন করে  তার বড় বড় ডানার ঝাপটায় হরিনটিকে মাটিতে ফেলে , লম্বা সূঁচালো ঠোঁট পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে একটানে নাড়ি ভুড়ি সব বের করে আনল। চোখের পলকে আরও কয়েকবার সেই বড়, সূঁচালো ঠোঁট ঢুকে গেল হরিনটির শরীরের ভেতর।
সুবিমল বাবুর পা দুটো কাঁপতে লাগল থর থর করে। ভয়ে গলা শুকিয়ে এল তার।এত বড় পাখি, আর তার এত বড় ঠোঁট এর আগে কখনো তিনি দেখেন নি। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন, তার জামা ধরে পিছনে কেউ টানছে। ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন তিনি– কে?
আসলে কিছুই ছিল না। কাঁটা লতায় বেধে তার জামায় টান পড়েছিল। কিন্তু এই চিৎকারে ঘটে গেল অঘটন। সুবিমল বাবু স্পষ্ট দেখতে পেলেন পাখিটি হরিন টি কে ছেড়ে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতের বন্দুক টা কখন নীচে পড়ে গেছে খেয়াল নেই তার। স্বভাববশত, পিছন ফিরে উর্দ্ধশ্বাসে দৌড়াতে লাগলেন।ছুটতে ছুটতে বন পেরিয়ে নদী, নদী পেরিয়ে, বড় রাস্তা ধরে যখন তার বাড়ির গেটের কাছে পৌছলেন তখন চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে পেছন দিকে ফিরে তাকালেন– না, কিছুই নেই।

বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা। একদিন সকালবেলা চা খেতে খেতে খবরের কাগজ পড়তে গিয়ে প্রথম পাতার নীচে একটা হেড লাইনে সুবিমল বাবুর চোখ আটকে গেল।-" অার্জেন্টিনায় দেখা মিলল মানুষ খেকো পাখির।" একটা ছিন্ন ভিন্ন মানুষের ছবির উপরে পাখিটির ছবি দেওয়া। ছবিটি দেখতেই সুবিমল বাবুর ভিতর টা ছ্যাঁত করে উঠল।হাত- পা কেঁপে উঠল। সেই বড় ডানা, সেই তীক্ষ্ণ চোখ, লম্বা সূচালো ধারালো ঠোঁট, যা তিনি কিছুদিন আগে এখান কারই জঙ্গলে পাখি শিকার করতে গিয়ে দেখেছিলেন।

স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১২)

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি প্রেমের গল্প " অসমাপ্ত প্রেমের পাঁচ বছর পর "

(১) মাঝে মাঝে মনে হয়,জীবনে ভালবাসা কেন আসে,আর আসলেও কেনই বা চলে যায়? যদি চলে যায়,পরে কি আবার তাকে ফিরে পাওয়া যায়? হয়তো বা যায়। আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। যদিও বা পাওয়া যায়,তাকে কি নিজের করে নেওয়া যায়?সবাই পারে না, কেউ কেউ পারে। এটা তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর নির্ভর করে।গল্প শুরুর আগে হয়তো অনেক বকবক করে ফেললাম! আপনারা হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। যাইহোক এবার আসল গল্পটা বলি। যেদিন প্রথম কলেজে উঠলাম,সেদিনই বুঝে গিয়েছিলাম এ মেয়ে আমার পড়াশুনার বারোটা বাজানোর জন্যই এই কলেজে ভর্তি হয়েছে। বাংলা ডিপার্টমেন্টের এত ঝাঁকে ঝাঁকে মেয়ের মধ্যেও,সে যে আলাদা করে সবার কাছে চোখে পড়ার মত।আর দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার ও চোখে পড়ে গেল।সদ্য আঠেরো তে পড়েছি। মনের মধ্যে একটা শিহরন, রোমান্স,উশখুশ, ফ্যান্টাসি ভাব যে তৈরী হচ্ছিল সেটা ভালই টের পাচ্ছিলাম। ওরকম দুধের মতো গায়ের রঙ, টানা–টানা চোখ,মাথার ঘন কালো চুল পিঠের মাঝ বরাবর ছড়ানো,উন্নত বুক,চিকন চেহারা দেখলে মনের ভেতর একটা ভূমিকম্প, উথাল পাথাল তরঙ্গমালা তৈরী হয়। সে যেন বন্য হরিনী! স্থির,শান্ত,মনোহরিনী তার চোখের চাহনি ভোলবার নয়।সারা শরীরে, সারাক্ষন একটা চপলতার ভা