Skip to main content

অনুগল্প "একা একা "~ স্বদেশ কুমার গায়েন





খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে বিনীতা। বালিশের উপর একপাশে কাত করে রাখা মাথাটা।চুল গুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে।মাথার সামনে ঝুলে থাকা বেড সুইচ টা একবার অফ করছে,একবার অন করছে।টিক-টক।সুইচ টিপলে ঠিক যেমনটা আওয়াজ হয়। ঠিক তেমন।আলোটা একবার নিভছে, আবার জ্বলে উঠছে।সে এক আলো-আধাঁরি পরিবেশ।
কিছুক্ষন আগে টিভি দেখছিল বিনীতা।একটা হিন্দি সিরিয়াল।সাথিয়া না,কি যেন সিরিয়াল টার নাম।সন্ধ্যাবেলা,ফ্লাটের সব ঘর থেকে এই সিরিয়ালের আওয়াজ শোনা যায়।বিনীতাও দেখে মাঝে মাঝে।সিরিয়াল যে তার খুব ভালো লাগে,তা ঠিক নয়।আগে কোনোদিন সেভাবে দেখিনি।তাই অনেকটা সময় কাটানোর মতো। কিন্তু কতক্ষন এভাবে সময় কাটানো যায়? চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে রিমোট টা সোফার উপর ছুঁড়ে ফেলে-সোজা খাটের উপর।তারপর যত রাগ নিরীহ,বেচারা সুইচ টার উপর পড়ল।

ঘড়িতে রাত ন'টা বেজে পঁইতাল্লিশ মিনিট। এখনো পুরোপুরি পঁইতাল্লিশ মিনিট হয় নি। মিনিট দু'য়েক বাকি।অনীকের অফিস থেকে ফিরতে এখনো মিনিট কুড়ি বাকি।কি করে ভালো লাগে! সেই সকাল ন'টায় অফিস বেরিয়ে যায় অনীক।ফিরতে ফিরতে রাত দশ টা।কখনো ট্রেন মিস করলে এগারোটাও বাজে।অনীক অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পর, সারাদিন টা বিনীতার একা একা কাটে এই ফ্লাটে।কলকাতার বুকে,দু'কামরার এই ছোট্ট ফ্লাটটির দক্ষিন দিক টা খোলা।নীল আকাশ দেখা যায়।সেই আকাশে হলুদ পাখি ওড়ে। লাল পাখিও উড়তে পারে। মাঝে মাঝে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই আকাশের সাথে শুভদৃষ্টি খেলে বিনীতা।ভালো লাগে না তার-আকাশের সাথে শুভদৃষ্টি খেলতে। সে একবার ভালো লেগেছিল।তার বিয়ের সময়। লাল ওড়নার আড়ালে যখন অনীক তার দিকে তাকিয়ে ছিল।একমাত্র অনীকের সাথেই শুভদৃষ্টি খেলতে ভালো লাগে তার।আর কারও সাথে নয়।

বিনীতা গ্রামের মেয়ে।সুশীলা,বিনম্র,ভদ্র, শিক্ষিতা। গ্রাজুয়েট।মেদিনীপুর জেলায় বাড়ি। বাবা মারা যাওয়ার পর,মা নিজের হাতেই তাকে বড় করে তুলেছে।মানুষ করেছে, পড়িয়েছে। অবশ্য বিনীতার মামা রাও যে সাহয্য করেনি,তা নয়।যতটুকু পেরেছে, ততটুকুই।কখনো পর করে দেখেনি।মাস দেড়েক হল বিনীতার বিয়ে হয়েছে। হঠাৎ করেই বিয়েটা হয়ে যায়।প্রথমে পরিচয়, তার কিছুদিন পরই বিয়ে। মামার ছেলের বিয়েতে গিয়েই,অনীকের সাথে তার পরিচয়। তার দাদার বন্ধু অনীক।বিনীতা কে দেখে,তার সাথে কথা বলে,বেশ ভালোই লেগে যায়।তারপর বিয়ের পিঁড়ি পযন্ত এগোতে আর বেশি টাইম লাগেনি। ছেলে হিসেবেও অনীক মন্দ নয়।বড় চাকুরী করে, কলকাতায় ফ্লাটে থাকে,দেখতেও সুন্দর। আর কি চাই!


বিয়ের আগে বিনীতা স্বপ্ন বুনতো।তাদের বাড়ির উঠোনে তুলশী মঞ্চের পাশে,সবেদা গাছের নীচে বসে।সব সময় অনীকের কাঁধে মাথা দিয়ে বসে আছে।এক সাথে গল্প করছে। মাথা-মুন্ডহীন গল্প। কিন্তু বিয়ের পর,কোথায় কি! সারাটা দিন তাকে একা একা কাটাতে হয়।এক সাথে থাকা বলতে, শুধু রাত টা।সারাদিনে এত গল্প তার মনে জমে থাকে যে, রাত ও ছোটো হয়ে যায়।কোনো গল্পই বলা হয় না।একবার অভিমান করে অনীক কে বলেছিল,-"আমি সারাটা দিন একা একা থাকতে পারি না।সময় কাটতে চায় না।"
বিনীতাকে কাছে টেনে অনীক হেসে বলেছিল,-"একা কোথায়? টিভি দেখো, গান শোনো,ভিডিও গেম খেলো....।"
-"আমি কি বাচ্চা মেয়ে,যে ভিডিও গেম খেলবো।" ঠোঁট ফুলিয়ে বলেছিল বিনীতা।
বিনীতা কিছুই দেখে না।কিছুই খেলে না।একা একা চার দেওয়ালের মধ্যে থাকা যে কত কষ্টের, কত যন্ত্রনার সে বোঝে।


বেড সুইচ টা অফ করে দিয়ে,জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় বিনীতা।বাইরে চোখ রাখে।যেন জোছনা সমুদ্রে বান ডেকেছে।কতদিন কাটাবে এভাবে সে!হঠাৎ তার মন টা চলে যায় অনেক দূরে।কলকাতা,হাওড়া পেরিয়ে মেদিনীপুরে। গ্রামের নিজের ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে।


তার মা ও তো একা একা আছে....সারা দিন,
সারা রাত......।


স্বদেশ কুমার গায়েন (২০১৬)

Comments

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প " পোস্টমাস্টার "

প্রথম কাজ আরম্ভ করিয়াই উলাপুর গ্রামে পোস্ট‌্মাস্টারকে আসিতে হয়। গ্রামটি অতি সামান্য। নিকটে একটি নীলকুঠি আছে, তাই কুঠির সাহেব অনেক জোগাড় করিয়া এই নূতন পোস্ট্আপিস স্থাপন করাইয়াছে। আমাদের পোস্ট‌্মাস্টার কলিকাতার ছেলে। জলের মাছকে ডাঙায় তুলিলে যেরকম হয়, এই গণ্ডগ্রামের মধ্যে আসিয়া পোস্ট‌্মাস্টারেরও সেই দশা উপস্থিত হইয়াছে। একখানি অন্ধকার আটচালার মধ্যে তাঁহার আপিস ; অদূরে একটি পানাপুকুর এবং তাহার চারি পাড়ে জঙ্গল। কুঠির গোমস্তা প্রভৃতি যে-সকল কর্মচারী আছে তাহাদের ফুরসত প্রায় নাই এবং তাহারা ভদ্রলোকের সহিত মিশিবার উপযুক্ত নহে। বিশেষত কলিকাতার ছেলে ভালো করিয়া মিশিতে জানে না। অপরিচিত স্থানে গেলে, হয় উদ্ধত নয় অপ্রতিভ হইয়া থাকে। এই কারণে স্থানীয় লোকের সহিত তাঁহার মেলামেশা হইয়া উঠে না। অথচ হাতে কাজ অধিক নাই। কখনো কখনো দুটো-একটা কবিতা লিখিতে চেষ্টা করেন। তাহাতে এমন ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন যে, সমস্ত দিন তরুপল্লবের কম্পন এবং আকাশের মেঘ দেখিয়া জীবন বড়ো সুখে কাটিয়া যায় – কিন্তু অন্তর্যামী জানেন, যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখাপল্লব-সমেত সমস্ত গাছগুলা কাটিয়া পাকা রাস্

পুলিশ বউ~ছোট গল্প [ স্বদেশ কুমার গায়েন]

মদের শেষ পেগ টা সাবাড় করে দিয়ে বললাম, — "তোরা বুঝবি না,বউ যদি পুলিস হয় তাহলে কি সমস্যায় পড়তে হয়! মনে হয়- নিজের বাড়িতে নয়, যেন লকাপে আছি। সারক্ষন একটা ভয়ে ভয়ে থাকি।" কুরকুরের প্যাকেট টা মুখের রেখে নাড়াতে নাড়াতে সুদীপ বলল,— "ঠিক বলেছিস ভাই, তোর মধ্যে সেই সিংহ গর্জন টা আর দেখতে পাই না।মনে হয়,না খেতে পেয়ে সিংহ শুকিয়ে ইঁদুর হয়ে গেছে।" ওরা তিন জন হো হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম। খালি মদের বোতল টা রাস্তার উপর আছাড় মেরে বললাম,- "সব আমার মা, বাবা আর দিদির মাস্টার প্লান। আমাকে জব্দ করতেই পুলিসের সাথে বিয়ে দিয়েছে।" পাশ থেকে রনি একটু টিপ্পনী কাটল,-" রাতে তোর বউ, গায়ে-টায়ে হাত দিতে দেয় তো?" রনির কথা শুনে হাসি পেল আমার।মনে মনে বললাম,—" তুই শালা মাল খেলেও পয়মাল, না খেলে ও পয়মাল। সব সময় অন্যের বেডরুমের কথা শুনতে ইচ্ছা করে। একমাত্র আমিই জানি বউ এর পাশে শুলে আমার হাত পা কত জোরে কাঁপে।" হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সন্ধে সাত টা বেজে গেছে। সুদীপ বলল,- "অনেক দিন পর মদ খেলি,চল তোকে এগিয়ে দিই একটু।" ওদের দিকে দু হাত জোড়ো করে বললাম

একটি থ্রিলার গল্প " খুনি "

বাংলা থ্রিলার গল্প - ' খুনি '  আমি একটা খুন করেছি। ভুল বললাম,একটা নয় দু'জন কে।নৃশংস খুন যাকে বলে,ঠিক তেমন।তবে খুন টা বড় কথা নয়। খুন তো যে কেউ করতে পারে।আমার মনে হয়েছিল,ওদের দু'জনের বেঁচে থাকা উচিত নয়, তাই খুন করেছি।কিন্তু মজার ব্যাপার হল,পুলিশ আমাকে ধরতে পারছে না।প্রতিদিন পুলিশের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি,খুনি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য ও বলে দিচ্ছি, কিন্তু তার পরে ও পুলিশের ধরার ক্ষমতা নেই।এই দেখুন,এখন থানায় এসে বসে আছি....। (১) গল্পটা তাহলে একটু আগে থেকেই বলি।বছর খানেক আগের কথা।সেদিন আমাদের বিবাহবার্ষিকী।এক বছর পুর্ন হল আমাদের বিয়ের।সকাল থেকে মন টা বেশ ভালোই।এদিন সবারই মন ভালো থাকে।আমারও আছে।এ দিন এলেই বিয়ের সেই কথা মনে পড়ে।বাড়ি জুড়ে কত মানুষ জন,আলোর রোসনাই,সানাই এর সুর, মেয়েদের উলুধ্বনি,সাত পাকে ঘোরা,শুভদৃষ্টি, কান্নাকাটি আরও অনেক কিছু।সবেমাত্র এক বছর,তাই হয়তো আমার এত কিছু মনে আছে। পুরানো হলে হয়তো থাকবে না।আবার থাকতেও পারে। ভোর থেকে উঠেই ব্যস্ত অসিত।আমার দিকে তার থাকানোর সময় নেই।ঘড়িতে আট টা বাজে। এখনো পর্যন্ত শুধু একটা মাত্র চুমু।ভালো লাগে এরকম! রাতে অসিত